বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৫ পূর্বাহ্ন
উত্তর : স্বামীর ওপর আবশ্যক হলো স্ত্রীকে সৎকাজের আদেশ করা, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা, কল্যাণের দিকে আহ্বান করা এবং অকল্যাণ থেকে সতর্ক করা। কারণ আল্লাহ তাকে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ (সূরা আত-তাহরীম : ৬)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় নিম্নোক্ত বক্তব্যগুলো নিয়ে এসেছেন,

(১) আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, أَدِّبُوهُمْ، عَلموهم ‘তোমরা তাদেরকে আদব শিক্ষা দাও এবং দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দাও’।
(২) ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, اِعْمَلُوْا بِطَاعَةِ اللهِ، وَاتَّقُوْا مَعَاصِيَ اللهِ، ومُروْا أَهْلِيْكُمْ بِالذِّكْرِ، يُنْجِيْكُمُ اللهُ مِنَ النَّار ‘আল্লাহর আনুগত্য কর, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাক এবং তোমার পরিবারকে আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্যের নির্দেশ দাও; তাহলে আল্লাহ তোমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন’।
(৩) মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, اتَّقُوا اللهَ، وَأَوْصُوْا أَهْلِيْكُمْ بِتَقْوَى اللهِ ‘নিজেরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পরিবারকেও তাক্বওয়ার উপদেশ দাও’।
(৪) ক্বাতাদাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, يَأْمُرُهُمْ بِطَاعَةِ اللهِ، وَيَنْهَاهُمْ عَنْ مَعْصِيَةِ اللهِ، وَأَنْ يقوْمَ عَلَيْهِمْ بِأَمْرِ اللهِ، وَيَأْمُرَهُمْ بِهِ وَيُسَاعِدَهُمْ عَلَيْهِ، فَإِذَا رَأَيْتَ لِلهِ مَعْصِيَةً، قَدعتهم عَنْهَا وَزَجَرْتَهُمْ عَنْهَا ‘পরিবারের সদস্যদের আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দিবে, আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করবে, আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাদের তত্ত্বাবধান করবে, তাদেরকে সে আদেশ পালনের নির্দেশ দিবে এবং তা পালনে সহযোগিতা করবে। অতঃপর যখনই তুমি আল্লাহর কোন অবাধ্যতা (গুনাহ) দেখতে পাবে, তখন তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখবে এবং সে কাজ থেকে কঠোরভাবে নিবৃত্ত করবে’।
(৫) যাহহাক ও মুকাতিল (রাহিমাহুল্লাহ) অনুরূপভাবে বলেন, حَقٌّ عَلَى الْمُسْلِمِ أَنْ يُعَلِّمَ أَهْلَهُ، مِنْ قَرَابَتِهِ وَإِمَائِهِ وَعَبِيدِهِ، مَا فَرَضَ اللهُ عَلَيْهِمْ، وَمَا نَهَاهُمُ اللَّهُ عَنْهُ. ‘একজন মুসলিমের ওপর অবশ্যকর্তব্য হল, সে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, দাসী ও দাসদেরকে আল্লাহ তাদের ওপর যা ফরয করেছেন এবং আল্লাহ তাদেরকে যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা শিক্ষা দেবে’ (তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৮/১৬৭ পৃ.)।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, وَ اۡمُرۡ اَہۡلَکَ بِالصَّلٰوۃِ وَ اصۡطَبِرۡ عَلَیۡہَا ‘তুমি তোমার পরিবারকে ছালাতের নির্দেশ দাও এবং এর ওপর অবিচল থাক’ (সূরা ত্বো-হা : ১৩২)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এ নির্দেশ যদিও নবী (ﷺ)-কে উদ্দেশ্য করে দেয়া হয়েছে, তবে তাঁর সমগ্র উম্মত এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষভাবে তাঁর পরিবার-পরিজন এতে শামিল’। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ‘এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রতিদিন সকালে ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে এসে বলতেন, الصَّلَاةُ ‘ছালাত!’ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে বলেন, وَ کَانَ یَاۡمُرُ اَہۡلَہٗ  بِالصَّلٰوۃِ  وَ الزَّکٰوۃِ ‘তিনি তাঁর পরিবারকে ছালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন (সূরা মারইয়াম : ৫৫)। বর্ণিত আছে যে, উরওয়াহ ইবনু যুবাইর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন শাসকদের খবরাখবর ও তাদের জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থা থেকে কোন কিছু দেখতেন, তখন দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে যেতেন। আর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন,

