জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ
- মূল: ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহহাফ আল-ক্বাহতানী
-অনুবাদ : মুহাম্মাদ ইমরান বিন ইদরিস*
(শেষ কিস্তি)
[এপ্রিল’২৫-এর পর]
১১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য হওয়া
যোদ্ধা বা জিহাদকারী একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে জিহাদ করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَ لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ خَرَجُوۡا مِنۡ دِیَارِہِمۡ بَطَرًا وَّ رِئَآءَ النَّاسِ ‘তোমরা তাদের মতো আচরণ করো না, যারা নিজেদের গৃহ হতে সদর্পে এবং লোকদেরকে (নিজেদের শক্তি) প্রদর্শন করে বের হয়’ (সূরা আনফাল : ৪৬)। তিনি আরো বলেন,وَ الَّذِیۡنَ جَاہَدُوۡا فِیۡنَا لَنَہۡدِیَنَّہُمۡ سُبُلَنَا ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ لَمَعَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন’ (সূরা আল-‘আনকাবূত : ৬৯)।
হাদিছে এসেছে, এক ব্যক্তি নাবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, এক ব্যক্তি গনীমতের জন্য, এক ব্যক্তি প্রসিদ্ধ হওয়ার জন্য এবং এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখানোর জন্য জিহাদে শরীক হলো। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করল? তিনি বললেন, مَنْ قَاتَلَ لِتَكُوْنَ كَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কালিমা বুলন্দ থাকার উদ্দেশে যুদ্ধ করল, সেই আল্লাহর পথে জিহাদ করল’।[১] হাদীছে আরো এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘লোকের মধ্যে ক্বিয়ামতের দিন যাদের বিচার করা হবে, তারা হবে তিন শ্রেণীর লোক। তিনি তাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো যে যুদ্ধ করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, তাকে যেন বলা হয় অমুক ব্যক্তি বাহাদুর।[২]
১২. আল্লাহর কাছে যা আছে তা লাভের আকাঙ্খা করা
যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সাহায্য লাভের বড় ও মহান উপকরণ হলো আল্লাহর নিকটের সমস্ত কল্যান, দুনিয়া এবং পরকালের সমস্ত কল্যান লাভের আশা আকাঙ্খা করা। এই কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবী এবং তাঁর পরে তার ছাহাবীদের সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার নিকট যা আছে তা লাভের আকাঙ্খা প্রকাশের ব্যাপারে দলীল
প্রথমত : ‘উমায়ের বিন হুমাম আল আনসারী যা করেছিলেন যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
قُوْمُوْا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ" فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللَّهِﷺ جَنَّةٌ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ قَالَ " نَعَمْ " . قَالَ بَخٍ بَخٍ . فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ " مَا يَحْمِلُكَ عَلَى قَوْلِكَ بَخٍ بَخٍ " . قَالَ لاَ وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ إِلَّا رَجَاءَةَ أَنْ أَكُوْنَ مِنْ أَهْلِهَا . قَالَ " فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا " . فَأَخْرَجَ تَمَرَاتٍ مِنْ قَرْنِهِ فَجَعَلَ يَأْكُلُ مِنْهُنَّ ثُمَّ قَالَ لَئِنْ أَنَا حَيِيْتُ حَتَّى آكُلَ تَمَرَاتِيْ هَذِهِ إِنَّهَا لَحَيَاةٌ طَوِيْلَةٌ قَالَ فَرَمَى بِمَا كَانَ مَعَهُ مِنَ التَّمْرِ. ثُمَّ قَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ.
