উত্তর : ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নবী (ﷺ)-এর আদর্শের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
(১) নবুয়ত লাভের আগে চাচা আবূ তালেবের সাথে নবী (ﷺ) ব্যবসায়িক কাজ করেছেন। এছাড়া খাদিজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ব্যবসাও করেছেন। ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামে সফর করেছেন। অধিকন্তু তিনি হাট-বাজারেও ব্যবসা করতেন; যেমন: মিজান্না, উকায। এগুলো ছিল জাহেলী যুগের কিছু বাজার। ব্যবসায়ীরা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য এই বাজারগুলোতে যেত।
(২) নবী (ﷺ) নিজে সরাসরি বিক্রি করতেন। যেমনটি উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উট ও জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উটের ক্ষেত্রে ঘটেছে। কিংবা কখনো তার কোন এক ছাহাবীকে এই দায়িত্ব দিতেন। যেমন তিনি উরওয়া ইবনে আবিল জা‘দ আল-বারেক্বীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বারেক্বী বলেন, নবী (ﷺ) তাকে এক দীনার দেন যেন সে এটি দিয়ে একটি কুরবানীর পশু কিংবা (বলেছেন) একটি বকরি কিনে আনেন। সে দু’টি বকরি কিনেছে। তারপর এক দীনারের বিনিময়ে একটি বকরি বিক্রি করে দেয়। তারপর একটি বকরি ও এক দীনার নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে আসে। তখন তিনি তার জন্য ব্যবসায় বরকত লাভের দু‘আ করেন। এরপর থেকে সে মাটি কিনলেও তাতে লাভ করতেন (তিরমিযী, হা/১২৫৮; আবূ দাঊদ, হা/৩৩৮৪; ইবনে মাজাহ, হা/২৪০২, সনদ ছহীহ)।
(৩) রাসূল (ﷺ) ব্যবসায়ীদেরকে সদাচরণ, সত্যবাদিতা ও দানশীলতার নির্দেশ দিতেন। হাকীম ইবনু হিযাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন,
اَلْبَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا بُوْرِكَ لَهُمَا فِيْ بَيْعِهِمَا وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا
‘ক্রেতা-বিক্রেতা একে অপর হতে আলাদা না হওয়া পর্যন্ত উভয়ের জন্য (ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার) স্বাধীনতা থাকে। যদি তারা সত্য বলে, পণ্যের দোষ-ত্রুটি খোলাখুলিভাবে বলে তবে তাদের এই লেনদেনে বরকত দেয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা দোষ-ত্রুটি গোপন করে ও মিথ্যাকথা বলে তখন তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত তুলে নেয়া হয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৩২)। ইসমাঈল ইবনে উবাইদ ইবনে রিফা‘আ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি নবী (ﷺ)-এর সাথে ছালাতের স্থানের উদ্দেশ্যে বের হন। পথিমধ্যে দেখতে পান যে, লোকজন ক্রয়-বিক্রয় করছে। তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়’! তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ডাকে সাড়া দিয়ে গলা ও চোখ তুলে তাকাল। তিনি বললেন, ‘ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন পাপিষ্ঠ অবস্থায় উত্থিত হবে। কেবল সেই ব্যবসায়ী ছাড়া যে আল্লাহকে ভয় করে, সৎ থাকে ও সত্য বলে’ (তিরমিযী, হা/১২১০; ইবনু মাজাহ, হা/২১৪৬; সনদ ছহীহ, ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭৮৫)। কাইস ইবনে আবী গারাযা বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বলতেন, يَا مَعْشَرَ التُّجَّارِ إِنَّ الْبَيْعَ يَحْضُرُهُ الْحَلِفُ وَاللَّغْوُ فَشُوبُوهُ بِالصَّدَقَةِ ‘হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়! ক্রয়-বিক্রয়ে শপথ ও অনর্থক কথা হয়ে যায়। তাই তোমরা এর সাথে দান-সদকার মিশ্রণ করো (ত্রুটিমুক্ত করো’ (তিরমিযী, হা/১২০৮; আবূ দাঊদ, হা/৩৩২৬; নাসাঈ, হা/৩৭৯৭; ইবনু মাজাহ, হা/২১৪৫, সনদ ছহীহ)।
