উত্তর : যদি আপনি কাজের উদ্দেশ্যে এবং জীবিকা অন্বেষণের উদ্দেশ্যে সফর করতে চান, তাহলে আপনার উপর মুসলিম দেশগুলোতে সফর করা অপরিহার্য, আলহামদুলিল্লাহ্ সে দেশগুলো কাফিরদের দেশগুলোর চেয়ে অধিক ধনী। কারণ, কাফির দেশে সফর করলে আক্বীদা, ঈমান, দ্বীন ও আখলাক্ব বিনষ্টের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কাফিরদের দেয়া জাতীয়তা গ্রহণ করা বা তাদের দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করা জায়েয নয়। কেননা এর অর্থ হল- তাদের বশ্যতা স্বীকার করা এবং তাদের শাসনে প্রবেশ করা (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমা, ১২/৫৮ পৃ.)।
প্রথমেই জানা উচিত যে, কাফিরদের দেশে সফর করা এবং সেখানে বসবাস করা বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে বৈধ হতে পারে। যেমন-
(১) মানুষ যেন তার দ্বীনের ব্যাপারে নিরাপদ থাকে, এতটা জ্ঞান ও ঈমান তার মধ্যে থাকতে হবে যা তাকে বিভ্রান্তি থেকে দূরে রাখবে।
(২) সে যেন অন্তরে কাফিরদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা থেকে বিরত থাকে।
(৩) সে যেন তার দ্বীন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, যেমন ছালাত আদায় ইত্যাদি।
এটি হল সারকথা। আর বিস্তারিতভাবে বলা যায় যে, কাফিরদের দেশে বসবাস কখনও বৈধ হয়, কখনও তা মুস্তাহাব (বা প্রশংসনীয়) হয়, আবার কখনও তা হারাম হয়। এটি নির্ভর করে ঐ ব্যক্তির অবস্থা, তার বসবাসের উদ্দেশ্য এবং সে কতটুকু নিজের দ্বীন স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারছে তার উপর’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮৩৯১২)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কাফেরদের দেশে বসবাস করা একজন মুসলিমের দ্বীন, আখলাক্ব, চরিত্র এবং আচার-আচরণের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আমরা নিজেরা এবং অন্যরাও প্রত্যক্ষ করেছি যে, অনেকেই যারা সেখানে গিয়ে বসবাস করেছে, তারা সেখান থেকে বিপথগামী হয়ে ফিরে এসেছে। কেউ ফিরে এসেছে ফাসিক্ব হয়ে, কেউ বা ফিরে এসেছে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে। আবার কেউ সব ধর্মকেই অস্বীকার করেছে, ইসলাম ধর্মকে অস্বীকার করে নাস্তিকতায় পতিত হয়ে, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। এভাবে তারা চরম অবিশ্বাস ও দ্বীনের প্রতি বিদ্রƒপে লিপ্ত হয়েছে। এমনকি তারা সম্পূর্ণ অস্বীকারবাদে লিপ্ত হয়েছে, ধর্ম ও ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে উপহাস করেছে। এজন্যই সেখানে বসবাসের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন অপরিহার্য, বরং আবশ্যক এবং এমন শর্ত আরোপ করা যরূরী, যা এসব সর্বনাশা গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে এবং ধ্বংসাত্মক পরিণতি রক্ষা করবে।
কাফিরদের দেশে বসবাসের দু’টি মৌলিক শর্ত আছে। যথা: প্রথম শর্ত : বসবাসকারী তার দ্বীনের ব্যাপারে নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ তার মধ্যে পর্যাপ্ত জ্ঞান, ঈমান ও দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে যা তাকে দ্বীনের উপর অটল রাখবে এবং বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করবে। তার অন্তরে কাফিরদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করা থেকে দূরে থাকবে। কারণ তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা ঈমানের পরিপন্থী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আপনি পাবেন না আল্লাহ ও আখিরাতের উপর বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়, যারা ভালোবাসে তাদেরকে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করে- হোক না এ বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই অথবা এদের জ্ঞাতি-গোত্র...’ (সূরা আল-মুজাদিলাহ : ২২)।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। সুতরাং যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে আপনি তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিলিত হতে দেখবেন এ বলে যে, ‘আমরা আশঙ্কা করছি যে, কোন বিপদ আমাদের আক্রান্ত করবে’। অতঃপর হয়ত আল্লাহ বিজয় বা তাঁর কাছ থেকে এমন কিছু দেবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সে জন্য লজ্জিত হবে’ (সূরা আল-মায়িদা : ৫১-৫২)। নবী (ﷺ) বলেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১; ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৫৬)।
