সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব
-হাসিবুর রহমান বুখারী*
(৪র্থ কিস্তি)
চতুর্থ চক্রান্ত
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীরা বিশ্বাস করে যে, কুরআন নিজেই নিজের ব্যাখ্যা দেয়, তাই এর অর্থ বুঝতে হলে শুধু কুরআনকেই অনুসরণ করতে হবে। তারা হাদীছ, ইজমা এবং অন্যান্য ব্যাখ্যা বা তাফসীরকে কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করে না। তাদের ধারণা, কুরআনকে সরাসরি বুঝতে পারাটাই যথেষ্ট। তাই তারা হাদীছ, ইজমা বা ক্বিয়াসের মাধ্যমে কুরআনের ব্যাখ্যা করাকে সমর্থন করে না। তারা বলে:
১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয় এটার সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি ওটা (জিবরীলের মাধ্যমে) পাঠ করি, তখন তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর। অতঃপর নিশ্চয় এর বিবৃতির দায়িত্ব আমারই’ (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ: ১৭-১৯)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজেই ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সেক্ষেত্রে কোন মানুষের ব্যাখ্যা কী করে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সুতরাং কোন বাহ্যিক তাফসীরের প্রয়োজন নেই। তাই তারা প্রথাগত তাফসীরগ্রন্থ (যেমন ইবনু কাছীর, ত্বাবারী, ইত্যাদি) প্রত্যাখ্যান করে, কারণ সেগুলো হাদীছ ও ঐতিহাসিক রিওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে রচিত।
২. তারা ব্যক্তিগতভাবে কুরআন অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যার পক্ষপাতী এবং মনে করে যে, প্রতিটি মানুষ সরাসরি কুরআন থেকে জ্ঞান লাভ করতে পারে। তাদের মতে, প্রথাগত আলেমদের তাফসীরের একচেটিয়া অধিকার নেই।
৩. অনেক আহলে কুরআন কুরআনের আয়াতগুলোকে আক্ষরিকের চেয়ে প্রেক্ষাপটভিত্তিক বা প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করেন, (যেমন জিন, ফেরেশতা বা ক্বিয়ামত সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো। সরল ভাষায় আহলে কুরআনরা মনে করে, ‘কুরআনই শেষ কথা, বাকি সব নষ্ট বা অপ্রয়োজনীয়’। তারা হাদীছ, ফিক্বহ বা তাফসীর মানে না। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের সাথে সাংঘর্ষিক।
জবাব
নিঃসন্দেহে কুরআনুল কারীম হল আল্লাহর পবিত্র বাণী, যা মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তবে কুরআনের গভীর অর্থ, বিধান ও বার্তা বুঝতে তাফসীর (ব্যাখ্যা) অপরিহার্য। কুরআন নিজেই রাসূল (ﷺ)-কে ব্যাখ্যার দায়িত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَيْهِمْ وَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ
‘আর আপনার প্রতি আমরা কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে। (সূরা আন-নাহল: ৪৪)। সুতরাং আপনি তাদের কাছে এ কিতাবের প্রতিটি বিধি-বিধান, ওয়াদা ও ধমকি সবই আপনার কথা ও কাজের মাধ্যমে বর্ণনা করে দিন। এতে বুঝা গেল যে, রাসূল (ﷺ) হচ্ছেন বর্ণনাকারী। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ কিতাবের যাবতীয় সংক্ষিপ্ত হুকুম ছালাত, যাকাত ইত্যাদি যে সমস্ত আহকাম বিস্তারিতভাবে আসেনি সেগুলোকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, রাসূল (ﷺ)-এর ব্যাখ্যা ও বিবৃতিগুলো কোথায় আছে? নিঃসন্দেহে সেগুলো সহীহ হাদীছের মধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে। শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘এই বক্তব্য যে, ফিক্বহ, তাফসীর এবং সুন্নাহর ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর প্রয়োজন নেই, কারণ সেগুলো মূল উৎস থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং এগুলো ছাড়াই কিতাব ও সুন্নাহ বোঝা সম্ভব। এটি এমন একটি বক্তব্য যা দ্বীনের জন্য খুবই বিপদজনক! ছাহাবী ও তাবিঈদের রেখে যাওয়া শিক্ষা, বিভিন্ন কিরআতের পদ্ধতি, ভাষার নিয়ম, বিধান আহরণের মূলনীতি, নাসিখ-মানসূখ এবং নাযিলের কারণ সম্পর্কে জ্ঞান না নিয়ে কিভাবে কুরআন বোঝা সম্ভব?!
