প্রশ্নকারী : নাহিদ, ঢাকা।
উত্তর : উক্ত কারণে আপন ভাই বা বোনকে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করা শরী‘আতসম্মত নয়। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ফরয এবং তা ছিন্ন করা কাবীরা গুনাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَہَلۡ عَسَیۡتُمۡ اِنۡ تَوَلَّیۡتُمۡ اَنۡ تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَ تُقَطِّعُوۡۤا اَرۡحَامَکُمۡ - اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ لَعَنَہُمُ اللّٰہُ فَاَصَمَّہُمۡ وَ اَعۡمٰۤی اَبۡصَارَہُمۡ.
‘অতঃপর তোমরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে কি এমনই করবে যে, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন; অতঃপর তাদেরকে বধির করেছেন এবং তাদের দৃষ্টিশক্তি অন্ধ করে দিয়েছেন’ (সূরা মুহাম্মাদ : ২২-২৩)। তিনি আরও বলেন, وَ اعۡبُدُوا اللّٰہَ وَ لَا تُشۡرِکُوۡا بِہٖ شَیۡئًا وَّ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّ بِذِی الۡقُرۡبٰی ‘তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। আর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়দের প্রতিও’ (সূরা আন-নিসা : ৩৬)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ ‘কোন মুসলিমের জন্য তার মুসলিম ভাইকে তিন রাতের বেশি বর্জন (কথাবার্তা বন্ধ) করা বৈধ নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬০৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬০)। তিনি আরো বলেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৮৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৫৬)।
সুতরাং যদি ভাই বা বোন ছালাতে অবহেলা করে, তাহলে তাকে হিকমত, নরম ভাষা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে বারবার দাওয়াত দিতে হবে। তার জন্য দু‘আ করতে হবে। প্রয়োজনে সাময়িকভাবে কঠোর আচরণ বা বয়কট করা যেতে পারে, যদি তা তার সংশোধনের জন্য উপকারী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু স্থায়ীভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। আল্লামা আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ফরয এবং তা ছিন্ন করা হারাম। তবে যদি কোন আত্মীয়কে সাময়িক বর্জন করলে তার সংশোধন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তা বৈধ; আর যদি এতে কোন উপকার না হয় বা ক্ষতি বৃদ্ধি পায়, তাহলে বর্জন করা বৈধ নয়’ (মাজমূঊ ফাতওয়া ইবনু বায, ২৮/২০৯-২১০ পৃ.)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া বোর্ড বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম। তবে শারঈ স্বার্থে এবং সংশোধনের উদ্দেশ্যে সাময়িক বর্জন বৈধ হতে পারে, যদি তাতে কল্যাণের আশা থাকে’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ, ২৫/২৯৮-৩০০ পৃ.)। উল্লেখ্য, পিতা-মাতা সন্তানের অধিকার পুরোপুরি বাতিল বা তাকে শারঈ অর্থে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করতে পারেন না। সন্তানের অবাধ্যতা বা পাপের কারণে তাকে শাসন, উপদেশ বা প্রয়োজনে সীমিত শাস্তি দিতে পারেন; কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বৈধ নয়। একইভাবে সন্তানও পিতা-মাতা বা ভাই-বোনকে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করতে পারে না। আল্লাহ অধিক জানেন।
প্রশ্ন (২) : অর্থ বুঝে কুরআন তেলাওয়াত করা কি অপরিহার্য?
-আবূ রুক্বাইয়্যাহ, সাতক্ষীরা।
উত্তর : ছালাতে বা ছালাতের বাইরে অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করা উচিত। বিশেষ করে ছালাতের মধ্যে তেলাওয়াত করার সময় অর্থ বোঝা ছালাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা আত্মিক সংযোগ ও মনোযোগকে বৃদ্ধি করে। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অর্থ বুঝুক বা না বুঝুক মানুষ কুরআন তেলাওয়াতের জন্য ছাওয়াব পাবে। তবে মুমিনের জন্য এটা উচিত নয় যে, সে আমলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েও কুরআন তেলাওয়াত করবে অথচ তার অর্থ বুঝবে না। উদাহরণস্বরূপ: যদি কেউ চিকিৎসাবিদ্যা শিখতে চায় এবং সে চিকিৎসা বিষয়ক বই পড়ে, তবে যতক্ষণ না সে তার অর্থ বুঝবে এবং তার ব্যাখ্যা শিখবে, ততক্ষণ সে তা থেকে উপকৃত হতে পারবে না। বরং সে এর অর্থ বুঝার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, যাতে করে সে তা বাস্তবায়ন করতে পারে। তাহলে আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে কী বলা যায়, যা অন্তরের রোগের জন্য শিফা এবং মানুষের জন্য উপদেশ? মানুষ কি তা না বুঝেই এবং গভীরভাবে চিন্তা না করেই পড়বে? এজন্যই ছাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) দশ আয়াত অতিক্রম করতেন না, যতক্ষণ না তাঁরা তার এবং এর মধ্যকার জ্ঞান ও আমল শিখে নিতেন। সুতরাং তাঁরা কুরআন, জ্ঞান ও আমল সবকিছু একসাথে শিখতেন। অতএব, মানুষ কুরআন তিলাওয়াতের জন্য ছাওয়াব পাবে, তা সে অর্থ বুঝুক বা না বুঝুক। তবে তার উচিত সর্বাত্মক চেষ্টা করা এর অর্থ বুঝার জন্য এবং এই অর্থ নির্ভরযোগ্য আলিমদের কাছ থেকে গ্রহণ করা, যাদের জ্ঞান ও আমানতদারিতে তারা বিশ্বস্ত’ (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ র্দাব, ৫/২ পৃ.)। ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
مَا مَنَعَ الْفَهْمَ وَشُهُوْدَ الْقَلْبِ بِحَيْثُ يَصِيْرُ الرَّجُلُ غَافِلًا فَهَذَا لَا رَيْبَ أَنَّهُ يَمْنَعُ الثَّوَابَ.
‘যা উপলব্ধিকে এবং অন্তরের উপস্থিতিকে বাধা দেয়, যাতে মুছল্লী গাফেল প্রমাণিত হয়, তাহলে তা যে ছওয়াবকে বাধা প্রদান করবে- তাতে কোন সন্দেহ নেই’ (ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ ২২/৬১২ পৃ.)। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
وَهَذَا بِإِجْمَاعِ السَّلَفِ أَنَّهُ لَيْسَ لِلْعَبْدِ مِنْ صَلَاتِهِ إِلَّا مَا عَقَلَ مِنْهَا وَحَضَرَهُ بِقَلْبِهِ.
‘এটা সালাফদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, বান্দাকে ছালাতের নেকী ততটুকুই দেয়া হবে, ছালাতের যতটুকু সে উপলব্ধি করবে এবং অন্তর দিয়ে নিজেকে যতটুকু উপস্থিত রাখবে’ (বাদায়েউল ফাওয়ায়েদ ২/১৯৬ পৃ.)। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) উদাসীন মুছল্লী সম্পর্কে বলেন, وَإِمَّا عَنِ الْخُشُوْعِ فِيْهَا وَالتَّدَبُّرِ لِمَعَانِيْهَا ‘ছালাতে একাগ্রতা না থাকা এবং ছালাতের অর্থ গভীরভাবে অনুধাবন না করা’ (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৮/৪৯৩ পৃ.)।
প্রশ্ন (৩) : বোন জীবিত থাকা অবস্থায় দুলাভাইয়ের সামনে কেমন পর্দা করতে হবে? নন মাহরাম ব্যক্তির সামনে হিজাব-নিকাব পরে যেমন যায় তেমন, না-কি ঢিলাঢেলা পোশাক পরে হাত মুখ খোলা রেখে যাওয়া যাবে?
-আয়েশ খাতুন, গোপালগঞ্জ।
উত্তর : বোনের স্বামীর সামনে স্ত্রীর বোন পূর্ণ পর্দা করবে। অর্থাৎ দুলাভাই নিজের শ্যালিকার (স্ত্রীর বোনের) জন্য মাহরাম নন। তাই তার সামনে সাধারণ অপরিচিত পুরুষের মতই পর্দা করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا لِبُعُوۡلَتِہِنَّ ... اَوۡ بَنِیۡۤ اِخۡوَانِہِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اَخَوٰتِہِنَّ
‘তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে তাদের স্বামী... অথবা তাদের ভাইয়ের ছেলে, অথবা বোনের ছেলে (মাহরামদের) সামনে ব্যতীত’ (সূরা আন-নূর : ৩১)। এই আয়াতে যাদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি দেয়া হয়েছে, তাদের তালিকায় বোনের স্বামীকে রাখা হয়নি। তাই তিনি মাহরাম নন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ ... الْحَمْوُ الْمَوْتُ ‘তোমরা নারীদের কাছে (নির্জনে) প্রবেশ করা থেকে বেঁচে থাক। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! দেবর সম্পর্কে কী? তিনি বললেন, দেবর তো মৃত্যুসম’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৭২)। এখানে স্বামীর নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ মানুষ তাদের ব্যাপারে অনেক সময় শিথিলতা করে। দুলাভাইও একইভাবে গায়রে মাহরাম।
প্রশ্ন (৪) : আল্লাহ তা‘আলাকে উত্তম পরিকল্পনাকারী বলা যাবে?
-নাহিদ, ঢাকা।
উত্তর : বলা যাবে। তবে আরবীর মূল শব্দ ও অর্থের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। কুরআনে আল্লাহ্র জন্য خَیۡرُ الۡمٰکِرِیۡنَ ‘সর্বোত্তম কৌশল অবলম্বনকারী/পরিকল্পনাকারী’ শব্দ এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ یَمۡکُرُوۡنَ وَ یَمۡکُرُ اللّٰہُ ؕ وَ اللّٰہُ خَیۡرُ الۡمٰکِرِیۡنَ ‘তারা ষড়যন্ত্র করে, আর আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ হলেন সর্বোত্তম কৌশল অবলম্বনকারী’ (সূরা আল-আনফাল : ৩০)। তবে আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘পরিকল্পনা’ বলতে মানুষের মত ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পরিকল্পনা করা নয়; বরং তাঁর চিরন্তন জ্ঞান, হিকমত ও সিদ্ধান্তকে বোঝায়।
প্রশ্ন (৫) : কবিরাজের উপর বিশ্বাস রাখা যাবে কি?
-সাব্বির, কাঁচপুর, ঢাকা।
উত্তর : ইসলামে চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ; তবে চিকিৎসার কার্যকারিতা আল্লাহ্র ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল, এ বিশ্বাস থাকা আবশ্যক। তাই কোন কবিরাজের ওষুধ, ভেষজ বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়া হারাম নয়, যদি তা শরী‘আতসম্মত ও বৈধ উপায়ে হয়। কিন্তু যদি বিশ্বাস করা হয় যে, কবিরাজ নিজেই অদৃশ্যভাবে রোগ সারিয়ে দিতে পারে, জিন-ভূত নিয়ন্ত্রণ করে, তাবীয-কবচ, শিরকী মন্ত্র, গণনা, নক্ষত্র, ভাগ্য বা অজানা শক্তির মাধ্যমে রোগমুক্তি দেয়, তবে এ বিশ্বাস হারাম; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা শিরক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اِذَا مَرِضۡتُ فَہُوَ یَشۡفِیۡنِ ‘আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই (আল্লাহ) আমাকে সুস্থ করেন’ (সূরা আশ-শূ‘আরা : ৮০)। তিনি আরও বলেন, قُلۡ لَّنۡ یُّصِیۡبَنَاۤ اِلَّا مَا کَتَبَ اللّٰہُ لَنَا ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা ছাড়া অন্য কিছু আমাদের কাছে পৌঁছবে না’ (সূরা আত-তাওবাহ : ৫১)। এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, প্রকৃত উপকার ও ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ। চিকিৎসক, কবিরাজ বা ওষুধ কেবল মাধ্যম।
আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, تَدَاوَوْا، فَإِنَّ اللهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً ‘তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি, যার জন্য তিনি চিকিৎসাও সৃষ্টি করেননি’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৮৫৫; তিরমিযী, হা/২০৩৮, সনদ ছহীহ)। অন্য হাদীছে এসেছে, مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ‘যে ব্যক্তি কোন গণক বা ভাগ্যবক্তার কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করবে, তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৩০)। আরও কঠোরভাবে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষী বা গণকের কাছে গিয়ে তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ওপর অবতীর্ণ বিধানের সাথে কুফরী করল’ (আহমাদ, হা/৯৫৩২; আবূ দাঊদ, হা/৩৯০৪, সনদ ছহীহ)।
প্রশ্ন (৬) : ফেতনার যুগে দ্বীনি ইলম অর্জনের উপায় কী?
