সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব
-হাসিবুর রহমান বুখারী*
(৬ষ্ঠ কিস্তি)
সপ্তম চক্রান্ত
সুন্নাহ বিরোধী কুরানিস্ট বা আহলে কুরআন নামক অন্ধবিশ্বাসীদের একটি দাবী প্রায়শই শোনা যায় যে, ‘খোদ নবীই তো হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছিলেন। তাহলে হাদীছ মানার প্রয়োজন কী? সুন্নাহ বিরোধীদের একজন কুখ্যাত ইবলীস পারভেজ বলেছে, যদি সত্যিই সুন্নাহ দ্বীনের অংশ হত, তাহলে অবশ্যই নবী (ﷺ) তা সংরক্ষণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করতেন, যেমনটি তিনি কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের ক্ষেত্রে করেছেন। যেমন: লিপিবদ্ধকরণ, মুখস্থকরণ, শ্রুতি এবং স্মৃতিতে ধরে রাখা ইত্যাদি এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বে অবশ্যই এর জন্য একটি সন্তুষ্টজনক ব্যবস্থা করে যেতেন। এছাড়া একটি সুরক্ষিত রূপরেখা উম্মতের হাতে তুলে দিয়ে যেতেন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) যাবতীয় কার্যকলাপ ও ব্যবস্থাপনা কুরআনুল কারীমের জন্য গ্রহণ করেছেন আর সুন্নাতের জন্য কিছুই করেননি। বরং তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেছেন,
لَا تَكْتُبُوْا عَنِّيْ وَمَنْ كَتَبَ عَنِّيْ غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ وَحَدِّثُوْا عَنِّيْ وَلَا حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَىَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
‘তোমরা আমার বাণী লিপিবদ্ধ করো না। কুরআন ব্যতীত কেউ যদি আমার বাণী লিপিবদ্ধ করে থাকে তবে যেন তা মুছে ফেলে। আমার হাদীছ বর্ণনা কর, এতে কোন অসুবিধা নেই। যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে- তবে সে যেন জাহান্নামে তাঁর ঠিকানা বানিয়ে নেয়’।[১]
জবাব
ইমাম খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) লিখেছেন,
إنما نهى أن يكتب الحديث مع القرآن في صحيفة واحدة لئلا يختلط به ويشتبه على القارىء فأما أن يكون نفس الكتاب محظوراً وتقييد العلم بالخط منهياً عنه فلا
‘নিশ্চয় রাসূল (ﷺ) একই পৃষ্ঠায় কুরআনের সাথে হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছেন। যেন কুরআন ও হাদীছ মিশ্রিত হয়ে না যায় এবং কোন পাঠকের জন্য যেন তা বিভ্রান্তিকর না হয়। পক্ষান্তরে হাদীছ লিপিবদ্ধ করা ও জ্ঞান সংরক্ষণ করার যে বিষয়টি রয়েছে, এটি মৌলিকভাবে কখনোই নিষিদ্ধ ছিল না’।[২]
মজার বিষয় হল- ‘এক সময় যে রাসূল (ﷺ) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন, সেই কথাটাও আমরা হাদীছ থেকেই জানতে পেরেছি। সুতরাং এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল- যদি সত্যিই মুনকিরীনে হাদীছরা ‘হাদীছ অস্বীকার করে থাকে’, তাহলে তারা ‘হাদীছ লিপিবদ্ধ করা নিষেধ’ সম্পর্কিত হাদীছ বর্ণনা করে হাদীছ সংকলন নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ পেশ করে কোন্ লজ্জায়! এটা কি তাদের দ্বিচারিতা নয়? এই হাদীছ মানার অর্থই হল- তারা হাদীছ মানে। না মানলে দলীল