উত্তর : প্রতিবেশীর হিদায়াত কামনা করা এবং তাঁর জন্য ইসলাম গ্রহণের আশা পোষণ করা একটি মহৎ আকাঙ্ক্ষা। তবে মনে রাখতে হবে, হিদায়াত দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আমাদের দায়িত্ব হল প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাঁর কাছে ইসলামের সত্যতা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করা যেতে পারে:
(১) নিজের উত্তম আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা : দাওয়াতের প্রথম ধাপ হল নিজের চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে ইসলামের শিক্ষা তুলে ধরা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ قُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বল’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ৮৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ ‘আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, সুন্দর ভাষা ও উপযুক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করা অপরিহার্য।
(২) প্রথমেই তাঁর ধর্মকে আক্রমণ না করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করা : তাঁকে সরাসরি তাঁর ধর্মের সমালোচনা করে বিব্রত করবেন না। বরং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে স্রষ্টা, জীবনের উদ্দেশ্য, মৃত্যুর পরের জীবন এবং মানুষের মুক্তি সম্পর্কে আলোচনা শুরু করতে পারেন। আমাদের জীবনের স্রষ্টা কে, তিনি আমাদের কাছ থেকে কী চান এবং মৃত্যুর পর আমাদের কী হবে—এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা কি আমাদের জন্য যরূরী নয়? তিনি আগ্রহ দেখালে ধীরে ধীরে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ব্যাখ্যা করুন। তিনি আগ্রহী না হলে চাপ দেবেন না।
(৩) তাওহীদের দাওয়াত দিন—আল্লাহর একত্বের পরিচয় তুলে ধরা : ইসলামের দাওয়াতের মূল বিষয় হল তাওহীদ। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং ইবাদতে কাউকে তাঁর শরীক না করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلۡ ہُوَ اللّٰہُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾اَللّٰہُ الصَّمَدُ
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ ব্যতীয় অমুখাপেক্ষী; সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী’ (সূরা আল-ইখলাছ : ১-২)। তাঁকে বোঝাতে পারেন, ইসলামে স্রষ্টা এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, তিনি সৃষ্টির মত নন এবং ইবাদত একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اعۡبُدُوۡا رَبَّکُمُ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারা : ২১)।
(৪) তাঁকে রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরিচয় ও রিসালাতের সত্যতা বোঝানো : তাওহীদের পাশাপাশি তাঁকে বোঝাতে হবে, আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَ لٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَ خَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ‘মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী’ (সূরা আল-আহযাব : ৪০)। তাঁকে বোঝাতে পারেন, ইসলাম কেবল কোন জাতি বা জনগোষ্ঠীর ধর্ম নয়; বরং এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰہِ الۡاِسۡلَامُ ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন হল ইসলাম’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯)। এখানে তাঁর কাছে শুধু দাবি উপস্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; বরং কুরআনের শিক্ষা, রাসূল (ﷺ)-এর জীবনচরিত এবং ইসলামের মূল বিশ্বাসগুলো নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করুন।
(৫) ইসকনের অনুসারী হিসাবে তাঁর প্রশ্ন ও বিশ্বাস মনোযোগ দিয়ে শুনুন : তিনি যেহেতু ইসকনের অনুসারী, তাই তাঁর বিশ্বাস সম্পর্কে না জেনে বিতর্কে জড়ানো উচিত নয়। প্রথমে তাঁকে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি স্রষ্টা, ঈশ্বরের স্বরূপ, উপাসনা ও পরকাল সম্পর্কে কী বিশ্বাস করেন? এরপর তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ لَا تُجَادِلُوۡۤا اَہۡلَ الۡکِتٰبِ اِلَّا بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ
‘আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবের সঙ্গে বিতর্ক কর না’ (সূরা আল-আনকাবূত : ৪৬)। যদিও এই আয়াতে আহলে কিতাবের কথা বলা হয়েছে, উত্তম পন্থায় আলোচনা করার শিক্ষা দাওয়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
(৬) তাঁকে কুরআনের অনুবাদ ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী বই উপহার দিন : তিনি আগ্রহী হলে তাঁকে বাংলা বা তাঁর বোধগম্য ভাষায় কুরআনের অনুবাদ দিন। তাঁকে বলুন, পড়ার সময় কোন প্রশ্ন বা আপত্তি মনে এলে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে বই পড়তে বাধ্য করবেন না; তাঁর আগ্রহ ও বোঝার গতিকে সম্মান করুন।
(৭) তাঁর হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন : রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেও মানুষের হিদায়াত কামনা করতেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّکَ لَا تَہۡدِیۡ مَنۡ اَحۡبَبۡتَ وَ لٰکِنَّ اللّٰہَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ‘নিশ্চয় আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না; বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন’ (সূরা আল-ক্বাছাছ : ৫৬)। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী ইবন আবী তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, فَوَاللّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ ‘আল্লাহর শপথ! আপনার মাধ্যমে আল্লাহ যদি একজন মানুষকেও হিদায়াত দান করেন, তবে তা আপনার জন্য লাল উট লাভ করার চেয়েও উত্তম’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪২১০; ছহীহ মুসলিম, হা/ ২৪০৬)। এই হাদীছ থেকে বোঝা যায়, একজন মানুষের হিদায়াতের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।
প্রশ্নকারী : আহমাদ, কিশোরগঞ্জ।