উত্তর : যে সমস্ত গ্রন্থ সমাজ বা মানুষের মধ্যে শিরক, বিদ‘আত, পাপাচার, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার প্রচার-প্রসার করে, সেগুলো ক্রয়-বিক্রয় করা হারাম। যেমন: বেহেস্তি জেওর, নেয়ামুল কোরআন, ফাজায়েলে আমল, নোংরা ম্যাগাজিন, অশ্লীল উপন্যাস, চলচ্চিত্র জগতের মডেল, অভিনেত্রী ও গায়িকাদের উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ চিত্র ইত্যাদি। কারণ আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহায়তা করতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, ‘তোমরা নেককাজ ও তাক্বওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য কর এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যধিক কঠোর’ (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাতে ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) ও কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এখানে আল্লাহ তা‘আলা মুমিন ব্যক্তিদেরকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে আদেশ করেছেন এবং অন্যায়, অসৎ ও হারাম কাজে সাহায্য, সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন’ (তাফসীর ইবনু কাছীর, ২/১২; তাফসীরে কুরতুবী, ৬/৪৬-৪৭ পৃ.)।
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ), শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) ও শায়খ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘যাদু, জ্যোতিষশাস্ত্র, গণক, মিথ্যা সমন্বিত, বিদ‘আতীমূলক, কুফরীমূলক ও বিভ্রান্তিকর গ্রন্থসমূহ বিনষ্ট করা অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা অপরিহার্য। মুসলিমদের উচিত এ সম্পর্কে ভয় করা এবং কুফরীমূলক গ্রন্থসমূহ ক্রয়-বিক্রয় না করা। এর মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। তাই একে ধ্বংস করা অপরিহার্য’ (আল-মাজমূঊ লিন নাবাবী, ৯/২৫৩; ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ র্দাব, ১/১৯৪ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৫২১৯২)। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, لا ضمان في تحريق الكتب المضلة وإتلافها ‘বিভ্রান্তিকর গ্রন্থসমূহ পুড়িয়ে ফেললে বা বিনষ্ট করলে কোন কৈফিয়ত তলব করা হবে না’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৫২১৯২)। আবূ বকর আল-মাররুযিয়্যু (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বললাম যে, ‘আমি একটি বই ধার স্বরূপ নিয়েছি, যার মধ্যে কিছু নিকৃষ্ট, খারাপ, বাজে জিনিস আছে। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী? আমি সেটাকে ছিঁড়ে বিনষ্ট করব নাকি আগুনে পুড়িয়ে ফেলব? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি সেটাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলো’ (আস-সুন্নাহ, ৩/৫১০; আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ, ১/২২৯)। ‘নবী (ﷺ) উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে একটি গ্রন্থ দেখতে পেলেন, যা তিনি তাওরাত থেকে লিখেছিলেন এবং সেটি কুরআনের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। এটি দেখে রাসূল (ﷺ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একটি চুলার কাছে গিয়ে সেটিকে নিক্ষেপ করলেন’ (ইরওয়াউল গালীল, হা/১৫৮৯, সনদ হাসান; আহমাদ, ৩/৩৮৭; আস-সুন্নাহ, ১/২৭)।
তবে যে সমস্ত গ্রন্থ মানুষের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী তা ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, তিনি পৃথিবীর সব কিছুই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৯)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ ‘যা তোমার জন্য কল্যাণকর তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৪; ইবনু মাজাহ, হা/৭৯, ৪১৬৮)। তাছাড়া ইসলামী শরী‘আতের স্থিরীকৃত নীতিমালাসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, إذا اجتَمَع الحلالُ والحرامُ غُلِّبَ الحرامُ ‘যখন কোন বিষয়ে হালাল ও হারামের মাসআলা একত্রিত হয়, তখন হারামের মাসআলা প্রাধান্য পায়’ (অর্থাৎ সেটাকে হারাম বলে গণ্য করতে হবে)। নবী (ﷺ) বলেন, ‘নিশ্চয় হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট, আর উভয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহজনক বিষয়, অনেক লোকই সেগুলো জানে না। যে ব্যক্তি এসব সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকে সে তার দ্বীন ও মর্যাদাকে নিরাপদে রাখে, আর যে লোক সন্দেহজনক বিষয়ে পতিত হবে সে হারামের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়বে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২; ছহীহ মুসলিম হা/১৫৯৯)। তিনি আরো বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে যাতে সন্দেহের সম্ভাবনা নেই তা গ্রহণ কর। যেহেতু সত্য হল শান্তি ও স্বস্তি এবং মিথ্যা হল দ্বিধা-সন্দেহ’ (তিরমিযী, হা/২৫১৮, হাদীছ ছহীহ)।
প্রশ্নকারী : মুহাম্মাদ তাজুল ইসলাম, ডেমরা, ঢাকা।