দ্বিতীয় শর্ত : সে যেন দ্বীন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। যেমনÑ সে যেন ছালাত, জুমু‘আহ, জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ এবং অন্যান্য ইবাদত পালন করতে পারে। যদি সে এসব করতে না পারে, তবে তার জন্য সেখানে বসবাস বৈধ নয়, বরং হিজরত করা তার জন্য আবশ্যক। ইমাম ইবনে কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) হিজরতের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ সম্পর্কে বলেন, প্রথম দল হলÑ সেই সব মানুষ যাদের উপর হিজরত করা ফরয। আর তারা হল এমন লোক, যারা হিজরত করতে সক্ষম এবং কাফিরদের দেশে বসবাস করে দ্বীন প্রকাশ করতে পারে না, ওয়াজিব ইবাদত পালনে অক্ষম থাকে। তাদের উপর হিজরত ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা নিজেদের উপর যুলুম করে, তাদের প্রাণ-হরণের সময় ফিরিশতাগণ বলে, ‘তোমরা কি অবস্থায় ছিলে?’ তারা বলে, ‘দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম’। তারা বলে, ‘আল্লাহর যমীন কি এমন প্রশস্ত ছিল না যেখানে তোমরা হিজরত করতে?’ এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস!’ (সূরা আন-নিসা : ৯৭)। এটি ভীষণ কঠোর হুঁশিয়ারি, যা হিজরতের ফরয হওয়ার প্রমাণ। কারণ দ্বীনের ফরয পালন করা ফরয, আর হিজরত হল সেই ফরয পূরণের উপায়। আর কোন ফরয আদায়ের জন্য যা প্রয়োজনীয়, সেটিও ফরয (আল-মুগনী, ৮/৪৫৭ পৃ.)।
উপরিউক্ত দু’টি মৌলিক শর্ত পূর্ণ হলে, কাফিরদের দেশে বসবাস ছয়টি ভাগে বিভক্ত হয়। যথা: প্রথম ভাগ : ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বসবাস করা। নবী (ﷺ) প্রত্যেক যুগে ও কালে তাবলীগ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জেনে থাকলেও তা অপরের কাছে পৌঁছে দাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১)। দ্বিতীয় ভাগ : কাফিরদের অবস্থা ও তাদের ধর্মীয় ভ্রান্তি, নৈতিক অধঃপতন, অনিয়ম-কানুন অধ্যয়ন করার জন্য বসবাস করা, যাতে মুসলিমদের সতর্ক করা যায়। এটিও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। তবে শর্ত হলোÑ এটি যেন বড় কোন ক্ষতির কারণ না হয়। তৃতীয় ভাগ : মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, যেমনÑ দূতাবাস বা কূটনৈতিক সম্পর্ক। তখন শাসক বা রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী বসবাস বৈধ হবে। চতুর্থ ভাগ : ব্যক্তিগত প্রয়োজন যেমনÑ ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা। এগুলোতে প্রয়োজনের তীব্রতা অনুযায়ী বসবাস বৈধ। আলিমগণ সর্বসম্মতিক্রমে এটিকে জায়েয বলেছেন, কারণ অসংখ্য ছাহাবী অমুসলিম দেশে ব্যবসায়িক সূত্রে যাওয়া আসা করতেন। পঞ্চম ভাগ : পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বসবাস করা। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ছাত্র সাধারণত শিক্ষককে আদর্শ মনে করে, তার চিন্তা-ভাবনা ও আচরণে প্রভাবিত হয়।
এজন্য ছাত্রের মধ্যে বাড়তি কিছু শর্ত থাকা যরূরী। যেমন: (১) পর্যাপ্ত মানসিক পরিপক্কতা। (২) শরী‘আতের পর্যাপ্ত জ্ঞান, যাতে হক্ব-বাতিল আলাদা করতে পারে। (৩) দৃঢ় ঈমান, যাতে বিভ্রান্তি ও পাপ থেকে বাঁচতে পারে। (৪) শেখার উদ্দেশ্যটি মুসলিম সমাজের প্রকৃত প্রয়োজনীয় জ্ঞানের জন্য হতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ষষ্ঠ ভাগ : স্থায়ী বসবাসের জন্য থাকা। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এতে সে কাফিরদের সাথে মিশে যায়, তাদের সমাজে পরিবার লালন-পালন করে, সন্তানরা তাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে বড় হয়ে ওঠে। এ অবস্থার কারণে নবী (ﷺ) বলেছেন, জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আমি ঐ সমস্ত মুসলিম থেকে দায়মুক্ত যারা মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তা কেন? তিনি বললেন, এইটুকু দূরে থাকবে যেন উভয়ের আগুন না দেখা যায়’ (আবূ দাঊদ, হা/২৬৪৫; তিরমিযী, হা/১৬০৪; ছহীহুল জামি‘, হা/১৪৬১; ইরওয়াউল গালীল, হা/১২০৭; সিলসিলা ছহীহাহ, ২/২২৮ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮৩৯১২)।
প্রশ্নকারী : আহমাদ শাওন, মিলান, ইতালী।