উপরিউক্ত বিষয়গুলোই তাফসীরের কিতাবসমূহে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর কিভাবে সুন্নাহকে বোঝা সম্ভব তা সংকলন না করে, তার অর্থ না জেনে, ছহীহ ও দুর্বল হাদীছের মধ্যে পার্থক্য না করে, সাধারণ হাদীছকে বিশেষায়িত না করে, মুত্বলাক্ব হাদীছকে সীমাবদ্ধ না করে, নাসিখ-মানসূখ না জেনে, তার ভাষা ও শব্দার্থ না বুঝে এবং সেগুলোকে যথাযথভাবে আয়ত্ত না করে?! আর এটা কি সম্ভব সেই সব প্রতিষ্ঠিত আলিমগণ ছাড়া যারা আরবী ভাষা, সাহিত্য, উছূলুল ফিক্বহ, হাদীছ শাস্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন?! পক্ষান্তরে ফিক্বহের কিতাব সমূহ: আফসোস ঐ ব্যক্তির জন্য যে দাবি করে সে নিজে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধি-বিধান গ্রহণ করবে! এটা কি মুজতাহিদের কাজ নয়? আর কেউ কি উল্লিখিত সকল জ্ঞানের রচনাবলী না অধ্যায়ন করে ইজতিহাদের স্তরে পৌঁছাতে পারে? আর মানুষের আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কিত গ্রন্থের প্রয়োজন নেই কী? যা তাদের জন্য মূলনীতিসমূহ স্পষ্ট করে, বুঝতে সাহায্য করে এবং সংশয় দূর করে?! এই দাবিটি এতই ভিত্তিহীন যে, এর বিরুদ্ধে বেশি কিছু বলারও প্রয়োজন হয় না। এগুলো এমন কিছু ব্যক্তির পক্ষ থেকে আসে যে জ্ঞানের প্রকৃতি ও অর্জনের পথ সম্পর্কে অজ্ঞ এবং আলিমদের মর্যাদা সম্পর্কেও অজ্ঞ। সুতরাং আমাদের উপদেশ হল- আপনি এমন কথায় কান দেবেন না, সতর্ক থাকবেন এবং এর প্রচারকদের এড়িয়ে চলবেন। কারণ, এই ধরনের দাবির পিছনে যে ব্যক্তিই গেছে সে পথভ্রষ্ট হয়েছে, হয় সে সুন্নাতকে অস্বীকার করেছে, মুসলিমদেরকে কাফির বলেছে, নিষিদ্ধ কাজগুলোকে হালাল মনে করেছে। আর সে দাবি করে যে, সে অহীকে বুঝতে পারে ছাহাবী, তাবিঈ ও ইমামদের মত করে! অথচ সে তার পরিবারের গাধার চেয়েও বেশি অজ্ঞ, তার হৃদয় ও জিহ্বা অন্ধকারাচ্ছন্ন। যদি তার সামনে ছোট ছোট সূরা তিলাওয়াত করা হয়, সে তার বেশিরভাগের অর্থই বুঝবে না। আর যদি তার সামনে হাদীছ পাঠ করা হয়, তাহলে সে অভিধানের সাহায্য চাইবে! আর অভিধানও তো রচনাবলীর অন্তর্ভুক্ত![১]
এখানে জ্ঞানার্জন সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি উপকারী বাণী দেয়া হল:
প্রশ্ন : ‘আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে হিফাযত করুন, আমি আপনার নিকট বিভিন্ন শারঈ ইলম সঠিকভাবে অর্জনের পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে জানতে চাই। আল্লাহ্ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং ক্ষমা করুন’। উত্তরে তিনি বলেন, শারঈ ইলম বা জ্ঞান বিভিন্ন প্রকারের। যেমন:
১. ইলমুত তাফসীর বা তাফসীরের জ্ঞান : সুতরাং তালিবুল ইলমের উচিত তাফসীর অধ্যয়নের সাথে কুরআন মুখস্থ করা, ছাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-র অনুসরণে। তারা দশ আয়াত অতিক্রম করতেন না, যতক্ষণ না তা ভালোভাবে শিখে নিতেন এবং তার অভ্যন্তরীণ জ্ঞান ও আমল আয়ত্ত করতেন। এতে কুরআনের অর্থ তার শব্দের সাথে সম্পর্কিত হয়, ফলে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে কুরআন তিলাওয়াতকারী হয়, বিশেষত যখন সে তা অনুযায়ী আমল করে’।