-আব্দুল্লাহ, ঢাকা।
উত্তর : বর্তমান যুগে খেলাধুলা, বিনোদন ও নানা ব্যস্ততার কারণে মানুষের সময় নষ্ট হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। ফুটবল বৈধ বিনোদনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে যদি তা দ্বীনী দায়িত্ব ও ইলম অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা ক্ষতির কারণ হয়। তাই একজন মুমিনের উচিত সময়ের সঠিক ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উপায়গুলো অনুসরণ করা যেতে পারে:
১. ইলমের গুরুত্ব হৃদয়ে ধারণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یَرۡفَعِ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন’ (সূরা আল-মুজাদালাহ : ১১)। যে ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে, ইলম তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করবে, তার কাছে ফুটবলসহ অন্যান্য দুনিয়াবী বিষয় দ্বিতীয় স্থানে চলে আসবে।
২. সময়ের মূল্য বুঝতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, نِعْمَتَانِ مَغْبُوْنٌ فِيْهِمَا كَثِيْرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ ‘দু’টি নে‘মতের ব্যাপারে অনেক মানুষ উদাসীন: সুস্থতা ও অবসর সময়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১২)। ফুটবল বা অন্য কোন কাজে এত সময় দেয়া উচিত নয়, যাতে কুরআন, ছালাত ও দ্বীনি শিক্ষা পিছিয়ে যায়।
৩. প্রতিদিন ইলমের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা। যেমন: ফজরের পর কুরআন তিলাওয়াত ও তাফসীর, প্রতিদিন কিছু হাদীছ অধ্যয়ন, একজন আলেমের কাছে নিয়মিত পড়াশোনা, অবসর সময়ে উপকারী লেকচার শোনা। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّيْنِ ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭১)।
৪. ভালো সঙ্গ গ্রহণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ کُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ ‘তোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গী হও’ (সূরা আত-তাওবাহ : ১১৯)। যারা ইলম, আমল ও আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তাদের সঙ্গ ইলম অর্জনে সাহায্য করে।
প্রশ্ন (৭) : আযানের উত্তর না দিলে বা আযানের সময় কথা বললে কি গুনাহ হয়?
-গোলাম রাব্বী, বরিশাল।
উত্তর : আযান ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এটি শুধু ছালাতের সময় জানানোর একটি ঘোষণা নয়; বরং এতে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা, তাওহীদের সাক্ষ্য এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি সাক্ষ্যের আহ্বান রয়েছে। তাই আযানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা একজন মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। আযান শুনলে তার উত্তর দেয়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, إِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ فَقُوْلُوْا مِثْلَ مَا يَقُوْلُ الْمُؤَذِّنُ ‘তোমরা যখন আযান শুনবে, তখন মুয়াযযিন যা বলে তোমরাও অনুরূপ বল’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬১১; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৩)। এই হাদীছের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আযানের উত্তর দেয়া নবী (ﷺ)-এর নির্দেশিত সুন্নাত। অধিকাংশ আলেমের মতে, এটি ওয়াজিব নয়; বরং সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তাই কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আযানের উত্তর না দিলে একটি বড় ফযীলত ও সুন্নাত থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে কোন কারণ ছাড়া নিয়মিত আযানের উত্তর ছেড়ে দেয়া একজন মুসলিমের জন্য অনুচিত। সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আযান চলাকালে কথা বলা বৈধ হলেও উত্তম হল কথা না বলে মুয়াযযিনের উত্তর দেয়া। কারণ আযান একটি মহান যিকির এবং এর প্রতি মনোযোগ দেয়া সুন্নাত’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনু বায, ১০/৩৬৫ পৃ.)। তবে কেউ যদি আযানকে অবজ্ঞা করে, উপহাস করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে অসম্মান করার উদ্দেশ্যে কথা বলে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ এটি ইসলামের একটি নিদর্শনের প্রতি অবমাননা, যা ইসলাম হতে বের করে দেয়।
প্রশ্ন (৮) : ইসলামে ছাগল বা অন্যান্য হালাল পশু খাসি (ঈধংঃৎধঃব) করা কি হারাম?
-হুমায়ুন কবীর, সঊদী আরব।
উত্তর : ইসলামে ছাগল বা অন্যান্য হালাল পশুকে খাসি (ঈধংঃৎধঃব) করা সম্পর্কে মূলনীতি হল, আল্লাহ তা‘আলা যেসব প্রাণী মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো থেকে বৈধ উপায়ে উপকার গ্রহণ করা জায়েয। তবে কোন প্রাণীর অঙ্গহানি বা কষ্ট দেয়ার বিষয়টি শরী‘আতের নীতিমালার অধীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَّ الۡخَیۡلَ وَ الۡبِغَالَ وَ الۡحَمِیۡرَ لِتَرۡکَبُوۡہَا وَ زِیۡنَۃً ؕ وَ یَخۡلُقُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ‘আর তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা, যাতে তোমরা তাতে আরোহণ কর এবং এগুলো সৌন্দর্যের উপকরণ। আর তিনি এমন কিছু সৃষ্টি করেন যা তোমরা জান না’ (সূরা আন-নাহল : ৮)। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, প্রাণীগুলো মানুষের বিভিন্ন উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে তাদের ওপর এমন আচরণ করা যাবে না, যা অপ্রয়োজনীয় কষ্টের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রাণীর প্রতি দয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, إِنَّ اللهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ ‘নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের মধ্যে ইহসান (সুন্দর আচরণ) আবশ্যক করেছেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৫৫)।
পশুকে খাসি করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ফক্বীহ বলেছেন, যদি এর দ্বারা বৈধ উপকার উদ্দেশ্য হয় এবং প্রাণীর জন্য অতিরিক্ত ক্ষতি না হয়, তাহলে তা জায়েয। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে পশু খাওয়া হয়, তাকে খাসি করা জায়েয; কারণ এতে তার গোশত অধিক উত্তম হয় এবং এতে কোন উপকার থাকলে তা বৈধ’ (শারহু ছহীহ মুসলিম, ১৩/১০৫ পৃ.)। খাওয়ার উদ্দেশ্যে পালিত পশু যেমন ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি খাসি করা জায়েয, বিশেষত যখন এতে গোশতের মান বৃদ্ধি পায় বা পশু শান্ত হয়। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া বোর্ড বলেন, ‘খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা পশুকে খাসি করা জায়েয, যদি এতে পশুর প্রতি এমন ক্ষতি না হয় যা সহ্য করা অসম্ভব। কারণ এতে গোশত ভালো হওয়ার উপকার রয়েছে’ (ফাতাওয়া আল লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ১১/৪৩১ পৃ.)। শায়খ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, খাওয়ার উদ্দেশ্যে ছাগল বা ভেড়া খাসি করাতে কোন অসুবিধা নেই; কারণ এতে গোশতের গুণ বৃদ্ধি পায় এবং এটি মানুষের জন্য উপকারী’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবন বায, ২৫/৪৯ পৃ.)। আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশুকে খাসি করা জায়েয, যদি তা পশুর জন্য উপকারী হয় এবং এতে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট না দেয়া হয়’ (লিকাউল বাব আল-মাফতূহ, ২০/৩)।
প্রশ্ন (৯) : গোসল ফরয হওয়ার পর, গোসল না করে কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে কি?
-সালীমুদ্দীন, মালদা, ভারত।
উত্তর : জানাবাত অবস্থায় (যেমন সহবাস, স্বপ্নদোষ বা বীর্যপাতের পর গোসল না করা পর্যন্ত) কুরআন পাঠ করা হারাম। এব্যাপারে সবাই একমত। ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ, তাবেঈন এবং পরবর্তী যুগের অধিকাংশ আলেম যেমন সুফিয়ান ছাওরী, ইবনু মুবারক, ইমাম শাফঈ, ইমাম আহমাদ ও ইসহাক্ব সহ তারা সবাই মত দিয়েছেন যে, জানাবাত অবস্থায় কুরআন পাঠ করা নিষিদ্ধ’ (তিরমিযী, ১/১৯৫ পৃ.)। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘চার ইমাম (আবু হানিফা, মালিক, শাফঈ ও আহমাদ) এই ব্যাপারে একমত যে, জানাবাত অবস্থায় কুরআন পড়া নিষিদ্ধ’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২১/৩৪৪ পৃ.)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সুন্নাহর স্পষ্ট দলীল রয়েছে যে, জানাবাত অবস্থায় কুরআন পাঠ করা বৈধ নয়’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১২/১৭ পৃ.)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন যে, ‘জানাবাত অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করা যাবে না, কুরআন তেলাওয়াত বা শিক্ষাদানও করা যাবে না, যতক্ষণ না গোসল করে নেয়’ (ফাতাওয়াল আল-লাজনা আদ-দায়েমা, ৫/৩৮০ পৃ.)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জানাবাত অবস্থায় পড়ে যায়, তার জন্য আবশ্যক সে গোসল করবে, এরপর কুরআন পড়বে। কেননা জানাবাত অবস্থায় কুরআন পাঠ করা হারাম। কেউ যদি কুরআন পাঠ করার নিয়তে কোন আয়াত পড়ে, তাহলে সেটা জায়েয হবে না’ (লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ)। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা যরূরী যে, ওযূ ভঙ্গ হওয়া এবং গোসল ফরয হওয়া এক বিষয় নয়। শুধু ওযূ না থাকলে মুখস্থ থেকে কুরআন পড়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কিন্তু জানাবাত (যার জন্য গোসল ফরয) অবস্থায় অধিকাংশ আলেমের মতে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা যাবে না; বরং দ্রুত গোসল করে পবিত্র হয়ে তিলাওয়াত করা উচিত। আর যদি কেউ দু‘আ, যিকির বা আল্লাহর স্মরণ করতে চায়, তাহলে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াতের নিয়ত ছাড়া সাধারণ যিকির-আযকার করতে পারে। তবে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার্থে জানাবাত অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে তা পাঠ করাই সুন্নাহসম্মত ও অধিক সতর্কতার পথ।
প্রশ্ন (১০) : কাফের দেশের জার্সি পরিধান করা যাবে কি?