‘তোমরা জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার মত’। রাবী বলেন, ‘উমায়র ইবনু হুমাম আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! জান্নাতের প্রশস্ততা কি আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার ন্যায়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ‘উমায়র বলে উঠলেন, বাহ, বাহ, কী চমৎকার! তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, বাহ, বাহ্, বলতে তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করলো হে! তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! বরং আল্লাহর কসম! আমি তার অধিবাসী হওয়ার আশায়ই এরূপ বলেছি। তখন তিনি বললেন, তুমি নিশ্চয়ই তার অধিবাসী (হবে)। রাবী বলেন, তারপর তিনি তার তৃণ থেকে কয়েকটি খেজুর বের করলেন এবং তা খেতে লাগলেন। তারপর বললেন, আমি যদি এ খেজুরগুলো খেয়ে শেষ করা পর্যন্ত বেঁচে থাকি তবে তাও হবে এক দীর্ঘ জীবন। রাবী বলেন, তারপর তিনি তাঁর কাছে রক্ষিত খেজুরগুলো ছুড়ে ফেলে দিলেন, তারপর জিহাদে প্রবৃত্ত হলেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হলেন।[৩]
দ্বিতীয়ত : উহুদের দিন আনাস বিন মালেক এর চাচা আনাস বিন নজর যা করেছিলেন। কারন বদর যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। আর বদর যুদ্ধ থেকে তিনি পিছিয়ে থাকার বিষয়টি তাঁর উপর খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি করলেন এবং বললেন,
أَوَّلُ مَشْهَدٍ شَهِدَهُ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ غُيِّبْتُ عَنْهُ وَإِنْ أَرَانِيَ اللهُ مَشْهَدًا فِيْمَا بَعْدُ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ لَيَرَانِيَ اللهُ مَا أَصْنَعُ - قَالَ فَشَهِدَ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ يَوْمَ أُحُدٍ- قَالَ فَاسْتَقْبَلَ سَعْدُ بْنُ مُعَاذٍ فَقَالَ لَهُ أَنَسٌ يَا أَبَا عَمْرٍو أَيْنَ فَقَالَ وَاهًا لِرِيْحِ الْجَنَّةِ أَجِدُهُ دُوْنَ أُحُدٍ- قَالَ فَقَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ- قَالَ فَوُجِدَ فِيْ جَسَدِهِ بِضْعٌ وَثَمَانُونَ مِنْ بَيْنِ ضَرْبَةٍ وَطَعْنَةٍ وَرَمْيَةٍ - قَالَ فَقَالَتْ أُخْتُهُ عَمَّتِيَ الرُّبَيِّعُ بِنْتُ النَّضْرِ فَمَا عَرَفْتُ أَخِيْ إِلَّا بِبَنَانِهِ . وَنَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ (مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ رِجَالٌ صَدَقُوۡا مَا عَاہَدُوا اللّٰہَ عَلَیۡہِ ۚ فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ قَضٰی نَحۡبَہٗ وَ مِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّنۡتَظِرُ ۫ۖ وَ مَا بَدَّلُوۡا تَبۡدِیۡلًا).
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রথম যে যুদ্ধটি করেছিলেন, তাতে আমি শরীক হতে পারলাম না। এরপর যদি আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তার কোন যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দান করেন তাহলে আমি কী করি তা আল্লাহ দেখবেন। (রাবী বলেন) তারপর উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (রাবী বলেন) সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন অগ্রসর হলেন, তখন আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আবূ ‘আমর কোথায় (যাচ্ছে)? আহা! জান্নাতের ঘ্রাণ আমি উহুদ প্রান্ত থেকে পাচ্ছি। (রাবী বলেন) তারপর তিনি কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, এমন কি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়ে গেলেন। (রাবী বলেন) অতঃপর তার মৃত লাশে আশিটিরও অধিক তরবারি, বর্শা ও তীরের চিহ্ন পাওয়া যায়। (রাবী) তার বোন এবং আমার ফুফু রুবাইঈ বিনতু নাযর (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, (শহীদের ক্ষত-বিক্ষত দেহের) কেবল তার আঙ্গুলের জোড়া দেখেই তাকে আমি সনাক্ত করেছি। (অন্য কোন পরিচয়ই অবশিষ্ট ছিল না।) তখন নাযিল হলো,مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ رِجَالٌ صَدَقُوۡا مَا عَاہَدُوا اللّٰہَ عَلَیۡہِ ۚ فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ قَضٰی نَحۡبَہٗ وَ مِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّنۡتَظِرُ ۫ۖ وَ مَا بَدَّلُوۡا تَبۡدِیۡلًا ‘মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যে বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ (যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ (শাহাদাত বরণের) প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা (প্রতিশ্রুতিতে) কোন পরিবর্তনই করেনি’ (সূরা আল-আহযাব : ২৩)।[৪]