وَ لَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ  اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ  الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَ  رِزۡقُ  رَبِّکَ خَیۡرٌ  وَّ  اَبۡقٰی  

‘তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত কর না তার প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়েছি, তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী’ (সূরা ত্বো-হা: ১৩১)। এরপর তিনি ডাক দিতেন, الصَّلَاةَ يَرْحَمُكُمُ اللهُ ‘ছালাত! আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন’। অতঃপর তিনি ছালাত আদায় করতেন’। অনুরূপভাবে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাতের ছালাতের জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে দিতেন এবং নিজেও ছালাত আদায় করতেন। এ সময় তিনি এ আয়াত পাঠ করতেন (তাফসীরে কুরতুবী, ১১/২৬৩ পৃ.)।

দ্বিতীয়তঃ যদি স্ত্রী একেবারেই ছালাত না পড়ে, তাহলে নবী (ﷺ)-এর বহু হাদীছ অনুযায়ী ছালাত ত্যাগ করা ব্যক্তি কাফের। সে ক্ষেত্রে তাকে স্ত্রী হিসাবে রাখা বৈধ নয়। তাই স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, ‘ছালাত ত্যাগের ওপর অটল থাকলে তুমি আমার জন্য বৈধ স্ত্রী থাকবে না। হয় তাওবা করে ছালাত প্রতিষ্ঠা কর, না হয় বিচ্ছেদ ঘটবে’। অন্যদিকে যদি ছালাত কখনো পড়ে, কখনো ছেড়ে দেয় যেমন প্রশ্নে প্রতীয়মান হচ্ছে- তাহলে কিছু আলেমের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।

তবে এক্ষেত্রে স্বামীর কর্তব্য হল- কোমলতা ও প্রজ্ঞার সাথে নসীহত করা। তার ছালাতে অবহেলার কারণ অনুসন্ধান করা। ছালাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝানো। গুনাহের ভয়াবহতা স্মরণ করানো। ঈমান ও ইয়াকীন বৃদ্ধির চেষ্টা করা। নেককার মহিলাদের সঙ্গের ব্যবস্থা করা। উপকারী ইসলামী বই, লেকচার ও অডিও সরবরাহ করা। নিয়মিত ছালাত সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া। সুতরাং যদি স্ত্রী ছালাতে নিয়মিত না হওয়ার ওপর অটল থাকে, তাহলে তাকে ত্বালাক্ব দেয়া আপনার জন্য বৈধ। ত্বালাক্ব দিলে তার সমস্ত প্রাপ্য অধিকার আদায় করা আপনার ওপর আবশ্যক হবে। এর মধ্যে মুয়াখ্খার মোহর বা বিলম্বিত মোহরও অন্তর্ভুক্ত। কারণ মুয়াখ্খার মোহর স্ত্রীর একটি বৈধ অধিকার। নির্ধারিত সময় এলে বা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ত্বালাক্ব বা মৃত্যুর সময় তা পরিশোধ করতে হবে।

আরেকটি বিধান হল- আপনি চাইলে তাকে অবিলম্বে ত্বালাক্ব না দিয়েও অপেক্ষা করতে পারেন এবং তাকে খুলা‘ (خلع) গ্রহণের দিকে আহ্বান করতে পারেন, যাতে সে মোহরের সব বা কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করবে। কারণ স্ত্রী যদি আল্লাহর ফরয বিধান ত্যাগ করে, তাহলে তা স্বামীর জন্য কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। এর দলীল আল্লাহ তা‘আলার বাণী- وَ لَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ لِتَذۡہَبُوۡا بِبَعۡضِ مَاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ  اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ‘তোমরা তাদেরকে কষ্ট দিয়ে আটকে রেখো না, যাতে তাদেরকে দেয়া সম্পদের কিছু অংশ ফিরিয়ে নিতে পার; তবে যদি তারা স্পষ্ট অশ্লীলতা বা গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে ভিন্ন কথা’ (সূরা আন-নিসা : ১৯)।

