উত্তর : পর্যালোচনা সাপেক্ষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। প্রচলিত রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার উপকারিতা ও মুসলিমদের লাভের দিক এবং অংশগ্রহণের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে তুলনা করতে হবে। যদি উপকারিতা অধিক হয়, তাহলে অংশগ্রহণ জায়েয। আর যদি ক্ষতির দিকটি অধিক হয়, তাহলে অংশগ্রহণ জায়েয নয়। অতএব এ হুকুম দেশ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোন দেশে মুসলিমদের জন্য অংশগ্রহণ উপকারী হতে পারে, অন্য দেশে নাও হতে পারে। তেমনি ব্যক্তিভেদেও ভিন্নতা হতে পারে (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১১১৮৯৮)।
শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে নির্বাচনে অংশ নেয়ার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাবে বলেন, ‘আমি মনে করি এ নির্বাচনগুলোতে অংশ নেয়া ফরয। আমরা যাকে ভাল মনে করি তাকে সহযোগিতা করা ফরয। কারণ ভাল লোকেরা যদি ঢিলেমি করে তাহলে এ স্থানগুলোকে কারা দখল করবে? খারাপ লোকেরাই দখল করবে কিংবা এমন লোকেরা দখল করবে, যাদের কাছে না আছে ভাল, না আছে খারাপ, যারা সুবিধাবাদী। তাই আমাদের উচিত যাকে যোগ্য মনে করি তাকে নির্বাচিত করা। যদি কেউ বলেন, আমরা যাকে নির্বাচিত করলাম আইনসভার অধিকাংশ সদস্য তার বিপক্ষে। আমরা জবাবে বলব, কোন অসুবিধা নেই। এই একজনের মধ্যে আল্লাহ বরকত দিতে পারেন। তিনি যদি আইনসভার সামনে হক্ব কথা বলতে পারেন, তাহলে অবশ্যই এর প্রভাব থাকবে, প্রভাব থাকতেই হবে। তবে এক্ষেত্রে আমাদের অপরাধ যেটা হয় সেটা হচ্ছে, আল্লাহর সাথে বিশ্বস্ত না হওয়া। আমরা শুধু বৈষয়িক বিষয়ের উপর নির্ভর করি। সুতরাং আপনি যাকে ভাল মনে করেন, তাকে নির্বাচিত করুন, এরপর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন (লিক্বা‘আতুল বাব আল-মাফতূহ থেকে সংক্ষেপিত ও সমাপ্ত, ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১০৭১৬৬)।
সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নির্বাচনে কাউকে মনোনয়ন দেয়া ও ভোট দেয়া জায়েয আছে কি? উল্লেখ্য, আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থা আল্লাহর নাযিলকৃত আইন দ্বারা পরিচালিত হয় না। জবাবে তাঁরা বলেন, যে সরকার আল্লাহর নাযিলকৃত আইন দিয়ে শাসন করে না, শরী‘আহ আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে না কোন মুসলিমের জন্য সে সরকারে যোগ দেয়ার প্রত্যাশায় নিজেকে মনোনীত করা জায়েয নয়। তাই এ সরকারের সাথে কাজ করার জন্য কোন মুসলিমের নিজেকে কিংবা অন্য কাউকে নির্বাচিত করা জায়েয নেই। তবে কোন মুসলিম যদি এ উদ্দেশ্য নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয় কিংবা অন্যকে নির্বাচিত করে যে, এর মাধ্যমে এ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে ইসলামী শরী‘আহ ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ক্বায়িম করবে, নির্বাচনে অংশ গ্রহণকে তারা যদি বর্তমান শাসনব্যবস্থার উপর আধিপত্য বিস্তার করার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে সেটা জায়েয। তবে, সে ক্ষেত্রেও যে ব্যক্তি প্রার্থী হবেন তিনি এমন কোন পদ গ্রহণ করতে পারবেন না যা ইসলামী শরী‘আর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২৩/৪০৬, ৪০৭ পৃ.)।