২. ইলমুস সুন্নাহ বা সুন্নাহর জ্ঞান : এটি সর্বাধিক সহীহ দিয়ে শুরু হয় এবং সুন্নাহতে সর্বাধিক ছহীহ হল: যার উপর বুখারী ও মুসলিম একমত হয়েছেন। তবে সুন্নাহ অধ্যয়নের দু’টি বিভাগ রয়েছে। যথা: একটি বিভাগ হল: যেখানে ব্যক্তি শারঈ বিধান জানতে চায়, তা আক্বীদা ও তাওহীদের জ্ঞান হোক বা আমলী বিধান সংক্রান্ত জ্ঞান হোক। এ ক্ষেত্রে এই বিষয়ে রচিত বইগুলোতে মনোনিবেশ করা উচিত, যেমন সেগুলো মুখস্থ করা, যেমন বুলূগুল মারাম, উমদাতুল আহকাম, শেখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের কিতাবুত তাওহীদ এবং অনুরূপ অন্যান্য বই। আর মূল গ্রন্থগুলো রেফারেন্স ও অধ্যয়নের জন্য রাখা হয়। এখানে মুখস্থকরণ এবং পাঠ দু’টিই রয়েছে, সে মূল গ্রন্থগুলো পড়বে এবং সেগুলোতে গভীরভাবে চিন্তা করবে। কারণ এতে দু’টি উপকারিতা রয়েছে। যথা: প্রথমতঃ মূল উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া। দ্বিতীয়তঃ তার মনে বর্ণনাকারীদের বা রাবীদের নামগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটানো। কারণ যখন রাবীদের নাম বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, তখন যেমন বুখারীর রাবীদের মধ্যে কেউ কোন সনদে আসলে সে তাকে চিনতে পারবে যে এটি বুখারীর রাবী, এভাবে সে এই হাদীছ সংক্রান্ত উপকারিতা অর্জন করবে
৩. ইলমুল আক্বাইদ বা ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কিত জ্ঞান : এ বিষয়ে অনেক বই রয়েছে। আমি মনে করি এ সময়ে সেগুলো পড়তে অনেক সময় লাগবে, অথচ মূল উপকারিতা পাওয়া যাবে সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ বইগুলোতে, যেগুলো লিখেছেন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) এবং নাজদ এলাকার আলিম যেমন শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব এবং তাঁর পরবর্তী আলিমদের লেখা বইগুলো
৪. ইলমুল ফিক্বহ বা ইসলামিক আইনশাস্ত্র : নিঃসন্দেহে মানুষের উচিত একটি নির্দিষ্ট মানহাজের উপর মনোনিবেশ করা, সেটি মুখস্থ করা এবং এর মূলনীতিগুলো ও নিয়ম-কানুনগুলো আয়ত্ত্ব করা।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা ইমামের মতকে এমনভাবে মেনে নেব যেমনভাবে নবী (ﷺ)-এর কথা মেনে নিই। বরং তিনি এ মতের উপর ফিক্বহ গড়ে তুলবেন এবং অন্যান্য মাযহাব থেকে যা সঠিক দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণিত, তা গ্রহণ করবেন। যেমনটি মাযহাব অনুসারী ইমামদের পদ্ধতি ছিল। যেমন: শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইমাম নববী প্রমুখ। এভাবে তিনি একটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবেন। কারণ আমি দেখেছি, যারা সরাসরি হাদীছ গ্রহণ করেন কিন্তু উলামায়ে কিরামের লিখিত ফিক্বহী বিধানগুলোর দিকে ফিরে দেখেন না, তাদের মধ্যে অনেক ভ্রান্তি দেখা যায়। যদিও তারা হাদীছ ও তার অর্থ বুঝতে শক্তিশালী, তবুও তাদের মধ্যে অনেক ভ্রান্তি থাকে। কারণ তারা ফক্বীহদের আলোচনা থেকে দূরে থাকে। ফলে আপনি তাদের কাছে এমন সব অদ্ভুত মাস’আলা পাবেন, যা প্রায় নিশ্চিতভাবে ইজমার বিরোধী বলে মনে হবে, অথবা আপনার ধারণা হবে যে তা ইজমার বিপরীত। এজন্য মানুষের উচিত তার বুঝকে ফক্বীহদের লিখনীর সাথে সম্পৃক্ত করা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তিনি তার মাযহাবের ইমামকে রাসূল (ﷺ)-এর মত মনে করবেন এবং তার কথা ও কাজকে অন্ধভাবে মেনে নেবেন। বরং তিনি তা দলীল হিসাবে ব্যবহার করবেন এবং এটাকে একটি মূলনীতি হিসাবে বিবেচনা করবেন। এতে কোন সমস্যা নেই, বরং যদি তিনি অন্য মাযহাবে সঠিক মত দেখতে পান, তাহলে সেদিকে ফিরে যাওয়া তার জন্য অবশ্যকর্তব্য।[২]
সারসংক্ষেপ হল: তাফসীর ও হাদীছ সম্পর্কিত রচিত গ্রন্থসমূহ কুরআন ও সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝার জন্য সহায়ক। তাহলে সেগুলো কিভাবে মূল উৎস থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, অথচ সেগুলো তো মূল উৎসেরই পথনির্দেশক?! আল্লাহই সর্বজ্ঞ। নিম্নে তাফসীরের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হল:
১- কুরআনের সঠিক অর্থ অনুধাবন করা
কুরআনের আয়াতসমূহ আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, যার অনেক শব্দের গভীর ও বহুমুখী অর্থ রয়েছে। তাফসীরের মাধ্যমে শাব্দিক অর্থ, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা জানা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَيَالٍ عَشْرٍۙ ‘শপথ দশ রাতের’ (সূরা আল-ফাজর: ২)। প্রশ্ন হচ্ছে: ‘দশ রাত্রী’ কী? ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা), ক্বাতাদা, মুজাহিদ সহ অধিকাংশ মুফাসসিরগণ বলেন: ‘দশ রাত্রী’ বলতে যুলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রাত্রীকে বোঝানো হয়েছে (ইবনু কাছীর)। যার গুরুত্ব হাদীছসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ‘আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমলই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী (ﷺ) বললেন, জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।[৩] তাছাড়াও এই দশ দিনের তাফসীরে জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ﷺ) বলেন, নিশ্চয় দশ হচ্ছে কুরবানীর মাসের দশদিন, বেজোড় হচ্ছে আরাফার দিন আর জোড় হচ্ছে কুরবানীর দিন।[৪] সুতরাং এখানে দশ রাত্রি বলে যিলহজ্জের দশদিন বোঝানো হয়েছে।
২- আয়াতের প্রেক্ষাপট (আসবাবুন নুযূল) জানা
কুরআনের অনেক আয়াত নির্দিষ্ট ঘটনা বা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। তাফসীরে শানে নুযূল অর্থাৎ আয়াত নাযিলের কারণ বর্ণিত থাকে, যা বুঝতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا۠ لِلْمُشْرِكِيْنَ۠
‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে’ (সূরা আত-তাওবা: ১১৩)। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে নবী (ﷺ) তার কাছে গেলেন। এ সময় আবূ জাহল এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াহও সেখানে বসা ছিল। নবী (ﷺ) বললেন, হে চাচা! আপনি পড়ুন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আপনার মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এটা দলীল হিসাবে পেশ করব। এ কথা শুনে আবূ জাহল ও ‘আব্দুল্লাহ ইবনু উমাইয়্যাহ বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করে দিবে? নবী (ﷺ) বললেন, হে চাচা! আমি আপনার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ ক্ষমা চাইতে থাকব। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, ‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য, যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী’।[৫]
৩- ফিক্বহী বিধান ও মাসআলা বের করা
কুরআনে অনেক আইন ও নির্দেশনা রয়েছে, যেমনঃ স্বালাত, স্বিয়াম, যাকাত, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি। কিন্তু নীতিমালা বা বিধি-বিধানের নিয়মনীতি, পদ্ধতি, বৈশিষ্ট্য, আকার-আকৃতি, ধরণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে কোন আলোচনা করা হয়নি। যদি তাই হয় তাহলে ছালাতের, যাকাতের, ছিয়ামের বিধিবিধান, হজ্জের নিয়ম কানুন কোথায় বলা হয়েছে? যদি রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত না থাকত, তাহলে আমরা এগুলো কোথায় থেকে জানতে পারতাম। সেই জন্যই ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত-ই হল- আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের ব্যাখ্যাকারী।[৬] সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি যে, তাফসীরের মাধ্যমে এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও প্রয়োগবিধি জানা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتُوا الزَّكٰوةَ وَ ارْكَعُوْا مَعَ الرّٰكِعِيْنَ