অতএব স্ত্রী ছালাত আদায় না করলে স্বামীর কর্তব্য হল- স্ত্রীকে ছালাতের নির্দেশ দেয়া এবং এ ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করা। যদি স্ত্রী একেবারেই ছালাত না পড়ে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। যদি কখনো পড়ে, কখনো ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকে নরমভাবে নছীহত, শিক্ষা ও সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে ত্বালাক্ব দেয়া বৈধ। ত্বালাক্ব দিলে স্ত্রীর প্রাপ্য মুয়াখ্খার মোহরসহ সব অধিকার আদায় করা স্বামীর ওপর আবশ্যক। কিছু ক্ষেত্রে খুলার মাধ্যমে মোহরের সব বা কিছু অংশ পরিত্যাগ করে বিচ্ছেদও হতে পারে (ফাতাওয়া সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২১৪৭৭৯)।


প্রশ্নকারী : এ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম, ঢাকা।





প্রশ্ন (১৩) : মাজা বা হাঁটুতে ব্যথা বা এক্সিডেন্টে পা ভাঙ্গার কারণে রুকূ‘ ও সিজদা করতে অক্ষম ব্যক্তি চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করতে পারবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১১) : অনার্স পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে দুপুর ১টা থেকে চার ঘণ্টা। এমতাবস্থায় কিভাবে যোহরের ছালাত আদায় করতে হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৮) : শাওয়াল মাসে বিয়ে করা কি সুন্নত? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৪১) : স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্বন্দ্ব হলে ‘মীমাংসামূলক ছালাত’ নামে ছালাত পড়া হয়। উক্ত ছালাতের কোন দলীল আছে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৮) : নারীর ব্যবসায়ী হওয়ার বিধান কী? সে সফরে থাকুক বা নিজ এলাকায় থাকুক, উভয় অবস্থায় কি ব্যবসা করতে পারবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১১) : ইউটিউবে অশ্লীল এ্যাডযুক্ত ভিডিও আপলোড করে অর্থ উপার্জন করা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩৫) : ঔষধ দিয়ে পোকা-মাকড়, পিঁপড়া, মাছি, তেলাপোকা মারা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৯) : আমার বাড়ির কাছাকাছি কোন আহলেহাদীছ মসজিদ নেই। পার্শ্ববর্তী হানাফী মসজিদে ছালাত আদায় করতে গেলে তারা আমাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করে। এমতাবস্থায় আমি বাড়িতে ছালাত আদায় করতে পারব কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩০) : আছরের পূর্বে ৪ রাক‘আত বা ২ রাক‘আত ছালাত সম্পর্কিত যে হাদীছগুলো আছে সেই হাদীছগুলোর ছহীহ-যইফ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ আছে। হাদীছগুলোর তাহক্বীক্ব কী এবং এই চার রাক‘আত ছালাত এক সালাম না দুই সালামে পড়তে হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২০) : অনেক দ্বীনি ভাই টাখনুর নিচের অতিরিক্ত অংশটা গুটিয়ে রাখে। তাদেরকে কেটে ফেলার কথা বললে, তারা বিভিন্ন শায়েখের বক্তব্য শুনায় এবং বলে পায়ের ক্ষেত্রে গুটিয়ে রাখলে সমস্যা নেই। এই দাবী কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৮): বিবাহের ক্ষেত্রে কেমন পাত্র দেখা উচিত? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১২) : প্রচলিত আছে যে, কেউ যদি দিনে পঁচিশ জনের সাথে মুছাফাহা করে আর সেদিন মারা যায়, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ

ফেসবুক পেজ