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুসলিম ব্যক্তি যখন আল্লাহর নিকটে থাকা বস্তু লাভের আশা আকাঙ্খা করবে, তখন এই আগ্রহের দরুনে তার কাছে আপতিত কোনো কষ্টই তার কষ্ট মনে হবে না। যেমনভাবে খুবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মৃত্যুক্ষণে কবিতা আকারে বলেছিলেন,
فَلَسْتُ أُبَالِيْ حِيْنَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا
عَلَى أيِّ جَنْبٍ كَانَ للهِ مَصْرَعِيْ
‘আমি যখন মুসলিম হয়ে মৃত্যুর সৌভাগ্য লাভ করছি, তাই আমার কোনই ভয় নেই।
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে কোন অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হোক’।[৫]
১৩. মুমিন ব্যক্তিকে নেতৃত্বর দায়িত্ব প্রদান করা
জিহাদের ময়দানে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য লাভের উত্তম ও উপযুক্ত উপকরণ হলো, পূর্ণ মুমিন এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিকে যুদ্ধ এবং সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্বভার প্রদান করা। অতঃপর তাদের নিকটতম ব্যক্তিকে (সেনাবাহিনী ও যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বভার) প্রদান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اِنَّ اَکۡرَمَکُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ اَتۡقٰکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)। মহান আল্লাহ মুত্তাক্বী ব্যক্তিদেরকে ভালোবাসেন। বান্দার জন্য আল্লাহর ভালোবাসা যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর শত্রুকে পরাজিত করতে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য লাভের অতি উত্তম একটি উপায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,بَلٰی مَنۡ اَوۡفٰی بِعَہۡدِہٖ وَ اتَّقٰی فَاِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَّقِیۡنَ ‘হ্যাঁ, যারা স্বীয় অঙ্গীকার পূর্ণ করে ও সংযত হয়, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাক্বীদেরকে ভালোবাসেন’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ৭৬)।
১৪. আযাব অবতারণ, পরাজয় মনোভাব ও ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে রক্ষাকারী স্তম্ভগুলো সংরক্ষণ করা
বান্দার জন্য সংরক্ষক ও হেফাজতকারী রয়েছে যা আযাব অবতারণ, পরাজয় বরণ মনোভাব ও ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে বান্দাকে সংরক্ষণ ও হেফাজত করে। এই বিষয়গুলোই তাকে হেফাজত ও রক্ষা করবে, যে ব্যক্তি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, ধ্বংসে এবং মহামারীতে পতিত হয়েছে। অনুরূপভাবে তার কাছে বিপদ মুছীবত আপতিত হওয়ার আগেই তা নিঃশেষ করে দিবে। আযাব অবতারণ, পরাজয় মনোভাব ও ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে রক্ষাকারী স্তম্ভগুলো হলো,
১. ছোট বড় সমস্ত পাপ ও খারাপ কাজ থেকে তাওবা ও ইস্তেগফার করা। নিম্নোক্ত শর্তসমূহ ছাড়া তাওবা কবুল হবে না।
১. সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হওয়া এবং বর্জন করা
২. পুনরায় ঐ পাপে নিমজ্জিত না হওয়ায় প্রতি দৃঢ় সংকল্প করা
৩. পাপ করার কারণে লজ্জিত হওয়া।
পাপ কাজটা অপর বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে তাহলে তার জন্য আরো একটি বেশি শর্ত হলো,
৪. সেই বান্দার নিকট থেকে মুক্ত হওয়া।
