উত্তর : নিঃসন্দেহে আত্মহত্যা করা কাবীরা গুনাহ। তবে আত্মহত্যা করার কারণে সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায় না। সাধারণ মুসলিমরা তার জানাযার ছালাত আদায় করবে। তবে সমাজের আলিম ও নেককার ব্যক্তিদের জন্য আত্মহত্যাকারীর জানাযার ছালাত আদায় না করা উত্তম। এটা অন্যদের জন্য ভীতি ও সতর্কতার কারণে। জাবির ইবনু সামুরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর কাছে এমন এক ব্যক্তিকে আনা হল, যে নিজেকে একটি মিশকাস (প্রশস্ত ও ধারালো ফলাযুক্ত তীর) দ্বারা হত্যা করেছিল। তখন তিনি তার জানাযার ছালাতে শরীক হননি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৮)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আলিমগণ বলেছেন, এই হাদীছটি আত্মহত্যা থেকে মানুষকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। যেমন: যে ব্যক্তির উপর ঋণ রয়েছে, তার জানাযার ছালাত রাসূল (ﷺ) নিজে পড়েননি। তবে ছাহাবীগণ তাঁর নির্দেশে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাযার ছালাত আদায় করেছেন। এটি ঋণগ্রস্ত হওয়া থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ছিল, তাকে কাফির মনে করার কারণে নয় (শারহু ছহীহ মুসলিম, ৭/৪৭ পৃ.)।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘এক ব্যক্তি নিজেকে ‘শাইখ’ বা পীর-মুর্শিদ দাবি করত। একদিন সে একটি সাপ দেখতে পেল। উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন সেটিকে মেরে ফেলতে উদ্যত হলে সে তাকে বাধা দিল এবং সাপটিকে হাতে ধরে নিল- সাপটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং এটিকে একটি ‘কারামত’ মনে করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সাপটি তাকে দংশন করল এবং এর ফলে সে মারা গেল। তার জানাযার ছালাত পড়া যাবে কি? তিনি উত্তরে বলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। আলিম ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের উচিত হল- এ ধরনের ব্যক্তিদের জানাযার ছালাত থেকে বিরত থাকা। যদিও সাধারণ মানুষ তার জানাযার ছালাত আদায় করবে। যেমন নবী (ﷺ) আত্মহত্যাকারী এবং গণীমতের সম্পদে খিয়ানতকারী ব্যক্তির জানাযার ছালাত আদায় করা থেকে বিরত ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জানাযা পড়’।
আর একবার লোকেরা সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলল, ‘আপনার ছেলে গত রাতে ঘুমায়নি’। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেশি খাওয়ার কারণে কি সে ঘুমাতে পারেনি?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, ‘জেনে রেখো, সে যদি এ কারণে মারা যেত, তাহলে আমি তার জানাযার ছালাত পড়তাম না’। এর মাধ্যমে সামুরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) স্পষ্ট করেছেন যে, তার ছেলে যদি অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের কারণে মারা যেত, তাহলে তিনি তার জানাযার ছালাত আদায় করতেন না। কারণ, অতিরিক্ত খাওয়ার মাধ্যমে সে নিজের মৃত্যুর কারণ নিজেই সৃষ্টি করত। অতএব, যে ব্যক্তি সাপটিকে হত্যা করতে বাধা দিয়েছে এবং সেটিকে হাতে ধরে রেখেছে, শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে হত্যা করেছে, তার ক্ষেত্রে আলিম ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের জানাযার ছালাত থেকে বিরত থাকা আরও অধিক যুক্তিসঙ্গত। কারণ, সে নিজেই নিজের মৃত্যুর কারণ হয়েছে’ (আল-ফাতাওয়াউল কুবরা, ৩/২০-২১ পৃ.)।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন, ‘তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তির অর্থাৎ গনিমতের সম্পদে খিয়ানতকারী, আত্মহত্যাকারী এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাযার ছালাত থেকে কেউ যদি তার মতো অন্যদেরকে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে বিরত থাকে, তাহলে তা উত্তম কাজ হবে। আর যদি বাহ্যিকভাবে তার জানাযার ছালাত থেকে বিরত থাকে, কিন্তু গোপনে তার জন্য দু‘আ করে- যাতে উভয় কল্যাণের সমন্বয় ঘটে, তাহলে এটি একটি কল্যাণকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়ার চেয়ে অধিক উত্তম’ (আল-ইখতিয়ারাত আল-ইলমিয়্যাহ, পৃ. ৫২)।
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করেছে, তাকে কি গোসল দেয়া হবে এবং তার জানাযার ছালাত পড়া হবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আত্মহত্যাকারীকে গোসল দেয়া হবে, তার জানাযার ছালাত পড়া হবে এবং তাকে মুসলিমদের সঙ্গে দাফন করা হবে। কারণ, সে একজন পাপী, কিন্তু সে কাফির নয়। কেননা, আত্মহত্যা করা একটি গুনাহ, কুফর নয়। সুতরাং যদি কেউ আত্মহত্যা করে, তাহলে তাকে গোসল দেয়া হবে, কাফন পরানো হবে এবং তার জানাযার ছালাত পড়া হবে। তবে বড় ইমাম/প্রধান ইমাম এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য তার জানাযার ছালাত না পড়া উচিত- এটি প্রতিবাদ ও নিন্দা প্রকাশের উদ্দেশ্যে। যাতে মানুষ মনে না করে যে, তিনি তার এই কাজকে সমর্থন বা অনুমোদন করেন। অতএব প্রধান ইমাম, শাসক, বিচারক, শহর বা এলাকার প্রধান কিংবা আমির যদি এই কাজের প্রতিবাদ এবং এটি যে ভুল- তা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তার জানাযার ছালাত না পড়েন, তাহলে তা উত্তম। তবে অন্য মুসলিমদের মধ্য থেকে কেউ তার জানাযার ছালাত পড়াবে’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া লিইবনি বায, ১৩/১২২; ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, ২/৬২)।
প্রশ্নকারী : আব্দুল করীম, সিলেট।