উত্তর : ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, أمَّا خاتَمُ الفِضَّةِ فيُباحُ باتِّفاقِ الْأَئِمَّةِ ‘আলিমদের সর্বসম্মতিক্রমে রৌপ্যের আংটি পরিধান করা জায়েয’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ, ২৫/৬৩ পৃ.)। ইবনু আব্দিল বার্র (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وأمَّا اتِّخاذُ خاتَمِ الوَرِقِ للرجالِ والنِّساءِ، فمُجتمَعٌ على إجازتِه ‘নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই রৌপ্যের আংটি পরিধান করা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন’ (আত-তামহীদ, ১৭/৯৯ পৃ.)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, يجوزُ للرجُلِ خاتَمُ الفِضَّة بالإجماعِ ‘আলিমদের সর্বসম্মতিক্রমে পুরুষের জন্য রৌপ্যের আংটি পরিধান করা বৈধ’ (আল-মাজমূঊ, ৪/৪৪৪ পৃ.)। অনুরূপভাবে ইমাম ইবনে হায্ম, কাযী আয়ায ও ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুমুল্লাহ) একই কথা বলেছেন (মারাতিবুল ইজমা,‘ পৃ. ১৫০; ইকমালুল মুয়াল্লিম, ৬/৬০৬; তাফসীরে কুরতুবী, ১০/৮৭ পৃ.)।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) একটি স্বর্ণের আংটি পরিধান করেন। আংটিটির মোহর হাতের তালুর ভিতরের দিকে ঘুরিয়ে রাখেন। তাতে তিনি ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ খোদাই করেছিলেন। লোকেরাও এ রকম আংটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। যখন তিনি দেখলেন যে, তারাও ঐ রকম আংটি ব্যবহার করছে, তখন তিনি তা ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং বলেন, আমি আর কখনও স্বর্ণের আংটি ব্যবহার করব না। অতঃপর তিনি একটি রূপার আংটি ব্যবহার করেন। লোকেরাও রূপার আংটি পরা শুরু করে। ইবনে ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (ﷺ)-এর পরে আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু), তারপর ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও তারপর ‘উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তা ব্যবহার করেছেন। শেষে ‘উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাত থেকে আংটিটি ‘আরীস’ নামক কূপের মধ্যে পড়ে যায়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৬৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২০৯১)।
আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর নবী (ﷺ) অনারব একটি দলের কাছে বা কিছু লোকের কাছে পত্র লিখতে চাইলেন। তখন তাঁকে বলা হল যে, তারা এমন কোন পত্র গ্রহণ করে না, যার উপর মোহরাঙ্কিত থাকে না। তখন নবী (ﷺ) রৌপ্যের একটি আংটি তৈরি করেন। তাতে অঙ্কিত ছিল ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। বর্ণনাকারী আনাস বলেন, আমি যেন এখনও নবী (ﷺ)-এর আঙ্গুলে বা তাঁর হাতে সে আংটির ঔজ্জ্বল্য প্রত্যক্ষ করছি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৭২; ছহীহ মুসলিম, হা/২০৯২)। উপরিউক্ত হাদীছের আলোকে শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আংটি পরিধান করা এমন একটি সুন্নাত যা প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নবী (ﷺ) রাষ্ট্রীয় শাসক হিসাবে একটি সিলমোহরের প্রয়োজন অনুভব করেন, ফলে তিনি স্ট্যাম্প স্বরূপ একটি আংটি গ্রহণ করেন। তাই অনুরূপ প্রয়োজন ব্যতীত আংটি ব্যবহার করা অনুচিত (ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব, ১১/১৯৮ পৃ.)।
