উত্তর : ইসলাম নারীদের কাজ বা ব্যবসা করতে নিষেধ করে না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য কাজকে শরী‘আতসম্মত করেছেন এবং তাদেরকে তা করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আপনি বলুন, ‘তোমরা কাজ করতে থাক, আল্লাহ তো তোমাদের কাজকর্ম দেখবেন এবং তাঁর রাসূল ও মুমিনগণও। আর অচিরেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে অদৃশ্য ও প্রকাশ্যের জ্ঞানীর নিকট, অতঃপর তিনি তোমরা যা করতে তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন’ (সূরা আত-তাওবাহ : ১০৫)। এটি সকলের জন্যই প্রযোজ্য, পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য। মানুষকেÑসে পুরুষ হোক বা নারী, ব্যবসা করা, উপার্জনের উপায় অবলম্বন করা এবং কাজ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। তবে তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু’ (সূরা আন-নিসা : ২৯)। এটি পুরুষ ও নারী সকলের জন্যই প্রযোজ্য। ধর্মীয় বিষয়ের লেখালেখি পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য, ব্যবসা-বাণিজ্যও পুরুষ ও নারীর জন্য, সাক্ষ্য দেয়াও পুরুষ ও নারীর জন্য, তারা তাদের বিক্রয়ের উপর সাক্ষ্য দেয়, তাদের ব্যবসা ও লেখালেখিতে সাক্ষ্য দেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সূদ হারাম করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারা : ২৭৫)। আর এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য। তবে কাজে ও ব্যবসায় অপরিহার্য রূপে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন পুরুষ ও নারীর মেলামেশা থেকে মুক্ত হয় এবং এমন সব বিষয় থেকে দূরে থাকে যা সমস্যা সৃষ্টি করে বা গোনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়। নারীর কাজ এমনভাবে হতে হবে যাতে পুরুষদের সাথে মিশ্রণ না হয় এবং ফিতনার কারণ না হয়। তেমনি তার ব্যবসাও এমন হতে হবে যাতে কোন ফিতনা না থাকে, হিজাব ও পর্দা রক্ষা এবং ফিতনার সব কারণ থেকে দূরে থাকার প্রতি যত্নশীল থাকতে হবে (সূরা আল-আহযাব : ৫৩)।
সুতরাং তাদের ক্রয়-বিক্রয় যদি আলাদা থাকে, অর্থাৎ নারীরা নারীদের সাথে লেনদেন করবে এবং পুরুষরা পুরুষদের সাথে, তাহলে এতে কোন দোষ নেই। একইভাবে তারা এমন কাজ করতে পারে যা তাদের স্বভাব-প্রকৃতি ও নারীত্বের জন্য উপযোগী। যেমন কোন নারী নারীদের জন্য চিকিৎসক হবে, নারীদের জন্য নার্স হবে, নারীদের শিক্ষা দেবে, এতে কোন অসুবিধা নেই। আর কোন পুরুষ পুরুষদের জন্য চিকিৎসক হবে, পুরুষদের শিক্ষা দেবে, এতেও অসুবিধা নেই। কিন্তু নারী যদি পুরুষদের চিকিৎসক হয়, পুরুষদের নার্স হয় অথবা পুরুষ যদি নারীদের চিকিৎসক বা নার্স হয়, তাহলে এতে ফিতনা ও অনাচার থাকার কারণে শরী‘আত তা গ্রহণ করে না। তবে যদি প্রয়োজন হয় যে কোন নারীকে পুরুষ চিকিৎসা করবে, যখন কোন নারী ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না, অথবা পুরুষ রোগীর চিকিৎসা করবে কোন নারী, যখন পুরুষ ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ সে নারী তার রোগ ও অসুখ সম্পর্কে জানে, তাহলে সে চিকিৎসা করবে সতর্কতার সাথে, লজ্জাশীলতা বজায় রেখে, ফিতনার কারণ থেকে দূরে থেকে এবং নির্জনতা ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে। তাহলে যদি নারীর সঙ্গে পুরুষের, বা পুরুষের সঙ্গে নারীর কোন কাজ করার প্রয়োজন ও অপরিহার্যতা দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে ফিতনার কারণ, যেমন নির্জনতা, অশালীন উন্মোচন ইত্যাদি থেকে দূরে থাকার শর্ত মানতে হবে। এ ধরনের কাজ ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত হবে।