‘আর তোমরা ছাালাত প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত দাও এবং রুকূ‘কারীদের সাথে রুকূ‘ কর (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪৩)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে: ছালাত ও যাকাত আমরা কিভাবে আদায় করব? পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাতের রাক‘আত সংখ্যা, পদ্ধতি, নিয়ম-নীতি, উট, গরু, ছাগল, স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাতের নিছাব বা পরিমাণ কী? কারণ এগুলোর নিয়মনীতি ও পদ্ধতি তো কুরআনুল কারীমের কোথাও বর্ণনা করা হয়নি। এর জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। রাসূল (ﷺ) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের সময়সারণি সম্পর্কে বলেছেন, ‘যোহরের ছালাতের ওয়াক্ত শুরু হয় যখন সূর্য পশ্চিমাকাশে (মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে) হেলে পড়ে এবং মানুষের ছায়া তার দৈর্ঘের সমপরিমাণ হওয়া পর্যন্ত। আর আছরের ছালাতের সময় না হওয়া পর্যন্ত তা থাকে। আছরের ছালাতের সময় থাকে সূর্য বিবর্ণ হয়ে সোনালী বা তাম্রবর্ণ ধারণ না করা পর্যন্ত। মাগরিবের ছালাতের সময় থাকে সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যা গোধূলি বা পশ্চিম দিগন্তে উদ্ভাসিত লালিমা অন্তর্হিত না হওয়া পর্যন্ত। ইশার ছালাতের সময় থাকে অর্ধরাত্রি অর্থাৎ- মধ্যরাত পর্যন্ত। আর ফজরের ছালাতের সময় শুরু হয় ফজর বা উষার উদয় থেকে শুরু করে সূর্যোদয় পর্যন্ত। অতএব সূর্যোদয়ের সময় ছালাত আদায় করা বন্ধ রাখবে। কারণ সূর্য শয়তানের দু’শিংয়ের মধ্যখানে উদিত হয়।[৭] ছালাত আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘যখন তুমি ছালাতের জন্য দাঁড়াবে, তখন তাকবীর বলবে। অতঃপর কুরআন হতে যা তোমার পক্ষে সহজ তা পড়বে। অতঃপর রুকূ‘তে যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে রুকূ‘ করবে। অতঃপর রুকূ‘ হতে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। ধীরস্থিরভাবে সাজদাহ করবে। অতঃপর সাজদাহ হতে উঠে স্থিরভাবে বসবে এবং পুনরায় সাজদায় গিয়ে স্থিরভাবে সাজদাহ করবে। অতঃপর তোমার পুরো ছালাতে এভাবেই করবে’।[৮]
অনুরূপভাবে ইমাম শাফিঈ, ইবনুল মুনযির, ইবনে বাত্ত্বাল, মাওয়ার্দী ও ক্বাযী আয়ায (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, ‘আলিমদের ঐকমত্যানুযায়ী, বিশ মিছক্বাল পরিমাণ স্বর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাতে যে যাকাত নেই এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। সুতরাং যখন তা বিশ মিছক্বাল পরিমাণে পৌঁছাবে, তখন তাতে যাকাত ধার্য হবে।[৯] উল্লেখ্য, মিছক্বাল (مثقال) বলতে এক প্রকারের বিশেষ দীনার বা স্বর্ণের মুদ্রাকে বুঝায়। মূলত এটি হল: স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওজন পরিমাপের একটি ঐতিহ্যবাহী একক। আধুনিক ওজন হিসাবে ১ মিছক্বাল=৪.২৫ গ্রাম। সুতরাং ৪.২৫দ্ধ২০= ৮৫ গ্রাম (খাঁটি স্বর্ণের ক্ষেত্রে)।[১০] আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দীনারের কমে যাকাত নেই। বিশ দীনারে পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে অর্ধ দীনার যাকাত দিতে হবে। এরপর যা বাড়বে তাতে উপরিউক্ত হিসাবে যাকাত দিতে হবে।[১১] প্রখ্যাত তাবিঈ ইররাহীম নাখ’ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রীর একটি কণ্ঠহার ছিল যাতে বিশ মিছক্বাল (স্বর্ণ) ছিল। তিনি তাকে এর থেকে পাঁচ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) যাকাত বের করার আদেশ দিলেন’।[১২]