দেয় কিভাবে? তাহলে এক হাদীছ মেনে বাকি হাদীছ অস্বীকার করা ভণ্ডামী ছাড়া আর কী? আর যদি এই অপদার্থরা এ হাদীছকে ‘হাদীছ’ না মানে, তাহলে ‘হাদীছ লিখতে নিষেধ হওয়া’ মর্মে কুরআনের কোন আয়াত দেখানো তাদের দায়িত্ব। যেহেতু তাদের কাছে দলীল ও হুজ্জাত কেবল কুরআন। যদি কুরআন থেকে ‘হাদীছ লেখা নিষেধ’ দেখাতে না পারে, তাহলে হাদীছ অস্বীকার করে আবার হাদীছ দিয়ে ‘হাদীছ লেখা নিষেধ’ প্রমাণ করা প্রতারণা বৈ আর কী? কিছু জেনারেল শিক্ষিত মানুষের মাঝে মুনকিরীনে হাদীছ তথা হাদীছ অস্বীকারকারী দলের আবির্ভাব হয়েছে। তাদের শিক্ষার ঘাটতি কিংবা ইসলাম ধর্মকে সাধারণ মানুষের সামনে বিতর্কিত করতে ইসলামের অপরিহার্য অংশ হাদীছকে অস্বীকার করে থাকে। সেই জন্যই আমরা বলি, তাদের এই ভণ্ডামি ও চক্রান্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সামনে টিকবে না। সেই অস্বীকারের নোংরা মনোবৃত্তিকে প্রমাণ করতে আবার হাদীছেরই সহায়তা নিয়ে বলে যে, নবী (ﷺ) ছাহাবায়ে কিরামগণকে তাঁর হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছেন। এসব কথা বলে উম্মতকে হাদীছ থেকে দূরে রাখার ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে এটি হাদীছ অস্বীকারকারীদের ঘৃণিত চক্রান্ত ও অপপ্রচার। কুরআন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যেমন শ্রুতি এবং স্মৃতিই প্রধান নিয়ামক হিসাবে এবং লিপিবদ্ধকরণের সহায়ক হিসাবে কাজ করেছে, হাদীছের ক্ষেত্রেও তাই। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে যে সকল মানুষের শ্রুতি, স্মৃতি এবং বিশ্বস্ততার দ্বারা সংরক্ষণ করেছেন, হাদীছের ক্ষেত্রেও সেই একই মানুষের শ্রুতি, স্মৃতি এবং বিশ্বস্ততার দ্বারা সংরক্ষণ করা হয়েছে। একথা সত্য যে, কুরআন অবতরণের প্রথম দিকে কুরআন এবং হাদীছ মিশ্রিত হয়ে যাবার আশঙ্কায় এবং লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমের অপ্রতুলতা থাকায় হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে এর মাধ্যমে মৌখিক প্রচার বন্ধ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং আল্লাহর বাণীর সাথে তাঁর কথা, ব্যাখ্যা ইত্যাদি লিখিতভাবে মিলে মিশে যাক, সেটা তিনি চাননি। যেমন আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা আমার মুখ নিঃসৃত বাণী লিপিবদ্ধ করো না। কুরআন ব্যতীত কেউ যদি আমার বাণী লিপিবদ্ধ করে থাকে তবে যেন তা মুছে ফেলে। আমার হাদীছ বর্ণনা কর, এতে কোন অসুবিধা নেই। যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে- তবে সে যেন জাহান্নামে তাঁর ঠিকানা বানিয়ে নেয়’।[৩] লক্ষণীয় বিষয় হল- এখানে যেমন কুরআন ব্যতীত অন্য কোন কিছু লিপিবদ্ধকরণকে নিষেধ করা হচ্ছে। ঠিক তেমনি হাদীছ মুখস্থ করা ও বর্ণনা করার নির্দেশও প্রদান করা হচ্ছে। তাহলে এই হাদীছ উপস্থাপন করে ‘হাদীছ সংকলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে’ বলা পরিষ্কার নবী (ﷺ)-এর উপর মিথ্যারোপ করা। আর নবী (ﷺ) -এর উপর মিথ্যারোপকারী জাহান্নামে নিজের ঠিকানা নির্ধারণ করলো বলে উক্ত হাদীছেই বলা হয়েছে।