(৪) রাসূল (ﷺ) ক্রয়-বিক্রয়ে উদারতা ও সহজতার নির্দেশ দিতেন। জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি দয়া করুন যে ব্যক্তি বিক্রয়কালে উদারচিত্ত, ক্রয়কালেও উদারচিত্ত এবং পাওনা আদায়ের তাগাদায়ও উদারচিত্ত’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৭০)। ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উক্ত হাদীছে লেনদেনে উদার হওয়া, উত্তম ব্যবহার করা ও ঝগড়াঝাটি পরিহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং পাওনা আদায় করা ও মানুষের কাছ অতিরিক্ত গ্রহণ করার জন্য চাপাচাপি পরিহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে’ (ফাৎহুল বারী, ৪/৩০৭ পৃ.)। নবী (ﷺ)-এর উদারতার কিছু নমুনা:
(ক) ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমরা এক সফরে নবী (ﷺ)-এর সাথে ছিলাম। আমি (আমার পিতা) উমারের একটি অবাধ্য জওয়ান উটের উপর সওয়ার ছিলাম। উটটি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সকলের আগে আগে চলে যাচ্ছিল। উমার তাকে তাড়িয়ে ফিরিয়ে আনছিলেন। তখন নবী (ﷺ) উমারকে বললেন, ‘এটি আমার কাছে বিক্রি করে দাও’। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এটি আপনারই। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘তুমি এটি আমার কাছে বিক্রি কর’। তখন তিনি সেটি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কাছে বিক্রি করে দিলেন। নবী (ﷺ) বললেন, ‘হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার! এটি তোমার, তুমি এটি দিয়ে যা খুশি তা করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৬১০)।
(খ) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, তিনি একটা উটের পিঠে সফর করছিলেন। উটটি ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। তখন তিনি উটটিকে ছেড়ে দিতে চাইলেন। তিনি বলেন, তখন নবী (ﷺ) আমার কাছে এসে আমার জন্য দু‘আ করলেন এবং উটটিকে প্রহার করলেন। এরপর থেকে উটটি এমন গতিতে চলতে লাগল যেভাবে ইতঃপূর্বে চলেনি। তারপর নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, ‘তুমি উটটি এক উকিয়াহর বিনিময়ে আমার কাছে বিক্রি করে দাও’। আমি বললাম, না। অতঃপর দ্বিতীয়বার তিনি বললেন, ‘এটা আমার কাছে বিক্রি করে দাও’। ফলে আমি উটটি তাঁর কাছে এক উকিয়াহ মূল্যে বিক্রি করে দিলাম এবং বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত উটের পিঠে চড়ে যাবার শর্ত করলাম। যখন বাড়ি পৌঁছালাম তখন উটটি নিয়ে তাঁর কাছে এলাম। তখন তিনি সেটির মূল্য নগদে পরিশোধ করে দিলেন। অতঃপর আমি ফিরে আসছিলাম। এমন সময় তিনি আমার পেছনে লোক পাঠালেন এবং আমাকে বললেন, ‘তুমি কি মনে করছ যে, আমি তোমার উটটি কম মূল্য দিয়ে নিতে চাচ্ছি, তুমি তোমার উট ও দিরহামগুলো নিয়ে যাও। এ (সবই) তোমার জন্য’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৫)।
(৫) তিনি অধিকারীর অধিকার উত্তমরূপে পরিশোধ করতেন এবং এভাবে পরিশোধ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ)-এর কাছে কোন এক ব্যক্তির একটি বিশেষ বয়সের উট পাওনা ছিল। সে পাওয়ার জন্য আসলে তিনি ছাহাবীদের বললেন, ‘তার পাওনা দিয়ে দাও’। তারা সে উটের সমবয়সী উট অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন। কিন্তু পেলেন না। কিন্তু এর থেকে বেশী বয়সের উট পেলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, ‘সেটাই দিয়ে দাও’। তখন লোকটি বলল, ‘আপনি আমার প্রাপ্য পুরোপুরি আদায় করেছেন; আল্লাহ আপনাকেও পুরোপুরি প্রতিদান দিন’। নবী (ﷺ) বললেন, ‘যে পরিশোধ করার বেলায় উদার সেই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি’ (ছহীহ বুখারী, হা/২১৮২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬০১)।