রৌপ্য ব্যতীত লৌহ বা অন্যান্য ধাতুর আংটি পরিধান করার ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, لا بأس مِن لُبسِ الخاتَمِ مِن الحديدِ للرجُلِ والمرأة ‘নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই লৌহের আংটি পরিধান করা দোষণীয় নয়’ (ফাতাওয়া নূর আলাদ্-দারব লি ইবনি বায, ৭/২৮৯; আল-ইফহাম ফী শারহি ‘ঊমদাতুল আহকাম, পৃ. ৬৩২)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলিমগণ বলেন, অধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী লৌহের আংটি পরিধান করা অপসন্দনীয় নয়। তবে রৌপ্যের আংটি পরিধান করাই সর্বাধিক উত্তম। কেননা নবী (ﷺ)-এর আংটি রূপার ছিল, যা বুখারী-মুসলিমের হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২৪/৬৪ পৃ.)।
শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘লোহার আংটি পরিধান করার ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, কেউ জায়েয বলেছেন আবার কেউ নাজায়েয বলেছেন। তবে নবী (ﷺ)-এর ঐ হাদীছ, যেখানে জনৈক ছাহাবী একজন মহিলাকে বিবাহের ইচ্ছা পোষণ করলেন, নবী (ﷺ) তাঁকে বললেন, اذْهَبْ فَالْتَمِسْ وَلَوْ خَاتَمًا مِنْ حَدِيدٍ ‘যাও, অন্বেষণ কর, দেখো কোন কিছু পাও কিনা? যদি একটি লোহার আংটিও পাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫১২১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪২৫)। এ হাদীছ প্রমাণ করে যে, লৌহের আংটি পরিধান করা জায়েয। তবে এত্থেকে বেঁচে থাকায় উত্তম। কেননা মতপার্থক্য থেকে দূরে থাকায় আদর্শ মুসলিমের বৈশিষ্ট্য (ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব, ১১/৫৭ পৃ.)। উল্লেখ্য, পুরুষের জন্য স্বর্ণ বা স্বর্ণের আংটি পরিধান করা হারাম। আলী ইবনে আবী ত্বালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, একদা আল্লাহর নবী (ﷺ) ডান হাতে রেশম ও বাম হাতে স্বর্ণ নিয়ে বললেন, ‘এ দু’টি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৫৭; নাসাঈ, হা/৫১৪৪; ইবনু মাজাহ, হা/৩৫৯৫)।
দ্বিতীয়তঃ ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মুসলিমরা এ বিষয়ে ঐকমত্য যে, পুরুষের জন্য কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আংটি পরিধান করাই সুন্নাত সম্মত। আর মহিলারা পঞ্চমাঙ্গুলির মধ্যে যেটাই ইচ্ছা পরিধান করতে পারে’ (শারহুন নববী, ১৪/৭১ পৃ.)। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) একটি আংটি তৈরি করেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি একটি আংটি তৈরি করেছি এবং তাতে একটি নকশা করেছি। সুতরাং কেউ যেন নিজের আংটিতে নকশা না করে। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি যেন তাঁর কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আংটিটির ঔজ্জ্বল্য এখনো প্রত্যক্ষ করছি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৭৪)। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর আংটি ছিল এই আঙ্গুলে- এ কথা বলে তিনি তাঁর বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলের দিকে ইঙ্গিত করেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২০৯৫)। পুরুষের জন্য মধ্যমা ও তর্জনী বা শাহাদাত আঙ্গুলে আংটি পরিধান করা নিষিদ্ধ। আবূ বুরদাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, রাসূল (ﷺ) আমাকে নিষেধ করেছেন, আমি যেন আমার এ আঙ্গুল অথবা এ আঙ্গুলে আংটি পরিধান না করি। এ বলে তিনি তাঁর মধ্যমা ও তর্জনী আঙ্গুলের দিকে ইশারা করলেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২০৯৫)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আংটি পরিধান করার দিক দিয়ে পঞ্চমাঙ্গুলি তিনভাগে বিভক্ত। যথা: (১) কনিষ্ঠা অঙ্গুলিতে আংটি পরিধান করা উত্তম। (২) তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলে আংটি পরিধান করা নিষিদ্ধ। (৩) অনামিকা ও বৃদ্ধাঙ্গুলিতে আংটি পরিধান করা জায়েয (শারহুল মুমতি‘, ৬/১০৯ পৃ.)।
শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, রাসূল (ﷺ) থেকে প্রমাণিত যে, তিনি কখনো কখনো ডান হাতে আংটি পরিধান করতেন আবার কখনো কখনো বাম হাতে পরতেন’ (ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব, ১১/১৮৫-১৮৭ পৃ.)। ইমাম নববী, ইবনু আব্দিল বার্র ও হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুমুল্লাহ) একই মতামত ব্যক্ত করেছেন (শারহুন নববী, ১৪/৭৩; আত-তামহীদ, ৬/৮০-৮১; ফাৎহুল বারী, ১০/৩২৭ পৃ.)। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘নবী (ﷺ) তাঁর ডান হাতে আংটি পরতেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৪২২৬)। নাফি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর বাম হাতে আংটি পরতেন (আবূ দাঊদ, হা/৪২২৮)। লোকেরা আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে রাসূল (ﷺ)-এর আংটি (বা সিল-মোহর) সম্পর্কে জানার জন্য জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি যেন রাসূল (ﷺ)-এর রৌপ্য নির্মিত আংটির চাকচিক্য বা উজ্জ্বলতা এখনও দেখতে পাচ্ছি। এ কথা বলে আনাস তার বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলি উঠিয়ে ইশারা করলেন (অর্থাৎ এর দ্বারা তিনি বুঝাতে চাইলেন যে, আংটিটি রাসূল (ﷺ)-এর ঐ আঙ্গুলেই পরিহিত ছিল (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪০, ১৩২৪; ছহীহ বুখারী, হা/৫৭২)।
তৃতীয়তঃ আপনার এলাকায় পুরুষদের মধ্যে যদি একাধিক রূপার আংটি পরা প্রচলিত থাকে, তবে এতে কোন দোষ নেই- তবে এক্ষেত্রে দু’টি শর্ত রয়েছে। যথা: (১) এটি যেন অপচয় ও অহংকারে রূপ না নেয়। (২) এতে যেন নারীদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়, যদি হয় তবে নিষিদ্ধ। কিন্তু যদি আপনার এলাকায় প্রচলিত রীতি ভিন্ন হয়, তবে সেটির বিরোধিতা করা যাবে না। ফক্বীহগণ বলেন, ‘আদত, অভ্যাস, স্বভাব ও রীতিকে গুরুত্ব দেয়ার মূল ভিত্তি হল- ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) -এর এ উক্তি, ‘মুসলিমরা যেটিকে ভালো মনে করে, সেটিই আল্লাহর নিকট ভালো। ফিক্বহের মূলনীতি ও কাওয়াইদ সম্পর্কিত কিতাবগুলোতেও প্রমাণ আছে যে, আদত শরী‘আতে গ্রহণযোগ্য। যেমন তারা বলে থাকে, ‘আদত শরী‘আতের বিধান নির্ধারণে প্রযোজ্য’। তবে শর্ত হল- তা যেন ধারাবাহিক বা প্রচলিত হয়। খুব কমই এমন ফিক্বহের কোন শাখা আছে যেখানে আদতের প্রভাব নেই’ (আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, ২৯/২১৬ পৃ.)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘যদি কেউ নিজের জন্য একাধিক আংটি বা একাধিক বেল্ট ইত্যাদি রাখে, তবে প্রচলিত রীতি থেকে বের না হলে সঠিক অভিমত হল- যে তা বৈধ’ (কাশশাফুল ক্বিনা‘, ২/২৩৮ পৃ.)।
সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, পুরুষদের জন্য রূপার আংটি পরা জায়েয, এতে কোন অসুবিধা নেই এবং এটি নারীদের অনুকরণও নয়। তবে যদি কোন নির্দিষ্ট ধরন বা সংখ্যায় পরা হয়, যা কোন স্থানের বা সময়ের রীতি-বিরুদ্ধ বা নারীদের অনুকরণ হিসাবে গণ্য হয়, তবে সেক্ষেত্রে তা বৈধ হবে না (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২০৪৪৯২)।
প্রশ্নকারী : মুহাম্মাদ মনিরুল ইসলাম, উত্তর পটুয়া পাড়া, নাটোর।