উত্তর : ’হাদীছ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল নতুন, নবীন, আধুনিক, নব্য, সাম্প্রতিক, কথা, বাণী, আলোচনা, কথিকা, সংবাদ, খবর, কাহিনী ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে সাধারণত রাসূল (ﷺ)-এর কথা, কাজ, গুণাবলী ও মৌনসম্মতিকে হাদীছ বলা হয় (ইসলাম ওয়েব, ফৎওয়া নং-২৫৬৭৬)। অনুরূপভাবে ‘সুন্নাহ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হল- রীতি, নিয়ম, পথ, পন্থা, সুন্নাত, স্বভাব, হাদীছ ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে নবী (ﷺ)-এর কথা, কাজ এবং মৌনসম্মতি সম্পর্কে যা কিছু এসেছে তা সবই সুন্নাহ নামে পরিচিত। যারা এগুলোকে আঁকড়ে ধরে তাদের আহলুস সুন্নাহ বা সুন্নাতের অনুসারী বলা হয় (আল-মুফরাদাত লির-রাগীব, পৃ. ৪২৯; আছ-ছিহাহ লিল জাওহারী, ৫/২১৩৮ পৃ.)। এখানে শুধু শব্দগত বা পরিভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত হাদীছ ও সুন্নাহ একই জিনিস, এখানে পার্থক্য কেবল ভাষাগত দিক থেকে।
(ক) একত্র হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ: (১) নবী (ﷺ)-এর নিকট থেকে বর্ণিত তাঁর উক্তি, কর্ম বা অনুমোদনকে ‘হাদীছ’ বলা হয়, আবার একে ‘সুন্নাহ’ বলেও অভিহিত করা হয়। শাইখ আব্দুল্লাহ আল-জাদী‘ বলেন, ‘ক্বায়িদাহ অনুযায়ী ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ‘হাদীছ’-এর সমর্থন শব্দ, যেমনটি মুহাদ্দিছগণ হাদীছের সংজ্ঞা দেয়ার সময় উল্লেখ করেছেন। তবে এখান থেকে নবী (ﷺ)-এর গঠনগত বৈশিষ্ট্য (শারীরিক বর্ণনা) বাদ দেয়া হয়, কারণ ‘সুন্নাহ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় শরী‘আতের উৎস হিসাবে। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নবী (ﷺ)-এর স্বভাবগত বা শারীরিক বর্ণনা বিবেচ্য নয়, বরং তাঁর বক্তব্য, কর্ম ও অনুমোদনই বিবেচ্য’ (তাহরীরু ঊলূমিল হাদীছ)। (২) যারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধের উপর অটল থাকে, সেই নাজাতপ্রাপ্ত দলকে ‘আহলুল হাদীছ’ বলা হয়, আবার ‘আহলুস সুন্নাহ’ বলেও অভিহিত করা হয়। (৩) যেসব গ্রন্থে রাসূল (ﷺ) এবং ছাহাবীদের বাণী, কর্ম এবং উক্তি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলোকে ‘হাদীছের কিতাব’ বলা হয়, আবার ‘সুন্নাহর কিতাব’ও বলা হয়।
(খ) পৃথক হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ: (১) রাসূল (ﷺ)-এর সামগ্রিক পথনির্দেশ, পন্থা, তথা তাঁর জীবনাচরণকে ‘সুন্নাহ’ বলা হয়। যেমন, তাঁর জীবনপদ্ধতি, কর্মপদ্ধতি, আচরণ ইত্যাদি। কিন্তু এখানে সাধারণত ‘হাদীছ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় না।
(২) শরী‘আতের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকা, অতিরিক্ততা বা বিদ‘আত থেকে বিরত থাকার আমলকেও ‘সুন্নাহ’ বলা হয়, কিন্তু একে ‘হাদীছ’ বলা হয় না। এই বিষয়ে বিখ্যাত ইমাম আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সুফিয়ান ছাওরী হাদীছের ইমাম, কিন্তু সুন্নাহর ইমাম নন। আর আওযাঈ সুন্নাহর ইমাম, কিন্তু হাদীছের নন। আর মালিক ইবনে আনাস দু’টির-ই ইমাম’ (তারীখু দিমাশক্ব ইবনু আসাকির, ৩৫/১৮৩ পৃ.)।
(৩) ইমাম আবু আমর ইবনু ছালাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, ‘কেউ বলেছেন ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) সুন্নাহ ও হাদীছ উভয় বিষয়ে-ই পারদর্শী ছিলেন। এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য কী?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘এখানে ‘সুন্নাহ’ হল- বিদ‘আতের বিপরীত, অর্থাৎ ধর্মের মূলনীতি অনুযায়ী বিশ্বাস ও আমল করা। কেউ কেউ হাদীছ জানে কিন্তু বিদ‘আতী হয়, তাই তাকে ‘সুন্নাহর অনুসারী’ বলা যায় না। আর ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) উভয় ক্ষেত্রেই ছিলেন পারদর্শী, অর্থাৎ তিনি হাদীছ বিশারদ ছিলেন এবং পাশাপাশি ‘আহলুস সুন্নাহ’ তথা সঠিক আক্বীদার অনুসারীও ছিলেন (ফাতাওয়া ইবনু ছালাহ, ১/১৩৯-১৪০ পৃ.)।
(৪) ফক্বীহগণ যখন কোন আমলের ‘মুস্তাহাব’ বা ‘পসন্দনীয়’ হওয়ার রায় দেন, তখন তাঁরা একে ‘সুন্নাহ’ বলে থাকেন, ‘হাদীছ’ বলেন না।
(৫) যখন মুহাদ্দিছগণ কোন রিওয়ায়েত বিশুদ্ধ বা দুর্বল বলে রায় দেন, তখন তাঁরা ‘হাদীছ’ শব্দটি ব্যবহার করেন, ‘সুন্নাহ’ বলেন না। যেমন- ‘এই হাদীছটি দুর্বল’, কেউ বলেন না ‘এই সুন্নাহটি দুর্বল’। কারণ, ‘সুন্নাহ’ হল সেই হাদীছগুলো যা বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাঁরা কখনো কখনো বলতেন, ‘এই হাদীছটি ক্বিয়াস, সুন্নাহ এবং ইজমার বিরোধী’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪৫৫২০)।
প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বি, বরিশাল।