(৬) যে ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়ের পর আফসোস করে তার ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার প্রতি নবী (ﷺ) উৎসাহ দিতেন। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, مَنْ أَقَالَ مُسْلِمًا أَقَالَهُ اللهُ عَثْرَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে চুক্তি বাতিল করার সুযোগ দিবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দিবেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৪৬০; ইবনু মাজাহ, হা/২১৯৯, সনদ ছহীহ)। চুক্তিভঙ্গ করতে দেয়া মানে: উদার হওয়া, ক্রয়-বিক্রয় থেকে রুজু করা। এটি বড় মনের পরিচায়ক। ‘ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ভঙ্গের উদাহরণ হচ্ছে: যদি কোন ব্যক্তি অন্য কারো থেকে কোন কিছু ক্রয় করার পর আফসোস করে; এতে ঠকে যাওয়া প্রকাশ হওয়া কিংবা তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া কিংবা তার কাছে পয়সা না থাকার কারণে; তারপর সে পণ্যটি বিক্রেতার কাছে ফেরত দেয়, আর বিক্রেতা তার ফিরিয়ে দেয়া পণ্য গ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঐ বিক্রেতার ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দিবেন ও তার কষ্ট দূর করে দিবেন। কারণ সে ক্রেতার প্রতি দয়া করেছে, যেহেতু বিক্রয় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ক্রেতার জন্য তা বাতিল করা সম্ভব ছিল না’ (‘আউনুল মা‘বূদ, ৯/২৩৭ পৃ.)।
(৭) রাসূল (ﷺ) ক্রয় করার সময় দর-দাম করতেন। তবে মানুষের পণ্যের মূল্য কম দিতেন না। যেমনটি ইতঃপূর্বে জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উটের হাদীছে আমরা দেখেছি। সুয়াইদ ইবনু কাইস বলেন: আমি ও মাখরামা আল-আব্দী ‘হাজার’ নামক স্থান থেকে কিছু কাপড় মক্কায় আমদানী করলাম। নবী (ﷺ) আমাদের কাছে এসে কিছু পায়জামা দামাদামি করলেন এবং আমরা তার কাছে পায়জামা বিক্রি করলাম (তিরমিযী, হা/১৩০৫; আবূ দাঊদ, হা/৩৩৩৬; নাসাঈ, হা/৪৫৯২; ইবনু মাজাহ, হা/২২২, সনদ হাসান ছহীহ)।
(৮) নবী (ﷺ) ওজনে কিছুটা বেশি দেয়ার নির্দেশ দিতেন। সুয়াইদ ইবনে কাইস থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (ﷺ) এক ব্যক্তিকে ওজন করতে দেখে তাকে বললেন, ‘ওজন করো এবং একটু বেশি দাও’ (তিরমিযী, হা/১৩০৫; আবূ দাঊদ, হা/৩৩৩৬; নাসাঈ, হা/৪৫৯২; ইবনু মাজাহ, হা/২২২, সনদ হাসান ছহীহ)।
(৯) নবী (ﷺ) অর্থকষ্টে থাকা ব্যক্তিকে সময় দেয়া এবং তার থেকে পাওনা মাফ করে দেয়ার নির্দেশ দিতেন। আবুল ইউসর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِراً أَوْ وَضَعَ عَنْهُ أَظَلَّهُ اللهُ فِيْ ظِلِّهِ ‘যে ব্যক্তি অর্থকষ্টে থাকা ব্যক্তিকে সময় দিবে বা পাওনা মাফ করে দিবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করবেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৬)।
(১০) রাসূল (ﷺ) সূদী লেনদেন, প্রতারণাপূর্ণ বিক্রি, ঈনা (কোন বস্তু বাকিতে বিক্রি করার পর পুনরায় ক্রেতার কাছ থেকে নগদে কম মূল্যে ক্রয় করা) পদ্ধতিতে বিক্রি, হারাম বস্তু দিয়ে ব্যবসা করা, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা করতে নিষেধ করেছেন। এর পক্ষে প্রমাণ অগণিত ও প্রসিদ্ধ। আমাদের কাছে রাসূল (ﷺ)-এর জীবনের সকল ব্যবসায়িক লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ নেই। কারণ তিনি ব্যবসা করতেন জাহেলী যুগে। তখন তিনি নবী ছিলেন না যে তার কার্যক্রম ছাহাবীদের মাধ্যমে বর্ণিত হবে। তবে তার সুন্নাহ হিসাবে যা বর্ণিত হয়েছে সেটাই যথেষ্ট।
প্রশ্নকারী : ছালাহউদ্দীন, গাইবান্ধা।