মোদ্দাকথা হল- লিপিবদ্ধকরণের নিষেধাজ্ঞা কখনোই হাদীছের প্রচার-প্রসারকে রূদ্ধ করার জন্য ছিল না। বরং নবী (ﷺ) ছাহাবীদের বলতেন, তোমরা তোমাদের গোত্রের নিকট ফিরে যাও এবং তাদেরকে শিক্ষা দাও। আবূ জামরাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং অন্য লোকদের মধ্যে ভাষান্তরের কাজ করতাম। একদা ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, ‘আব্দুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দল নবী (ﷺ)-এর নিকট আসলে তিনি বললেন, তোমরা কোন্ প্রতিনিধি দল? অথবা বললেন, তোমরা কোন্ গোত্রের? তারা বলল, ‘রাবী‘আহ গোত্রের। তিনি বললেন, ‘স্বাগতম। এ গোত্রের প্রতি অথবা এ প্রতিনিধি দলের প্রতি, এরা কোনরূপ অপদস্থ ও লাঞ্ছিত না হয়েই এসেছে। তারা বলল, ‘আমরা বহু দূর হতে আপনার নিকট এসেছি। আর আমাদের ও আপনার মধ্যে রয়েছে কাফিরদের এই ‘মুযার’ গোত্রের বাস। আমরা নিষিদ্ধ মাস ব্যতীত আপনার নিকট আসতে সক্ষম নই। সুতরাং আমাদের এমন কিছু নির্দেশ দিন, যা আমাদের পিছনে যারা রয়েছে তাদের নিকট পৌঁছতে এবং তার ওয়াছিলায় আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি’। তখন তিনি তাদের চারটি কাজের নির্দেশ দিলেন এবং চারটি কাজ থেকে নিষেধ করলেন। তাদের এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের আদেশ করলেন। তিনি বললেন, এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন কীরূপে হয় জান? তারা বলল, ‘আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন’। তিনি বললেন, ‘তা হল এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল, ছালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা এবং রামাযান-এর ছিয়াম পালন করা আর তোমরা গনীমাতের মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ দান করবে’। আর তাদের নিষেধ করলেন শুকনো কদুর খোল, সবুজ কলস এবং আলকাতরা দ্বারা রঙ করা পাত্র ব্যবহার করতে। শু‘বা বলেন, কখনও (আবূ জামরা) খেজুর গাছ থেকে তৈরি পাত্রের কথাও বলেছেন। রাসূল (ﷺ) বললেন, احْفَظُوْهُ وَأَخْبِرُوْهُ مَنْ وَرَاءَكُمْ ‘তোমরা এগুলো মনোযোগ সহকারে স্মরণ রাখ এবং তোমাদের পশ্চাতে যারা রয়েছে তাদের নিকট পৌঁছে দাও’।[৪]
আবূ সুলাইমান মালিক ইবনু হুওয়ায়রিস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন নবী (ﷺ)-এর নিকটে (দ্বীন শিখতে) আসলাম। তখন আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী যুবক। বিশ দিন তাঁর কাছে আমরা থাকলাম। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা আমাদের পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছি। যাদের আমরা বাড়িতে রেখে এসেছি তাদের ব্যাপারে তিনি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তা তাঁকে জানালাম। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয় ও দয়ার্দ্র। তাই তিনি বললেন,
ارْجِعُوْا إِلَى أَهْلِيْكُمْ فَعَلِّمُوْهُمْ وَمُرُوْهُمْ، وَصَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ، وَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ.
