উত্তর : ছাহাবী গাছ নামে কোন গাছের অস্তিত্ব নেই। এটা মিডিয়ার মিথ্যাচার। এগুলোর পিছনে সময় নষ্ট করা মুমিনের কাজ নয়, এটা বিদ‘আতীদের কাজ। তাছাড়া নবী করীম (ﷺ) বিশ্রাম নিলে তার নাম হবে নববী গাছ, ছাহাবী গাছ হল কিভাবে? ‘ইসলাম ওয়েব’-এর আলেমগণ বলেন,
فلم نقف على شيء يثبت صحة هذه الصورة المنتشرة على مواقع الإنترنت للشجرة
‘আমরা এমন কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র বা তথ্য পাইনি, যার মাধ্যমে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া গাছের সত্যতা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়’ (ইসলাম ওয়েব, প্রশ্ন নং-২০০২৫৩, তারিখ- ১২/০৩/২০২৩)।
প্রথমতঃ ১২ বছর বয়সে চাচা আবূ ত্বালীবের সাথে ব্যবসা সূত্রে নবী (ﷺ)-এর সর্বপ্রথম সিরিয়ার বুসরা শহরে গমন করা এবং সেখানে বাহীরা নামক রাহীব বা খ্রিষ্টান পাদ্রীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছের বিশুদ্ধতা নিয়ে বিদ্বানদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এ সম্পর্কে বর্ণিত প্রসিদ্ধ বর্ণনাটি হল,
আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘কিছু প্রবীণ কুরাইশসহ আবূ ত্বালীব ব্যবসার উদ্দেশে সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হলে নবী (ﷺ)ও তার সাথে রওয়ানা হন। তারা বাহীরা নামক পাদ্রীর নিকট পৌঁছে তাদের নিজেদের সওয়ারী থেকে মালপত্র নামাতে থাকেন, তখন উক্ত পাদ্রী গীর্জা থেকে বেরিয়ে তাদের নিকটে এলেন। অথচ এ কাফিলার আগে অনেক কাফিলা এখান দিয়ে চলাচল করেছে কিন্তু তিনি কখনও তাদের নিকট গীর্জা থেকে বেরিয়ে আসেননি বা তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি। রাবী বলেন, লোকেরা তাদের বাহন থেকে সামানপত্র নামাতে ব্যস্ত থাকাবস্থায় উক্ত পাদ্রী তাদের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং রাসূল (ﷺ)-এর হাত ধরে বললেন, ইনিই বিশ্ববাসীর নেতা, ইনি প্রতিপালকের রাসূল এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে রাহমাতুল্লিল আলামীন করে পাঠাবেন। তখন কুরাইশদের বৃদ্ধ লোকেরা তাকে প্রশ্ন করে বললেন, আপনি কী করে জানলেন? তিনি বলেন, যখন তোমরা এ উপত্যকা হতে নামছিলে, তখন আমি লক্ষ্য করেছি যে, প্রতিটি গাছ ও পাথর সিজদায় লুটিয়ে পড়ছে। এগুলো নবী ব্যতীত অন্য কোন সৃষ্টিকে সিজদা করে না। এতদভিন্ন তার ঘাড়ের নিচে আপেল সদৃশ গোলাকার মোহরে নবুওয়াতের সাহায্যে আমি তাকে চিনেছি। খাদ্যদ্রব্যসহ যখন তাদের নিকটে এলেন, তখন রাসূল (ﷺ) উটের পাল চরাতে গিয়েছিলেন। পাদ্রী বলেন, তোমরা তাকে ডেকে আনার ব্যবস্থা কর। অতএব রাসূল (ﷺ) ফিরে এলেন, তখন একখণ্ড মেঘ তার উপর ছায়া বিস্তার করেছিল এবং কাফিলার লোকেরা যারা তার পূর্বেই এসেছিল তাদেরকে তিনি গাছের ছায়ায় বসা অবস্থায় পেলেন। তিনি বসলে গাছের ছায়া তার দিকে ঝুকে পড়ে। পাদ্রি বলেন, তোমরা গাছের ছায়ার দিকে লক্ষ্য কর, ছায়াটি তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রাবী বলেন, ইত্যবসরে পাদ্রী তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদেরকে শপথ দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা তাকে নিয়ে রোম সাম্রাজ্যে যেও না। কেননা রোমীয়রা যদি তাকে দেখে তাহলে তাকে চিহ্নগুলোর দ্বারা সনাক্ত করে ফেলবে এবং তাকে মেরে ফেলবে। এমতাবস্থায় পাদ্রী লক্ষ্য করেন যে, রোমের সাতজন লোক তাদের দিকে আসছে। পাদ্রী তাদের দিকে অগ্রসর হয়ে প্রশ্ন করেন, তোমরা কেন এসেছ? তারা বলল, এ মাসে আখিরী যামানার নবীর আগমন ঘটবে। তাই চলাচলের প্রতিটি রাস্তায় লোক পাঠানো হয়েছে এবং আমাদেরকে আপনাদের পথে পাঠানো হয়েছে।
