উত্তর : পরীক্ষিত আমল- বলতে সাধারণত এমন কিছু দু‘আ, কুরআনের আয়াত, বা নেক আমল বোঝানো হয়, যেটি মানুষ নিজের জীবনে বারবার অনুশীলন করে কোন কল্যাণ লাভ করেছে- যেমন রোগমুক্তি, দুঃখ দূর হওয়া ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সালাফদের অবস্থান অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক। সালাফে ছালিহীন কুরআন-সুন্নাহতে প্রমাণিত দু‘আ, যিকর ও আমলকে আঁকড়ে ধরতেন। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে কোন আমলকে ‘শরী‘আতের অংশ’ বা ‘মাসনূন’ বলে চালাতেন না। তবে তাঁরা এটাও মানতেন যে কুরআন পুরোপুরি শিফা ও রহমত (সূরা বানী ইসরাঈল : ৮২), এবং এর তিলাওয়াত বা কিছু আয়াত দ্বারা দু‘আ করলে আল্লাহ তা‘আলা উপকার দেন। যেমন,
আবূ সাঈদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, নবী (ﷺ)-এর একদল ছাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সরদার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হল। লোকেরা তার (আরগ্যের) জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না, তখন তাদের কেউ বলল, এ কাফেলা যারা এখানে অবতরণ করেছে তাদের কাছে তোমরা গেলে ভালো হত। সম্ভবত, তাদের কারো কাছে কিছু থাকতে পারে। ওরা তাদের নিকট গেল এবং বলল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো কাছে কিছু আছে কি? তাদের (ছাহাবীদের) একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ্র কসম আমি ঝাড়-ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য মেহমানদারী করনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়-ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত না তোমরা, আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। তখন তারা এক পাল বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল।
তারপর তিনি গিয়ে ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ (সূরা ফাতিহা) পড়ে তার উপর ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে নিরাময় হল) যেন বন্ধন হতে মুক্ত হল এবং সে এমনভাবে চলতে ফিরে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তারা তাদের স্বীকৃত পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দিল। ছাহাবীদের কেউ কেউ বলেন, এগুলো বণ্টন কর। কিন্তু যিনি ঝাড়-ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন এটা করব না, যে পর্যন্ত না আমরা নবী (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে এই ঘটনা জানাই এবং লক্ষ্য করি তিনি আমাদের কী নির্দেশ দেন। তারা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি [নবী (ﷺ)] বলেন, তুমি কিভাবে জানলে যে, সূরা ফাতিহা একটি দু‘আ? তারপর বলেন, তোমরা ঠিকই করেছ। বণ্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখ। এ বলে নবী (ﷺ) হাসলেন। শু‘বা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমার নিকট আবূ বিশর (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন যে, আমি মুতাওয়াক্কিল (রাহিমাহুল্লাহ) হতে এ হাদীছ শুনেছি (ছহীহ বুখারী, হা/২২৭৬)। এটি পরীক্ষিত আমল ছিল, কিন্তু ছাহাবীরা একে শরী‘আতের বাইরে কোন নতুন ইবাদত বানাননি, বরং কুরআনকে শিফা হিসাবে ব্যবহার করেছেন। সালাফগণ শরী‘আতে প্রমাণিত দু‘আ-যিকরের বাইরে নতুন আমল প্রবর্তন থেকে বিরত থাকতেন, কারণ তা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে।
পরীক্ষিত আমল বৈধ হতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। যথাÑ ১. শরী‘আতের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়- অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহতে প্রমাণিত দু‘আ, ছালাত, যিকর, বা জায়েয উপায়ে দু‘আ/দাওয়াই হতে হবে। ২. একে শরী‘আতের অংশ বা মাসনূন আমল হিসাবে না ধরা- বরং শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা দু‘আর একটি ধরন হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। ৩. কোন নির্দিষ্ট সময়, সংখ্যা বা পদ্ধতি শরী‘আতে প্রমাণ ছাড়া স্থায়ী করা যাবে না। যেমন: কেউ যদি বলে- এই দু‘আ ১০০ বার রাত ১২টায় পড়লে সমস্যা দূর হবে- তাহলে এটি বিদ‘আত। ৪. কোন শিরক বা কুফরীয় বিষয় থাকবে না- যেমন তাবীয-কবচ, জ্বিন-আত্মার নাম ইত্যাদি।
ভ্রান্ত আমল ও পরীক্ষিত আমলের পার্থক্য রয়েছে। ভ্রান্ত আমল শরী‘আতে প্রমাণ নেই, তবুও তাকে নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময়, বা পদ্ধতিতে ইবাদত বানানো হয়েছে। যেমন বিশেষ মাসে বিশেষ দু‘আ আবশ্যক ধরা, নির্দিষ্ট শর্তে কুরআন পড়া, তা‘বীয-গণ্ডির মত কুসংস্কার ইত্যাদি। পরীক্ষিত আমল হলÑ কুরআন-সুন্নাহতে প্রমাণিত দু‘আ বা যিকরকে ব্যবহার করা, কিন্তু একে শরী‘আতের বাইরে নতুন নিয়ম বানিয়ে না নেয়া। যেমন: কোন রোগের সময় সূরা ফাতিহা পড়া, আয়াতুল কুরসি পাঠ করা, মুসীবতে إنا لله وإنا إليه راجعون বলা।
প্রশ্নকারী : হুরে জান্নাত, চট্টগ্রাম।