‘তোমরা তোমাদের পরিজনের নিকট ফিরে যাও। তাদের (কুরআন) শিক্ষা দাও, (সৎ কাজের) আদেশ কর এবং যে ভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখেছ ঠিক তেমনভাবে ছালাত আদায় কর। ছালাতের ওয়াক্ত হলে, তোমাদের একজন আযান দেবে এবং যে তোমাদের মধ্যে বড় সে ইমামতী করবে’।[৫] জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে তাঁর বাহনে সওয়ার অবস্থায় কংকর মারতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলেছিলেন, لِتَأْخُذُوْا مَنَاسِكَكُمْ، فَإِنِّيْ لَا أَدْرِيْ لَعَلِّي لَا أَحُجُّ بَعْدَ حَجَّتِيْ هَذِهِ ‘তোমরা হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। কেননা আমি অবহিত নই আমার এই হজ্জের পর আবার হজ্জ করার সুযোগ পাবো কি-না’।[৬]
অতঃপর যেক্ষেত্রে এবং যে সময়ে ঐ আশঙ্কা বিদ্যমান ছিল না, সেক্ষেত্রে এবং সে সময়ে হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের এই নিষেধাজ্ঞাও বহাল ছিল না, বরং হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ শুরু হয় স্বয়ং নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই। এর কতিপয় দলীল-প্রমাণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
১- আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, মক্কা বিজয়কালে খুযা‘আহ গোত্র লায়স গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করল। এ হত্যা ছিল তাদের এক নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ, যাকে ইতিপূর্বে লায়স গোত্রের লোক হত্যা করেছিল। অতঃপর এ খবর নবী (ﷺ)-এর নিকট পৌঁছল। তিনি তাঁর উটের উপর আরোহণ করে ভাষণ দিলেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা মক্কা হতে ‘হত্যা’-কে কিংবা ‘হাতী’-কে রোধ করেছেন’। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ‘হত্যা’ বলেছেন, না-কি ‘হাতী’ বলেছেন এ ব্যাপারে বর্ণনাকারী আবূ নু‘আঈম সন্দেহ পোষণ করেন। অন্যরা শুধু ‘হাতী’ শব্দ উল্লেখ করেছেন। অবশ্য মক্কাবাসীদের উপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং মুমিনগণকে (যুদ্ধের মাধ্যমে) বিজয়ী করা হয়েছে। জেনে রাখ, আমার পূর্বে কারো জন্য মক্কাকে হালাল করা হয়নি এবং আমার পরেও হালাল হবে না। জেনে রাখ, তাও আমার জন্য দিনের কিছু সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। আরো জেনে রাখ যে, আমার এই কথা বলার মুহূর্তে আবার তা অবৈধ হয়ে গেছে। সেখানকার কোন কাঁটা কিংবা গাছ কাটা যাবে না এবং সেখানে পড়ে থাকা কোন বস্তু কুড়িয়ে নেয়া যাবে না। তবে ঘোষণা দেয়ার জন্য তা নিতে পারবে। আর কেউ নিহত হলে তার আপনজনদের জন্য দু’টি ব্যবস্থার যে কোন একটি গ্রহণের এখতিয়ার আছে। হয় তার ‘রক্তপণ নিবে নয় ‘ক্বিছাছের ফায়সালা’ গ্রহণ করব।
فَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْيَمَنِ فَقَالَ اكْتُبْ لِي يَا رَسُولَ اللَّهِ. فَقَالَ اكْتُبُوْا لِأَبِيْ فُلَانٍ.
‘অতঃপর ইয়ামানবাসী জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! (এই কথাগুলো) আমাকে লিখে দিন। তিনি (ছাহাবীদের) বললেন, তোমরা অমুকের পিতাকে লিখে দাও। তারপর জনৈক কুরাইশ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! গাছপালা কাটার নিষেধাজ্ঞা হতে ইযখির (এক প্রকার লম্বা ঘাষ) বাদ দিন। কারণ তা আমরা আমাদের গৃহে ও ক্ববরে কাজে লাগাই’। নবী (ﷺ) বললেন, ‘ইযখির ব্যতীত, ইযখির ব্যতীত’। فَقِيْلَ لأَبِيْ عَبْدِ اللهِ أَىُّ شَىْءٍ كَتَبَ لَهُ قَالَ كَتَبَ لَهُ هَذِهِ الْخُطْبَةَ ‘আবূ আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘কোন্ জিনিস তাকে লিখে দিতে বলা হয়েছিল? জবাবে তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -এর বক্তৃতাটি’।[৭]
২- আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
مَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ أَحَدٌ أَكْثَرَ حَدِيْثًا عَنْهُ مِنِّي، إِلَّا مَا كَانَ مِنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ وَلَا أَكْتُبُ.