উপরিউক্ত হাদীছ ও আছারের আলোকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) ও মিছক্বাল ওজনের দিক দিয়ে সমান। মিছক্বাল ও দিরহাম পরিমাপ সম্পর্কে ব্যাখ্যা হল: সাধারণত ২০ মিছক্বাল স্বর্ণের যাকাত হিসাবে এর ২.৫% মিছক্বাল অর্থাৎ প্রায় ৫ দিরহাম রৌপ্যের সমতুল্য দিতে হয়। পক্ষান্তরে ইবনুল মুনযির, ইবনে রূশদ ও ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, আলিমদের ঐকমত্যানুযায়ী, নিছাব পরিমাণ রৌপ্য না হওয়া পর্যন্ত যাকাত নেই। আর রৌপ্যের নিছাব হল: পাঁচ উকিয়াহ, যা দুইশো দিরহামের (রৌপ্য মুদ্রা) সমান।[১৩] আবূ সাঈদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, لَيْسَ فِيْمَا دُوْنَ خَمْسِ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ ‘পাঁচ উকিয়ার কম সম্পদের উপর যাকাত (ফরয) নেই’।[১৪] ইবনুল আছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, উকিয়াহ হল- প্রচলিত দিরহাম। দিরহাম হল- ঐতিহাসিক আরবী রৌপ্যমুদ্রা, যা ইসলামী যুগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত।[১৫] আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমার কাছে দুইশ’ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) থাকলে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে পাঁচ দিরহাম (যাকাত) দিবে।[১৬] ইমাম ইবনে আব্দিল বার্র (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘তাঁদের নিকট এক উকিয়াহ হল চল্লিশ দিরহাম পরিমাণ, এতে কোন মতবিরোধ নেই। সুতরাং পাঁচ উকিয়াহ সমান দুইশ’ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা)’।[১৭]
এক দিরহাম সমান ২.৯৭৫ গ্রাম। তাহলে ২০০ দিরহাম (রৌপ্যের নিছাব)দ্ধ২.৯৭৫ গ্রাম সমান ৫৯৫ গ্রাম। সুতরাং যে ব্যক্তি খাঁটি রৌপ্যের মালিক হবে যার ওজন ৫৯৫ গ্রাম, তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। সেই জন্য শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘নিছাবের পরিমাণ হল: স্বর্ণে পঁচাশি গ্রাম (৮৫), রৌপ্যে পাঁচশ’ পঁচানব্বই গ্রাম (৫৯৫), যা রৌপ্যের ছাপান্ন রিয়ালের সমতুল্য। আর নগদ অর্থের ক্ষেত্রে এর সমমূল্যের অর্থ নিছাব হিসাবে গণ্য হবে’।[১৮] সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি ও শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘স্বর্ণের নিছাব হল: ২০ মিছক্বাল বা ৮৫ গ্রাম অর্থাৎ ৭.৫ ভরি আর রূপার নিছাব হল: ১৪০ মিছক্বাল বা ৫৯৫ গ্রাম অর্থাৎ ৫২.৫ ভরি। অতএব যখনই আপনার কাছে ঐ নিছাব পরিমাণ স্বর্ণ বা রূপা একত্রিত হবে এবং তার উপর যখন এক বছর অতিবাহিত হবে, তখন যাকাত ফরয হবে।[১৯] রাসূল (ﷺ) বলেন, وَفِي الرِّقَّةِ رُبْعُ الْعُشْرِ ‘রৌপ্যের যাকাত চল্লিশ ভাগের এক ভাগ’।[২০] উপরিউক্ত হাদীছে রৌপ্যের যাকাত সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০০ দিরহামে ৫ দিরহাম যাকাত লাগবে। অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫%। আর স্বর্ণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০ দীনারে অর্ধ দীনার যাকাত লাগবে। অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫%। অতঃপর উপরের দিকে যত বাড়বে তাতে উপরিউক্ত হিসাবে যাকাত দিতে হবে।[২১]
৪- ভুল ব্যাখ্যা ও বিকৃতি রোধ