-হাসিব, ঢাকা।
উত্তর : ইসলামে পোশাকের মূলনীতি হল, যে কোন পোশাক মূলত বৈধ, যতক্ষণ তাতে শরী‘আতবিরোধী কোন বিষয় না পাওয়া যায়। তবে কোন পোশাক যদি কোন ধর্ম, কুফরী বিশ্বাস, অশ্লীলতা, হারাম প্রতীক অথবা বাতিল মতাদর্শের পরিচায়ক হয়, তাহলে তা পরিধান করা বৈধ নয়। এ কারণে মুসলিমের জন্য পোশাক নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করা যরূরী। অনেক মুসলিম ব্যক্তি বিভিন্ন দেশের ফুটবল বা অন্যান্য দলের জার্সি পরিধান করেন। এর মধ্যে অমুসলিম দেশের জার্সিও রয়েছে। এ বিষয়ে শরী‘আতের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে কয়েকটি মূলনীতি সামনে রাখতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَرۡکَنُوۡۤا اِلَی الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا فَتَمَسَّکُمُ النَّارُ ‘আর তোমরা যালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে’ (সূরা হূদ : ১১৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ لَا تَکُوۡنُوۡا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ‘এবং তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’ (সূরা আর-রূম : ৩১)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১)।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন, নিষিদ্ধ সাদৃশ্য গ্রহণ হল এমন সাদৃশ্য, যা তাদের ধর্মীয় নিদর্শন, বিশ্বাস, বিশেষ সংস্কৃতি বা পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। আল্লামা ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কোন পোশাক যদি কাফেরদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা পরিচয়ের প্রতীক হয়, তাহলে তা পরিধান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কিন্তু যদি তা সাধারণ পোশাক হয়, যা মুসলিম ও অমুসলিম উভয়েই ব্যবহার করে, তাহলে শুধু অমুসলিমরা ব্যবহার করে বলে তা হারাম হয়ে যায় না’। যদি জার্সিতে ক্রুশ, কোন কুফরী ধর্মীয় প্রতীক, অশ্লীল ছবি, হারাম শব্দ, বা ইসলামের বিরোধী কোন স্লোগান থাকে, তাহলে তা পরিধান করা জায়েয নয়। যদি জার্সি কোন দেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয় এবং তা পরিধানকারী ব্যক্তি সেই দেশের প্রতি গর্ব, আনুগত্য বা তাদের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্যে পরে, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ মুসলিমের প্রকৃত পরিচয় হল ইসলাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ ‘নিশ্চয় মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১০)। তবে যদি কোন ব্যক্তি শুধু খেলাধুলার পসন্দ, খেলোয়াড়ের দক্ষতা বা সাধারণ পোশাক হিসাবে কোন জার্সি পরিধান করে এবং তাতে কোন নিষিদ্ধ প্রতীক না থাকে, তাহলে তা সরাসরি হারাম বলা যায় না। কিন্তু মুসলিমের জন্য উত্তম হল এমন পোশাক নির্বাচন করা, যা তার ঈমানী পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে।
প্রশ্ন (১১) : গণতান্ত্রিক নির্বাচনে যদি অংশ গ্রহণ না করা যায়, গণতন্ত্র ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিকল্প পন্থা কী?
-মুহাম্মাদ মুতালিব, কুমিল্লা।
উত্তর : বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ শরী‘আতসম্মত নয়। এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল পদ্ধতি কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত এবং সেটিই সকল নবী-রাসূলের অনুসৃত পদ্ধতি। ইসলাম কখনো কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং মানুষের অন্তরে ঈমান, সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ এবং নেতৃত্বে দ্বীনি যোগ্যতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা সেই প্রচেষ্টার একটি ফল হতে পারে, কিন্তু সেটিই শুরু নয়। নবী (ﷺ)-এর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি মক্কায় প্রায় ১৩ বছর কোন নির্বাচন, রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি প্রথমে মানুষের আক্বীদা সংশোধন করেছেন, তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন, কুরআনের শিক্ষা দিয়েছেন, ছাহাবীদের চরিত্র গঠন করেছেন এবং একটি ঈমানদার জামা‘আত তৈরি করেছেন। এরপর যখন আল্লাহ তা‘আলা উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলেন, তখন মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই নববী মানহাজ। তাই ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য করণীয় হল-
১. তাওহীদ ও বিশুদ্ধ আক্বীদার দাওয়াতÑ শিরক, বিদ‘আত ও কুসংস্কার থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনা। ২. কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর শিক্ষা প্রসারÑ সঠিক দ্বীনি জ্ঞান ছাড়া ইসলামী সমাজ গঠন সম্ভব নয়। ৩. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ইসলামী সংস্কারÑ সৎ চরিত্র, আমানতদারিতা, ন্যায়বিচার ও তাক্বওয়া প্রতিষ্ঠা করা। ৪. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধÑ হিকমত, ধৈর্য ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে। ৫. যোগ্য আলেম, দাঈ ও নেতৃত্ব গড়ে তোলাÑ যারা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে সমাজকে পরিচালিত করতে পারবেন। ৬. মুসলিমদের ঐক্য, ধৈর্য ও আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভর করাÑ কারণ প্রকৃত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلۡ ہٰذِہٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ ۟ؔ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ اَنَا وَ مَنِ اتَّبَعَنِیۡ
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, এটাই আমার পথ। আমি এবং আমার অনুসারীরা জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে আহ্বান করি’ (সূরা ইউসুফ : ১০৮)। অন্যত্র তিনি বলেন,
وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ
‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে’ (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)। তিনি আরও বলেন,
وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ کَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ.
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে যমীনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে’ (সূরা আন-নূর: ৫৫)।
উক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায়, ক্ষমতা (তামকীন) হলো ঈমান ও সৎকর্মের ফল, এর বিকল্প নয়। একজন খাঁটি-নিষ্ঠাবান মুমিনের জন্য বিকল্প পথ হলো নবী (ﷺ)-এর দাওয়াতি ও সংস্কারমূলক পদ্ধতিÑ তাওহীদের দাওয়াত, ইলম শিক্ষা, তাযকিয়া, সমাজ সংস্কার, সৎ নেতৃত্ব গঠন এবং আল্লাহ্র সাহায্যের অপেক্ষা করা। কারণ ইসলাম প্রতিষ্ঠা শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে; রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তার পরবর্তী ধাপ। সুতরাং ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হল বিশুদ্ধ আক্বীদা, ছহীহ ইলম, দাওয়াত, সমাজ সংস্কার এবং আল্লাহর সাহায্যের উপর ভরসা। ক্ষমতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান এগুলোরই ফল, এগুলোকে অতিক্রম করে শর্টকাট কোন পদ্ধতি কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ নির্দেশ করে না।
প্রশ্ন (১২) : বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে গরু কুরবানী করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন হল- লুকিয়ে গরু কুরবানী করলে সে কুরবানী জায়েয হবে কি?
-আব্দুল আলীম, কালিয়াচক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
উত্তর : কুরবানী একটি মহান ইবাদত। তবে ইসলামে ইবাদত আদায়ের পাশাপাশি জীবন, সম্পদ ও সামগ্রিক ক্ষতি এড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই কোন স্থানে যদি গরু কুরবানী আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয় বা তা করলে নিজের বা অন্য মুসলিমদের জান-মাল, নিরাপত্তা বা সাম্প্রদায়িক অশান্তির বাস্তব আশঙ্কা থাকে, তাহলে গোপনে গরু কুরবানী করা উচিত নয়। এ অবস্থায় যদি অন্য বৈধ কুরবানীর পশুÑ যেমন ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা পাওয়া যায়, তাহলে সেগুলো দিয়েই কুরবানী আদায় করা উচিত। কারণ শরী‘আতের উদ্দেশ্য হল ইবাদত আদায় করা, নিজের বা অন্যের জন্য অযথা ক্ষতি ডেকে আনা নয়। তবে যদি কোন ব্যক্তি গোপনে গরু কুরবানী করেন এবং কুরবানীর সব শরঈ শর্ত পূরণ হয়, তাহলে কুরবানী ছহীহ হওয়ার বিষয়টি এক প্রশ্ন; আর আইন ভঙ্গ করা বা নিজের ও অন্যের জন্য বিপদ সৃষ্টি করা আরেক প্রশ্ন। কুরবানী ইবাদত হিসাবে ছহীহ হতে পারে, কিন্তু অকারণে এমন কাজ করা, যা বড় ধরনের ক্ষতি, ফিতনা বা নির্যাতনের কারণ হয়, শরী‘আতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡکُمۡ اِلَی التَّہۡلُکَۃِ ‘তোমরা নিজেদেরকে নিজেদের হাতে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯৫)। অন্যত্র তিনি বলেন,
یُرِیۡدُ اللّٰہُ بِکُمُ الۡیُسۡرَ وَ لَا یُرِیۡدُ بِکُمُ الۡعُسۡرَ ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, তিনি তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৫)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধে ক্ষতি করাও যাবে না’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪০; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/১৪৬১; সনদ ছহীহ)।
গোপনে গরু কুরবানী করলে শারঈ শর্ত পূরণ হলে কুরবানী ছহীহ হবে কিন্তু যদি এর ফলে নিজের বা মুসলিমদের জান-মাল, নিরাপত্তা বা দ্বীনি স্বার্থের বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে এমন কাজ করা উচিত নয়। সে ক্ষেত্রে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে কুরবানী আদায় করাই শরী‘আতের অধিকতর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও নিরাপদ পন্থা।
প্রশ্ন (১৩) : কাবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত না থাকলে নেক আমলের মাধ্যমে কি কোন ছাগীরা গুনাহ ক্ষমা পাওয়া যাবে না?
-আবূ হেনা মণ্ডল, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
উত্তর : কাবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে ছালাত, জুমু‘আ, রামাযান, ওযূ এবং অন্যান্য নেক আমল দ্বারা ছগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি কাবীরা গুনাহে লিপ্ত থাকে এবং তা থেকে তাওবা না করে, তাহলে এই বিশেষ প্রতিশ্রুতি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِنۡ تَجۡتَنِبُوۡا کَبَآئِرَ مَا تُنۡہَوۡنَ عَنۡہُ نُکَفِّرۡ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ
‘যেসব বড় গুনাহ থেকে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, যদি তোমরা সেগুলো থেকে বেঁচে থাক, তবে আমি তোমাদের ছোট গুনাহগুলো মাফ করে দেব’ (সূরা আন-নিসা : ৩১)। আর নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, এক জুমু‘আহ থেকে আরেক জুমু‘আহ এবং এক রামাযান থেকে আরেক রামাযান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহের কাফফারা; যদি কাবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩)। তাহলে কি কাবীরা গুনাহ থাকলে কোন ছগীরা গুনাহই মাফ হবে না? এখানে আলেমদের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যাখ্যা করেছেন যে, হাদীছে উল্লিখিত স্বয়ংক্রিয় কাফফারার প্রতিশ্রুতি কাবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সঙ্গে শর্তযুক্ত। অর্থাৎ কাবীরা গুনাহে অব্যাহত থাকলে এই বিশেষ প্রতিশ্রুতি প্রযোজ্য হয় না। তবে এর অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ কোন অবস্থাতেই তার ছগীরা গুনাহ ক্ষমা করবেন না। কারণ আল্লাহ্র রহমত ব্যাপক। তাওবা, আন্তরিক ইস্তিগফার, বিপদ-মুছীবত, দু‘আ এবং আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের মাধ্যমে তিনি ছোট গুনাহ এমনকি বড় গুনাহও ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু হাদীছে যে নির্দিষ্ট নেক আমলগুলোর মাধ্যমে ছগীরা গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, তা কাবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্তসাপেক্ষ।
প্রশ্ন (১৪) : অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
-গোলাম রাব্বী, বরিশাল।
উত্তর : ইসলামে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেয়া, গণপিটুনি দেয়া বা হত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে কি না, তা প্রমাণ করা এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি প্রদান করা ব্যক্তিবিশেষ বা জনতার কাজ নয়; এটি ইসলামী বিচারব্যবস্থা ও ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কেউ অপরাধী বলে সন্দেহ হলেই তাকে মারধর বা হত্যা করা ইসলামে বৈধ নয়। বরং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ বলে গণ্য হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত হলেও শাস্তি কার্যকর করার অধিকার বিচারকের, জনসাধারণের নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ‘আল্লাহ যে প্রাণকে সম্মানিত করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
مَنۡ قَتَلَ نَفۡسًۢا بِغَیۡرِ نَفۡسٍ اَوۡ فَسَادٍ فِی الۡاَرۡضِ فَکَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیۡعًا
‘যে ব্যক্তি কোন প্রাণের বিনিময় বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩২)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُوۡنُوۡا قَوّٰمِیۡنَ لِلّٰہِ شُہَدَآءَ بِالۡقِسۡطِ ۫ وَ لَا یَجۡرِمَنَّکُمۡ شَنَاٰنُ قَوۡمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعۡدِلُوۡا ؕ اِعۡدِلُوۡا ۟ ہُوَ اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی.
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ না করে। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ ‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৭৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৯)। রাসূল (ﷺ) আরও বলেছেন,
لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لَادَّعَى رِجَالٌ دِمَاءَ قَوْمٍ وَأَمْوَالَهُمْ، وَلَكِنِ الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي، وَالْيَمِيْنُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ.