একইভাবে এর মত অন্যান্য কাজও হতে পারে। যেমন বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করা, যেখানে নারী পুরুষদের থেকে আড়াল ও পর্দা বজায় রাখবে, অথবা মসজিদে মানুষের সঙ্গে ছালাত আদায় করা, যেখানে সে লজ্জাশীলতা ও আড়াল বজায় রেখে পুরুষদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে। এর মত অন্যান্য কাজও বৈধ, যেগুলোতে ফিতনার আশঙ্কা নেই এবং দুই পক্ষের কারো জন্য ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। আর এর সমগোত্রীয় কাজ যা নবী (ﷺ) করেছেন। তিনি মাঝে মাঝে মহিলাদের উদ্দেশ্যে খুত্ববা দিতেন, তখন মহিলারা তাঁর কাছে সমবেত হতেন, আর তিনি তাদের উপদেশ দিতেন। যেমন ঈদের ছালাতে খুত্ববাহ শেষ করে পুরুষদের নছীহত করার পর তিনি মহিলাদের কাছে যেতেন, তাদের উপদেশ দিতেন এবং কল্যাণের দিকে দিকনির্দেশনা করতেন। তেমনি কিছু সময়ে তারা একত্র হত এবং তিনি তাদের উপদেশ দিতেন, শিক্ষা দিতেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। এটি সেই কাজের অন্তর্ভুক্ত যা একজন পুরুষ মহিলাদের সঙ্গে করে থাকে। নবী (ﷺ)-এর পরও একইভাবে পুরুষরা উত্তম পদ্ধতিতে, পর্দা ও সতর্কতা সহকারে এবং ফিতনার সব কারণ থেকে দূরে থেকে মহিলাদের উপদেশ দিতেন, তাদের নছীহত করতেন, শিক্ষা দিতেন। সুতরাং যদি এর প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে পুরুষ এই দায়িত্ব (অর্থাৎ উপদেশ, স্মরণ করিয়ে দেয়া ও শিক্ষা প্রদানের দায়িত্ব) পালন করবে, কিন্তু পর্দা, সতর্কতা এবং এমন সব ব্যবস্থার সাথে যা উভয় পক্ষকে ফিতনা থেকে দূরে রাখে (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুশ শাইখ ইবনে বায, ২৮/১০৩ পৃ.)।
শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘নারীর জন্য প্রয়োজনীয় শর্তসাপেক্ষে বাড়ি থেকে বের হয়ে কাজ করা জায়েয। এসব শর্ত পূরণ হলে নারীর বের হওয়া বৈধ হবে, আর তা হল-
(১) সে যেন কাজের মুখাপেক্ষী হয় এবং তীব্র প্রয়োজন অনুভব করে। যেমন তার নিজের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ জোগাড়ের জন্য, যেমন আপনার ক্ষেত্রেও রয়েছে।
(২) কাজ যেন নারীর স্বভাব ও গঠনের সাথে মানানসই হয়, যেমন চিকিৎসা, নার্সিং, শিক্ষাদান, সেলাই ইত্যাদি।
(৩) কাজ যেন পুরোপুরি নারীদের পরিবেশে হয়, যেখানে গায়ির মাহরাম বা পরপুরুষদের সঙ্গে মিশ্রণ নেই।
(৪) কর্মস্থলে নারী যেন শরী‘আতসম্মত পর্দা মেনে চলে।
(৫) কাজ যেন তাকে মাহরাম পুরুষ ছাড়া ভ্রমণে বাধ্য না করে।
(৬) কাজে যাওয়া যেন কোন হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণ না হয়। যেমন ড্রাইভারের সঙ্গে নির্জন হওয়া, বা সুগন্ধি ব্যবহার করা যাতে কোন পরপুরুষ তা অনুভব করতে পারে।
(৭) কাজ যেন তার উপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দায়িত্বগুলোর ক্ষতি না করে।যেমন গৃহ পরিচালনা, স্বামীর সেবা এবং সন্তানদের যত্ন।
সুতরাং যদি আপনি এ সমস্ত শর্ত পূরণ করে কাজ করেন, তবে এতে আপনার জন্য কোনো দোষ নেই। ইনশাআল্লাহ’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১০৬৮১৫)।
প্রশ্নকারী : মুশফিকা, সাতক্ষীরা।