‘নবী করীম (ﷺ)-এর ছাহাবীগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ব্যতীত আর কারো নিকট আমার চেয়ে অধিক হাদীছ নেই। কারণ তিনি লিখতেন, আর আমি লিখতাম না’।[৮]
৩- আবী ক্বাবিল বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বলতে শুনেছি, আমরা রাসূল (ﷺ)-এর পাশে বসে লিখতাম। একদা রাসূল (ﷺ)-কে প্রশ্ন করা হল যে, দুই শহরের মধ্যে কোন্ শহরটি সর্বপ্রথম বিজিত হবে, কনস্টানটিনোপল, না-কি রোম? তখন নবী (ﷺ) বললেন, বরং হিরাক্লিয়াসের শহর (অর্থাৎ কনস্টানটিনোপল) সর্বপ্রথম বিজিত হবে’।[৯]
৪- আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-এর নিকট যা কিছু শুনতাম লিখে রাখতাম। মনে রাখার জন্যই আমি এরূপ করতাম। কুরাইশরা আমাকে সবকিছু লিখতে বারণ করলেন এবং বললেন, তুমি কি রাসূল (ﷺ)-এর নিকট থেকে শোনা সব কিছুকেই লিখে রাখো? তিনি তো একজন মানুষ, রাগ ও শান্ত উভয় অবস্থায় কথা বলে থাকেন। সুতরাং আমি লেখা স্থগিত রাখলাম। আমি এটা রাসূল (ﷺ)-এর নিকট উল্লেখ করলাম,
فَأْوَمَأَ إلى شَفَتَيْهِ، فقالَ والَّذي نَفْسي بيَدِهِ ما يَخْرُج مِمَّا بيْنَهما إلَّا حَقٌّ؛ فاكْتُبْ
‘তিনি আঙ্গুল দিয়ে তাঁর মুখের দিকে ইশারা করে বললেন, তুমি লিখে রাখো, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এ মুখ থেকে সর্বাবস্থায় সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বের হয় না। সুতরাং তুমি নির্বিঘ্নে লিখে রাখো’।[১০] এ হাদীছে আমরা দেখতে পাচ্ছি আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) গোপনে বা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাদীছ লিপিবদ্ধ করতেন না, বরং রাসূল (ﷺ)-এর অনুমতি সাপেক্ষেই তাঁরই অনুপ্রেরণা ও নির্দেশে তিনি হাদীছ লিপিবদ্ধ করতেন। কিন্তু হাদীছ অস্বীকারকারীরা এতটাই কৌশলী মাতাল যে, তারা প্রথম হাদীছটিকে স্বীকার করলেও পরের হাদীছগুলোকে অস্বীকার করে থাকে।
৫- আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার কাছে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে যাকাত সম্পর্কে যে বিধান দিয়েছেন তা লিখে পাঠান, যে ব্যক্তির উপর যাকাত হিসাবে বিনতে মাখায (অর্থাৎ যে উট এক বছর পূর্ণ হয়ে সবেমাত্র দ্বিতীয় বর্ষে পতিত হয়েছে) ওয়াজিব হয়েছে কিন্তু তার কাছে তা নেই বরং বিনতে লাবূন (অর্থাৎ যে উট দু’বছর পূর্ণ হয়ে সবেমাত্র তৃতীয় বর্ষে পতিত হয়েছে) রয়েছে, তা হলে তা-ই (যাকাত স্বরূপ) গ্রহণ করা হবে। এ অবস্থায় যাকাত আদায়কারী যাকাত দাতাকে বিশটি দিরহাম বা দু’টি বকরী দিবে। আর যদি বিনতে মাখায না থাকে বরং ইবনু লাবূন থাকে তা হলে তা-ই গ্রহণ করা হবে। এমতাবস্থায় আদায়কারীর যাকাত দাতাকে কিছু দিতে হবে না’।[১১]
৬- আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) যাকাতের বিধান হিসাবে যা নির্দিষ্ট করেছিলেন, আবূ বক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তা আমাকে লিখে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, যেখানে দু’জন অংশীদার থাকে (যাকাত প্রদানের পর) তারা দু’জনে নিজ নিজ অংশ আদান-প্রদান করে নেবে’।[১২]
৭- আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ﷺ) কর্তৃক নির্ধারিত ছাদাক্বার ব্যাপারে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার কাছে একটি ফরমান পাঠান। এতে লিখেন যে, ছাদাক্বাহ প্রদানের আশঙ্কায় যেন পৃথক মালকে একত্রিত করা না হয় এবং একত্রিত মালকে যেন পৃথক করা না হয়’।[১৩]
