উত্তর : এটি আল্লাহপ্রদত্ত নির্দেশ এবং শাসনের একটি মৌলিক দাবি, বরং রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও স্থায়িত্বের প্রধান ভিত্তি। ন্যায়বিচার হারিয়ে গেলে রাষ্ট্রের আর কোন অর্থ থাকে না। আর যদি শাসক নিজেই অত্যাচারী হয়ে ওঠে, তবে তার শাসনের সমাপ্তি ঘোষণা করাই যথাযথ। ‘বিচারে ন্যায়পরায়ণতা এবং বণ্টনে সমতা-এসবই সেই মৌলিক নীতিগুলোর অন্তর্ভুক্ত, যার উপর প্রাথমিক ইসলামী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা অবতীর্ণ দ্বীনের শিক্ষার প্রতিফলন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বহু আয়াতে এই নীতিকে জোরালোভাবে নিশ্চিত করেছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার করতে বিরত না রাখে; ন্যায়বিচার করো, এটিই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮; আল-হুর্রিয়্যাতু আও আত্ব-তূফান, পৃ. ৭৪)। আরও বলা হয়েছে, ‘শরী‘আত সামগ্রিকভাবে ও সার্বিকভাবে প্রত্যেক কল্যাণ, ন্যায় ও মঙ্গলের নির্দেশ দেয় এবং প্রত্যেক অনাচার, যুল্ম ও অকল্যাণ থেকে নিষেধ করে। অতএব যে কোন নীতি বা রাজনীতি যদি এই দিকেই অগ্রসর হয়, তবে তা শারঈ রাজনীতি, আর যে কোন পদক্ষেপ যদি এই পরিসরে পড়ে, তবে তা শারঈ কাজ হিসাবে গণ্য হবে’ (মাক্বাছিদুল মাক্বাছিদি, পৃ. ১৩৪)।
উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিচারসংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো যুগে যুগে অনুসরণীয় সংবিধানের মত বিবেচিত হয়েছে। তাঁর আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, ‘তোমার চেহারায়, বসার আসনে ও বিচারে মানুষের মধ্যে সমতা বজায় রাখবে; যেন দুর্বল ব্যক্তি তোমার ন্যায়বিচার থেকে নিরাশ না হয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি তোমার পক্ষপাতের আশায় লোভী না হয়। দাবি উপস্থাপনকারীর উপর প্রমাণের দায়িত্ব এবং অস্বীকারকারীর উপর শপথ। মুসলিমদের মধ্যে আপস বৈধ- তবে এমন আপস নয় যা হারামকে হালাল করে বা হালালকে হারাম করে। গতকাল তুমি যে রায় দিয়েছিলে, পরে যদি তা পুনর্বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাও, তবে সত্যে ফিরে আসতে দ্বিধা করবে না; কারণ সত্য প্রাচীন (চিরস্থায়ী) মুসলিমরা পরস্পরের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষ্যদাতা- তবে সে ব্যক্তি ব্যতীত যে শরী‘আতী শাস্তি প্রাপ্ত, মিথ্যা সাক্ষ্যে অভ্যস্ত বা পক্ষপাতদুষ্ট। মানুষের কারণে অস্থিরতা, বিরক্তি বা বিরূপ আচরণ থেকে বিরত থাকবে; কারণ ন্যায়ের স্থানে সঠিক আচরণ আল্লাহর নিকট প্রতিদান ও সঞ্চিত সওয়াবের কারণ (দারাকুতনী, আস-সুনান, উমারের চিঠি আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট, হা/৪৪৭১)।
আলী ইবনে আবী তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর বসরার গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে লিখেছিলেন, ‘আমি তোমাকে মহান আল্লাহর তাক্বওয়ার উপদেশ দিচ্ছি এবং যাদের উপর আল্লাহ তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমার চেহারা, জ্ঞান ও ফয়সালার মাধ্যমে মানুষের জন্য প্রশস্ত হও (অর্থাৎ সদাচরণ ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে তাদের জন্য সহজ ও অনুকূল হও)’ (ইবনে কুতাইবা আদ-দীনাওয়ারী, আল-ইমামাহ ওয়াস-সিয়াসাহ, ৫/৭৯ পৃ.)। সে যুগের বিচারব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও প্রভাবমুক্ত। বিচারকার্যে হস্তক্ষেপ বা পক্ষপাতের সুযোগ ছিল না। বাদী ও বিবাদী- উভয়েই আইনের দৃষ্টিতে সমান ছিলেন, এমনকি খলীফা ও গভর্নররাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না, সকলেই আইনের চোখে সমান ছিলেন। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, আলী ইবনে আবী তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর একটি বর্ম নিয়ে এক আহলে যিম্মির সঙ্গে বিরোধে জড়ান। তিনি বিষয়টি তাঁর নিযুক্ত কাযী শুরাইহ আল-কাদি-এর কাছে উপস্থাপন করেন। কাযী শুরাইহ রায় দেন সেই যিম্মির পক্ষে (সুয়ূত্বী, তারীখুল খুলাফা, পৃ. ১৪২)।
