উত্তর : আক্বীদাহ, ইবাদত, অর্থনীতি, রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সামাজিক বিষয়াবলি ইত্যাদি কিতাব ও সুন্নাহ্র মধ্যে রয়েছে। সুতরাং ইসলাম জীবনের কোন দিকই উপেক্ষা করেনি; বরং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট বিধান দিয়েছে। সুতরাং এতে কোন সন্দেহ বা সংশয় নেই যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইসলামেরই অংশ। আর যে ব্যক্তি এর বিপরীত কথা বলে, সে মূলত ইসলামকে সঠিকভাবে জানে না। যারা বলে, ‘ধর্মে রাজনীতি নেই এবং রাজনীতিতে ধর্ম নেই’- তারা মূলত আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার সেই বক্তব্য তোতাপাখির মত অনুসরণ করে, যা ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দাবি করে যে, ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করতে হবে, ধর্মের স্থান কেবল মসজিদ ও ঘরে; আর রাষ্ট্র যা ইচ্ছা তাই করবে এবং যেভাবে ইচ্ছা শাসন করবে- সে আল্লাহ্র উপর মহা অপবাদ আরোপ করেছে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে এবং চরম ভুলে পতিত হয়েছে; বরং এটি কুফর ও সুদূরপ্রসারী ভ্রষ্টতা’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাত, ২/২৪৭ পৃ.)।
ইসলামে রাজনীতি নেই- এ দাবি প্রথমদিকেই যিনি উত্থাপন করেন, তিনি হলেন ‘আলী আব্দুর রাযযাক’, আল-আযহারের একজন আলিম। তিনি ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে (الإسلام وأصول الحكم) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তার এ বক্তব্যের জবাব অনেক আলিম প্রদান করেন; যেমন- মুহাম্মাদ রাশীদ রেযা, মুহাম্মাদ শাকীর, মুহাম্মাদ আল-খাযীর হুসাইন, মুহাম্মাদ বখীত এবং মুহাম্মাদ আত-তাহির ইবনে আশূর প্রমুখ। পরবর্তীতে আল-আযহারের ‘হাইয়াতু কিবারিল উলামা’ (শীর্ষ আলিম পরিষদ) তার বিচার করে। পরিষদের সভাপতি ছিলেন মুহাম্মাদ আবুল ফাজল (শাইখুল আযহার) এবং এতে চব্বিশজন শীর্ষ আলিম সদস্য ছিলেন। তারা তাকে আলিমদের অন্তর্ভুক্তি থেকে বহিষ্কার করার রায় দেন। এর ফলে তিনি যে শরী‘আত আদালতে বিচারক ছিলেন, সেখান থেকেও তাকে অপসারণ করা হয় (মুক্বাদ্দিমাহ ফী ফিক্বহিন নিযামিস সিয়াসিয়্যিল ইসলামী, পৃ. ৩)।
শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইসলাম শরী‘আত ও রাজনীতি উভয়ই। যে ব্যক্তি রাজনীতি ও শরী‘আতকে পৃথক করে, সে পথভ্রষ্ট। ইসলামে রয়েছে সৃষ্টির সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্কের নীতি এবং ইবাদতের বিধান, রয়েছে মানুষের নিজের পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, ছাত্র, শিক্ষক এবং সকল মানুষের সঙ্গে আচরণের নীতিমালা। প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট নীতি রয়েছে।...সুতরাং দ্বীন নিজেই একটি শরী‘আতসম্মত রাজনীতি। যে ব্যক্তি দ্বীনকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে, সে পথভ্রষ্ট’। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘ইসলামী শরী‘আত প্রকৃত অর্থেই রাজনীতি- মানুষের ইবাদতে নীতি, লেনদেনে নীতি এবং পারস্পরিক সম্পর্কে নীতি; যা আমাদের যুগে ‘কূটনীতি’ নামে পরিচিত। যে ব্যক্তি রাজনীতিকে শরী‘আত থেকে পৃথক করে, সে মারাত্মক ভুল করে। পুরো শরী‘আতই রাজনীতি এবং তা সর্বোচ্চ মানের কূটনীতি; কারণ এটি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রণীত। তিনিই বান্দাদের জন্য তা বিধিবদ্ধ করেছেন এবং সর্বোত্তমভাবে বিন্যস্ত করেছেন। সূরাহ্ তাওবা পড়লে কাফির রাষ্ট্র ও মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নীতিমালা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু যখন গির্জা মানুষের উপর ইবাদতের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করল এবং তারা মনে করল দুনিয়া ও আখিরাত একত্র করা সম্ভব নয়, তখন তারা ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করল- রাজনীতির জন্য এক পথ এবং ধর্মের জন্য আরেক পথ নির্ধারণ করল’ (ফাতহু যিল-জালালি ওয়াল ইকরাম, ৯/১০৯-২১৮ পৃ.; আত-তা‘লীক্ব ‘আলাল ক্বাওয়াইদিল হিসান, পৃ. ১৭৫)।