জীবন কন্ঠনালিতে আসার পর অথবা সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠার পর আর কারো কোন তাওবা কবুল হবে না। কোন সন্দেহ নেই যে, কবুলযোগ্য তাওবা এবং ইস্তেগফার যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য লাভের উত্তম উপায় ও উপকরণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِنَّ اللّٰہَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ؕ وَ اِذَاۤ اَرَادَ اللّٰہُ بِقَوۡمٍ سُوۡٓءًا فَلَا مَرَدَّ لَہٗ ۚ وَ مَا لَہُمۡ مِّنۡ دُوۡنِہٖ مِنۡ وَّالٍ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেননা, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। কোন সম্প্রদায় সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তাহলে তা রদ করার কেহ নেই এবং তিনি ছাড়া তাদের কোন অভিভাবক (ওয়ালী) নেই’ (সূরা আর-রা‘দ : ১১)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, وَ مَا کَانَ اللّٰہُ لِیُعَذِّبَہُمۡ وَ اَنۡتَ فِیۡہِمۡ ؕ وَ مَا کَانَ اللّٰہُ مُعَذِّبَہُمۡ وَ ہُمۡ یَسۡتَغۡفِرُوۡنَ ‘(হে নাবী!) আপনি তাদের মধ্যে থাকা অবস্থায় তাদেরকে শাস্তি দেয়া আল্লাহর অভিপ্রায় নয়, আর আল্লাহ এটাও চাননা যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন’ (সূরা আল-আনফাল : ৩৩)।
২. আল্লাহ ভীতি। বান্দা তার এবং তার প্রভুর ভয়, আযাব, শাস্তি, রাগ ও ক্রোধের মধ্যে একটি সুরক্ষা স্থাপন করবে, যেই সুরক্ষা তাকে এ সমস্ত বিষয় থেকে হেফাজত ও রক্ষা করবে। ত্বালক ইবনু হাবিব (রাহিমাহুল্লাহ) যথার্থই বলেছেন,
أن تعمل بطاعة الله على نور من الله، ترجو ثواب الله، وأن تترك معصية الله على نور من الله تخاف عقاب الله
‘(তাকওয়া হলো) তুমি আল্লাহর আনুগত্য করো আল্লাহর নূরের ভিত্তিতে, আল্লাহর পুরস্কারের আশায়। আর আল্লাহর অবাধ্যতা ত্যাগ করো আল্লাহর নূরের ভিত্তিতে, আল্লাহর শাস্তির ভয়ে’।[৬]
৩. ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথ সম্পাদন করা এবং নফল ইবাদতগুলো ভালোভাবে আদায় করা। কেননা এগুলোর মাধ্যমেই বান্দার জন্য আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হয়। আর আল্লাহ তা‘আলা যখন তার কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তাকে সাহায্য সহযোগিতা করেন, সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং ভালো কাজ করার তাওফীক্ব দান করেন। হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِنَّ اللهَ تَعَالَى قَالَ مَنْ عَادَى لِيْ وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِيْ بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِيْ يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِيْ يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِيْ يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِيْ يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِيْ يَمْشِيْ بِهَا وَإِنْ سَأَلَنِيْ لَأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِيْ لَأُعِيْذَنَّهُ وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِيْ عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ وَأَنَا أَكْرَهُ مُسَاءَتَهُ وَلَا بُدَّ لَهُ مِنْهُ
আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যে আমার কোন বন্ধুকে শত্রু ভাবে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করি। আমি আমার বান্দার উপর যা ফরয করেছি শুধু তা দ্বারা কেউ নৈকট্য লাভ করতে পারবে না; বরং আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে সর্বদা আমার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করবে। অবশেষে আমি তাকে ভালবাসি। আর আমি যখন তাকে ভালবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শুনে, আমি তার চোখ হযে যাই, যা দ্বারা সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে এবং যখন সে আমার নিকট কিছু চায় আমি তাকে তা দেই। যদি সে আমার আশ্রয় চায়, তাহলে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেয়। আর আমি যা করতে চাই তা করতে দ্বিধা করি না। তবে মুমিনের রূহ কবয করতে ইতস্তত করি। সে মরণকে অপসন্দ করে, আর আমি তাকে অসন্তুষ্ট করতে (বেঁচে থাকা) অপসন্দ করি। যদিও মৃত্যু তার জন্য আবশ্যক।[৭]
৪. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। হাদীছে এসেছে,
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوْشِكَنَّ اللهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُوْنَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ.
হুযাইফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নাবী (ﷺ) বলেছেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ তা‘আলা শীঘ্রই তোমাদের উপর তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তার নিকট দু‘আ করলেও তিনি তোমাদের সেই দু‘আ গ্রহণ করবেন না।[৮] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَلَمَّا نَسُوۡا مَا ذُکِّرُوۡا بِہٖۤ اَنۡجَیۡنَا الَّذِیۡنَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ السُّوۡٓءِ وَ اَخَذۡنَا الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا بِعَذَابٍۭ بَئِیۡسٍۭ بِمَا کَانُوۡا یَفۡسُقُوۡنَ
‘অতঃপর যে উপদেশ তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, যখন তারা তা ভুলে তখন আমি মুক্তি দিলাম তাদেরকে যারা মন্দ হতে নিষেধ করে। আর যারা যুলম করেছে তাদেরকে কঠিন আযাব দ্বারা পাকড়াও করলাম। কারণ, তারা পাপাচার করত’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৬৫)।
৫. সমস্ত কাজ, কর্মে কথায় এবং বিশ্বাসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণ করা।
৬. আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু‘আ ও মিনতি করা।
পরিশেষে সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের শেষ ও শ্রেষ্ঠ নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর। তাঁর পরিবার পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের উপর। আরো সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক যারা একনিষ্ঠভাবে ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করে।
* শিক্ষক, মাদরাসাতুল হাদীছ আস-সালাফিয়া, সাবগ্রাম, বগুড়া।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৩।
[২]. আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন প্রথমে শহীদের বিচার হবে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে তাঁর নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সে তা অবগতও হবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এ নে‘মতের বিনিময়ে দুনিয়ায় কী কাজ করেছ? সে বলবে, আপনার পথে আমি যুদ্ধ করেছি, এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছিলে, যাতে তোমাকে ‘বাহাদুর’ বলা হয়। আর তা তোমাকে বলাও হয়েছে। অতঃপর তাঁর সম্পর্কে আদেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর এমন ব্যক্তি, যে ইলম শিক্ষা করেছে এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন পড়েছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ প্রথমে তাকে তাঁর নে‘মতসূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সে তা অবগতও হবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এসকল নে‘মতের বিনিময়ে কী করেছ? সে বলবে, আমি ইলম শিক্ষা করেছি ও অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার জন্য কুরআন পড়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি এই জন্য ইলম শিক্ষা করেছিলে, যাতে তোমাকে ‘আলেম’ বলা হয় এবং এই জন্য কুরআন পড়েছিলে যাতে তোমাকে ‘ক্বারী’ বলা হয়। আর তা তোমাকে বলাও হয়েছে। অতঃপর তাঁর সম্পর্কে আদেশ করা হবে এবং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর এমন ব্যক্তি, যার আল্লাহ রিযিক প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন এবং তাকে বিভিন্ন প্রকারের সম্পদ প্রদান করেছিলেন। তাকে আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে তাঁর নে‘মতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সে তা অবগতও হবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এসবের কৃতজ্ঞতায় কী করেছ? জওয়াবে সে বলবে, আমি এমন কোন রাস্তায় ব্যয় করা বাকী রাখিনি, যে খাতে ব্যয় করাকে আপনি পসন্দ করেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি এ উদ্দেশ্যে দান করেছিলে, যাতে তোমাকে ‘দানবীর’ বলা হয়। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তাঁর সম্পর্কে আদেশ করা হবে এবং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। দ্র. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৫।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০১।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৩।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৯৮৯।
[৬]. রাওযাতুল ‘আবিদীন, পৃ. ৯৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫০২।
[৮]. তিরমিযী, হা/২১৬৯, সনদ হাসান।