খুলাফায়ে রাশিদীন তাদের কথা ও কাজে এই ভিত্তির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। জনগণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত খুতবায় তারা এই মূলনীতির উপর জোর দিয়েছেন এবং তাদের নিয়োজিত শাসনকর্তাদেরও এর প্রতি বাধ্য করেছেন। সকল মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতা স্পষ্ট ছিল। তারা এমন গভর্নর (ওয়ালী) নির্বাচন করতেন, যারা সৎ চরিত্র ও উত্তম আচরণের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তারা শাসকদের অন্যায়ভাবে মানুষের উপর কর্তৃত্ব ফলাতে দিতেন না, বরং তাদের তদারকি করতেন এবং সীমালঙ্ঘন করলে জবাবদিহির আওতায় আনতেন। তাওউস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘তোমরা বল তো, যদি আমি তোমাদের উপর এমন একজনকে নিয়োগ করি যাকে আমি সর্বোত্তম জানি, তারপর তাকে ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিই, তাহলে কি আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? লোকেরা বলল, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, ‘না, যতক্ষণ না আমি তার কাজ পর্যবেক্ষণ করি- সে আমার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছে কি না’ (বাইহাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, ‘ন্যায়পরায়ণ ইমামের ফযীলাত ও শাসকদের যুলম প্রসঙ্গে’, হা/৭৩৯৫)।
এছাড়া উছমান ইবনে আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর গভর্নরদেরকে জনগণের প্রতি ন্যায়বিচার করতে এবং তাদের প্রাপ্য হক্ব আদায় করে দিতে ও তাদের উপর অযথা যুলুম না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তার কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে প্রথম যে পত্র লিখেছিলেন, তাতে বলেন, ‘সর্বোত্তম ন্যায়নিষ্ঠ নীতি হল- তোমরা মুসলিমদের ব্যাপারে লক্ষ্য রাখবে; তাদের প্রাপ্য হক্ব তাদের দেবে এবং তাদের উপর যা কর্তব্য, তা আদায় করবে’ (তাবারী, তারীখুল উমাম, ২/৫৯০ পৃ.)। আবূ বকর ছিদ্দীক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আহলে কিতাবদের প্রতি সংযম প্রদর্শনের নির্দেশ দেন এবং তাঁর সেনাপতি যায়িদ ইবনে ছাবিতকে (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কিছু উপদেশ দেন, যার মধ্যে ছিল, ‘তোমরা এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে যারা নিজেদেরকে উপাসনালয়ে নিবেদিত করেছে, তাদের এবং তারা যে কাজে নিবেদিত হয়েছে, তা ছেড়ে দিও’ (তাবারী, তারীখুল উমাম, ৩/২২৭ পৃ.)। আর উছমান ইবনে আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদের প্রতি যুল্ম ও অবিচার থেকে সতর্ক করে বলেন, ওয়াদা পূর্ণ করো, ওয়াদা পূর্ণ করো। ইয়াতীম ও চুক্তিবদ্ধদের উপর যুল্ম করো না; কারণ আল্লাহ তাদের প্রতি যুল্মকারীর বিরুদ্ধে নিজেই প্রতিপক্ষ (তাবারী, তারীখুল উমাম, ২/৫৯১ পৃ.)।
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এক আনছারী ছাহাবীকে একটি অঞ্চলের কোন দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি হীরা নগরের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি- আব্দুল মাসীহ ইবনে বাক্বিলা-এর আতিথ্যে অবতরণ করেন। গৃহস্বামী তাঁর জন্য খাবার-দাবারের যে ব্যবস্থা চাওয়া হয়েছিল, তা উদারভাবে পরিবেশন করেন। কিন্তু সেই আমীল (কর্মকর্তা) হালকা রসিকতা করতে গিয়ে তাকে কিছুক্ষণ আটকে রাখেন এবং ডেকে এনে তার দাড়িতে হাত বুলিয়ে দেন (অর্থাৎ অপমানজনক আচরণ করেন)। তখন সে ব্যক্তি উমার ইবনে খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আমি কিসরা ও কায়সারের দরবারেও কাজ করেছি, কিন্তু তাদের শাসনামলেও আপনার শাসনের মত এমন আচরণের শিকার হইনি’। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘কী ঘটনা’? সে বলল, আপনার অমুক কর্মচারী আমার অতিথি হয়েছিল। আমরা তার জন্য তার চাওয়া অনুযায়ী খাবার ও পানীয় পরিবেশন করেছি। তারপর সে আমাকে ডেকে এনে আমার দাড়িতে হাত বুলিয়েছে’। তখন উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সেই কর্মচারীকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, এই যে! সে কি তোমার জন্য চাওয়া অনুযায়ী খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করেনি? তারপর তুমি তার দাড়িতে হাত দিলে? আল্লাহর কসম! যদি এটা কোন প্রচলিত রীতি (বা ক্বিসাসের বিধান) না হত, তবে আমি তোমার দাড়ির একটি লোমও অবশিষ্ট রাখতাম না- সব উপড়ে ফেলতাম। কিন্তু যাও, আল্লাহর কসম! তুমি আর কখনো আমার পক্ষ থেকে কোন দায়িত্ব পাবে না’ (ইবনে শাব্বাহ, তারীখুল মাদীনাহ, ৩/৮১৩ পৃ.)। এছাড়া আলী ইবনে আবী তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মাকিল ইবনে ইয়াসারকে বনু নাজিয়ার বিরুদ্ধে প্রেরণের সময় উপদেশ দেন, ‘ক্বিবলামুখী (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করো না এবং আহলে যিম্মার উপর যুল্ম করো না’ (তাবারী, তারীখুল উমাম, ৩/১৪৩; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৩/২৩৮ পৃ.)।
প্রশ্নকারী : ইমরান, সাতক্ষীরা।