উত্তর : এটি ক্বিয়ামতের একেবারে পূর্বমুহূর্তে ঘটবে। দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের পূর্বের ঘটনা নয়। প্রকৃতপক্ষে আখেরী যামানায় মুসলিমদের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, অত্যাচার ও উৎপীড়ন থেকে মুক্ত করতে এই উম্মাতের মধ্যে ইমাম মাহদী নামে একজন সৎ মানুষ আগমন করবেন। মাক্বামে ইবরাহীম এবং রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী স্থানে মুসলিমগণ তাঁর হাতে বাই‘আত করবে। তাঁকে হত্যা করার জন্য সিরিয়া থেকে একদল সৈন্য প্রেরণ করা হবে। সৈন্যদলটি যখন মক্কার পথে ‘বায়দা’ নামক স্থানে পৌঁছবে তখন ভূমিধ্বসে সকল সৈন্যকে ধ্বংস করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইমাম মাহদীকে এভাবেই শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবেন। তিনি মুসলিমদের খলীফা হয়ে শরী‘আতের মাধ্যমে বিচার-ফায়সালা করবেন। তাঁর যামানায় মুসলিমদের মাঝে চরম সুখ-শান্তি বিরাজ করবে। নবী (ﷺ) বলেন, ‘আখেরী যামানায় আমার উম্মতের মধ্যে ইমাম মাহদীর আগমন ঘটবে। তাঁর শাসনামলে আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে, ভূপৃষ্ঠ প্রচুর ফসল উৎপন্ন করবে, তিনি মানুষের মাঝে সমানভাবে প্রচুর সম্পদ বিতরণ করবেন, গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর সম্মান বৃদ্ধি পাবে। তিনি সাত বছর কিংবা আট বছর জীবিত থাকবেন (মুস্তাদরাকুল হাকিম, হা/৮৬৭৩; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৭১১)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমার বংশ থেকেই মাহদী আবির্ভূত হবে। সে হবে প্রশস্ত ললাট ও উন্নত নাকবিশিষ্ট। পৃথিবী হতে যুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন দূরীভূত করে সমপরিমাণ ন্যায়বিচার ও ইনছাফ দ্বারা তা পরিপূর্ণ করে দিবেন। সাত বছর পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করবেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৪২৮৫; সনদ হাসান, ছহীহুল জামি‘, হা/৬৭৩৬; মিশকাত, হা/৫৩৮২)। মূলত মুসলিমদের এই সুখ-শান্তি বিনষ্ট করার জন্যই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে।
বড় আলামাতগুলোর মধ্যে প্রথম হল দাজ্জালের আগমন। ইমাম মাহদীর আগমনের কিছু কাল পরেই দাজ্জালের আগমন ঘটবে এবং তারও কিছু কাল পরে তাকে হত্যা করার জন্য ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন ঘটবে। অন্তত কিছুটা সময় হলেও তারা তিনজন একইসাথে পৃথিবীতে অবস্থান করবে। সুতরাং বলা যায় যে, ইমাম মাহদী না আসা পর্যন্ত দাজ্জাল আসবে না। আর দাজ্জাল না আসা পর্যন্ত ঈসা (আলাইহিস সালাম) আসবেন না। একদিন ইমাম মাহদী দামেস্কের মসজিদে ফজরের ছালাতের সময় ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ করবেন। প্রথমে তিনি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে ছালাতের ইমামতি করার অনুরোধ জানাবেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলে স্বয়ং ইমাম মাহদী ইমামতি করবেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) ইমাম মাহদীর পিছনে মুক্তাদী হিসাবে ছালাত আদায় করবেন। অতঃপর তিনি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে যোগ দিয়ে দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বের হবেন এবং দাজ্জালকে হত্যার কাজে ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে সহায়তা করবেন (আহমাদ হা/১৪৯৯৭, সনদ ছহীহ, আলবানী, ক্বিছ্ছাতুল মাসীহিদ দাজ্জাল, পৃ. ৭৩)। অতঃপর তিনি সাত বছর মতান্তরে নয় বছর পৃথিবীতে বসবাস করবেন। অতঃপর তাঁর মৃত্যু হবে। তাদের অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক বিস্তারিত ও বিশুদ্ধ হাদীছ হচ্ছে নাওয়াস ইবনে সাম‘আন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছটি। সেখানে বলা হয়েছে,
ঈসা (আলাইহিস সালাম) দাজ্জালকে বাবে ‘লুদ’ নামক স্থানে হত্যা করবেন। ..অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) ঐ সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) তাদের কাছে গিয়ে তাদের মুখমণ্ডলে হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে অবগত করবেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি এ মর্মে অহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটাতে যাচ্ছি, যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা কারোই নেই। অতএব আপনি আমার মুমিন বান্দাদেরকে সমবেত করে তুর পাহাড়ে চলে যান (সে মতে তিনি তাই করবেন)। তখন আল্লাহ তা‘আলা ইয়া’জূজ-মা’জূজের রাস্তা উন্মুক্ত করে দেবেন। তারা মুক্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং তারা প্রত্যেক উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে। তাদের প্রথম দলটি ‘তাবারিয়্যা’ উপসাগরের (ভূমধ্যসাগর) উপকূল দিয়ে অতিক্রমকালে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। অতঃপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, ‘এ সমুদ্রে কোন কালে পানি ছিল কি?’ তারা আল্লাহর নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সাথীদেরকে তূর পর্বতে অবরোধ করে রাখবে। খাদ্যসামগ্রীর ঘাটতির ফলে তাদের নিকট একটি গরুর মস্তক বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ’ দীনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান বিবেচিত হবে। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তার সঙ্গীগণ কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা ইয়া’জূজ-মা’জূজ সম্প্রদায়ের প্রতি মহামারী স্বরূপ ‘নাগাফ’ নামক এক প্রকারের পোকা পাঠাবেন। যা তাদের ঘাড়ে অবস্থান করবে। এতে তারা সকলেই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সাথীগণ পাহাড় হতে যমীনে অবতরণ করবেন। কিন্তু তাঁরা এক বিঘত জায়গাও এমন পাবেন না যেখানে তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ‘ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সাথীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা উটের ঘাড়ের মত লম্বা বিরাটাকার এক ধরনের পাখি প্রেরণ করবেন। তারা তাদের লাশগুলোকে ঠোঁটে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন এক স্থানে ফেলে আসবে।
অতঃপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে ভূপৃষ্ঠ বিধৌত হয়ে কাঁচের মত স্বচ্ছ উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় ভূপৃষ্ঠকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে ভূপৃষ্ঠ! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন কর এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একটি ডালিম একদল লোকের আহারের জন্য যথেষ্ট হবে এবং এর বাকলের নিচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে এতই বারাকাত প্রদান করা হবে যে, দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভী একটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে এবং দুগ্ধবতী একটি বকরী এক দাদার সন্তানদের (একটি পরিবারের) জন্য যথেষ্ট হবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত আরামদায়ক ও মনোরম একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন-মুসলিমের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭ ‘কিতাবুল ফিতান’; তিরমিযী, হা/২২৪০)।
প্রশ্নকারী : বাবু, মাদারীপুর।