উত্তর : যে অজ্ঞতা ব্যক্তির জন্য ওযর (ক্ষমাযোগ্য) বলে গণ্য হয়, তা হল হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞতা। সুতরাং কেউ যদি কোন ফরয কাজ ছেড়ে দেয়, অথচ সে জানে না যে তা ফরয; অথবা কোন হারাম কাজ করে, অথচ সে জানে না যে তা হারামÑ তাহলে সে এমন অজ্ঞ ব্যক্তি, যে তার অজ্ঞতার কারণে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু যে ব্যক্তি জানে যে কাজটি হারাম, এরপরও তা করে, কেবল এই অজুহাতে যে সে জানত না এর শাস্তি কীÑএটি ওযর হিসাবে গণ্য হবে না। কারণ সে জেনে-বুঝে গুনাহে লিপ্ত হয়েছে এবং হারামকে লঙ্ঘন করেছে। যদি কেউ জানে যে যিনা হারাম, অথচ সে জানে না যে যিনাকারীর ওপর হদ্দ (শাস্তি) রয়েছে- তাহলে সে ক্ষমার যোগ্য হবে না; বরং শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তার ওপর যিনার হদ্দ ক্বায়িম করা হবে। অনুরূপভাবে, যদি কেউ ছালাত ত্যাগ করে এই অজ্ঞতায় যে ছালাত ফরয- তাহলে সে তার অজ্ঞতার কারণে ক্ষমাযোগ্য হবে এবং কাফির হবে না। কিন্তু যদি কেউ ছালাত ত্যাগ করে, এই জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও যে ছালাত ত্যাগ করা হারাম, তবে সে যদি না-ও জানে যে ছালাত ত্যাগ করা কুফর- তবুও সে ক্ষমাযোগ্য হবে না (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২০২৩৭)।
এ বিষয়ে দলীল ও আলিমদের বক্তব্যগুলো নিম্নরূপ :
(১) যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ কাজের হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল এবং তা করে ফেলেছে, অথচ সে কাজে হদ্দ বা কাফ্ফারা রয়েছে- তাহলে তার ওপর কিছুই প্রযোজ্য হবে না। রাসূল (ﷺ) সেই ব্যক্তিকে, যে নিজের ওপর যিনার স্বীকারোক্তি দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি জানো, যিনা কী?’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৪২৮)। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এর মধ্যে প্রমাণ রয়েছে যে, হারাম হওয়া সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তির ওপর হদ্দ ওয়াজিব হয় না। কারণ রাসূল (ﷺ) তাকে যিনার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন সে বলেছিল, ‘আমি তার সাথে হারাম পদ্ধতিতে সম্পর্ক করেছি, যেমনভাবে মানুষ তার স্ত্রীর সাথে হালাল পদ্ধতিতে করে’ (যাদুল মা‘আদ, ৫/৩৩ পৃ.)।
(২) যদি কেউ হারাম হওয়া জানে, কিন্তু এর পরিণত শাস্তি হদ্দ, কাফফারা বা অন্য কিছু- সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তাহলে তার ওপর হদ্দ ক্বায়িম করা হবে। কারণ সে জেনে-বুঝে হারাম কাজে সাহস দেখিয়েছে। আর যদি সে গুনাহের জন্য কাফ্ফারা নির্ধারিত থাকে, তাহলে তাকে কাফ্ফারাও আদায় করতে হবে।
মাআ‘ইয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছ- যেখানে তিনি যিনার স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। এতে তিনি বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ফিরিয়ে নিয়ে চলো। আমার আপনজনেরাই আমাকে হত্যার জন্য দায়ী। তারা আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা আমাকে বলেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে হত্যা করবেন না’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৪২০; সনদ হাসান, ইরওয়াউল গালীল, ৭/৩৫৪ পৃ.)। এই ছাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হারাম হওয়া জানতেন, কিন্তু শাস্তি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এতে প্রমাণ রয়েছে যে, শাস্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা হদ্দ বাতিল করে না- যদি সে হারাম হওয়া জানে। কারণ মাআ‘ইয জানতেন না যে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; তবুও এই অজ্ঞতা তার থেকে হদ্দ রহিত করেনি’ (যাদুল মা‘আদ, ৫/৩৪ পৃ.)।
অনুরূপভাবে সেই ছাহাবীর ঘটনা, যিনি রামাযানের দিনে স্ত্রীর সাথে সহবাস করেছিলেন। তিনি হারাম জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে করেছিলেন- যেমনটি হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন (ফাৎহুল বারী, ৪/২০৭ পৃ.)। এর প্রমাণ হল তার কথা, ‘আমি ধ্বংস হয়ে গেছি’, আর অন্য বর্ণনায়, ‘আমি পুড়ে গেছি’। তাই নবী (ﷺ) তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব করেছেন এবং কাফফারা সম্পর্কে তার অজ্ঞতাকে ওজর হিসাবে গ্রহণ করেননি (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১১১)।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি কেউ বলে! ‘যে ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এসেছিল, সে কি অজ্ঞ ছিল না? উত্তর হল, সে কী করতে হবেÑ এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিল; কিন্তু সে জানত যে কাজটি হারাম। এজন্যই সে বলেছিল, ‘আমি ধ্বংস হয়ে গেছি’। আমরা যখন বলি ‘অজ্ঞতাই ওজর’, তখন আমাদের উদ্দেশ্য হারাম কাজের পরিণাম সম্পর্কে অজ্ঞতা নয়; বরং কাজটি নিজেই হারাম কি না- এ বিষয়ে অজ্ঞতা। অতএব, যদি কেউ যিনা করে হারাম হওয়া সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেÑ যেমন এমন কেউ, যে অমুসলিম দেশে বসবাস করেছে, বা নতুন মুসলিম হয়েছে, বা দূরবর্তী মরুভূমিতে থেকেছে যেখানে তারা জানে না যে, যিনা হারামÑ তাহলে তার ওপর কোন হদ্দ নেই। কিন্তু যদি সে জানে যে যিনা হারাম, অথচ সে জানে না যে এর শাস্তি রজম বা বেত্রাঘাত ও নির্বাসনÑতাহলেও তার ওপর হদ্দ ক্বায়িম করা হবে। কারণ সে হারাম লঙ্ঘন করেছে। সুতরাং হারাম কাজের পরিণাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ওযর নয়; বরং কাজটি হারাম কি নাÑএ বিষয়ে অজ্ঞতাই ওযর’ (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৬/৪১৭ পৃ.)।
প্রশ্নকারী : কিফায়াত আলম জিতু, হালুয়াঘাট, ময়মনসিংহ।