‘মানুষকে যদি শুধু দাবির ভিত্তিতে (রায়) দেয়া হত, তবে অনেকেই অন্যের রক্ত ও সম্পদের দাবি করত। কিন্তু দাবিকারীর ওপর প্রমাণ পেশ করা এবং অস্বীকারকারীর ওপর শপথ করা আবশ্যক’ (সুনান আল-বায়হাকী, ১০/২৫২; সনদ ছহীহ)। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
لَوْ تَمَالَأَ عَلَيْهِ أَهْلُ صَنْعَاءَ لَقَتَلْتُهُمْ بِهِ.
‘যদি ছান‘আ নগরীর সমস্ত লোক একজন ব্যক্তিকে হত্যার কাজে অংশগ্রহণ করত, তাহলে আমি সেই একজনের হত্যার অপরাধে তাদের সবাইকে ক্বিসাস হিসাবে হত্যা করতাম’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৩০)।
অতএব আদালত কর্তৃক বিচার শেষে ক্বিছাছ ব্যতীত সর্বাবস্থায় মানুষ হত্যা করা হারাম। এমনকি কোন স্পষ্ট অপরাধীকেও বিচারহীনভাবে মারা যাবে না। এক্ষণে কাউকে গণপিটুনী দিয়ে হত্যা করা হলে সংশ্লিষ্ট সকলেই অপরাধী সাব্যস্ত হবে এবং নিহতের উত্তরাধিকারীরা ক্ষমা না করলে সকলকেই ক্বিছাছ হিসাবে হত্যা করা হবে। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একজন লোককে হত্যার অপরাধে ছান‘আর সাতজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, যদি পুরো ছান‘আবাসী এতে জড়িত থাকত, তাহলে সকলকেই আমরা হত্যা করতাম (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৩০; মিশকাত, হা/৩৪৮১)। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একজনকে হত্যার অপরাধে তিনজনকে হত্যা করেছিলেন (বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান হা/৫০৬৩; ইরওয়া হা/২২০২, সনদ যঈফ)। ইবনু আববাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) একজনকে হত্যার অপরাধে একদল লোককে হত্যার শাস্তি দিয়েছিলেন (আব্দুর রাযযাক হা/১৮০৮২; ইরওয়া ৭/২৬১)। সর্বোপরি বিচারক অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিচার করবেন। যদি গণপিটুনী হত্যার উদ্দেশ্যে না হয়ে থাকে, তবে আদালত ক্বিছাছের পরিবর্তে আসামীদের নিকট থেকে দিয়াত বা রক্তমূল্য আদায় করবে (সূরা আন-নিসা : ৯২)। আর যদি আদালতের বিচারে নিহত ব্যক্তি প্রকৃতই অপরাধী সাব্যস্ত হয়, তবে আদালত আসামীদের শাস্তি মওকূফ করতে পারেন।
প্রশ্ন (১৫) : টেলিভিশনে কিংবা সরাসরি ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা জায়েয? বিভিন্ন দলকে সাপোর্ট করা, বিভিন্ন দলের পতাকা বাড়ির ছাদে লাগানো, তাদের জার্সি গায়ে পরা, তাদের খেলা সম্পর্কে মিছিল-মিটিং করা সম্পর্কে ইসলামের নীতিমালা কী?
-মোস্তফা মনোয়ার, হারাগাছ, রংপুর।
উত্তর : বর্তমান বিশ্বকাপ খেলায় অনেক ক্ষতির দিক রয়েছে, যা শরী‘আতে হারাম। (ক) ফরয ছালাত ছুটে যায় বা বিলম্বিত হয়। (খ) আল্লাহর যিকির ও দ্বীনি দায়িত্ব থেকে বিরত রাখে। (গ) নারী-পুরুষের নগ্ন দৃশ্য দেখা। (ঘ) জুয়া, বাজি বা হারাম উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। (ঙ) অন্ধ দলীয় পক্ষপাত, শত্রুতা ও ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয় । (চ) সময়ের অপচয় ও গুনাহের কারণ হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُلۡہِکُمۡ اَمۡوَالُکُمۡ وَ لَاۤ اَوۡلَادُکُمۡ عَنۡ ذِکۡرِ اللّٰہِ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল না করে’ (সূরা আল-মুনাফিকূন : ৯)।
িিবভিন্ন দলকে সমর্থন করা ও অন্ধ দলীয় পক্ষপাত (عصبية), বিদ্বেষ ও ঝগড়ার কারণ, এটা ইসলামে হারাম। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, دَعُوْهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ ‘এ ধরনের দলীয় পক্ষপাত পরিত্যাগ কর; কারণ এটি দুর্গন্ধময়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯০৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৪)। আরও বলেছেন, لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ ‘যে ব্যক্তি আছাবিয়্যাতের (অন্ধ দলীয় পক্ষপাতের) দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (আবূ দাউদ, হা/ ৫১২১, সনদ হাসান)।
এছাড়া বিভিন্ন দেশের বা দলের পতাকা বাড়ির ছাদে লাগানো। এটা অন্ধ ভালোবাসা, যা শরী‘আতের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَا تَتَّخِذُوا الۡیَہُوۡدَ وَ النَّصٰرٰۤی اَوۡلِیَآءَ ‘তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে অন্তরঙ্গ অভিভাবক (বন্ধু-সহায়ক) হিসাবে গ্রহণ কর না’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৫১)। বিভিন্ন দলের জার্সি পরা যেখানে ক্রুশচিহ্ন, ধর্মীয় প্রতীক বা হারাম বিষয় রয়েছে, যা পরা হারাম। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি কোন জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’ (আবূ দাউদ, হা/৪০৩১, সনদ ছহীহ)।
পঞ্চমতঃ খেলা নিয়ে মিছিল, মিটিং ও উন্মাদনা ঝগড়া, বিদ্বেষ ছড়ায়, ফরয ইবাদতও নষ্টের কারণ হয়। এগুলো শরী‘আতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَنَازَعُوۡا فَتَفۡشَلُوۡا وَ تَذۡہَبَ رِیۡحُکُمۡ ‘তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে’ (সূরা আল-আনফাল : ৪৬)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَ لَا تُسۡرِفُوۡا ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ ‘তোমরা অপচয় কর না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে ভালোবাসেন না’ (সূরা আল-আন‘আম : ১৪১)।
প্রশ্ন (১৬) : সামরিক বাহিনীতে ট্রেনিং এর সময় দাড়ি শেভ করা আবশ্যক। সুতরাং এই সমস্ত বাহিনীতে যোগদান করা যাবে কী?
-ইবনু কাওসার মাহমুদ, সাপাহার, নওগাঁ।
উত্তর : যদি কোন সামরিক বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগদানের শর্ত হয় দাড়ি সম্পূর্ণ শেভ করতে হবে এবং এই শর্ত মানা বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে এমন চাকরিতে যোগদান করা জায়েয নয়। কারণ, কোন সৃষ্টির আনুগত্য করতে গিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। রাসূল (ﷺ)-এর দাড়ি রাখার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, خَالِفُوا الْمُشْرِكِيْنَ، وَفِّرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ ‘তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর; দাড়ি বড় কর এবং গোঁফ ছোট কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯)। আরেক বর্ণনায় এসেছে, أَعْفُوا اللِّحَى، وَاحْفُوا الشَّوَارِبَ ‘দাড়ি বাড়তে দাও এবং গোঁফ ছোট কর’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬০)।
আর শরী‘আতের নির্দেশনা হল- রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশ মানা ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর, আর তিনি যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক’ (সূরা আল-হাশর : ৭)। রাসূল (ﷺ)-এর আদেশ অমান্য করার সতর্কতা আল্লাহ তা’আলা বলেন, فَلۡیَحۡذَرِ الَّذِیۡنَ یُخَالِفُوۡنَ عَنۡ اَمۡرِہٖۤ اَنۡ تُصِیۡبَہُمۡ فِتۡنَۃٌ اَوۡ یُصِیۡبَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ‘যারা রাসূলের আদেশের বিরোধিতা করে, তারা সতর্ক থাকুক, যেন তাদের ওপর কোন ফিতনা বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে না পড়ে’ (সূরা আন-নূর: ৬৩)। গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِيْ مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ ‘স্রষ্টার অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই’ (আহমাদ, হা/১০৯৮; তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর, হা/৩৬৭; ছহীহুল জামে‘, হা/৭৫২০)। তাক্বওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا - وَّ یَرۡزُقۡہُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَحۡتَسِبُ
‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ২-৩)।
প্রশ্ন (১৭) : আমার বাবার মাসিক আয় জানি না। অনেক রকম কাজ করে উপার্জন করেন। সরকার আমার ইনস্টিটিউটকে উপবৃত্তি প্রদান করে থাকে আর আমি যতদুর জানি যাদের বাবার মাসিক ইনকাম ২০ হাজার টাকার বেশি তাদের সরকার উপবৃত্তি দিবে না। এমতাবস্থায় আমি কী করতে পারি? আমার উপবৃত্তি গ্রহণ করা জায়েয হবে?
-তাওসীফ আহমাদ, বরিশাল, পটুয়াখালী।
উত্তর : যদি সরকার নির্দিষ্ট শর্তে উপবৃত্তি প্রদান করে এবং সেই শর্তের একটি হয় যে অভিভাবকের মাসিক আয় ২০,০০০ টাকার কম হতে হবে, তাহলে সেই শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও উপবৃত্তি গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ এটি অন্যের হক গ্রহণ এবং তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য প্রদানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু যদি আপনি আপনার বাবার প্রকৃত মাসিক আয় না জানেন, তাহলে প্রথম কর্তব্য হল যথাসম্ভব তা জানার চেষ্টা করা। অনুমান বা সন্দেহের ভিত্তিতে আবেদন করা উচিত নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার হক্বদারের কাছে পৌঁছে দেবে’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ کُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক’ (সূরা আত-তাওবা : ১১৯)। আল্লাহ তা’আলা বলেন, وَ لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কর না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০২)।
প্রশ্ন (১৮) : সন্তানের বয়স মাত্র ২৩ মাস। বর্তমানে স্ত্রী পুনরায় গর্ভধারণ করেছেন। আনুমানিক এক সপ্তাহ হল। প্রথম সন্তানটি এখনও খুব ছোট। এছাড়া তার স্ত্রীর বয়স প্রায় ২০-২১ বছর এবং শারীরিক দিক থেকেও তিনি অনেক বেশি সবল নন। এ অবস্থায় পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এই গর্ভধারণ অব্যাহত থাকলে মা ও ছোট সন্তানের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শরী‘আতের দৃষ্টিতে এই প্রাথমিক পর্যায়ের গর্ভ নষ্ট করার অনুমতি আছে কি?
-সাদেকুর রহমান, ঢাকা।
উত্তর : গর্ভধারণ হওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে গর্ভপাত করা জায়েয নয়। কারণ, গর্ভস্থ সন্তানও আল্লাহর প্রদত্ত একটি আমানত। গর্ভের বয়স যত বাড়ে, গর্ভপাতের নিষেধাজ্ঞা তত কঠোর হয়। বিশেষ করে ১২০ দিন (চার মাস) পূর্ণ হওয়ার পর, যখন ভ্রƒণে রূহ ফুঁকে দেয়া হয়, তখন শরী‘আতসম্মত যরূরী কারণ (যেমন: নির্ভরযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে মায়ের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়া) ছাড়া গর্ভপাত করা হারাম এবং গুরুতর অপরাধ। অতএব আপনার বর্ণিত ক্ষেত্রে গর্ভের বয়স মাত্র এক সপ্তাহের মত। শুধু প্রথম সন্তান ছোট, মা দুর্বল, ভবিষ্যতে কষ্ট হতে পারে এসব আশঙ্কা মাত্রই গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয়। তবে যদি বিশ্বস্ত, দক্ষ ও দ্বীনদার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিতভাবে বলেন যে, এই গর্ভ অব্যাহত থাকলে মায়ের জীবন বা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিবে, তাহলে সে ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষজ্ঞ আলেম ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিবেচিত হতে পারে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُہُمۡ وَ اِیَّاکُمۡ ‘দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না। আমরাই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দান করি (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩১)। তিনি আরও বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ‘আল্লাহ যে প্রাণকে সম্মানিত করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কর না’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩৩)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন,
إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِيْ بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِيْنَ يَوْمًا ثُمَّ يَكُوْنُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُوْنُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَبْعَثُ اللهُ مَلَكًا.
