উত্তর : ইসলামী স্কলারদের সর্বসম্মত মত হল বাইনারি ট্রেডিং (Binary Trading) হারাম। কারণ (১) ভবিষ্যত মূল্য অনুমান করে বাজি ধরা (গ্যাম্বলিং বা জুয়া)। (২) অনিশ্চয়তা (গারার)। (৩) প্রকৃত সম্পদের মালিকানা থাকে না। (৪) নির্দিষ্ট সময়ে ওঠা-নামার উপর ভিত্তি করে জয়/পরাজয়। এটি জুয়া জাতীয় লেনদেন হওয়ায় শরী‘আতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে বাইনারি ট্রেডিং বলতে বুঝায় যে, এমন এক ধরনের লেনদেন যেখানে আপনি কোন পণ্যের (যেমন, ডলার, সোনা, তেল ইত্যাদি) দাম ভবিষ্যতে বাড়বে না কমবে এই অনুমান বা পূর্বাভাস দিয়ে টাকা বিনিয়োগ করলেন। অতঃপর এই লেনদেনে যদি আপনার অনুমান সঠিক হয়, তাহলে আপনি নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ পাবেন। আর যদি অনুমান ভুল হয়, তাহলে আপনি আপনার পুরো টাকা হারাবেন। এটি মূলত জুয়া, যেখানে পণ্যের মালিকানা লেনদেনকারীর হয় না, শুধু দামের উপর বাজি ধরা হয়। সুতরাং এই ধরনের ব্যবসায় অংশগ্রহণ করা হারাম। এ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, পূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয় করার শর তো কেবল ঘৃণার বস্তু, শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা সেগুলোকে বর্জন কর- যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৯০)।
দ্বিতীয়তঃ সাধারণ ফরেক্স ট্রেডিং (Forex Trading) এটি মূলত মুদ্রা বিনিময় এবং ইসলামে শর্তসাপেক্ষে হালাল। তবে যেসব কারণে সাধারণত ফরেক্স হারাম হয়ে যায়- তাহলো : (১) লিভারেজ (Leverage) ব্যবহার। (২) সোয়াপ/রাতের চার্জ (Riba)। (৩) ট্রেডার প্রকৃত মুদ্রা হস্তগত না করে কাগুজে হিসাবের মধ্যে লেনদেন করে। (৪) ব্রোকারের সাথে চুক্তি পরিষ্কার না থাকা। (৫) অস্বচ্ছ ট্রেডিং পরিবেশ।
সুতরাং লিভারেজবিহীন, তাৎক্ষণিক হস্তান্তর-নির্ভর, সূদমুক্ত অ্যাকাউন্ট হলে ফরেক্স হালাল। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ব্রোকার/অ্যাকাউন্ট এসব শর্ত পূরণ করে না। ফরেক্স ট্রেডিং হল : বিভিন্ন দেশের মুদ্রা একে অন্যের সঙ্গে কেনা-বেচার একটি অনলাইন ব্যবসা। যেমন, আপনি ডলার দিয়ে ইউরো কিনলেন, পরে দাম বাড়লে আবার ইউরো বিক্রি করে ডলার নিলেন এইভাবে লাভ করেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুদ্রা বাজার। আন্তর্জাতিক ফিক্বাহ্ বোর্ডের সদস্যরা বলেন, আমাদের জানামতে বর্তমান সময়ে ফরেক্স ট্রেডিংয়ের যে পদ্ধতিগুলো প্রচলিত আছে, সেগুলোকে ইসলামী শরী‘আত পূর্ণরূপে সমর্থন করে না এবং এতে কিছু বড় শর্তগত ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে এগুলো নাজায়েয। সমস্যাসমূহ-
(১) কারেন্সি কেনা-বেচা শরী‘আতের দৃষ্টিতে ‘বাই’উস-সারফ’ (মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা লেনদেন) হিসাবে গণ্য হয়, যার মধ্যে উভয়পক্ষের পক্ষ থেকেই লেনদেনের একই বৈঠকে মালিকানা অর্জন করা যরূরী। উভয় পক্ষ অথবা কোন এক পক্ষ যদি তাৎক্ষণিক ক্ববজা না করে কিংবা যদি লেনদেন বাকি রেখে করা হয়, তাহলে তা শরী‘আতের দৃষ্টিতে অবৈধ হয়। তাই স্পট ট্রেড হোক বা ফিউচার ট্রেড যেসব কারেন্সি লেনদেনের মধ্যে কোন পক্ষ বা উভয় পক্ষ সম্পূর্ণ মালিকানা গ্রহণ না করে বাকিতে লেনদেন করে, সে সকল লেনদেন শরী‘আতসম্মত নয়। যখন উভয় পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক মালিকানা অর্জন হয় না, তখন সে লেনদেন বাতিল বলে বিবেচিত হয় এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত লাভ হালাল নয়।