৮- যায়িদ ইবনু ছাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি,
نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا حَدِيْثًا، فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ، فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ، وَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَيْسَ بِفَقِيْهٍ
‘যে ব্যক্তি আমার নিকট থেকে হাদীছ শুনে তা মুখস্থ রাখলো এবং অন্যের নিকটেও তা পৌঁছে দিল, আল্লাহ তাকে চিরউজ্জ্বল করে রাখবেন। জ্ঞানের অনেক বাহক তার চেয়ে অধিক সমঝদার লোকের নিকট তার বহন নিয়ে যায়, যদিও জ্ঞানের বহু বাহক নিজেরা জ্ঞানী নয়।[১৪]
৯- সালিম (রাহিমাহুল্লাহ) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত,
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ম كَتَبَ كِتَابَ الصَّدَقَةِ فَلَمْ يُخْرِجْهُ إِلَى عُمَّالِهِ حَتَّى قُبِضَ فَقَرَنَهُ بِسَيْفِهِ فَلَمَّا قُبِضَ عَمِلَ بِهِ أَبُوْ بَكْرٍ حَتَّى قُبِضَ وَعُمَرُ حَتَّى قُبِضَ وَكَانَ فِيْهِ. فِيْ خَمْسٍ مِنَ الْإِبِلِ شَاةٌ وَفِيْ عَشْرٍ شَاتَانِ
‘ছাদাক্বাহ বা যাকাত প্রসঙ্গে রাসূল (ﷺ) একটি ফরমান (অধ্যাদেশ) লিখালেন। তাঁর কর্মচারীদের নিকটে এটা পাঠানোর আগেই তিনি মারা যান। তিনি এটা নিজের তরবারীর সাথে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তা কার্যকর করেন। তিনিও মারা যান। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ও সে অনুযায়ী কাজ করেন। তারপর তিনিও মারা যান। তাতে লিখা ছিল, ‘পাঁচটি উটের জন্য একটি বকরী এবং দশটি উটের জন্য দু’টি বকরী...’।[১৫]
১০- আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে মক্কা বিজয় দান করলেন, তখন রাসূল (ﷺ) লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হামদ ও ছানা (প্রশংসা) বর্ণনা করলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ তা‘আলা মক্কায় (আবরাহার) হস্তি বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেননি এবং তিনি তাঁর রাসূল ও মুমিন বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। আমার আগে অন্য কারোর জন্য মক্কায় যুদ্ধ করা বৈধ ছিল না, তবে আমার পক্ষে দিনের সামান্য সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল, আর তা আমার পরেও কারোর জন্য বৈধ হবে না। কাজেই এখানকার শিকার তাড়ানো যাবে না, এখানকার গাছ কাটা ও উপড়ানো যাবে না, ঘোষণাকারী ব্যক্তি ব্যতীত এখানকার পড়ে থাকা জিনিস তুলে নেয়া যাবে না। যার কোন লোক এখানে নিহত হয় সে দু’টির মধ্যে তার কাছে যা ভাল বলে বিবেচিত হয়, তা গ্রহণ করবে। ফিদ্ইয়া (বিনিময়) গ্রহণ অথবা ক্বিছাছ। ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ইযখিরের অনুমতি দিন। কেননা, আমরা এগুলো আমাদের ক্ববরের উপর এবং ঘরের কাজে ব্যবহার করে থাকি। রাসূল (ﷺ) বললেন, ইযখীর ব্যতীত (অর্থাৎ তা কাটা ও ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হল:
