উত্তর : শারঈ পরিভাষায় শিরক হল- আল্লাহর সাথে অন্য কোন অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করা; আল্লাহর রুবূবিয়্যতের ক্ষেত্রে কিংবা ইবাদতের ক্ষেত্রে কিংবা তাঁর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَلَا تَجۡعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا وَّ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
‘তোমরা আল্লাহ্র সাথে সমকক্ষ নির্ধারণ করো না। অথচ তোমরা জান (আল্লাহই স্রষ্টা, তিনিই রিযিকদাতা)’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২২)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ جَعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا لِّیُضِلُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِہٖ ؕ قُلۡ تَمَتَّعُوۡا فَاِنَّ مَصِیۡرَکُمۡ اِلَی النَّارِ ‘তারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য তাঁর বহু সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছে। আপনি বলুন, তোমরা উপভোগ করতে থাক। তোমাদের গন্তব্য হচ্ছে অগ্নি’ (সূরা ইবরাহীম: ৩০)। নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, সে আল্লাহর সাথে অপর কোন সমকক্ষকে ডাকে সে অগ্নিতে প্রবেশ করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৯২)।
শিরকের প্রকারভেদ: কুরআন-সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, শিরক কখনও ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়। আবার কখনও কখনও ইসলাম থেকে খারিজ করে না। তাই আলেমগণ শিরককে দুইভাগে ভাগ করার পরিভাষা গ্রহণ করেছেন: বড় শিরক ও ছোট শিরক।
(এক) বড় শিরক হল- যেটি নিরেট আল্লাহর অধিকার এমন কোন অধিকার আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে প্রদান করা; সেটা আল্লাহর রুবুবিয়্যত (প্রভুত্ব)-এর ক্ষেত্রে হোক, কিংবা উলূহিয়্যত (ইবাদতে)-এ হোক, কিংবা তাঁর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে হোক। এ প্রকারের শিরক কখনও প্রকাশ্য হতে পারে: যেমন- মূর্তি ও প্রতিমাপূজারীদের শিরক কিংবা কবর, মৃতব্যক্তি ও অনুপস্থিত ব্যক্তি-পূজারীদের শিরক। আবার কখনও কখনও অপ্রকাশ্যও হতে পারে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব উপাস্যের উপরে যারা তাওয়াক্কুল করে, কিংবা মুনাফিকদের শির্ক ও কুফরের মত। কেননা মুনাফিকদের শিরক যদিও বড় শিরক, ইসলাম থেকে খারিজকারী শিরক, এই শিরককারী স্থায়ী জাহান্নামী; কিন্তু এটি গোপন। যেহেতু তারা বাহ্যতঃ ইসলাম প্রকাশ করে এবং কুফর ও শিরক গোপন রাখে। তাই তারা গোপনে মুশরিক; প্রকাশ্যে নয়। এই শিরক কখনও কখনও বিশ্বাসগত বিষয়গুলোতে হতে পারে: যেমন ঐ সব লোকদের বিশ্বাস যারা বিশ্বাস করে যে, এমন কিছু সত্তা রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে সৃষ্টি করে, জীবন দেয়, মৃত্যু দেয়, মালিকানা লাভ করে এবং এ বিশ্ব পরিচালনা করে। কিংবা এমন বিশ্বাস যারা করে যে, এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা আল্লাহর মত নিঃশর্ত আনুগত্য প্রাপ্য। ফলে তারা সেসব ব্যক্তি যা হালাল করে ও যা হারাম করে সেক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করে; এমনকি সেগুলো যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শরী‘আতের বিপরীত হয় তবুও। কিংবা আল্লাহর ভালবাসা ও আল্লাহকে সম্মানপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে শিরক: অর্থাৎ আল্লাহকে যেভাবে ভালোবাসে কোন মাখলূক্বকে ঠিক সেইভাবে ভালোবাসা। এটি এমন শিরক যা, আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এই শিরক সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য শরীকদেরকে আল্লাহর মত ভালোবাসে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৬৫)।
(দুই) ছোট শিরক: প্রত্যেক এমন সব বিষয় যা বড় শিরকের মাধ্যম কিংবা শরী‘আতের দলীলে যে বিষয়গুলোকে শিরক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু সেগুলো বড় শিরকের গণ্ডিভুক্ত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই শিরক দুই দিক থেকে সংঘটিত হয়ে থাকে। (১) এমন কিছু উপায়-উপকরণের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দিক থেকে আল্লাহ তা‘আলা যে সব উপায়-উপকরণের অনুমতি দেননি। যেমন- হাতের কব্জি, পুতি বা এ ধরণের কিছু এ বিশ্বাস নিয়ে লটকানো যে, এগুলো সুরক্ষার উপকরণ কিংবা এগুলো বদনজরকে প্রতিহত করে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা এগুলোকে এসবের উপকরণ বানাননি; না শরী‘আতের বিধান হিসাবে; আর না তাকদীরের নিয়ম হিসেবে। (২) কিছু কিছু জিনিসকে এমন সম্মান প্রদর্শন করার দিক থেকে; তবে এমন সম্মান যেটা ঐ জিনিসকে রুবূবিয়্যতের পর্যায়ে পৌঁছায় না। যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্যসত্তার নামে কসম করা কিংবা ‘যদি আল্লাহ ও অমুক না হত’ এভাবে বলা এবং এ ধরণের অন্যান্য কথা।
প্রশ্নকারী : আব্দুর রাযযাক, চারঘাট, রাজশাহী।