(২) একটি স্বীকৃত ইসলামী নীতিমালা হল, যে বেচাকেনায় অবৈধ শর্ত আরোপ করা হয়, তা অবৈধ হয়ে যায়। ফরেক্স লেনদেনে বহু অনৈসলামিক শর্ত আরোপ করা হয়। যেমন সোয়াপস (Swaps)। এতে এই শর্ত থাকে যে নির্দিষ্ট একটি সময় পর বেচা-কেনা বাতিল করা হবে; অথচ ইসলামী শরী‘আতে একটি সম্পূর্ণ বেচা-কেনা সম্পন্ন হয়ে গেলে তা চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং দুই পক্ষের ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত বদলের অধিকার থাকে না।
(৩) তদ্রুপ, ‘অপশনস’ (Options)-এর লেনদেনেও এক প্রকার অবৈধ শর্ত থাকে, যেমন: ক্রেতাকে এমন অধিকার দেয়া যে, সে বিপরীত পক্ষের সম্মতি ছাড়াই পূর্বের বেচাকেনা বাতিল করতে পারে, যা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে লেনদেন বাতিল নিয়মের পরিপন্থী। যা ইসলামী শরী‘আতে শুধু উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতেই বৈধ।
(৪) উপরিউক্ত ফিউচার সেলের ধরণও শরী‘আতের দৃষ্টিতে অবৈধ, কারণ ইসলামে বেচা-কেনা তাৎক্ষণিক হওয়া যরূরী। ভবিষ্যতের তারিখ নির্ধারণ করে পণ্য বিক্রি করা বৈধ নয়।
(৫) ফরেক্স লেনদেনের আরেকটি বড় সমস্যা হল, মালিকানা অর্জনের আগেই তা অন্যকে বিক্রি করে দেয়া।
বাস্তবে দেখা যায়, ফরেক্স মার্কেটে প্রায় ৭০-৮০% লোক শুধু কারেন্সি রেটের ওঠানামা থেকে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে লেনদেনে অংশগ্রহণ করে। তারা বাস্তবে কোন কারেন্সি হাতে পায় না এবং মালিকানাও অর্জন করে না, বরং শুধু লাভের আশায় তা আবার অন্যকে বিক্রি করে দেয়। এছাড়াও একটি বড় ধোঁকার দিক হল, ব্রোকারের পক্ষ থেকে ব্যবহারকারীকে মালিক মনে করিয়ে শুধু ডিপোজিটের মাধ্যমে পণ্য কেনার সুযোগ দেয়া। অথচ বাস্তবে সেই পণ্য তার মালিকানায় আসে না। এমনকি যখন দাম কমে যায়, তখন ব্রোকার সেই লেনদেন একতরফাভাবে বাতিল করে দিতে পারে। অথচ ইসলামে ব্রোকার শুধু পরিষেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পেতে পারে, কিন্তু লেনদেন বাতিলের কোনো একতরফা অধিকার রাখে না। একজন ব্যক্তি কোনো কিছু কিনলে তার লাভ ও ক্ষতির দায় তার নিজের উপর বর্তায়; ক্ষতি দেখেই সে একতরফাভাবে লেনদেন বাতিল করতে পারে না, যতক্ষণ না অপর পক্ষ সম্মত হয়। উপরিউক্ত সকল শরী‘আতবিরোধী দিক ও দুর্নীতিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে বৈধ নয় (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১০৬০৯৪)।
একদা হাকিম ইবনু হিযাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কোন ব্যক্তি আমার নিকট এসে এমন জিনিস ক্রয় করতে চায় যা আমার কাছে নেই। আমি কি বাজার থেকে তার জন্য ঐ জিনিস ক্রয় করে আনবো? তিনি বলেন, لا تبِع ما ليسَ عندَكَ ‘তোমার কাছে যা নেই তা বিক্রি করো না’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫০৩; তিরমিযী, হা/১২৩২; নাসাঈ, হা/৪৬১৩)।