فَقَامَ أَبُوْ شَاهٍ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْيَمَنِ فَقَالَ اكْتُبُوْا لِي يَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اكْتُبُوْا لِأَبِيْ شَاهٍ، قُلْتُ لِلأَوْزَاعِيِّ مَا قَوْلُهُ اكْتُبُوْا لِيْ يَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ هَذِهِ الْخُطْبَةَ الَّتِيْ سَمِعَهَا مِنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ
‘তখন ইয়ামানবাসী আবূ শাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে লিখে দিন। রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা আবূ শাহকে লিখে দাও।
ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম বলেন, আমি আওযায়ীকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে লিখে দিন তাঁর এ উক্তির অর্থ কী? তিনি বলেন, এই ভাষণ যা রাসূল (ﷺ)-এর কাছ হতে তিনি শুনেছেন, তা লিখে দিন’।
[১৬]
[১৬]
এ হাদীছে আমরা দেখতে পেলাম, স্বয়ং রাসূল (ﷺ) ছাহাবীদেরকে হাদীছ লেখার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুতরাং পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করার হুকুমটি ছিল সাময়িক। এজন্য এটিকে পুঁজি করে হাদীছের প্রামাণিকতা অস্বীকার করার কোন যুক্তিকথা নেই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে ছহীহ বুঝ দান করুন। সুতরাং একথা বলা যে, নবী (ﷺ) স্বীয় হাদীছ সংরক্ষণে কোন প্রচেষ্টা করেননি। কিংবা ছাহাবীগণ হাদীছ সংরক্ষণ করেননি, এটা সম্পূর্ণই অজ্ঞতা কিংবা পরিষ্কার মিথ্যাচার।
উপরিউক্ত উদাহরণগুলোর আলোকে প্রমাণিত হয় যে, হাদীছ অস্বীকারকারী বা প্রাচ্যবিদদের অভিযোগের মধ্যে কোন সত্যতা ও বাস্তবতা নেই। হাদীছ ইসলামের অকাট্য এবং প্রমাণিত দলীল। এটি নিয়ে সন্দেহ করার সামান্যতম সুযোগ নেই।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১১৫৮, ১১৫৩৬; মাক্বামে হাদীছ, পৃ. ৭।
[২]. মা‘আলিমুস সুনান, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৪।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১১৫৮, ১১৫৩৬; মাক্বামে হাদীছ, পৃ. ৭।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৪; নাসাঈ, হা/৬৩৫।
[৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২৯৭; আবূ দাঊদ, হা/১৯৭০।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১১২।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৩; তিরমিযী, হা/২৬৬৮, ৩৮৪১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৩৮৯।
[৯]. দারিমী, হা/৫০৩, সনদ ছহীহ।
[১০]. আবূ দাঊদ, হা/৩৬৪৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৫১০, ৬৮০২; দারিমী, হা/৫০১; মুস্তাদরাক ‘আলাছ ছহীহাইন, হা/৩৬১।
[১১]. ছহীহ বুখারী হা/১৪৪৮, ১৪৫০, ১৪৫১, ১৪৫৩, ১৪৫৪, ১৪৫৫, ২৪৮৭, ৩১০৬, ৫৮৭৮, ৬৯৫৫।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৮৭।
[১৩]. ছহীহ বুখারী হা/৬৯৫৫।
[১৪]. আবূ দাঊদ, হা/৩৬৬০; তিরমিযী, হা/২৬৫৬, ২৬৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/২৩২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৪১৫৭।
[১৫]. তিরমিযী, হা/৬২১; আবূ দাঊদ, হা/১৫৬৮; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৯৮।
[১৬]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৩৪, ৬৮৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৫৫; আবূ দাঊদ, হা/৩৬৪৯, ৪৫০৫; তিরমিযী, হা/২৬৬৭।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সুন্নাত