পাদ্রী রোমীয় নাগরিকদের প্রশ্ন করেন, তোমাদের পেছনে তোমাদের চেয়েও ভাল কোন ব্যক্তি আছে কি? অর্থাৎ কোন পাদ্রী তোমাদেরকে এই নবীর সংবাদ দিয়েছ কি? তারা বলল, আপনার এ রাস্তায়ই আমাদেরকে ঐ নবীর আসার খরব দেয়া হয়েছে। পাদ্রী বলেন, তোমাদের কি মত, আল্লাহ তা‘আলা যদি কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তবে কোন মানুষের পক্ষে তা প্রতিহত করা কি সম্ভব? তারা বলল, না, (অর্থাৎ শেষ যামানার নবীর আগমন ঘটবেই, কোন মানুষ তা ঠেকাতে পারবে না)। রাবী বলেন, অতঃপর তারা তার নিকট আনুগত্যের শপথ করে এবং তার সাহচর্য অবলম্বন করে। তারপর পাদ্রী কুরাইশ কাফিলাকে আল্লাহর নামে শপথ করে প্রশ্ন করেন, তোমাদের মধ্যে কে তার অভিভাবক? লোকেরা বলল, আবূ ত্বালিব। পাদ্রী আবূ ত্বালিবকে অবিরতভাবে আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে তাকে স্বদেশে ফেরত পাঠাতে বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আবূ ত্বালীব নবী (ﷺ)-কে মক্কায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও বিলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে তার সাথে দেন। আর পাদ্রী তাকে পাথেয় হিসাবে কিছু রুটি ও যাইতুনের তৈল দেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীছটি হাসান গারীব। আমরা শুধু উপরিউক্ত সনদসূত্রে এ হাদীছ জেনেছি (তিরমিযী, হা/৩৬২০)।
ইমাম সাদরুদ্দীন আল-মুনাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এখানে আবূ বাকর (রাহিমাহুল্লাহ) ও বিলাল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ঘটনা সন্দেহযুক্ত’ (কাশফুল মানাহিজ ওয়াত তানাক্বীহ, ৫/২২২ পৃ.)। শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, অত্র হাদীছে আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও বিলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে তাঁকে মাক্কায় ফেরৎ পাঠানোর কথা এসেছে, যেটা ‘মুনকার’ (منكر وغير محفوظ), এ ঘটনা ব্যতীত বাকি অংশ ছহীহ (ছহীহ ও যঈফ তিরমিযী, হা/৩৬২০; হিদায়াতুর রুওয়াত, হা/৫৮৬১)। অথচ রাযীন-এর বর্ণনায় এসেছে যে, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর পিতা আবূ ত্বালিব সূত্রে বলেন যে, আমি তাকে একদল লোক সহ মক্কায় ফেরত পাঠাই, যাদের মধ্যে বিলাল ছিল (মিরক্বাত, হা/৫৯১৮-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)। ইমাম সুয়ূত্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সাক্ষীর ভিত্তিতে হাদীছটি ছহীহ পর্যন্ত পৌঁছে যায় (আল-খাছায়িছুল কুবরা, ১/৮৩ পৃ.)। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, (فيه غرابة) হাদীছটির মধ্যে গারাবাহ অর্থাৎ অপরিচিতি ও অস্পষ্টতা রয়েছে (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/২৬৪ পৃ.)। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীছটি অত্যধিক মুনকার, অস্বীকৃত, প্রত্যাখ্যাত, অপরিচিত (তারীখুল ইসলাম, ১/৫০৩-৫০৪; ছহীহ ফিকহুস সীরাহ, দিফা আনিল হাছীসিন নাবাবী, পৃ. ৬২-৭২)। ‘ইসলাম ওয়েব’-এর আলেমগণ বলেন, والحديث صححه بعض أهل العلم وضعفه بعضهم، ‘এবং হাদীছটিকে কিছু আহলে ইলম বা বিদ্বানগণ ছহীহ মনে করেছেন, আবার কিছু বিদ্বান যঈফ মনে করেছেন (ইসলাম ওয়েব, প্রশ্ন নং-৬০৫১৩; সীরাতে ইবনু হিশাম, ১/১৮০-৮৩ পৃ.; মুখতাসারুস সীরাহ, পৃ. ১৬)। আল্লামা সাফীউর রহমান মুবারাকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তিরমিযী ও অন্যান্য বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, বিলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল ভুল। কারণ তখনো বিলালের জন্ম হয়নি। আর জন্ম হয়ে থাকলেও আবূ তালিব আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গে ছিলেন না (যাদুল মা’আদ, ১/১৭ পৃ.)। এজন্য মুবারাকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিশ্ববরেণ্য গ্রন্থ ‘আর-রাহীকুল মাখতূম’-এর মধ্যে এই ঘটনাটি বর্ণনা করার সময় বলেন, ‘কথিত আছে যে, (এ বর্ণনা সূত্র কিছুটা সন্দেহযুক্ত)’।
শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে প্রসিদ্ধ ঘটনাটি ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম ইবনু ইসহাক্ব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দিকে ইঙ্গিত করা হয় এবং বলা হয়, ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম ইবনু ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, ‘নবী (ﷺ) চাচা আবূ তালিবের সঙ্গে ব্যবসায়িক সূত্রে শাম দেশে (সিরিয়া) সফর করেন। সফরের এক পর্যায়ে বসরায় গিয়ে উপস্থিত হন এবং বাহীরা নামক একজন খ্রীষ্টান ধর্মযাজকের (রাহিবের) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন’ (তারীখুল ইসলাম, ১/৫০২ পৃ.)। অথচ স্বয়ং ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) নিজেই ঘটনাটিকে যঈফ বা দুর্বল মনে করেছেন। যেমন তিনি বলেন,
وهو حديث منكر جدا، وأين كان أبو بكر؟ كان ابن عشر سنين، فإنه أصغر من رسول الله صلى الله عليه وسلم بسنتين ونصف؛ وأين كان بلال في هذا الوقت؟ فإن أبا بكر لم يشتره إلا بعد المبعث، ولم يكن ولد بعد؛ وأيضا فإذا كان عليه غمامة تُظِلُّه؛ كيف يتصور أن يميل فيءُ الشجرة؟ لأن ظل الغمامة يُعدم فيء الشجرة التي نزل تحتها، ولم نر النبي صلى الله عليه وسلم ذكّر أبا طالب قط بقول الراهب، ولا تذاكرته قريش، ولا حكته أولئك الأشياخ، مع توفر هممهم ودواعيهم على حكاية مثل ذلك، فلو وقع لاشتُهر بينهم أيما اشتهار، ولبقي عنده صلى الله عليه وسلم حس من النبوة؛ ولما أنكر مجيء الوحي إليه، أوّلًا بغار حراء... " انتهى
‘হাদীছটি অত্যধিক মুন্কার, অস্বীকৃত, প্রত্যাখ্যাত, অপরিচিত। তখন আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কোথায় ছিলেন? তখন তিনি ১০ বছরের ছেলে। কেননা তিনি রাসূল (ﷺ)-এর থেকে বয়সে আড়াই বছরের ছোট ছিলেন। আর এ সময় বিলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কোথায় ছিলেন? আবূ বাকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ক্রয় করে আযাদ করেন। এছাড়াও যখন তাঁর উপর মেঘ ছায়া করেছিল, তখন কিভাবে কল্পনা করা যায় যে, গাছের ছায়া নুয়ে পড়বে? কেননা মেঘের ছায়া গাছের নিচের ছায়াকে বিলীন করে দেয় এবং আমরা এটাও কখনো দেখিনি যে, নবী (ﷺ) চাচা আবূ তালিবকে খ্রীষ্টান পাদ্রীর কথা স্মরণ করিয়েছেন, আর না কুরাইশরা তাঁকে কখনো স্মরণ করিয়েছেন, আর না ঐ সমস্ত শাইখ। যদিও তাদের কাছে এমন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। সুতরাং যদি এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে তিনি অবশ্যই তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে যেতেন এবং নবুওয়াতের একটি অনুভূতি তাঁর কাছে বিদ্যমান থেকে যেত। সেই জন্য যখন হিরা গুহায় প্রথম অহী অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি অস্বীকার করেছিলেন’ (তারীখুল ইসলাম, ১/৫০৩-৫০৪ পৃ.)।
আর যে সমস্ত বিদ্বান এই ঘটনাটিকে ছহীহ মনে করেছেন, তাঁরাও কিন্তু এই ঘটনার কিছু কিছু অংশকে মুনকার (প্রত্যাখ্যাত) মনে করেছেন। