উত্তর : কুপ্রবৃত্তি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনের জন্যই বড় ক্ষতিকর। এটা মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই এর বিরুদ্ধে কঠিনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া প্রতিটি মানুষের উপর অপরিহার্য। আবু হাযিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, قَاتِلْ هَوَاكَ أَشَدَّ مِمَّا تُقَاتِلُ عَدُوَّكَ ‘তুমি তোমার শত্রুর বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধ করো, তার থেকেও অত্যধিক কঠোরতার সহিত তোমার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো’ (হিলয়াতুল আওলিয়া, ৩/২৩১ পৃ.)। এই খেয়াল-খুশিই সকল অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার মূল এবং সকল বিপদ-আপদের কারণ। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
يَا نَفْسُ تُوْبِىْ فَإِنَّ الْمَوْتَ قَدْ حَانَا * وَاعْصِ الْهَوَى فَالْهَوَى مَا زَالَ فَتَّانَا
‘হে মন! তুমি তওবাহ কর, কেননা মরণ তো অতি নিকটে। আর খেয়াল-খুশির অবাধ্য হবে, কেননা খেয়াল-খুশি তো সব সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’ (কিতাবু মাজমু‘আতিল ক্বাসাইদিল যুহদিয়্যাত, ২/৯৫ পৃ.)। ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘যে তার কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করবে, সে প্রকারন্তরে দুনিয়াদার লোকদের দাসে পরিণত হবে’ (সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ১০/৯৭ পৃ.)।
দ্বিতীয়তঃ নফসের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের কয়েকটি উপায় হল:
(১) পাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা (তিরমিযী, হা/৩৫৯১; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৩২৯)।
(২) গোনাহের জায়গা ও সুযোগ থেকে দূরে থাকা : যে পরিবেশ বা মাধ্যম নফসকে উত্তেজিত করে, তা থেকে দূরে থাকা। যেমন নোংরা ম্যাগাজিন, পত্র-পত্রিকা, প্রেম-কাহিনীমূলক উপন্যাস, চলচ্চিত্র জগতের মডেল, অভিনেত্রী ও গায়িকাদের উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ চিত্র। এমন স্থানে ভ্রমণে না যাওয়া যেখানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা। যেমন মেলা, সৌখিন বাজার, পার্ক ও সমুদ্র-সৈকতে। নচেৎ এ অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভবপর হবে না (সূরা আল-আন‘আম : ১৫১; সূরা আন-নূর : ১৯,৩১)।
(৩) দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা : গোনাহ ছেড়ে দেয়ার দৃঢ় মানসিকতা তৈরি করা। কারণ, চক্ষুই হল হৃদয়ের আয়না, যখন কোন জিনিস চোখে ভালো লাগে তখনই তার প্রতি অন্তরে কামনা-বাসনা উদিত হয়। ভিডিও, টিভি বা মোবাইলে সিনেমা, সিরিয়াল ও শর্ট বা রিল ভিডিও দেখা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। নচেৎ কুঁয়োতে বিড়াল রেখে বালতি-বালতি পানি তুলে ফেললেও যেমন পানি পবিত্র হবে না। অনুরূপভাবে আপনিও চক্ষুকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঐ কু-অভ্যাস ছাড়তে পারবেন না (সূরা আন-নূর : ৩০-৩১; ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৭; আবূ দাঊদ, হা/২১৪৯, ২১৫২; তিরমিযী, হা/২৭৭৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৭৪, ২২৯৯১, ২৩০২১)।
(৪) একাকী থাকা যাবে না। বিশেষ করে পূর্বে যৌন-উত্তেজক কোন কিছু নজরে পড়ে থাকলে নির্জনে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সুতরাং সৎ বন্ধু বা দ্বীনি ভাইদের সংস্পর্শে থাকতে হবে। যথাসম্ভব রাত্রীতেও তারই নিকট কবর, পরকাল, মুসলিমদের বর্তমান দুরবস্থা প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করতে করতে পৃথক বিছানায় ঘুমিয়ে যান। তবে একাকীত্ব দূর করতে কোন খারাপ বন্ধুর কাছে বসা বা রাত্রি যাপন করা যাবে না (তিরমিযী, হা/২১৬৫; ছহীহুল জামি‘, হা/২৫৪৬)।
(৫) নফসকে বৈধ কাজে ব্যস্ত রাখা : যেমন বিভিন্ন প্রকার ইবাদত ও যিকির-আযকারে নিজেকে ও নিজের অন্তরকে ব্যস্ত রাখতে হবে। দ্বীনি বই-পুস্তক পড়ুন, অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করুন, কুরআন অথবা ইসলামী বক্তৃতা শুনুন (তিরমিযী, হা/৩৩৭৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৭৯৩; ছহীহুল জামি’ হা/৭৭০০; ছহীহুত তারগীব, হা/১৪৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৬৮০, ১৭৬৯৮)।
(৬) তাক্বওয়া বৃদ্ধির আমল করা : নিয়মিত ওয়াক্তমত ছালাত আদায়, কুরআন পাঠ, সকাল-সন্ধ্যার যিকর ও নফল ছিয়াম নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমরা ছিয়াম রাখ, তবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২/১৮৩)।
(৭) নিজের কৃতকর্মের জন্য বেশি বেশি তাওবাহ-ইসতিগফার করতে থাকা (সূরা হূদ : ৩, ৫২; সূরা আন-নূহ : ১০-১২; সূরা আল-ফুরক্বান : ৭০-৭১)। প্রতিদিন ১০০ বার আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করা। এটি হৃদয় কোমল করে এবং গুনাহ কমিয়ে দেয়। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হল তারা যারা তাওবাহ করে’ (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫১)।
(৮) ভালো সঙ্গী নির্বাচন করা : ভালো সঙ্গী নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আর খারাপ সঙ্গী খারাপ পথে পরিচালিত করে। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের অনুসারী হয়। সুতরাং তার বন্ধু নির্বাচনের সময় এ বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত, সে কাকে বন্ধু নির্বাচন করছে’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৮৩৩)।
(৯) ধৈর্যধারণ করতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৬৯, ৬৪৭০)।
প্রশ্নকারী : আব্দুর রব, বরিশাল।