উত্তর : ইসলামী ফিকহ ও হাদীছশাস্ত্রের ইতিহাসে ‘আহলুল হাদীছ’ ও ‘আহলুর রায়’ এ দু’টি পরিভাষা বহু প্রাচীন। তবে বর্তমান যুগে অনেক সময় এ পরিভাষাগুলোকে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কিছু লোক দাবি করে থাকে যে, প্রসিদ্ধ চার ইমামের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন ‘আহলুর রায়’, আর ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ (রাহিমাহুমুল্লাহ) ছিলেন ‘আহলুল হাদীছ’। এ বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও, যেভাবে তা উপস্থাপন করা হয়, তা বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।
প্রথমতঃ বুঝতে হবে, ‘আহলুল হাদীছ’ ও ‘আহলুর রায়’ কোন আকীদাগত দল বা ভিন্ন দ্বীন ছিল না। বরং ফিকহী ইজতিহাদের দু’টি শাখা ছিল। ‘আহলুল হাদীছ’ বলতে মূলত হিজায অঞ্চলের আলেমদের বোঝানো হত, যারা সরাসরি হাদীছ ও আছারের উপর অধিক নির্ভর করতেন। আর ‘আহলুর রায়’ বলতে কুফার আলেমদের বোঝানো হত, যারা কুরআন-হাদীছের পাশাপাশি ক্বিয়াস, ইজতিহাদ ও রায়ের ব্যবহার বেশি করতেন। এর কারণ ছিল পরিবেশগত। কুফায় জাল হাদীছের প্রচলন বেশি ছিল এবং ছহীহ হাদীছের সংখ্যা তুলনামূলক কম পৌঁছত। তাই সেখানে আলেমরা হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন এবং বহু ক্ষেত্রে ক্বিয়াসের আশ্রয় নিতেন। পক্ষান্তরে মদীনায় হাদীছের প্রাচুর্য ছিল। ইবনু খালদূন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ফিক্বহশাস্ত্রের আলেমরা দুই দলে বিভক্ত ছিলেন। একদল ছিল আহলুর রায় ও ক্বিয়াস, তারা ছিল ইরাকবাসী। তাদের ইমাম ছিলেন আবূ হানিফা। আরেকদল ছিল আহলুল হাদীছ, তারা ছিল হিজাযবাসী। তাদের ইমাম ছিলেন মালিক ও শাফিঈ’ (আল-মুকাদ্দিমাহ, ইবনে খালদূন, ১/৪৪৬ পৃ.)। এখানে লক্ষনীয়, ইবনে খালদূন কোথাও বলেননি যে, ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছ মানতেন না, কিংবা তিনি আহলুস সুন্নাহ থেকে ভিন্ন ছিলেন। বরং ‘আহলুর রায়’ বলা হয়েছে তার ফিকহী পদ্ধতির কারণে। বাস্তবে চার ইমামই ছিলেন কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী। তারা প্রত্যেকেই বলেছেন, ছহীহ হাদীছ পাওয়া গেলে সেটাই তাদের মাযহাব।
ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যখন কোন হাদীছ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে ছহীহ প্রমাণিত হবে, তখন সেটাই আমার মাযহাব’ (ইবনু আবিদীন, রসমুল মুফতি, পৃ. ২৯)। তিনি আরো বলেন, ‘কারো জন্য বৈধ নয় যে, সে আমার কথা গ্রহণ করবে, যতক্ষণ না জানবে আমি কোথা থেকে তা গ্রহণ করেছি’ (আল-ইন্তিকা, ইবনু আবদিল বার্র, পৃ. ১৪৫)। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি মানুষ মাত্র। আমার কথা কখনো সঠিক হয়, কখনো ভুল হয়। অতএব আমার মতামত যাচাই কর। যা কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূল হবে তা গ্রহণ কর, আর যা বিরোধী হবে তা বর্জন কর’ (জামেঊ বায়ানিল ইলম, ২/৩২)। ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি তোমরা আমার কথার বিপরীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছহীহ হাদীছ পাও, তাহলে হাদীছ অনুযায়ী আমল কর এবং আমার কথা ছেড়ে দাও’ (আল-মাজমূ’, নববী, ১/৬৩ পৃ.)। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তুমি আমার তাক্বলীদ করো না, মালিকেরও না, শাফিঈরও না, আওযায়ীরও না; বরং তারা যেখান থেকে গ্রহণ করেছেন, সেখান থেকেই গ্রহণ কর’ (ইলামুল মুওয়াক্কিঈন, ২/৩০২ পৃ.)।
অতএব চার ইমামের সকলেই কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। কারো সাথে ‘আহলুল হাদীছ তথা হাদীছপন্থী’ এবং কারো সাথে ‘আহলুর রায় তথা রায়পন্থী’ শব্দ ব্যবহার করে এমন ধারণা দেয়া ঠিক নয় যে, একজন হাদীছ অনুসরণ করতেন আর অন্যরা করতেন না। তবে এটাও সত্য যে, ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ক্বিয়াস ও ইজতিহাদের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি করতেন। এজন্য তাকে ‘ইমামু আহলির রায়’ বলা হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি দুর্বল হাদীছের উপর রায়কে অগ্রাধিকার দিতেন। বরং তিনি ছহীহ হাদীছকে সর্বদা প্রাধান্য দিতেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি আবু হানীফার চেয়ে বেশি হাদীছ অনুসরণকারী কাউকে দেখিনি’ (তারীখ বাগদাদ, ১৩/৩৫১ পৃ.)। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা ছিলেন ইলম, ফিকহ, ইবাদত ও সতর্কতার ইমাম’ (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৬/৩৯০ পৃ.)। চার ইমামই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহর ইমাম ছিলেন। বরং তারা যুগ, পরিবেশ ও প্রাপ্ত দলীল অনুযায়ী ইজতিহাদ করেছেন। তারা ছিলেন যুগের বড় বড় মুজতাহিদ।
প্রশ্নকারী : মোস্তফা মনোয়ার, হারাগাছ, রংপুর।