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘১২ বছর বয়সে নবী (ﷺ)-কে নিয়ে চাচা আবূ তালিব ব্যবসায়িক সূত্রে শাম দেশে (সিরিয়া) সফর করেছিলেন। কারণ আবূ তালিব নবী (ﷺ)-কে খুবই ভালোবাসতেন এবং তাঁকে মক্কায় রেখে গেলে দেখাশুনা করার কেউ ছিল না। আবূ তালিব এবং তার সাথীরা শাম দেশে যাওয়ার পথে নবী (ﷺ)-এর অনেক নিদর্শন দেখেছিল। ফলস্বরূপ তাঁর প্রতি চাচার আগ্রহ, ভালোবাসা ও আকর্ষণ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। যেমনটি ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘জামি’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। তাঁর উপর মেঘ ছায়া করেছিল, গাছের ছায়া তাঁর জন্য নুয়ে পড়েছিল। তাঁর জন্য বাহীরা নামক রাহিবের ভবিষ্যদ্বাণী এবং তিনি আদেশ করেন তাঁর চাচাকে, যেন তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে আনা হয়, কারণ, যদি ইয়াহুদীরা তাঁকে দেখতে পায়, হতে পারে কিছু অঘটন ঘটিয়ে দেবে। হাদীছটি সত্যি এবং সুরক্ষিত, এতে আরো কিছু বাড়বাড়ন্ত আছে (আল-ফুছূল, পৃ. ৯৩-৯৪)।
সর্বাধিক বাড়াবাড়ি করেছে ‘মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকাল’। ‘হায়াতু মুহাম্মাদ’ নামে তিনি যে গ্রন্থ রচনা করেছেন, আদতে তাতে রাসূল (ﷺ)-এর প্রকৃত আত্মজীবনী ও সত্য ইতিহাস স্থান পায়নি। তিনি এমন এমন ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো সীরাত, আত্মজীবনী ও ইতিহাসের কোন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে বর্ণিত হয়নি। বরং সবটাই লেখকের কল্পনা ও চিন্তা-চেতনা। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল, এই গ্রন্থের মাধ্যমে আরবী সাহিত্যের উৎকৃষ্টতা, ফাসাহাত ও বালাগাত, শব্দের অলঙ্কার ও ভাষার মাধুর্য ফুটিয়ে তোলা এবং একটি সাহিত্যিক শৈলীতে এটি উপস্থাপন করা। তিনি যে প্রাচ্যবিদদের (ঙৎরবহঃধষরংঃ) সন্দেহের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তা এর মধ্যে স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে আহলে কিতাবদের জ্ঞান দ্বারা নবী (ﷺ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বের কিছু নিদর্শন প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। তারা শাম দেশের একটি সাধারণ বাণিজ্যিক সফরকে সম্পূর্ণরূপে একটি বৈজ্ঞানিক সফরে পরিণত করেছে, যেখানে তিনি মরুভূমির আরববাসীদের সাথে বসে তাদের খবরাখবর নেন এবং শাম দেশের লেখকদের সাথে বসে তাদের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন এবং এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মহা অপবাদ।
ইতিহাসবিদ ডক্টর আকরাম যিয়াউল উমরী (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, কিছু কিছু খ্রীষ্টান প্রাচ্যবিদ এই ঘটনাটিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ রূপে উপস্থাপন করেছেন এবং এর মাধ্যমে নবী চরিত্রের উপরে অপবাদ দিতে চেষ্টা করেছেন। তাদের দাবী, নবী (ﷺ) পাদ্রী বাহীরা-র নিকট থেকে তাওরাত শিখেছিলেন। পরবর্তীতে যা থেকে তিনি কুরআন রচনা করেছেন। এটি কী করে সম্ভব! মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি কিভাবে তাওরাত বুঝলেন? আর এতো স্বল্প সময়ে! তিনি বাহীরার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে খাদ্য গ্রহণের সমপরিমাণ সময় ওখানে ছিলেন! এবং তিনি ছিলেন নিরক্ষর, অক্ষরজ্ঞানহীন, লিখতে ও পড়তে পারতেন না। আর সেই সময় তাওরাত বা ইনজীল আরবীতে অনূদিত হয়নি। তাহলে কিভাবে এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে তিনি পাদ্রীর নিকট থেকে তাওরাত শিখলেন, যা হিব্রু ভাষায় লিখিত। কিভাবে তিনি তার অর্থ বুঝলেন? অতঃপর সেগুলো কিভাবে সাক্ষাতের ২৮ বছর পর আরবীতে পরিবর্তন করে ‘কুরআন’ আকারে পেশ করলেন? আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামের স্বচ্ছ, পবিত্র ও অনন্য জ্ঞানকে তাওরাতের দিকে ঝুঁকে দেয়া (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১১০ পৃ., সনদ সহীহ; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৪২৬০৫৭)।