কুরআনের আয়াত ভুলভাবে ব্যাখ্যা করলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। তাফসীর শাস্ত্রে রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ, ছাহাবায়ে কিরামের ব্যাখ্যা ও মুফাসসিরগণের গবেষণা এই বিভ্রান্তির নিরসন করে। একজন প্রকৃত মুসলিম সদা-সর্বদা কিতাব ও সুন্নাহকে সবার উপরে রাখে। তার ফায়সালাকেই চূড়ান্ত বলে মান্য করে। তার উপরে কারো কথা, ব্যক্তিগত মতামত, ধারণা, মনগড়া ব্যাখ্যা, খেয়ালখুশি, বিবেক, যুক্তি বা মাযহাবকে প্রাধান্য দেয় না। কুরআন ও হাদীছকে ছাহাবীদের বুঝ অনুযায়ী বোঝে এবং সেই মত আমল করে। তাওহীদে, ধর্মবিশ্বাসে, ইবাদতে, আচার-আচরণে, দাওয়াত ও তাবলীগে, শুধু তাঁদেরই অনুসরণ করে। সমস্ত ফিরক্বাই দাবি করে যে, আমরা কুরআন ও সুন্নাহ মেনে চলি। তারপরও কেন এত দলাদলি, ফিরক্বাবাজি ও বিভ্রান্তি? এসবের মূলে হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ সালাফদের বুঝের আলোকে না বুঝে নিজেদের বুঝ ও বিবেকের আলোকে বুঝা। অথচ কুরআন ও সুন্নাহ বুঝতে হবে সালাফদের বুঝের আলোকে। নিজের বুঝ ও খেয়ালখুশি অনুযায়ী কুরআন ও সুন্নাহ বুঝার কোন সুযোগ নেই, বরং সালাফদের বুঝের আলোকে বুঝা অপরিহার্য। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন,
وَمَنْ يُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدٰى وَ يَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰى وَ نُصْلِهٖ جَهَنَّمَ١ؕ وَ سَآءَتْ مَصِيْرًاؒ
‘আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমরা সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!’ (সূরা আন-নিসা: ১১৫)।
এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ যদি সালাফদের বুঝে ও মানহাজে কুরআন ও সুন্নাহ না বুঝে, তাদের পথে না চলে তবে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে, সালাফদের বুঝের আলোকে ইসলাম বুঝা। সুতরাং যে ব্যক্তি ছাহাবায়ে কিরাম, এবং তাঁদের অনুগামী তাবিঈন এবং তাঁদের অনুগামী তাবি’-তাবিঈন ও দ্বীনের ইমামগণের অনুসরণ করে ছহীহ হাদীছের সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে গ্রহণ করে, কুরআন ও হাদীছকে তাঁদের বুঝ অনুযায়ী বোঝে এবং সেই মত আমল করে। তাওহীদে, ধর্মবিশ্বাসে, ইবাদতে, আচার-আচরণে, দাওয়াত ও তাবলীগে, শুধু তাঁদেরই অনুসরণ করে, সেই হল প্রকৃত সালাফী। সেই-ই হল সালাফী মানহায ও আদর্শের অনুসারী।
৫- কুরআনের বৈজ্ঞানিক, নৈতিক ও দার্শনিক দিক উপলব্ধি করা
কুরআনে প্রকৃতি, মানবসৃষ্টি, নৈতিকতা ও আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর আলোচনা রয়েছে। তাফসীরে এগুলোর ব্যাখ্যা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০)। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে তাফসীরে এটির ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৬- বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া
তাফসীর শাস্ত্রে কুরআনের নীতিমালা বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জের সাথে কিভাবে খাপ খায়, তা আলোচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ অর্থনৈতিক সুবিচার, সমাজিক শান্তি বা পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা তাফসীরে বিশ্লেষণ করা হয়। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, তাফসীর হল: কুরআন বুঝার চাবিকাঠি। এটি ব্যতীত কুরআনের গভীর জ্ঞানার্জন ও সঠিক পথনির্দেশ পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্যই ইসলামী স্কলাররা হাদীছ, আরবী ভাষা, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের আলোকে তাফসীর রচনা করেছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর বাণী সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২৯০০৪৯।
