উত্তর : আল্লামা ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ‘রিয়াযুছ ছালেহীন’-এর ব্যাখ্যায় অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে বলেন, ‘বান্দা যখন ফরয ইবাদতগুলো যথাযথভাবে আদায় করার পাশাপাশি নফল ইবাদতে নিজেকে অধিক পরিমাণে নিয়োজিত করে, তখন ধীরে ধীরে সে আল্লাহ্র ভালোবাসার পাত্র হয়ে ওঠে। আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। আর আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে তাঁর আনুগত্যের পথে বিশেষভাবে পরিচালিত ও সংরক্ষণ করেন। হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি তার শ্রবণ হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শোনে; তার দৃষ্টি হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শক্তি প্রয়োগ করে এবং তার পা হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে চলাফেরা করে’। এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ বান্দার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাত কিংবা পা আল্লাহ এ ধারণা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। বরং এর প্রকৃত অর্থ হল- আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে এসব অঙ্গের সঠিক ও কল্যাণকর ব্যবহারের তাওফীক দান করেন এবং তাকে ভুল ও গুনাহ থেকে রক্ষা করেন। যেমন অন্য হাদীছে এর ব্যাখ্যায় রাসূল (ﷺ) বলেন,
فَبِيْ يَسْمَعُ وَبِيْ يُبْصِرُ وَبِيْ يَبْطِشُ وَبِيْ يَمْشِيْ
‘সুতরাং সে আমার তাওফীকেই শুনে, আমার তাওফীকেই দেখে, আমার রহমতেই ধরে এবং আমার কল্যাণেই চলে’ (ইবনু রজব, কালেমাতুল ইখলাছ হা/৩৪, আলবানী বলেন, সনদ ছহীহ)।
অর্থাৎ বান্দার কান তখন এমন কিছু শোনার জন্য উন্মুক্ত থাকে, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে; হারাম ও অনর্থক বিষয় থেকে সে তার শ্রবণশক্তিকে সংযত রাখে। তার চোখ এমন দৃশ্যের দিকেই নিবদ্ধ হয়, যা আল্লাহ পসন্দ করেন। হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে তাকানো থেকে সে নিজেকে বিরত রাখে। তার হাত কেবল সেই কাজেই ব্যবহৃত হয়, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। অন্যায়, যুলুম কিংবা গুনাহের কাজে সে হাত বাড়ায় না। তেমনি তার পা-ও তাকে এমন পথেই নিয়ে যায়, যে পথে চলায় আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। সে কল্যাণের দিকে এগিয়ে যায়; অকল্যাণ ও গুনাহের পথ থেকে তার পদযুগলকে আল্লাহ ফিরিয়ে রাখেন।
অতএব, ‘আল্লাহ তার শ্রবণ হয়ে যান, যার মাধ্যমে সে শোনে’—এর মর্ম হল, আল্লাহ তার শ্রবণকে হেফাযত ও সঠিক পথে পরিচালিত করেন। ‘তার দৃষ্টি হয়ে যান’—অর্থাৎ তার দৃষ্টিকে হেফাযত করেন ও সঠিক কাজে পরিচালিত করেন। একইভাবে তার হাত ও পা-কে এমন কাজে পরিচালিত করেন, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কারণ। এটাই হাদীছটির প্রকৃত তাৎপর্য। এখানে আল্লাহর সত্তাকে বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে একীভূত হওয়া বোঝানো হয়নি; বরং বোঝানো হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় বান্দার প্রতি বিশেষ তাওফীক, হেফাযত ও তত্ত্বাবধান।
অতএব, ‘আমি তার শ্রবণ হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শোনে; তার দৃষ্টি হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে দেখে’—এর অর্থ মোটেও এই নয় যে আল্লাহ বান্দার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাত কিংবা পায়ে পরিণত হন। বরং এর অর্থ হল, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বান্দাকে তার শ্রবণ, দৃষ্টি, হাতের ব্যবহার এবং চলাফেরার ক্ষেত্রে এমনভাবে পরিচালিত ও তত্ত্বাবধান করেন যে, সে এসব অঙ্গ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজেই ব্যবহার করে। আল্লাহ তাকে গুনাহ থেকে রক্ষা করেন এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত (ইবনু উছাইমীন, শারহু রিয়াদিছ ছালিহীন ব্যাখ্যা, ১ম খণ্ড, হা/৩৮৬-এর ব্যাখ্যা দ্র.)।
প্রশ্নকারী : মোস্তফা মনোয়ার অনিক, হারাগাছ, রংপুর।