দ্বিতীয়তঃ কথিত আছে যে, নবী (ﷺ) পঁচিশ বছর বয়সে খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর গোলাম মায়সারাকে সাথে নিয়ে আরেকবার ব্যবসায়িক সফরে সিরিয়া গমন করেন। এই পর্যায়ে ইবনু ইসহাক বিনা সনদে উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ায় গিয়ে রাসূল (ﷺ) ‘নাস্তুরা’ নামক একজন পাদ্রীর উপাসনালয়ের পাশে একটি গাছের ছায়ায় অবতরণ করেন। তখন পাদ্রীটি গোলাম মায়সারাকে ডেকে বলেন, এ ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, ইনি হারামের অধিবাসী কুরায়েশ বংশের একজন ব্যক্তি। পাদ্রী বলেন, এই গাছের নিচে নবী ব্যতীত কেউ কখনো অবতরণ করেন না (ইবনু হিশাম ১/১৮৮)। সোস্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে দেখানো হয়ে থাকে যে, ঐ গাছটি না-কি এখনো জীবিত আছে! বলা হয়, এটি সেই বৃক্ষ যার ছায়াতলে নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে নবী (ﷺ) আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন! এবং রবকত প্রাপ্তির জন্য অনেকেই সেখানে যিয়ারত করে! ‘ইসলাম ওয়েব’-এর আলেমগণ বলেন,
فلم نقف على شيء يثبت صحة هذه الصورة المنتشرة على مواقع الإنترنت للشجرة
‘আমরা এমন কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র বা তথ্য পাইনি, যার মাধ্যমে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া গাছের সত্যতা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়’। যে গাছ সম্পর্কে তাদের ধারণা হল- নবী (ﷺ) নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর গোলাম মায়সারার সঙ্গে ব্যবসায়িক সূত্রে সিরিয়া গমনকালে ঐ গাছের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তবে যাই হোক না কেন, যদি কোনভাবে এটি প্রমাণিত হয়ে যায়, তাহলে অবৈধ ও শরী‘আত বিরোধী প্রভাবকে জনসম্মুখে বড় করে তুলে ধরার ক্ষেত্রে শয়তানের পদক্ষেপগুলো ও ভয়ঙ্কর চক্রান্ত সম্পর্কে সাবধান হওয়া উচিত। কেননা এগুলো মানুষকে প্রকাশ্য শির্কের দিকে নিয়ে যায়। ইবনু আবী শাইবাহ্ তাঁর মুছান্নাফে নাফি‘ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেছেন। উমার ইবনু খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছালো যে, যে গাছের নিচে বাই‘আত করা হয়েছিল, তার তলদেশে (বরকতের আশায়) লোকজন আসছে এবং মসজিদ হিসাবে ছালাত আদায় করছে। সুতরাং তিনি সেটিকে কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন। আব্দুর রাযযাক তার মুছান্নাফে উমার ইবনু খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
إنما هلك من كان قبلكم أنهم اتخذوا آثار أنبيائهم بيَعا
‘নিশ্চয় তোমাদের পূর্বের লোকেরা তাদের নবীগণের পদচিহ্ন বা কবরগুলোকে উপাসনালয় বানিয়ে নেয়ার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/২৭৩৪)।
সুতরাং বুঝায় যাচ্ছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি বা বরকত প্রাপ্তির আশায় এরকম গাছের যিয়ারত করা ভয়ঙ্কর বিদ‘আত হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত (ইসলাম ওয়েব, প্রশ্ন নং-২০০২৫৩, তারিখ- ১২/০৩/২০২৩)। আলোচনার বিষয় হল- এই গাছের নিচে নবী ব্যতীত কেউ কখনো অবতরণ করেন না’ (ইবনু হিশাম, ১/১৮৮)। তার মানে নবী (ﷺ)-এর পূর্বেও এখানে অন্যান্য নবী বিশ্রাম নিয়েছেন। তাহলে গাছটির বয়স কত? সুহাইলী বলেন, ঈসা (আলাইহিস সালাম) থেকে এত দীর্ঘ বছর পর্যন্ত ঐ গাছটির বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং এমন একটি তথ্যবিহীন বিষয়ের উপর ঈমান আনা, তাকে বিশ্বাস করা, ফযীলতপূর্ণ মনে করে যিয়ারাত করা, কোন আদর্শ মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। কেননা ইসলাম আবেগের নাম নয়। ইসলাম হল- কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক দলীলের নাম।
প্রশ্নকারী : জাকির হোসেন, নাটোর।