[২]. শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ), আল-ইলম, পৃ. ৮৩।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৬৯; আবূ দাঊদ, হা/২৩৪৮; তিরমিযী, হা/৭৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৭২৭।
[৪]. মুসনাদে আহমাদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩২৭; মুস্তাদরাকে হাকিম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২২০; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৪০৮৬, ১১৬০৭, ১১৬০৮।
[৫]. সূরা আত-তাওবাহ: ১১৩; ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৭৫।
[৬]. রিসালাতুশ শাফিঈ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৯; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৯৩১১১।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬১২; আবূ দাঊদ, হা/৩৯৬: নাসাঈ, হা/৫২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৯৬৬, ৬৯৯৩, ৭০৭৭।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৭, ৭৯৩, ৬২৫১, ৬২৫২, ৬৬৬৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৭।
[৯]. আল-উম্ম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৩; আল-ইজমা‘, পৃ. ৪৬; শারহু ছহীহিল বুখারী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪০১; আল-হাবীউল কাবীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৬৭; ইকমালুল মু‘আল্লিম শারহু ছহীহি মুসলিম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৫৯।
[১০]. আন-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৭; লিসানুল ‘আরব, ১১/৮৭; হাশিয়া ইবনে আবেদীন, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৯৬; মাজাল্লাতুল বুহূছিল ইসলামিয়্যাহ, ৩৯শ খণ্ড, পৃ. ২৪৩-২৪৪।
[১১]. আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩, ১৫৭২, ১৫৭৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৬৪; ইরওয়াউল গালীল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৯০।
[১২]. আল-আমওয়াল লি আবী উবাইদ, হা/৯২৩; মুছান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১২০; দারাকুতনী, হা/১৯৬৩।
[১৩]. আল-ইজমা‘, পৃ. ৪৬; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৫; আল-মুগনী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৫।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪০৫, ১৪৪৭, ১৪৫৯, ১৪৮৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১২৫৩।
[১৫]. আন-নিহায়া, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৫৪।
[১৬]. আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩, ১৫৭২, ১৫৭৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৯১।
[১৭]. আল-ইসতিযকার, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১২৭-১২৮।
[১৮]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল লিইবনে উছাইমীন, ১৮শ খণ্ড, পৃ. ১৩৮।
[১৯]. ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৯ম খণ্ড, পৃ. ২৫৪-২৫৭।
[২০]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪৫৪, ১৫৭৩।
[২১]. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪৫৬০০।
প্রসঙ্গসমূহ »:
নীতি-নৈতিকতা