উত্তর : যাকাতুল ফিতর ঈদের ছালাতের জন্য বের হওয়ার আগেই মিসকীনদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এটাই সুন্নাত। ইমাম নববী, ইমাম ইবনু হাযম, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম, ইমাম ছানা’আনী, ইমাম শাওকানী, শাইখ ইবনু বায ও শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, ‘ফিতরা আদায়ের শেষ সময় হল- ঈদের ছালাত পর্যন্ত। ঈদের ছালাতের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা হারাম। যদি কেউ বিলম্ব করে, সেক্ষেত্রে তা যাকাতুল ফিতর হিসাবে গণ্য হবে না। বরং এটি তার জন্য সাধারণ ছাদাক্বাহ হিসাবে বিবেচিত হবে’ (আল-মাজমূঊ, ৬/১৪২; আল-মুহাল্লা, ৬/১৪২; হাশিয়াতু আর-রাওযিল মুরবি‘, ৩/২৮২; যাদুল মা‘আদ, ২/২১-২২; সুবুলুস সালাম, ২/১৩৮; আস-সাইলুল জার্রার, পৃ. ২৬৬; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনি বায, ১৪/২০১; আশ-শারহুল মুমতি‘, ৬/১৭২ পৃ.)।
সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন, ‘ছালাতের মত যাকাতুল ফিতর আদায় করারও একটি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পৃক্ত, আর তা হল- ঈদের ছালাতের পূর্বেই। সুতরাং ইচ্ছাকৃতভাবে সময় অতিবাহিত করলে অবশ্যই গুনাহগার হবে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হক্বদারদের নিকট পৌঁছানো অপরিহার্য। সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপর এটি একটি বিশাল বড় দায়িত্ব ও আমানাত। সুতরাং তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন হওয়া জায়েয নয়। আর যে সংগঠন উদাসীন তাদের উপর ভরসা করা যাবে না (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৯/৩৭০-৩৭৩, ৮/২৫৮-২৬০ ও ৮/২৭১-২৭২ পৃ.)।
শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, ‘ফক্বীর ব্যক্তির সন্ধানে যাকাতুল ফিতর বিলম্বিত করা জায়েয কী’? উত্তরে তিনি বলেন, ‘জায়েয নয়, বরং ঈদের ছালাতের পূর্বেই যাকাতুল ফিতর বের করা অপরিহার্য। যেমনটি রাসূল (ﷺ) বলেছেন। আলেমদের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা জায়েয নয়’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৪/২১৬-২১৮ পৃ.)। অনুরূপভাবে শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ঈদের ছালাতের পর পর্যন্ত যাকাতুল ফিত বণ্টন করতে বিলম্ব করলে তার ফিতরা ক্ববুল হবে না। কেননা এটি এমন একটি ইবাদত যা নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুতরাং কোন শারঈ অজুহাত ব্যতীত বিলম্ব করলে তার ফিতরা ক্ববুল হবে না। পক্ষান্তরে যদি কেউ ভুলে যায় কিংবা ঈদের রাত্রীতে ফক্বীর-মিসকীন না পায় সেটা ভিন্ন কথা’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ১৮/২৭০-২৭৩, ১৮/২৬৫-২৬৮; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১২৮)।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কোন ব্যক্তির জন্য এটি জায়েয যে, সে তার ফিতরার খাদ্যদ্রব্য তার প্রতিবেশীর কাছে রাখবে এবং বলবে যে, এগুলো অমুক ব্যক্তির জন্য, যখন সে আসবে তখন আপনি তাকে দিয়ে দেবেন। কিন্তু তাকে যে কোনোভাবে অবশ্যই ঈদের ছালাতের পূর্বে ফক্বীরদের হাতে পৌঁছাতে হবে...’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল ইবনু উছাইমীন, ১৮/২৮৫ পৃ.)। অনুরূপভাবে শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ)ও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের ছালাতের পূর্বেই যাকাতুল ফিতর দুঃস্থ-অসহায়দের মধ্যে বণ্টন করা অপরিহার্য। ছালাতের পর পর্যন্ত দেরি করা জায়েয নয়’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৪৯৭৯৩; আরশীফ মুলতাক্বা আহলিল হাদীছ, ৮৪/১৩২ পৃ.)।
সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটিকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, ‘কোন কল্যাণমূলক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানে যাকাতুল ফিতর জমা করলেই কি আদায় করা হয়ে গেল? উত্তরে তাঁরা বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতরের মাল কবজা করাটাই আদায় করা হিসাবে গণ্য হবে না। বরং কবজাকৃত মাল ঈদের ছালাতের পূর্বেই ফক্বীর-মিসকীনদের কাছে হস্তান্তর করা অপরিহার্য। যদি কোন ফক্বীর-মিসকীন অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সে কাউকে দায়িত্বশীল বানিয়ে নিজের অধিকার গ্রহণ করতে পারে, অথবা যারা উপস্থিত আছে তাদের মধ্যেই ঈদের ছালাতের পূর্বে সমস্ত মাল বণ্টন করতে হবে (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৮/৩১৮ পৃ.)। অন্যত্র জিজ্ঞাসা করা হয় যে, ‘কল্যাণকর সমিতি বা সংগঠনের প্রতিনিধিরা কি যাকাতুল ফিতরের মাল বিলম্ব করে ইচ্ছানুযায়ী দুঃস্থ-অসহায়দের মধ্যে বণ্টন করতে পারবেন কি?’ উত্তরে তাঁরা বলেন, ঈদের ছালাতের পূর্বে হক্বদার বা অধিকারীদের নিকট যাকাতুল ফিতরের মাল পৌঁছানো সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপর অপরিহার্য। বিলম্ব করা জায়েয নয়। কেননা নবী (ﷺ) ঈদের ছালাতের পূর্বেই তা ফক্বীরদেরকে আদায় করে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। সেই জন্য প্রত্যেক সংগঠনের প্রতিনিধিদের ঠিক ততটাই মাল একত্রিত করা উচিত, যতটা তাঁরা ঐ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বণ্টন করতে পারবেন (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৯/৩৭৭-৩৮০ পৃ.)।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘রাসূল (ﷺ) যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন- অশ্লীল কথা ও বেহুদা কাজ হতে ছিয়ামকে পবিত্র করার লক্ষ্যে এবং মিসকীনদের খাদ্য স্বরূপ। যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে তা আদায় করবে সেটা ক্ববুল ছাদাক্বাহ্ হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করবে, তা সাধারণ দান হিসাবে গৃহীত হবে’ (আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭; সনদ হাসান, ছহীহুল জামি‘, হা/৩৫৭০)। এ হাদীছ সম্পর্কে শামসুল হক্ব আযীমাবাদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এই হাদীছটি ঐ সমস্ত আলেমদের বিপক্ষে দলীল যারা বলেন যে, ঈদের পরেও যাকাতুল ফিতরা আদায় করা বা বণ্টন করা জায়েয’ (আওনুল মা’বূদ, হা/১৬০৯-এর ব্যাখ্যা দ্র.)। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) প্রত্যক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক সকল মুসলিমের উপর ছাদাকাতুল ফিতর হিসাবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক ছা‘ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের ছালাতে বের হবার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩, ১৫০৪, ১৫০৬, ১৫০৭, ১৫০৮, ১৫১০, ১৫১১, ১৫১২; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪-৯৮৬)।
ফিতরা আদায়ের উদ্দেশ্য হল- ঈদের দিনে ফক্বীর-মিসকীন ও অসহায়-দরিদ্রদের একটু সম্পদশালী করে তোলা। যেন তাদেরকে ঈদের দিনেও ভিক্ষাবৃত্তি না করতে হয়’ (আল-মুগনী, ৩/৯০ পৃ.)। সুতরাং যদি কেউ ছালাত আদায় করা পর্যন্ত বিলম্ব করে, তবে সে এমন একটি কাজ করল যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক নয়। আর এটিই অগ্রহণযোগ্য’ (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৬/১৭২ পৃ.)। প্রত্যেক ইবাদতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে। সুতরাং যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সময় অতিবাহিত করে ফেলে তাহলে তার ঐ ইবাদত ক্ববুল হবে না (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৬/১৭৪ পৃ.)। এটিকে কুরবানীর উপর ক্বিয়াস করা হয়েছে। যেমন কুরবানীর পশু ছালাতের পূর্বে যব্হ করা যাবে না, ঠিক তেমনি যাকাতুল ফিতর ছালাতের পরে আদায় করা যাবে না (যাদুল মা‘আদ, ২/২১-২২ পৃ.)।
উল্লেখ্য যে, ঈদের ছালাতের পর বণ্টন করা যাবে মর্মে যে বর্ণনা প্রচার করা হয় সেটি যঈফ হাদীছ (ইরওয়াউল গালীল, ৩/৩৩২-৩৩৩; হা/৮৪৪; ফাৎহুল বারী, ৩/৪৩৯; আওনুল মা‘বূদ, ৫/৬; নাইনুল আওত্বার, ৪/২৫৫)।
প্রশ্নকারী : হাসিবুল হাসান, জয়পুরহাট সদর।