স্থায়ী কমিটিকে আরো জিজ্ঞেস করা হয় যে, আপনারা জানেন, আমাদের আলজেরিয়াতে ‘আইনসভার নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়। কিছু কিছু দল আছে যারা ইসলামী হুকুমত ক্বায়িমের দিকে আহ্বান করে। আর কিছু কিছু দল আছে যারা ইসলামী হুকুমত চায় না। এখন যে ব্যক্তি এমন কাউকে ভোট দেয়, যে প্রার্থী ইসলামী হুকুম চায় না- সে ব্যক্তির হুকুম কী হবে? তবে এ ব্যক্তি ছালাত আদায় করে। জবাবে তাঁরা বলেন, যে সব দেশে ইসলামী শরী‘আহ ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালু নেই সেসব দেশের মুসলিমদের উপর ফরয ইসলামী হুকুমত ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়োজিত করা এবং যে দল ইসলামী হুকুমত বাস্তবায়ন করবে বলে তারা ধারণা করেন সে দলকে একজোটে সবাই মিলে সহযোগিতা করা। পক্ষান্তরে, যে দল ইসলামী শরী‘আহ বাস্তবায়ন না করার প্রতি আহ্বান জানায় সে দলকে সহযোগিতা করা নাজায়েয। বরং এ ধরনের সহযোগিতা ব্যক্তিকে কুফরের দিকে ধাবিত করে। দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: ‘আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের মাঝে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী বিধান দিন, তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যাতে করে আল্লাহ আপনার প্রতি যা নাযিল করেছেন তারা এর কোন কিছু হতে আপনাকে বিচ্যুত করতে না পারে। অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু পাপের শাস্তি দিতে চান। নিশ্চয় মানুষের মধ্যে অনেকেই ফাসিক্ব। তারা কি জাহিলিয়্যাতের বিধান কামনা করে? যারা (আল্লাহর প্রতি) বিশ্বাস রাখে তাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কে?’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৯-৫০)। এ কারণে যারা ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে না- আল্লাহ তাদেরকে কাফের হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাদের সাথে সহযোগিতা করা থেকে, তাদেরকে মিত্র হিসাবে গ্রহণ করা থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্য কাফিরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বন কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৫৭; ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ১/৩৭৩ পৃ.)।
এ বিষয়ে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিক্বাহ পরিষদ’ (المجمع الفقهي الإسلامي) একটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম হল- ‘অমুসলিমদের সঙ্গে মুসলিমের নির্বাচনে অংশগ্রহণ’। মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত ‘মুসলিম বিশ্বলীগ’ (رابطة العالم الإسلامي)-এর অধীনে ফিক্বাহ কাউন্সিলের উনবিংশ অধিবেশনে (২২-২৭ শাওয়াল ১৪২৮ হি. মোতাবেক ৩-৮ নভেম্বর ২০০৭ খ্রি.) এ বিষয়টি পুনরায় আলোচনা করা হয়। (এটি পূর্বে ১৬তম অধিবেশনে মুলতবী রাখা হয়েছিল)। গবেষণাপত্র ও আলোচনার পর কাউন্সিল নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে:
(১) অমুসলিম দেশে মুসলিমের নির্বাচনে অংশগ্রহণ শারঈ রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত বিষয়। এতে মাছলাহা (উপকার) ও মাফসাদা (ক্ষতি)-র ভারসাম্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সময়, স্থান ও পরিস্থিতি ভেদে ফাতাওয়া ভিন্ন হতে পারে। (২) যে মুসলিম কোন অমুসলিম দেশে নাগরিক অধিকার ভোগ করে, তার জন্য সংসদীয় নির্বাচন ও অনুরূপ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ জায়েয, যদি তার অংশগ্রহণের মাধ্যমে অধিকতর কল্যাণ সাধিত হয়। যেমন ইসলামের সঠিক চিত্র উপস্থাপন করা, নিজ দেশের মুসলিমদের বিষয়সমূহ রক্ষা করা, ধর্মীয় ও দুনিয়াবী সংখ্যালঘু অধিকার অর্জন করা, প্রভাবশালী অবস্থানে মুসলিমদের ভূমিকা জোরদার করা, ন্যায় ও ইনছাফের ভিত্তিতে মধ্যপন্থী ও সুবিচারপ্রবণ লোকদের সঙ্গে সহযোগিতা করা। তবে এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্তসমূহ মানতে হবে:
প্রথমতঃ অংশগ্রহণকারী মুসলিমের উদ্দেশ্য হবে বাকি মুসলিমদের কল্যাণ সাধন ও তাদের থেকে ক্ষতি দূর করা। দ্বিতীয়তঃ অংশগ্রহণকারীদের দৃঢ় ধারণা থাকতে হবে যে, তাদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। যেমন তাদের অবস্থান শক্তিশালী করা, সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের কাছে দাবিসমূহ পৌঁছানো এবং ধর্মীয় ও দুনিয়াবী স্বার্থ সংরক্ষণ করা। তৃতীয়তঃ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে তার দ্বীনের কোন ক্ষতি বা অবহেলা যেন না ঘটে (http://www.themwl.org/Fatwa/default.aspx?d=1&cidi=167&l=AR&cid=17)।
অনুরূপভাবে ইসলামী শরী‘আতের স্থিরিকৃত নীতিমালায় রয়েছে। যদিও নীতিমালাটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন: إِذَا تَعَارَضَتْ مَفْسَدَتَانِ رُوعِيَ أَعْظَمُهُمَا ضَرَرًا بِارْتِكَابِ أَخَفِّهِمَا ‘যদি দু’টি ক্ষতিকর বিষয় পরস্পর বিরোধী হয়, তবে অধিক ক্ষতিকরটি বর্জন করে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকরটি গ্রহণ করা উচিত’। ক্বায়িদাটি সূরা নিসার ২৫ নং আয়াতের অনুকরণে নির্মিত (আল-ওয়াজীয ফী ই’যাহী ক্বাওয়াঈদিল ফিক্বহ আল-কুল্লিয়্যাহ, পৃ. ২৬০; শারহু মাজাল্লাতিল আহকাম, পৃ. ২৮; আল-আশবাহ লিস সুয়ূত্বী, পৃ. ৮৭; আল-আশবাহ লি ইবনিন নুজাইম, পৃ. ৮৯)। অপর একটি নীতিমালায় রয়েছে, اَلضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ ‘প্রয়োজনে অবৈধ কাজও বৈধ হয়’ বা ‘অত্যন্ত প্রয়োজনে নিষিদ্ধ জিনিসও বৈধ হয়ে যায়’। ক্বায়িদাহ-টি সূরা আন‘আম: ১১৯, হজ্জ: ৭৮ ও বাক্বারার ১৭৩ নং আয়াতের অনুকরণে নির্মিত (আল-ওয়াজীয ফী ই’যাহী ক্বাওয়াঈদিল ফিক্বহ আল-কুল্লিয়্যাহ, পৃ. ২৩৪; তাফসীরে সা’দী, পৃ. ৮১)।
উপরিউক্ত মূলনীতির আলোকে শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচন পদ্ধতির প্রকৃত অবস্থা জানে, ইসলামে গণতন্ত্রের হুকুম কী সেটাও জানে, তারপরও এ পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেকে কিংবা অন্য কাউকে নির্বাচিত করে, সে ব্যক্তি ভয়াবহ শংকার মধ্যে রয়েছে। কারণ ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে ইসলাম বিরোধী। তবে যে ব্যক্তি এ পদ্ধতির অধীনে নিজেকে কিংবা অন্য কাউকে এ জন্যই নির্বাচিত করে, যাতে করে এই আইনসভাতে প্রবেশ করে এর বিরোধিতা করা যায়, এ পদ্ধতির বিপক্ষে দলীল উপস্থাপন করা যায়, সাধ্যানুযায়ী অকল্যাণ ও দুর্নীতি রোধ করা যায়। যারা যমীনে দুর্নীতি ছড়িয়ে দেয়, মানুষের দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ ধ্বংস করে দেয়, তারা যেন সুযোগ না পায় এবং পুরো ময়দান যেন দুর্নীতিবাজ ও নাস্তিকদের হাতে চলে না যায় সেই প্রচেষ্টা করতে হবে। তাই কল্যাণের দিক বিবেচনা করে ইজতিহাদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বরং কোন কোন আলিম মনে করেন, এ ধরনের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা ফরজ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১০৭১৬৬)।
প্রশ্নকারী : রফীকুল ইসলাম, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।