সঊদী আরবের স্থায়ী গবেষণা ও ফাতাওয়া কমিটি বলেছে, ‘যা সেক্যুলারিজম নামে পরিচিত- অর্থাৎ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার আহ্বান, ধর্মকে কেবল ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং লেনদেনসহ অন্যান্য বিষয় পরিত্যাগ করা, তথাকথিত ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া- যে ইসলাম মানতে চায় সে মানবে, আর যে মুরতাদ হতে চায় সে অন্য ভ্রান্ত মতবাদ গ্রহণ করবে- এগুলো এবং তাদের আরো ভ্রান্ত বিশ্বাসসমূহ এক জঘন্য ও কুফরী আহ্বান। এ থেকে সতর্ক করা, এর ভ্রান্তি উন্মোচন করা, এর বিপদ ব্যাখ্যা করা এবং যারা এতে বিভ্রান্ত হয়েছে, তাদের ব্যাপারে সাবধান করা অপরিহার্য। কারণ এর অনিষ্ট গুরুতর এবং এর বিপদ ভয়াবহ। নিঃসন্দেহে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাই এ ভ্রান্ত উক্তিটি সবচেয়ে বেশি প্রচার করে। ধর্মনিরপেক্ষতা একটি পাশ্চাত্য অপদর্শন, যা ইসলামী ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। সেক্যুলারিজম (SECULARISM)-এর সঠিক অনুবাদ হল- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বা ‘পার্থিবতাবাদ’।
এটি জীবনকে মানব-প্রণীত জ্ঞান ও যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার এবং ধর্ম থেকে দূরে থেকে স্বার্থ বিবেচনার আহ্বান জানায়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ হল- শাসনব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা। এ শব্দটির সঙ্গে ‘বিজ্ঞান’ (SCIENCE) শব্দের কোন সম্পর্ক নেই। এটি ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে প্রকাশ পায় এবং উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রাচ্যে প্রবেশ করে। প্রধানত মিশর, তুরস্ক, ইরান, লেবানন ও সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে; পরে তিউনিসিয়া এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে ইরাকেও পৌঁছে। অন্যান্য আরব দেশে এটি বিংশ শতাব্দীতে বিস্তার লাভ করে। ...ধর্মনিরপেক্ষতা খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক করার বিষয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ- যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সিজারের এবং চার্চের ক্ষমতা আল্লাহর জন্য। এ প্রসঙ্গে ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি সম্বন্ধিত উক্তি উল্লেখ করা হয়- ‘সিজারের যা, তা সিজারকে দাও; আর আল্লাহর যা, তা আল্লাহকে দাও’। কিন্তু ইসলাম এ দ্বৈততাকে স্বীকার করে না। মুসলিমের সবকিছুই আল্লাহ্র জন্য, তার সমগ্র জীবনই আল্লাহর উদ্দেশ্যে: ‘বলুন, নিশ্চয় আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু- সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য’ (সূরা আল-আন‘আম : ১৬২; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমা, ফৎওয়া নং-১৫৬৩১, ৯৮৮০, ৩১০৫, ৪০২৯, ৫৬৫১ দ্র.)। অতএব নিঃসন্দেহে ইসলাম ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করা অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয়।
প্রশ্নকারী : মুনীরুল ইসলাম, দারুশা, রাজশাহী।