শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন
উত্তর : পানির প্রকারভেদ নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও পানি তিন প্রকারের। (১) ত্বাহুর (طَهُوْرٌ) অর্থাৎ পরিষ্কারক, পবিত্রকারী। এমন পানি যে নিজে পবিত্র এবং অপরকে পবিত্র করে। যেমন : কুয়ো, টিউবওয়েল, নদী বা সমুদ্রের পানি। (২) ত্বাহির (طَاهِر) অর্থাৎ পরিষ্কার, নির্মল, নিষ্কলুষ, পবিত্র। এমন পানি যে নিজে পবিত্র কিন্তু অপরকে পবিত্রকারী নয়। যেমন গোলাপ জল, আঙুরের রস, ডালিমের রস ইত্যাদি। (৩) নাজ্স (نَجْس) অর্থাৎ নাপাক, অপবিত্র, ময়লা, নোংরা, কলুষিত, অপরিচ্ছন্ন। এমন পানি যে নিজেও পবিত্র নয় এবং অপরকেও পবিত্র করতে পারে না (হাশিয়াতুত্ব ত্বাহ্ত্বাবী, পৃ. ১৭; বাদায়িউছ ছানায়ী, ১/৬৭; আল-কাফী, ১/১৫৫; মাওয়াহিবুল জালীল, ১/৮২; আল-মাজমূঊ, ১/৮০)। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-এর নিকটে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা সমুদ্র পথে আসা-যাওয়া করি এবং সাথে করে সামান্য মিঠা পানি নিই। যদি আমরা তা দিয়ে ওযূ করি তাহলে পিপাসার্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে আমরা কি সমুদ্রের পানি দিয়ে ওযূ করতে পারি? উত্তরে তিনি বললেন, هُوَ الطَّهُوْرُ مَاؤُهُ الْحِلُّ مَيْتَتُهُ ‘তার পানি পবিত্রকারী এবং তার মৃত জীব হালাল’ (আবূ দাঊদ, হা/৮৩; তিরমিযী, হা/৬৯; নাসাঈ, হা/৩৩১; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৬১, ৩৯৩)।

ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ছাহাবীগণ এটি নিশ্চিতরূপে জানতেন যে, সমুদ্রের পানি পবিত্র, অপবিত্র নয়। তাঁদের জিজ্ঞাসা করার উদ্দেশ্যে ছিল, ‘সমুদ্রের পানি পবিত্রকারী কি-না?’ সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে, পবিত্র হলেও সব পানি পবিত্রকারী হয় না (আল-মাজমূঊ, ১/৮৫ পৃ.)। অনুরূপভাবে রাসূল (ﷺ) স্থির পানিতে গোসল করতে নিষেধ করেছেন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন স্থির, যা প্রবাহিত নয় এমন পানিতে কখনো পেশাব না করে। (সম্ভবত) পরে সে আবার তাতে গোসল করবে’ (ছহীহ বুখারী হা/২৩৮, ২৩৯, মুসলিম হা/২৮২) এবং ঘুম থেকে উঠে হাত ধৌত করার পূর্বে পানির পাত্রে হাত প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘...আর তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জাগে তখন সে যেন ওযূর পানিতে হাত ঢুকানোর পূর্বে হাত ধৌত করে নেয়, কারণ তোমাদের কেউ জানে না যে, ঘুমন্ত অবস্থায় তার হাত কোথায় থাকে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৮)। অতএব এই সমস্ত পানি অপবিত্র না হওয়া সত্ত্বেও তাতে গোসল করতে নিষেধ করা হয়েছে। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, কিছু পানি অপবিত্র না হলেও তা দ্বারা কিন্তু পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

কেউ কেউ বলেন, পানির শুধু দুই প্রকারের-ই হয়ে থাকে। যথা: (১) ত্বাহুর (طَهُوْرٌ) অর্থাৎ পরিষ্কারক, পবিত্রকারী। (২) নাজ্স (نَجْس) অর্থাৎ নাপাক, অপবিত্র, ময়লা, নোংরা, কলুষিত, অপরিচ্ছন্ন। ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অসংখ্য সাথীরা বলেছেন যে, بل الطَّاهِرُ هو الطَّهورُ ‘যেটা ত্বাহির সেটাই ত্বাহুর অর্থাৎ পবিত্র আর পবিত্রকারী একই জিনিস’ (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ৫/২৯৭ পৃ.)। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কিতাব এবং সুন্নাহতে পানি নামটি সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নবী (ﷺ) পানিকে দুইভাগে বিভক্ত করেননি: ‘পবিত্র আর পবিত্রকারী’। সুতরাং এরূপ বিভক্তকরণ কিতাব ও সুন্নাহ বিরোধী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং পানি না পেলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর’ (সূরা আন-নিসা: ৪৩; সূরা আল-মায়িদাহ: ৬)। এমন প্রত্যেক জিনিস যার নামকরণ করা হয়েছে পানি নামে সেটি ত্বাহুর এবং ত্বাহির দুটোই (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ১৯/২৩৬ পৃ.)। শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নির্ভরযোগ্য কথা হল, মুত্বলাক্ব বা সাধারণ পানি দুই প্রকারের, পবিত্র আর অপবিত্র। নবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, إنَّ الْماَءَ طَهوْرٌ لَا يُنجِّسُهُ شَيْءٌ ‘নিশ্চয় পানি পবিত্র, তাকে কোন কিছু অপবিত্র করতে পারে না’ (আবূ দাঊদ, হা/৬৭; তিরমিযী, হা/৬৬; নাসাঈ, হা/৩২৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৮১৮)।

আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এর অর্থ হল- যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে কোন অপবিত্র জিনিস পড়ে তার স্বাদ অথবা গন্ধ অথবা রং পরিবর্তন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পবিত্র। আর পরিবর্তন হয়ে গেলে, উলামাদের সর্বসম্মতিক্রমে তখন এটি অপবিত্র হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি পানিতে গাছের পাতা বা এ জাতীয় জিনিস পড়ে, তাহলে তা অপবিত্র হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত পানিকে পানি বলা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা পবিত্র হিসাবে বিবেচিত হবে। অপরদিকে কোন কিছু সংমিশ্রণ হওয়ার কারণে যদি পানির নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমন দুধ, চা, কাহ্ওয়া ইত্যাদি। তখন সেটা পানির বিধান থেকে বহির্ভূত হয়ে যায়, তখন তাকে আর পানি বলা যাবে না। এই সংমিশ্রণ ঘটার পরও কিন্তু সেটি পবিত্র, যদিও তা পবিত্রকারী নয়। পক্ষান্তরে মুক্বাইয়াদ বা আবদ্ধ পানি। যেমন গোলাপ জল, আঙুরের রস, ডালিমের রস, এগুলো ত্বাহির (পবিত্র) কিন্তু ত্বাহুর (পবিত্রকারী) নয়। এর মাধ্যমে অপবিত্রতা ও নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়। কেননা সেটি মুক্বাইয়াদ পানি, মুত্বলাক্ব পানি নয়। শরী‘আতের দৃষ্টিতে পবিত্রতা অর্জনের জন্য মুত্বলাক্ব বা সাধারণ পানি হওয়া শর্ত। যেমন বৃষ্টির পানি, সমুদ্র, নদী ও ঝর্নার পানি’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১০/১৪ পৃ.)।

শায়খ উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী পানি দুই প্রকার। যথা: পবিত্র এবং অপবিত্র। কোন নাপাকী জিনিস পড়ার কারণে যখন তার তার স্বাদ অথবা গন্ধ অথবা রং পরিবর্তন হয়ে যায়, সেটাই অপবিত্র। আর যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে সেটা পবিত্র।  ত্বাহির নামে তৃতীয় প্রকার প্রতিষ্ঠিত করা শরী‘আত সম্মত নয়। কেননা এর কোন দলীল নেই। শরী‘আতের আলোকে যদি তৃতীয় প্রকার প্রমাণিত হত, তাহলে অবশ্যই তা স্পষ্ট হাদীছ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হত। তাকে প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত বর্ণনার প্রয়োজন হত না (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন, ১১/৮৬ পৃ.)।


প্রশ্নকারী : আব্দুল মুমিন, সিরাজগঞ্জ।





প্রশ্ন (২৯) : জনৈক আলেম বলেন, অতিরিক্ত কথা বলা মুনাফিকের লক্ষণ। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৫) : ইসলামে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা নিষেধ। কিন্তু ইদানিং অনলাইনে ব্যাপকভাবে ‘মৃত্যু সংবাদ’ প্রচার করা হয়। প্রশ্ন হল, অনলাইনে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩২) : ‘দেবর মৃত্যু সমতুল্য’ এই হাদীছের তাৎপর্য কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৩) : গোসলের ফরয কয়টি ও কী কী? অনেকে মনে করেন কুলি ও নাকে পানি না দিলে গোসল হবে না। এই বক্তব্য কি ছহীহ? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২) : জনৈক আলেম বলেন, রাতে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর যে ব্যক্তি নিম্নের দু‘আটি পাঠ করবে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যদি সে দু‘আ করে, তবে তার দু‘আ কবুল হবে। আর সে যদি উঠে ওযয় করে ছালাত আদায় করে, তাহলে তার ছালাত কবুল হবে। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২০) : জিন এবং মানুষের ইবাদতের পার্থক্য কী? জিন জাতির উপরও কি ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতগুলো মানুষের মতই ফরয? তাদের ইবাদতের ধরণ কেমন? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৮) : যে ব্যক্তির কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে এবং প্রতিদিন তার ডায়ালেসিস করতে হয়। সে ছিয়াম রাখতে পারবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৪) : ফ্রি মিক্সিং পরিবেশে পুরুষদের চাকরি করার বিধান কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২০) : অফিসে কাজ করার সময় বিনা-অনুমতিতে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকা বা সময় অপচয় করার হুকুম কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৬) : মানতের খানা কি সবাই খেতে পারে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩১) : ক্বদরের রাত্রে সারা রাত নফল ছালাত আদায় করা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১১) : হজ্জের সামর্থ্য না থাকলে ওমরাহ করা যাবে কি? জনৈক ব্যক্তি বলেন, কারও যদি হজ্জের সামর্থ্য না থাকে, তবে সে কখনও ওমরাহ করতে পারবে না। কথাটি কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