‘নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিণ্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩২০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৩)।
শুধু সন্তান ছোট হওয়া বা মা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়া গর্ভপাত বৈধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট কারণ নয়। যদি নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করেন যে, গর্ভধারণ অব্যাহত থাকলে মায়ের জীবন বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে সে ক্ষেত্রে শরী‘আতের আলোকে বিশেষ প্রয়োজন (ضرورة) হিসাবে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তাই চিকিৎসাগত নিশ্চিত প্রয়োজন ছাড়া এই প্রাথমিক পর্যায়ের গর্ভও নষ্ট করা থেকে বিরত থাকাই শরী‘আতের দৃষ্টিতে নিরাপদ ও অধিক সতর্কতার পথ।
প্রশ্ন (১৯) : সিল্ক বা রেশমের কাপড় পুরুষদের জন্য হারাম। কিন্তু তা কি ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে?
-আবু বাকর, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা।
উত্তর : পুরুষের জন্য রেশমের পোশাক হারাম। তবে এটি ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয, যদি তা এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়, যার জন্য তা ব্যবহার করা বৈধ; যেমন- নারী বা এমন কাজে যেখানে শরী‘আত অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, কোন পুরুষ এটি হারামভাবে পরিধান করার জন্যই কিনছে, তাহলে তার কাছে তা বিক্রি করা জায়েয নয়। কারণ, এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল। আলী ইবনু আবূ তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, একদা আল্লাহর নবী (ﷺ) তাঁর ডান হাতে রেশম ও বাম হাতে স্বর্ণ নিয়ে বললেন, إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُوْرِ أُمَّتِيْ ‘এ দু’টি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৫৭, ৪০৪০-৪০৫৩; সনদ ছহীহ)। ইবনু আব্দুল বার্র (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামার সর্বসম্মতিক্রমে পুরুষের জন্য খাঁটি রেশমের বস্ত্রকে হারাম করা হয়েছে এবং মহিলাদের জন্য হালাল করা হয়েছে (আল-ইসতিযকার, ৮/৩১৮-৩২৩)। ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রেশমের বস্ত্র পুরুষের উপর হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য আছে বলে আমি জানি না (আল-মুগনী, ১/৪২১)। ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাত ও উলামার ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, রেশমের বস্ত্র পরিধান করা পুরুষের জন্য হারাম (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৯/২৯৮)। তবে কাপড়ে তালি দেয়ার উদ্দেশ্যে পুরুষের জন্য স্বল্প পরিমাণ তথা দুই আঙ্গুল বা তিন আঙ্গুল বা চার আঙ্গুল পরিমাণ রেশম ব্যবহার করা জায়েয (ছহীহ মুসলিম, হা/২০৬৯; রওযাতুত ত্বালিবীন, ২/৬৬)।
প্রশ্ন (২০) : ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে চাকরি করা কি জায়েয হবে। এই পদের কাজ হল জনগণের সেবামূলক কাজ। কিন্তু এর মধ্যে একটি কাজ সূদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণের টাকা উঠানো। উল্লেখ্য, যদিও সূদমুক্ত বলা হয় তবে ৫% সার্ভিস চার্জ বা সেবা মাশুল যুক্ত আছে।
-জুবায়ের মাহবুব জাবেদ, সিলেট।
উত্তর : এই প্রশ্নের হুকুম নির্ভর করবে ঋণের প্রকৃতির ওপর। যদি তথাকথিত ৫% সার্ভিস চার্জ প্রকৃতপক্ষে ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ হয় এবং বাস্তব কোন সেবার বিনিময় না হয়ে ঋণের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে শরী‘আতের দৃষ্টিতে তা সূদের অন্তর্ভুক্ত। এমন ঋণের কার্যক্রম পরিচালনা, আদায় বা সংগ্রহের কাজে অংশ নেয়া জায়েয নয়। কিন্তু যদি ৫% অর্থটি ঋণের লাভ না হয়ে, প্রকৃত প্রশাসনিক খরচ (যেমন: আবেদন প্রক্রিয়া, কাগজপত্র, মাঠপর্যায়ের বাস্তব ব্যয়) অনুযায়ী নির্ধারিত হয় এবং ঋণের মেয়াদ বা পরিমাণের ভিত্তিতে লাভ হিসাবে নেয়া না হয়, তাহলে তা ভিন্ন আলোচনা। এ বিষয়টি বাস্তব নীতিমালা দেখে নির্ধারণ করতে হবে। সূদের কাজে সহযোগিতা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘তোমরা নেককাজ ও তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কর না’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ২)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৫)। তিনি আরও বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৮)। সূদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই গুনাগার। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘রাসূল (ﷺ) সূদগ্রহণকারী, সূদদাতা, সূদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষী সকলের ওপর লা‘নত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহের ক্ষেত্রে)’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮)। এই চাকরির ক্ষেত্রে বিধান হল, যদি আপনার মূল দায়িত্ব জনগণের সেবামূলক কাজ হয় এবং সূদভিত্তিক ঋণের কিস্তি আদায় বা পরিচালনা আপনার কাজের অপরিহার্য অংশ হয়, তাহলে এমন চাকরি থেকে বিরত থাকা উচিত। যদি ঋণটি প্রকৃত অর্থেই শরী‘আতসম্মত, সূদমুক্ত হয় এবং ৫% কেবল বাস্তব প্রশাসনিক ব্যয়ের সমপরিমাণ হয় (লাভ নয়), তাহলে সে ক্ষেত্রে চাকরি জায়েয হতে পারে। যেহেতু বাস্তবে অনেক ‘সার্ভিস চার্জ’ নামের অর্থই সূদের বিকল্প হিসাবে নেয়া হয়। তাই চাকরি গ্রহণের আগে ঋণ প্রকল্পের নীতিমালা ও ৫% চার্জের প্রকৃতি নিশ্চিতভাবে যাচাই করা যরূরী।
প্রশ্ন (২১) : হাউজিংয়ে আমাদের একটি জমি আছে। উক্ত হাউজিংয়ে যতগুলো জমি রয়েছে সবগুলোর ক্ষেত্রে প্রায় পজিশন ঠিক আছে তো দাগ ঠিক নেই, আবার দাগ ঠিক আছে তো পজিশন ঠিক নেই। এমতাবস্থায় উক্ত জমি কি ব্যবহার করা যাবে?
-ইউনুস, ডাসার, মাদারীপুর।
উত্তর : ইসলামে জমি-জায়গার মালিকানা ও ব্যবহার বৈধ হওয়ার জন্য বেশকিছু শর্ত রয়েছে। তার মাঝে অন্যতম শর্ত হল, অন্যের হক নষ্ট না হওয়া, জবরদখল না করা এবং স্পষ্ট মালিকানা থাকা। বর্ণনা অনুযায়ী যদি ‘দাগ’ (খতিয়ান/রেকর্ড) ও ‘পজিশন’ (বাস্তব অবস্থান) মিল না থাকে, তাহলে বিষয়টি সন্দেহপূর্ণ অবস্থায় আছে। যদি হাউজিংয়ের জমিগুলোর মধ্যে ‘দাগ’ (রেকর্ড/খতিয়ান অনুযায়ী প্লট নম্বর) ও ‘পজিশন’ (বাস্তব অবস্থান) মিল না থাকে, এ অবস্থায় সরাসরি ব্যবহার, নির্মাণ বা বিক্রি করলে অন্যের হক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে খাওয়া হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কর না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন,
مَنْ أَخَذَ مِنَ الْأَرْضِ شَيْئًا بِغَيْرِ حَقِّهِ خُسِفَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِيْنَ.
‘যে ব্যক্তি অন্যের জমি থেকে সামান্য পরিমাণও অন্যায়ভাবে দখল করবে, ক্বিয়ামতের দিন তাকে সাত যমীন পর্যন্ত ধসিয়ে দেয়া হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৫৪)। অন্য হাদীছে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এক বিঘত জমি অন্যায়ভাবে দখল করবে, ক্বিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর যমীন বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪০২৪)। এ কারণে, যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, আপনারা যে জায়গা ব্যবহার করছেন সেটাই আপনাদের প্রকৃত জমি, তাহলে ব্যবহার করা জায়েয। কিন্তু যদি সন্দেহ থাকে যে, বাস্তবে অন্যের অংশ চলে আসতে পারে, তাহলে আগে জরিপ, মাপজোক, রেকর্ড সংশোধন ও মালিকদের পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যরূরী।
সমাজের অনেক মানুষেরই এরকম সমস্যা আছে। ‘সবাই এমন করছে’-এটা শরী‘আতের দলীল নয়। অন্যের হক্ব নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সতর্ক থাকতে হবে। ইসলামী ফিক্বহের একটি মূলনীতি হল- اليقين لا يزول بالشك ‘নিশ্চিত হক সন্দেহ দ্বারা নষ্ট হয় না’। তাই জমি ব্যবহারের পূর্বে করণীয় হল, দক্ষ সার্ভেয়ার/আমীন দিয়ে পুনরায় মাপজোক করা। হাউজিং কর্তৃপক্ষ ও জমির মালিকদের সম্মতিতে সীমানা নির্ধারণ করা। প্রয়োজনে সম্ভব হলে সরকারী রেকর্ড/দাগ সংশোধন করা। ইসলামে জমির বিষয়ে ‘সতর্কতা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ ক্বিয়ামতে বান্দার হক (হক্কুল ইবাদ) খুব কঠিনভাবে হিসাব নেয়া হবে।
প্রশ্ন (২২) : গীবত বা বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট গুনাহ মাফ করানোর জন্য কী কী কাজ করা যেতে পারে, যদি সে বান্দাকে না পাওয়া যায়?
-মুহাম্মদ রাহুল, ঢাকা।
উত্তর : মানুষের হক্ব বা বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট গুনাহ ইসলামে অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের হক্ব ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন; কিন্তু বান্দার হক বান্দা ক্ষমা না করলে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত এর হিসাব চলতে থাকবে। গীবত, হত্যা, সম্পদ আত্মসাৎ, অপবাদ, প্রতারণা, যুল্ম ইত্যাদি সবই বান্দার হক্বের অন্তর্ভুক্ত। তাই এসব গুনাহ থেকে তাওবা করার মাধ্যমে পূর্ণ হয় না; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক্ব আদায় করতে হয় বা তার কাছে ক্ষমা নিতে হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَ الۡاِحۡسَانِ وَ اِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ یَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَ الۡمُنۡکَرِ وَ الۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَذَکَّرُوۡنَ.
‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়কে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন’ (সূরা আল-নাহল : ৯০)। তিনি আরও বলেন,
وَ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ بِغَیۡرِ مَا اکۡتَسَبُوۡا فَقَدِ احۡتَمَلُوۡا بُہۡتَانًا وَّ اِثۡمًا مُّبِیۡنًا.
‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহ বহন করে’ (সূরা আল-আহযাব : ৫৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? ছাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব হল- যার টাকা-পয়সা নেই। তিনি বললেন, আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব সে ব্যক্তি, যে ক্বিয়ামতের দিন ছালাত, ছিয়াম ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভক্ষণ করেছে, কারও রক্তপাত করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। তখন তার নেক আমল থেকে এদেরকে দেয়া হবে। যদি নেক আমল শেষ হয়ে যায় অথচ হক বাকি থাকে, তবে তাদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে; এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮১)। এ কারণে কোন ব্যক্তি যদি গীবত বা বান্দার হক্ব সম্পর্কিত গুনাহ করে, তাহলে তার জন্য কয়েকটি বিষয় যরূরী।
প্রথমতঃ আন্তরিক তওবা করতে হবে। তওবার মূল শর্ত হল- গুনাহ ছেড়ে দেয়া, কৃতকর্মের জন্য গভীর অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ جَمِیۡعًا اَیُّہَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার’ (সূরা আন-নূর : ৩১)। দ্বিতীয়তঃ যার গীবত বা অন্যকোনো অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, সম্ভব হলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উত্তম। কারণ এটি মানুষের হক্ব। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيْهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ ‘যার কাছে তার ভাইয়ের সম্মান বা অন্য কোন বিষয়ে যুল্ম থাকে, সে যেন আজই তার থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯)। তবে অনেক সময় সরাসরি গিয়ে ক্ষমা চাইলে আরো বড় ফিতনা, ঝগড়া বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় তার জন্য বেশি বেশি দু‘আ করা, তার প্রশংসা করা এবং তার জন্য ইস্তিগফার করা যথেষ্ট হবে আশা করা যায়। আর সম্পদ সংক্রান্ত কিছু হলে ফেরত দেয়া। সম্ভব না হলে দান করে দেয়া। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি গীবতের কথা সেই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আর যদি না পৌঁছে থাকে, তাহলে তার জন্য দু‘আ ও ইস্তিগফার করবে’ (আল-আযকার, পৃ. ৩৬৮)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড বলেন, ‘যদি গীবতের বিষয়টি ঐ ব্যক্তির কাছে পৌঁছেনি এবং জানালে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার জন্য দু‘আ করবে, তার ভালো গুণাবলি উল্লেখ করবে এবং যেখানে তার গীবত করেছে সেখানে তার প্রশংসা করবে’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমা, ২৬/১০ পৃ.)।
আর যদি সেই ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া না যায়, মারা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা কোথায় আছে জানা না যায়, তাহলে তার জন্য বেশি বেশি দু‘আ করা, ছাদাক্বাহ করা, ইস্তিগফার করা এবং আল্লাহর কাছে তার হক মাফ চাওয়া উচিত। আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন বান্দাদের মাঝে সমাধান করে দেবেন।
প্রশ্ন (২৩) : বহুবিবাহ সম্পর্কে ইসলামের বিধান কী?
-মাশকুর, বগুড়া।
উত্তর : ইসলামে বহুবিবাহ একটি বৈধ ও শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা। ইসলাম পুরুষকে একাধিক বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। তবে তা সীমাহীন বা বাধ্যতামূলক করেনি; বরং কঠোর ন্যায়বিচার, দায়িত্ব ও সামর্থ্যরে শর্ত আরোপ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَانۡکِحُوۡا مَا طَابَ لَکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ مَثۡنٰی وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَ ۚ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تَعۡدِلُوۡا فَوَاحِدَۃً
‘তোমাদের পসন্দনীয় নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিয়ে কর। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে, তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনই যথেষ্ট’ (সূরা আন-নিসা : ৩)। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা চারজন পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং ইসলামে বহুবিবাহ কোন উন্মুক্ত ভোগবাদী ব্যবস্থা নয়; বরং সামাজিক প্রয়োজন, মানবিক বাস্তবতা এবং দায়িত্বশীল পারিবারিক কাঠামোর অংশ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَنۡ تَسۡتَطِیۡعُوۡۤا اَنۡ تَعۡدِلُوۡا بَیۡنَ النِّسَآءِ وَ لَوۡ حَرَصۡتُمۡ ‘তোমরা যতই আগ্রহী হও না কেন, স্ত্রীদের মধ্যে পুরোপুরি সমতা রক্ষা কখনো সক্ষম হবে না’ (সূরা আন-নিসা : ১২৯)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘যার দু’জন স্ত্রী আছে তারপর সে একজনের প্রতি বেশী ঝুঁকে গেল, ক্বিয়ামতের দিন সে এমনভাবে আসবে যেন তার একপার্শ্ব বাঁকা হয়ে আছে’ (আবূ দাঊদ, হা/২১৩৩)। তবে আয়াতে যে ‘আদল বা ইনসাফের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, ‘আর তোমরা যতই ইচ্ছে কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি ‘আদল বা সার্বিক সমান ব্যবহার করতে কখনই পারবে না’ সেটা হচ্ছে, ভালোবাসা ও স্বাভাবিক মনের টান। কেননা, কোন মানুষই দু’জনকে সবদিক থেকে সমান ভালোবাসতে পারে না। তবে শরী‘আত নির্ধারিত অধিকার যেমন, রাত্রী যাপন, সহবাস, খোরপোষ ইত্যাদির ব্যাপারে ‘আদল’ অবশ্যই করা যায় এবং করতে হবে। সেটা না করতে পারলে তাকে একটি বিয়েই করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেও একাধিক বিবাহ করেছেন। তবে তাঁর অধিকাংশ বিবাহ ছিল সামাজিক, দাওয়াহমূলক ও মানবিক উদ্দেশ্যে। তিনি বিধবা নারী, যুদ্ধাহত পরিবারের সদস্য ও অসহায় নারীদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, বহুবিবাহ কেবল প্রবৃত্তি পূরণের বিষয় নয়; বরং দায়িত্ব ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থাও হতে পারে। তাই ইসলাম বহুবিবাহকে বৈধ করলেও যুল্ম, অবহেলা বা বৈষম্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, বহুবিবাহ শরী‘আতে বৈধ এবং অনেক ক্ষেত্রে কল্যাণকর হতে পারে; যেমন, নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, বিধবা ও ত্বালাক্বপ্রাপ্ত নারীর আশ্রয়, সমাজে অশ্লীলতা কমানো ইত্যাদি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তার জন্য একাধিক বিবাহ করা উচিত নয়’। একইভাবে তিনি বলেন, ‘বহুবিবাহ ইসলামের সৌন্দর্যময় বিধানগুলোর একটি, তবে এটি কেবল তখনই প্রশংসনীয় যখন ব্যক্তি আর্থিক ও মানসিকভাবে সক্ষম হয় এবং স্ত্রীদের হক্ব আদায় করতে পারে। অন্যথা তা অন্যায় ও গুনাহের কারণ হতে পারে।
ইসলামে বহুবিবাহের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞা রয়েছে। যেমন, সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিধবা ও ইয়াতীম পরিবারের সহায়তা, অবৈধ সম্পর্ক ও ব্যভিচার কমানো এবং বিশেষ সামাজিক পরিস্থিতির সমাধান করা। ইতিহাসে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বহু নারী স্বামীহারা হয়ে পড়তেন; তখন বহুবিবাহ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা দিত। তবে বর্তমান সমাজে অনেক সময় বহুবিবাহকে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি প্রথম স্ত্রীর প্রতি যুল্ম করে, ভরণ-পোষণ না দেয়, প্রতারণা করে বা কেবল প্রবৃত্তির কারণে অন্যায়ভাবে একাধিক বিবাহ করে, তাহলে তা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলাম কেবল অনুমতি দিয়েছে; বাধ্যতামূলক করেনি।
প্রশ্ন (২৪) : বয়স্ক নারীর স্বামী মারা গেলে নাক ফুলে খুলে রাখতে হবে কি?
-মুহাম্মাদ বিন ফয়েজ, ময়মনসিংহ।
উত্তর : ইসলামে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ইদ্দত পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ الَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَ یَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّ عَشۡرًا
‘আর তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং স্ত্রী রেখে যাবে, তাদের স্ত্রীগণ নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে’ (সূরা আল-বাকারা : ২৩৪)। এই ইদ্দতের সময় স্ত্রীকে শোক পালন করতে হয়, যাকে আরবীতে ‘ইহদাদ’ বলা হয়। ইহদাদের অন্তর্ভুক্ত হল সাজসজ্জা, সুগন্ধি, অলংকার ইত্যাদি পরিহার করা। তাই স্বামী মারা যাওয়ার পর বিধবা নারীর জন্য নাকফুল, গহনা, মেকআপ বা সৌন্দর্যবর্ধক সাজে থাকা শরী‘আতসম্মত নয়; বরং তা পরিত্যাগ করাই সুন্নাহ ও শরী‘আতের নির্দেশ। রাসূল (ﷺ) বলেছেন,
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ فَإِنَّهَا تُحِدُّ عَلَيْهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا.
‘যে নারী আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য কোন মৃত ব্যক্তির ওপর তিন দিনের বেশি শোক পালন বৈধ নয়; তবে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১২৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮৬)। উম্মু আতিয়্যা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘আমাদেরকে নিষেধ করা হত যেন আমরা স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দতের সময় সুগন্ধি ব্যবহার না করি, রঙিন কাপড় না পরি, অলংকার না পরি এবং সাজসজ্জা না করি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩৮)।
নাকফুল যেহেতু অলংকারের অন্তর্ভুক্ত, তাই ইদ্দতের সময় তা পরে সাজসজ্জা করা বৈধ নয়। সঊদী আরবের প্রখ্যাত আলেম বলেছেন, ‘বিধবা নারীর জন্য ইদ্দতের সময় সব ধরনের অলংকার, যেমন কানের দুল, নেকলেস, বালা, নাকফুল ইত্যাদি বর্জন করা ওয়াজিব। কারণ এগুলো সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম। ইদ্দতের উদ্দেশ্য হল, স্বামীর মৃত্যুর শোক প্রকাশ, বৈবাহিক সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা এবং শরী‘আতের নির্দেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবন বায, ২০/৪৩৭-৪৩৮ পৃ.)। বিধবা নারীর জন্য ইদ্দতের সময় এমন সব কিছু বর্জন করা যরূরী, যা সাধারণত সৌন্দর্য ও আকর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে অলংকার, সুগন্ধি, মেহেদি, সাজসজ্জা এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারী পোশাক অন্তর্ভুক্ত (ফাতওয়া নূরুন আলাদ র্দাব, ২১/২১৬ পৃ.)। অতএব, বয়স্ক হোক বা যুবতী, স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দতের সময় বিধবা নারীর জন্য নাকফুল পরে সাজসজ্জা করে থাকা শরী‘আতসম্মত নয়।
প্রশ্ন (২৫) : একটি হিমাগারে অগ্রিম ভাড়া দিয়েছি ৬,০০,০০০ টাকা। আলু সংরক্ষণ করলে ডেলিভারি নেয়ার সময় ভাড়া দিতে হবে না। আর যদি আলু সংরক্ষণ না করি তাহলে ৮ মাস পরে আমাকে ৮,০০,০০০ টাকা ফেরত দিবে। আলু সংরক্ষণ না করে ৮,০০,০০০ টাকা ফেরত নেয়া বৈধ হবে কি?