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি-বিষয়ক নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। যার মাধ্যমে সর্বাগ্রে মানুষের অধিকার সুরক্ষা করা যায়, ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক লেনদেনকে ধোঁকা, প্রতারণা, ঠগবাজি, জুয়াচুরি, নকল, জাল ও ভেজাল থেকে মুক্ত রাখা যায়। মানুষ যেন নিশ্চিন্তে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত হাদীছে নির্দিষ্ট করে ঐ জিনিস বিক্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে যা তার মালিকানাধীন নয়। এখানে নিষেধ করার কারণ হল, যদি সে এমন জিনিস বিক্রয় করে যা তার অধীনে নেই, তাহলে সে সেটি পাওয়ার ব্যাপারে সুনিশ্চিত হতে পারবে না, কারণ একই বৈশিষ্ট্যের জিনিস নির্ধারিত সময়ে সে পেতেও পারে আবার নাও পেতে পারে। এটিই তো প্রতারণা। আর যে ক্রয়-বিক্রয় কোন ধরনের প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত, মূলত সেটিই হল ধোঁকা, প্রবঞ্চনা, ঠগবাজি (‘আওনুল মা‘বূদ)।
আজ শেয়ার বাজারে বা অন্যান্য দোকানে দেখা যায় অধিকাংশ সময় মানুষ এমন জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করে, যা তার মালিকানাধীন ও অধিকারভুক্ত নয় এবং সেটি তার আয়ত্তেও নেই। শরী‘আতের আলোকে এরূপ ব্যবসা নিষিদ্ধ। সাধারণত শেয়ার ব্যবসায় পণ্য নিজ আয়ত্বে না নিয়েই ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। অথচ শরী‘আতের দৃষ্টিতে ক্রয়কৃত বস্তু হস্তগত হওয়ার পূর্বে বিক্রয় করা হারাম। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমরা রাসূল (ﷺ)-এর যুগে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতাম। তখন তিনি আমাদের নিকট এ মর্মে আদেশ দিয়ে লোক পাঠাতেন যে, ঐ ক্রয়কৃত মাল বিক্রয় করার পূর্বেই যেন ক্রয়ের স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বরং নিজেদের ঘরে তুলে নেয়ার আগেই বিক্রয় করলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হত (ছহীহ বুখারী, হা/২১৩৭, ২১৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫২৭)।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করবে সে তা নিজ আয়ত্বে নেয়ার পূর্বে বিক্রয় করতে পারবে না (ছহীহ বুখারী, হা/২১৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫২৫)। রাবী তাউস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এটি কিভাবে হয়ে থাকে? তিনি বললেন, এটি এভাবে হয়ে থাকে যে, দিরহামের বিনিময়ে আদান-প্রদান হয় অথচ পণ্যদ্রব্য উপস্থিত থাকে না (ছহীহ বুখারী, হা/২১৩২, ২১৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫২৫)। ইবনে ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আরো বলেন, আমি মনে করি, প্রত্যেক পণ্যের ব্যাপারে অনুরূপ নির্দেশ প্রযোজ্য হবে (ছহীহ বুখারী, হা/২১৩৫, ২১৩২; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৪৩১১)। পক্ষান্তরে অনেক দেশে (যেমন ইন্দোনেশিয়ায়) বাইনারি অপশনকে অনলাইন জুয়ার একটি রূপ হিসাবে দেখা হয় এবং অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রিপ্টো / ফরেক্সে বিনিয়োগ সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ক্রিপ্টো লেনদেন বাংলাদেশে বৈধভাবে অনুমোদিত নয়। ফরেক্সেও অফিসিয়াল অনুমোদন নেই। তাই ব্যক্তিগতভাবে ডিপোজিট করে অনলাইন ফরেক্স/ক্রিপ্টো ট্রেডিং আইনি ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশ্নকারী : মো: জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, রাঙ্গামাটি সাইন্স এ্যান্ড টেকনোলজী ইউনিভার্সিটি।