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, নয়নপুর, দিনাজপুর সদর।
উত্তর : ইসলামী শরী‘আতে ঋণ বা অগ্রিম অর্থের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কুরআন ও সুন্নাহতে ‘রিবা’ বা সূদকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ ذَرُوۡا مَا بَقِیَ مِنَ الرِّبٰۤوا ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূদখোর, সূদদাতা, সূদ লেখক ও সাক্ষীদ্বয় সকলের উপর লা‘নত করেছেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮)।
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় গুদাম কর্তৃপক্ষকে ৬,০০,০০০ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে। যদি আলু সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে ঐ অর্থ ভাড়ার মধ্যে সমন্বয় হবে। কিন্তু যদি সংরক্ষণ না করা হয়, তাহলে ৮ মাস পরে ৮,০০,০০০ টাকা ফেরত দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন পণ্য বা সেবা গ্রহণ ছাড়াই ৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত সময় পরে ৮ লক্ষ টাকা নেয়া হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা মূলত সময়ের বিনিময়ে লাভ, যা শরী‘আতের দৃষ্টিতে ‘রিবা’ বা সূদের অন্তর্ভুক্ত। ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল- كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا ‘যে ঋণ কোন উপকার টেনে আনে, তা সূদ’। এখানে ৬ লক্ষ টাকা মূলত আমানত বা ঋণের মত ব্যবহৃত হচ্ছে, আর তার বিপরীতে অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা শর্তসাপেক্ষে প্রদান করা হচ্ছে। তাই এটি বৈধ ব্যবসায়িক লাভ নয়; বরং সূদভিত্তিক লেনদেনের সাদৃশ্য বহন করে। সঊদী আরবের শায়খগণও এ ধরনের লেনদেনকে হারাম বলেছেন। ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘যে ঋণের মধ্যে ঋণদাতার জন্য অতিরিক্ত সুবিধার শর্ত থাকে, তা জায়েয নয়। কারণ আলেমগণের ঐকমত্য হল- ঋণের বিনিময়ে শর্তযুক্ত উপকার গ্রহণ রিবা (সূদ)’। তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক ঋণ, যা কোন লাভ বা সুবিধা টেনে আনে, তা সূদের অন্তর্ভুক্ত। যদি তা শর্তযুক্ত বা পূর্বসম্মতও হয়’ (ফাতওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/৪২৬-৪২৭ পৃ.)। মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ঋণ মূলত সহযোগিতা ও দয়ার চুক্তি। তাই এটিকে লাভ ও ব্যবসার মাধ্যমে পরিণত করা জায়েয নয়। এজন্য আলেমদের নিকট প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল- ‘প্রত্যেক ঋণ, যা কোন উপকার বয়ে আনে, তা রিবা’। তিনি উদাহরণ দিয়ে আরও বলেন, ‘যদি কেউ কাউকে ঋণ দেয় এবং শর্ত করে যে সে তার বাড়িতে থাকবে বা কোন সুবিধা নেবে, তাহলে তা হারাম; কারণ ঋণদাতা ঋণের মাধ্যমে লাভ গ্রহণ করছে’ (ফাতওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/৪২২-৪২৩; আশ-শারহুল মুমতি’, ৪/৬৪ পৃ.)। তবে যদি গুদাম কর্তৃপক্ষ ৬ লক্ষ টাকা নিরাপত্তা জামানত হিসাবে নেয় এবং আলু সংরক্ষণ না করলে ঠিক একই ৬ লক্ষ টাকা ফেরত দেয়, তাহলে তা বৈধ হবে। কারণ সেখানে অতিরিক্ত কোন আর্থিক সুবিধা নেই। আবার যদি আলু সংরক্ষণ করা হয় এবং সেই অর্থ ভাড়ার সমন্বয়ে ব্যবহৃত হয়, তাহলেও তা জায়েয হতে পারে; কারণ তা সেবার বিনিময়। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِيْنِهِ وَعِرْضِهِ ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৯)।
প্রশ্ন (২৬) : কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানে সারা বছর যে উন্নয়ন হয় তার জন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত ২.৫০% টাকা ঠিকাদার ঐ প্রতিষ্ঠানের সিও বরাবর জমা করে। তারপর সিও উক্ত টাকা তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিউটির উপর বিবেচনায় করে বেসিকের ১৫%, ২০% ৩০% এভাবে দিয়ে থাকেন (বিশেষ সুবিধা)। এই টাকা মসজিদের ইমাম সহ আরও ২/৩ জন নেয় না। প্রশ্ন হল- এই টাকা গ্রহণ করা যাবে কি?
-মীযানুর রহমান ভুঁইয়া।
উত্তর : ইসলামী শরী‘আতে কোন অর্থ হালাল হওয়ার জন্য মূলনীতি হল, তা বৈধ উৎস থেকে অর্জিত হতে হবে এবং গ্রহণের ক্ষেত্রে শরী‘আতের কোন নিষেধাজ্ঞা থাকবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কর না’ (সূরা আন-নিসা: ২৯)। রাসূল (ﷺ) বলেন, إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا ‘নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫)। উল্লেখিত ক্ষেত্রে যদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত ২.৫০% অর্থ বৈধ নিয়মে বরাদ্দ করে এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান (সিও) সরকারী নীতিমালার আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত সুবিধা বা ইনসেনটিভ হিসাবে বণ্টন করেন, তাহলে মূলত এ অর্থ গ্রহণ করা বৈধ হবে; কারণ এটি চাকরির অংশ হিসাবে প্রদত্ত অনুমোদিত ভাতা বা সুবিধা হিসাবে গণ্য হবে। কর্মচারী তার দায়িত্ব পালন করার কারণে এই অর্থ পাচ্ছে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে বৈধ চাকরির বিনিময়ে প্রাপ্ত বেতন, ভাতা বা ইনসেনটিভ হালাল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اَنۡ لَّیۡسَ لِلۡاِنۡسَانِ اِلَّا مَا سَعٰی ‘মানুষ তাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে’ (সূরা আন-নাজম : ৩৯)।
এখানে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যেমন: প্রথমতঃ এই অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারী আইন বা নীতিমালা লঙ্ঘন করা যাবে না। যদি সিও নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায়ভাবে কাউকে বেশি বা কম দেন, ঘুষ, পক্ষপাত বা আত্মসাৎ করেন, তাহলে সেই অতিরিক্ত বা অবৈধ অংশ গ্রহণ করা জায়েয হবে না। দ্বিতীয়তঃ যদি এ অর্থ মূলত উন্নয়ন খাতে ব্যয় করার জন্য নির্ধারিত হয়, কিন্তু বেআইনিভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয় এবং আইনগতভাবে তা অনুমোদিত না হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা বৈধ হবে না। কারণ এটি সরকারী আমানতের খিয়ানত হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُوْلٌ ‘আমি যাকে কোন কাজের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়ে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দিয়েছি, এরপর সে অতিরিক্ত যা গ্রহণ করে তা হল খিয়ানত’ (আবূ দাঊদ, হা/২৯৪৩)। এ কারণে অনেকেই সতর্কতার জন্য এ ধরনের অর্থ গ্রহণ করেন না। বিশেষত যখন তাদের কাছে বিষয়টি পুরোপুরি স্বচ্ছ নয় বা সন্দেহজনক মনে হয়। এটি তাক্বওয়া ও পরহেযগারিতার অন্তর্ভুক্ত। তবে কেউ না নিলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায় না। রাসূল (ﷺ) বলেন, دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ ‘যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে দাও, আর যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ কর’ (তিরমিযী, হা/২৫১৮)। সুতরাং সারকথা হল, যদি উক্ত অর্থ সরকারী নীতিমালার অধীনে বৈধভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা হিসাবে প্রদান করা হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয। আর যদি তা উন্নয়ন খাতের অর্থ আত্মসাৎ করে বা বেআইনিভাবে ভাগ-বণ্টন করা হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা হারাম হবে।
প্রশ্ন (২৭) : কুরবানী করার জন্য কি নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত? পশু যব্হে না করে কুরবানীর উদ্দেশ্যে টাকা বিতরণ করলে বৈধ হবে কি?
-তৌহীদুল ইসলাম, আরব আমিরাত।
উত্তর : ইসলামে কুরবানী একটি মহান ইবাদত ও আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّکَ وَ انۡحَرۡ ‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর’ (সূরা আল-কাউছার : ২)। তিনি আরও বলেন, لَنۡ یَّنَالَ اللّٰہَ لُحُوۡمُہَا وَ لَا دِمَآؤُہَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُہُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া’ (সূরা আল-হজ্জ : ৩৭)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ وَجَدَ سَعَةً وَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে’ (ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৩)। এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। সঊদী আরবের অনেক আলেম ও স্থায়ী ফাতাওয়া বোর্ডও বলেছেন যে, কুরবানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। (কুরবানী) সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য সুন্নাতে মুয়াক্কাদা; নবী (ﷺ) নিজে কুরবানী করেছেন এবং মুসলিমদের উৎসাহিত করেছেন’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ১১/৪২৩ পৃ.)। ‘যার সামর্থ্য আছে, তার জন্য কুরবানী করা শরী‘আসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। পরিবারপ্রধান একজনের কুরবানী পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৮/৩৬ পৃ.)। ‘কুরবানী আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম বড় ইবাদত; সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য তা ত্যাগ করা উচিত নয়’ (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৭/৪২২ পৃ.)।
টাকা দিয়ে কুরবানী করলে তা জায়েয হবে কি? যদি ‘টাকা দিয়ে কুরবানী’ বলতে বোঝানো হয় যে, কেউ নিজের পক্ষ থেকে অন্য কাউকে অর্থ দিয়ে পশু কিনে যব্হ করতে দায়িত্ব দিল, তাহলে এটি সম্পূর্ণ জায়েয। কারণ ইসলামে ওয়াকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ বৈধ। অনেক মানুষ বর্তমানে বিভিন্ন ইসলামিক সংস্থা বা বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে কুরবানী করিয়ে থাকেন। এতে কোন সমস্যা নেই, যদি শরী‘আতসম্মতভাবে নির্ধারিত সময়ে পশু যব্হ করা হয়। কিন্তু যদি ‘পশু যব্হ না করে শুধু টাকা গরীবকে দান করে দেয়া’ বোঝানো হয়, তাহলে তা কুরবানীর বিকল্প হবে না। কারণ কুরবানী একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যার মূল উদ্দেশ্য পশু যব্হ করা। শুধু টাকা ছাদাক্বাহ করলে ছাদাক্বাহ ছাওয়াব হবে, কিন্তু কুরবানীর ছাওয়াব আদায় হবে না। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুরবানীর স্থলে পশুর মূল্য ছাদাক্বাহ করলে কুরবানী আদায় হবে না; কারণ উদ্দেশ্য হল রক্ত প্রবাহিত করা (যব্হ করা)’ (আল-মাজমূ‘, ৮/৪২৫ পৃ.)। ‘কুরবানীর পরিবর্তে টাকা দান করা যথেষ্ট নয়। কারণ কুরবানী একটি নির্দিষ্ট ইবাদত, যা পশু যব্হ ছাড়া আদায় হয় না’ (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান, ১/৪৩৩ পৃ.)।
প্রশ্ন (২৮) : শরী‘আতের আইন মোতাবেক পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ে যতটুকু অংশ প্রাপ্য তা কি বিয়ের ৮/১০ বছর পরে বাবা-মা জীবিত থাকতে নিতে পারবে? আর যদি পিতা-মাতা না দিতে চায়, তাহলে কি তারা গুনাহগার হবে?
-মীজানুর রহমান ভূঁইয়া, মোমেনশাহী সেনানিবাস।
উত্তর : ইসলামী শরী‘আতে পিতা-মাতার সম্পদের মালিকানা তাঁদের জীবদ্দশায় তাঁদের হাতেই থাকে। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, পিতা-মাতা জীবিত থাকা অবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মীরাছের অধিকারী হবে না। কুরআনে যে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান এসেছে, তা কার্যকর হয় মৃত্যুর পর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یُوۡصِیۡکُمُ اللّٰہُ فِیۡۤ اَوۡلَادِکُمۡ ٭ لِلذَّکَرِ مِثۡلُ حَظِّ الۡاُنۡثَیَیۡنِ ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন-একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার অংশের সমান’ (সূরা আন-নিসা : ১১)। এই আয়াতে এবং পরবর্তী আয়াতগুলোতে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান বর্ণিত হয়েছে, যা মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ পিতা-মাতা জীবিত থাকলে মেয়ে তার নির্ধারিত মীরাছ ‘দাবি’ করে নিতে পারবে না; কারণ তখনো সে মীরাছের মালিক হয়নি। পিতা-মাতা চাইলে জীবদ্দশায় সন্তানদেরকে হাদিয়া বা উপহার দিতে পারেন, আবার নাও দিতে পারেন। তবে যদি কাউকে দেন, তাহলে ন্যায়বিচার বজায় রাখা যরূরী। হাদীছে এসেছে, নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে একটি দান দিতে চাইলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এ রকম দান দিয়েছ? তিনি বললেন, না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় কর এবং সন্তানদের মধ্যে সুবিচার কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৩)। জীবদ্দশায় সম্পদের মালিক ব্যক্তি নিজ সম্পদের পূর্ণ অধিকারী। তাঁর মৃত্যুর আগে কেউ মীরাছ দাবি করতে পারে না। কিন্তু যদি তিনি সন্তানদের কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে সব সম্পদ একদিকে দিয়ে দেন, তাহলে তা যুল্মের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবন বায, খণ্ড ২০)। উত্তরাধিকার কেবল মৃত্যুর পর সাব্যস্ত হয়। জীবিত অবস্থায় সন্তানদের কারো ‘আমার মীরাছের অংশ এখনই চাই’ বলা শরী‘আতের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তবে পিতা-মাতা যদি কোন সন্তানকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করতে চান, বা কারো প্রতি যুল্ম করেন, তাহলে তা গুনাহ হবে’ (আশ-শারহুল মুমতি‘, (মীরাছ) খণ্ড ১১)।
অতএব, কোনো মেয়ে বিয়ের ৮/১০ বছর পর হলেও পিতা-মাতা জীবিত থাকতে শরী‘আত অনুযায়ী ‘মীরাছ’ হিসাবে অংশ দাবি করতে পারবে না। কারণ মীরাছ তখনো ওয়াজিব হয়নি। তবে সে ভদ্রভাবে প্রয়োজনের কথা বলতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে, বা পিতা-মাতার কাছে ন্যায্য আচরণ আশা করতে পারে। কিন্তু যদি পিতা-মাতা মৃত্যুর আগে কৌশলে শুধু ছেলেদের নামে সব সম্পত্তি লিখে দেন, আর মেয়েদেরকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে এটি হারাম, যুল্ম ও বড় গুনাহ। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে নির্ধারিত হক্ব নষ্ট করা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন উত্তরাধিকারীর অধিকার নষ্ট করে, আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতে তার অধিকার নষ্ট করবেন’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৭০৩)। তাই পিতা-মাতার উচিত, মৃত্যুর পর শরী‘আত অনুযায়ী মেয়েদের নির্ধারিত অংশ অবশ্যই দিতে অছিয়ত করা এবং জীবদ্দশায়ও সন্তানদের সাথে ইনছাফপূর্ণ আচরণ করা। মেয়েদের হক্ব মেরে খাওয়া, সমাজের রেওয়াজের কারণে বঞ্চিত করা, বা ‘মেয়ে তো বিয়ে হয়ে গেছে’ বলে সম্পদ না দেয়া ইসলামে বৈধ নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
لِلرِّجَالِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا تَرَکَ الۡوَالِدٰنِ وَ الۡاَقۡرَبُوۡنَ ۪ وَ لِلنِّسَآءِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا تَرَکَ الۡوَالِدٰنِ وَ الۡاَقۡرَبُوۡنَ مِمَّا قَلَّ مِنۡہُ اَوۡ کَثُرَ ؕ نَصِیۡبًا مَّفۡرُوۡضًا.
‘পুরুষদের জন্য রয়েছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশ, আর নারীদের জন্যও রয়েছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশÑ তা অল্প হোক বা বেশি; এটি নির্ধারিত অংশ’ (সূরা আন-নিসা : ৭)। সুতরাং পিতা-মাতা জীবিত থাকলে মেয়ের মীরাছের অংশ কার্যকর হয় না; তাই সে জোরপূর্বক তা নিতে পারবে না। তবে মৃত্যুর পর তার নির্ধারিত অংশ না দিলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বঞ্চিত করলে তা স্পষ্ট গুনাহ, যুল্ম এবং আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিরোধিতা হবে।
প্রশ্ন (২৯) : কতিপয় আলেম থাকেন যে, প্রসিদ্ধ ৪ ইমামদের মধ্যে ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যতীত বাকী ৩ জন ইমাম আহলেহাদীছ ছিলেন। আর ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন আহলুর রায়। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক?
-মোস্তফা মনোয়ার, হারাগাছ, রংপুর।
উত্তর : ইসলামী ফিকহ ও হাদীছশাস্ত্রের ইতিহাসে ‘আহলুল হাদীছ’ ও ‘আহলুর রায়’ এ দু’টি পরিভাষা বহু প্রাচীন। তবে বর্তমান যুগে অনেক সময় এ পরিভাষাগুলোকে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কিছু লোক দাবি করে থাকে যে, প্রসিদ্ধ চার ইমামের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন ‘আহলুর রায়’, আর ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ (রাহিমাহুমুল্লাহ) ছিলেন ‘আহলুল হাদীছ’। এ বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও, যেভাবে তা উপস্থাপন করা হয়, তা বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।
প্রথমতঃ বুঝতে হবে, ‘আহলুল হাদীছ’ ও ‘আহলুর রায়’ কোন আকীদাগত দল বা ভিন্ন দ্বীন ছিল না। বরং ফিকহী ইজতিহাদের দু’টি শাখা ছিল। ‘আহলুল হাদীছ’ বলতে মূলত হিজায অঞ্চলের আলেমদের বোঝানো হত, যারা সরাসরি হাদীছ ও আছারের উপর অধিক নির্ভর করতেন। আর ‘আহলুর রায়’ বলতে কুফার আলেমদের বোঝানো হত, যারা কুরআন-হাদীছের পাশাপাশি ক্বিয়াস, ইজতিহাদ ও রায়ের ব্যবহার বেশি করতেন। এর কারণ ছিল পরিবেশগত। কুফায় জাল হাদীছের প্রচলন বেশি ছিল এবং ছহীহ হাদীছের সংখ্যা তুলনামূলক কম পৌঁছত। তাই সেখানে আলেমরা হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন এবং বহু ক্ষেত্রে ক্বিয়াসের আশ্রয় নিতেন। পক্ষান্তরে মদীনায় হাদীছের প্রাচুর্য ছিল। ইবনু খালদূন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ফিক্বহশাস্ত্রের আলেমরা দুই দলে বিভক্ত ছিলেন। একদল ছিল আহলুর রায় ও ক্বিয়াস, তারা ছিল ইরাকবাসী। তাদের ইমাম ছিলেন আবূ হানিফা। আরেকদল ছিল আহলুল হাদীছ, তারা ছিল হিজাযবাসী। তাদের ইমাম ছিলেন মালিক ও শাফিঈ’ (আল-মুকাদ্দিমাহ, ইবনে খালদূন, ১/৪৪৬ পৃ.)। এখানে লক্ষনীয়, ইবনে খালদূন কোথাও বলেননি যে, ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছ মানতেন না, কিংবা তিনি আহলুস সুন্নাহ থেকে ভিন্ন ছিলেন। বরং ‘আহলুর রায়’ বলা হয়েছে তার ফিকহী পদ্ধতির কারণে। বাস্তবে চার ইমামই ছিলেন কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী। তারা প্রত্যেকেই বলেছেন, ছহীহ হাদীছ পাওয়া গেলে সেটাই তাদের মাযহাব।
ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যখন কোন হাদীছ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে ছহীহ প্রমাণিত হবে, তখন সেটাই আমার মাযহাব’ (ইবনু আবিদীন, রসমুল মুফতি, পৃ. ২৯)। তিনি আরো বলেন, ‘কারো জন্য বৈধ নয় যে, সে আমার কথা গ্রহণ করবে, যতক্ষণ না জানবে আমি কোথা থেকে তা গ্রহণ করেছি’ (আল-ইন্তিকা, ইবনু আবদিল বার্র, পৃ. ১৪৫)। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি মানুষ মাত্র। আমার কথা কখনো সঠিক হয়, কখনো ভুল হয়। অতএব আমার মতামত যাচাই কর। যা কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূল হবে তা গ্রহণ কর, আর যা বিরোধী হবে তা বর্জন কর’ (জামেঊ বায়ানিল ইলম, ২/৩২)। ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি তোমরা আমার কথার বিপরীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছহীহ হাদীছ পাও, তাহলে হাদীছ অনুযায়ী আমল কর এবং আমার কথা ছেড়ে দাও’ (আল-মাজমূ’, নববী, ১/৬৩ পৃ.)। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তুমি আমার তাক্বলীদ করো না, মালিকেরও না, শাফিঈরও না, আওযায়ীরও না; বরং তারা যেখান থেকে গ্রহণ করেছেন, সেখান থেকেই গ্রহণ কর’ (ইলামুল মুওয়াক্কিঈন, ২/৩০২ পৃ.)।
অতএব চার ইমামের সকলেই কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। কারো সাথে ‘আহলুল হাদীছ তথা হাদীছপন্থী’ এবং কারো সাথে ‘আহলুর রায় তথা রায়পন্থী’ শব্দ ব্যবহার করে এমন ধারণা দেয়া ঠিক নয় যে, একজন হাদীছ অনুসরণ করতেন আর অন্যরা করতেন না। তবে এটাও সত্য যে, ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ক্বিয়াস ও ইজতিহাদের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি করতেন। এজন্য তাকে ‘ইমামু আহলির রায়’ বলা হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি দুর্বল হাদীছের উপর রায়কে অগ্রাধিকার দিতেন। বরং তিনি ছহীহ হাদীছকে সর্বদা প্রাধান্য দিতেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি আবু হানীফার চেয়ে বেশি হাদীছ অনুসরণকারী কাউকে দেখিনি’ (তারীখ বাগদাদ, ১৩/৩৫১ পৃ.)। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা ছিলেন ইলম, ফিকহ, ইবাদত ও সতর্কতার ইমাম’ (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৬/৩৯০ পৃ.)। চার ইমামই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহর ইমাম ছিলেন। বরং তারা যুগ, পরিবেশ ও প্রাপ্ত দলীল অনুযায়ী ইজতিহাদ করেছেন। তারা ছিলেন যুগের বড় বড় মুজতাহিদ।
প্রশ্ন (৩০) : আমার একটি সাইকেল চুরি হয়ে গিয়েছিল। পরে আমি জানতে পারি, কে সেটি চুরি করেছে। আমি তার কাছে আমার সাইকেল ফেরত চাইলে সে আমাকে আরেকটি সাইকেল দেয়। কিন্তু আমি জানি, সেই সাইকেলটিও চুরি করা। তবে এর প্রকৃত মালিক কে, তা আমি জানি না। এ অবস্থায় ঐ সাইকেলটি গ্রহণ করার বিধান কী?
-সেলিম, মাদারীপুর।
উত্তর : আপনি যেহেতু জানেন যে, চোর আপনার সাইকেলের পরিবর্তে যে সাইকেলটি আপনাকে দিয়েছে, সেটিও চুরি করা সম্পদ, তাই আপনার জন্য সেটি গ্রহণ করা বৈধ নয়। যদি আপনি তা গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি সেই গুনাহে অংশীদার হয়ে যাবেন। আবু র্হুরা আর-রাক্কাশী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, أَلَا تَظْلِمُوْا أَلَا لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيْبِ نَفْسٍ مِّنْهُ ‘সাবধান! কেউ কারো প্রতি যুল্ম করবে না। সাবধান! কারো মাল তার মনের সন্তোষ ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়’ (শু‘আবুল ঈমান, হা/৫৪৯২; দারাকুৎনী, হা/২৯২৩, সনদ ছহীহ)। সুতরাং এমতাবস্থায় যদি আপনি সেই সাইকেলের প্রকৃত মালিককে চিনতে পারেন, তাহলে সাইকেলটি তাঁর কাছেই ফিরিয়ে দিন। চোরের কাছে ফেরত দেবেন না। আর যদি মালিককে চিনতে না পারেন, তাহলে চুরি যাওয়া মালামাল সংরক্ষণ ও উদ্ধার করে এমন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিন, যাতে প্রকৃত মালিক তা ফিরে পেতে পারেন। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-মাজমূ‘’ গ্রন্থে বলেন, ‘কেউ যদি কোন বস্তু অবৈধ (ফাসিদ) ক্রয়ের মাধ্যমে অর্জন করে, তারপর তা অন্য কারো কাছে বিক্রি করে, তবে তার দৃষ্টান্ত হল- যেমন কোন দখলদার জবরদখলকৃত সম্পদ বিক্রি করেছে। এরপর যদি দ্বিতীয় ব্যক্তির হাতে বস্তুটি আসে এবং সে প্রকৃত অবস্থা জানতে পারে, তাহলে তার ওপর ওয়াজিব হল সেটি প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া। প্রথম ক্রেতার কাছে তা ফিরিয়ে দেয়া বৈধ নয়’ (আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ৯/৩৭২ পৃ.)। অতএব আপনার চুরি হওয়া সাইকেলটি যদি এখনও বিদ্যমান থাকে, তাহলে চোরের কাছে সেটিই দাবি করুন। আর যদি সে সেটি নষ্ট করে ফেলে, বিক্রি করে দেয় বা ফেরত দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সাইকেলের সমমূল্য (ক্ষতিপূরণ) তার কাছ থেকে দাবি করবেন (বিস্তারিত দ্র.: ইসলাম ওয়েব, ফৎওয়া নং-৫৩৪৩০১)।