শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ন
উত্তর : স্বামীর ওপর আবশ্যক হলো স্ত্রীকে সৎকাজের আদেশ করা, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা, কল্যাণের দিকে আহ্বান করা এবং অকল্যাণ থেকে সতর্ক করা। কারণ আল্লাহ তাকে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ (সূরা আত-তাহরীম : ৬)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় নিম্নোক্ত বক্তব্যগুলো নিয়ে এসেছেন,

(১) আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, أَدِّبُوهُمْ، عَلموهم ‘তোমরা তাদেরকে আদব শিক্ষা দাও এবং দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দাও’।
(২) ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, اِعْمَلُوْا بِطَاعَةِ اللهِ، وَاتَّقُوْا مَعَاصِيَ اللهِ، ومُروْا أَهْلِيْكُمْ بِالذِّكْرِ، يُنْجِيْكُمُ اللهُ مِنَ النَّار ‘আল্লাহর আনুগত্য কর, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাক এবং তোমার পরিবারকে আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্যের নির্দেশ দাও; তাহলে আল্লাহ তোমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন’।
(৩) মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, اتَّقُوا اللهَ، وَأَوْصُوْا أَهْلِيْكُمْ بِتَقْوَى اللهِ ‘নিজেরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পরিবারকেও তাক্বওয়ার উপদেশ দাও’।
(৪) ক্বাতাদাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, يَأْمُرُهُمْ بِطَاعَةِ اللهِ، وَيَنْهَاهُمْ عَنْ مَعْصِيَةِ اللهِ، وَأَنْ يقوْمَ عَلَيْهِمْ بِأَمْرِ اللهِ، وَيَأْمُرَهُمْ بِهِ وَيُسَاعِدَهُمْ عَلَيْهِ، فَإِذَا رَأَيْتَ لِلهِ مَعْصِيَةً، قَدعتهم عَنْهَا وَزَجَرْتَهُمْ عَنْهَا ‘পরিবারের সদস্যদের আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দিবে, আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করবে, আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাদের তত্ত্বাবধান করবে, তাদেরকে সে আদেশ পালনের নির্দেশ দিবে এবং তা পালনে সহযোগিতা করবে। অতঃপর যখনই তুমি আল্লাহর কোন অবাধ্যতা (গুনাহ) দেখতে পাবে, তখন তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখবে এবং সে কাজ থেকে কঠোরভাবে নিবৃত্ত করবে’।
(৫) যাহহাক ও মুকাতিল (রাহিমাহুল্লাহ) অনুরূপভাবে বলেন, حَقٌّ عَلَى الْمُسْلِمِ أَنْ يُعَلِّمَ أَهْلَهُ، مِنْ قَرَابَتِهِ وَإِمَائِهِ وَعَبِيدِهِ، مَا فَرَضَ اللهُ عَلَيْهِمْ، وَمَا نَهَاهُمُ اللَّهُ عَنْهُ. ‘একজন মুসলিমের ওপর অবশ্যকর্তব্য হল, সে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, দাসী ও দাসদেরকে আল্লাহ তাদের ওপর যা ফরয করেছেন এবং আল্লাহ তাদেরকে যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা শিক্ষা দেবে’ (তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৮/১৬৭ পৃ.)

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, وَ اۡمُرۡ اَہۡلَکَ بِالصَّلٰوۃِ وَ اصۡطَبِرۡ عَلَیۡہَا ‘তুমি তোমার পরিবারকে ছালাতের নির্দেশ দাও এবং এর ওপর অবিচল থাক’ (সূরা ত্বো-হা : ১৩২)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এ নির্দেশ যদিও নবী (ﷺ)-কে উদ্দেশ্য করে দেয়া হয়েছে, তবে তাঁর সমগ্র উম্মত এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষভাবে তাঁর পরিবার-পরিজন এতে শামিল’। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ‘এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রতিদিন সকালে ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে এসে বলতেন, الصَّلَاةُ ‘ছালাত!’ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে বলেন, وَ کَانَ یَاۡمُرُ اَہۡلَہٗ  بِالصَّلٰوۃِ  وَ الزَّکٰوۃِ ‘তিনি তাঁর পরিবারকে ছালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন (সূরা মারইয়াম : ৫৫)। বর্ণিত আছে যে, উরওয়াহ ইবনু যুবাইর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন শাসকদের খবরাখবর ও তাদের জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থা থেকে কোন কিছু দেখতেন, তখন দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে যেতেন। আর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন,

وَ لَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ  اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ  الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَ  رِزۡقُ  رَبِّکَ خَیۡرٌ  وَّ  اَبۡقٰی  

‘তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত কর না তার প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়েছি, তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী’ (সূরা ত্বো-হা: ১৩১)। এরপর তিনি ডাক দিতেন, الصَّلَاةَ يَرْحَمُكُمُ اللهُ ‘ছালাত! আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন’। অতঃপর তিনি ছালাত আদায় করতেন’। অনুরূপভাবে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাতের ছালাতের জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে দিতেন এবং নিজেও ছালাত আদায় করতেন। এ সময় তিনি এ আয়াত পাঠ করতেন (তাফসীরে কুরতুবী, ১১/২৬৩ পৃ.)

দ্বিতীয়তঃ যদি স্ত্রী একেবারেই ছালাত না পড়ে, তাহলে নবী (ﷺ)-এর বহু হাদীছ অনুযায়ী ছালাত ত্যাগ করা ব্যক্তি কাফের। সে ক্ষেত্রে তাকে স্ত্রী হিসাবে রাখা বৈধ নয়। তাই স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, ‘ছালাত ত্যাগের ওপর অটল থাকলে তুমি আমার জন্য বৈধ স্ত্রী থাকবে না। হয় তাওবা করে ছালাত প্রতিষ্ঠা কর, না হয় বিচ্ছেদ ঘটবে’। অন্যদিকে যদি ছালাত কখনো পড়ে, কখনো ছেড়ে দেয় যেমন প্রশ্নে প্রতীয়মান হচ্ছে- তাহলে কিছু আলেমের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।

তবে এক্ষেত্রে স্বামীর কর্তব্য হল- কোমলতা ও প্রজ্ঞার সাথে নসীহত করা। তার ছালাতে অবহেলার কারণ অনুসন্ধান করা। ছালাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝানো। গুনাহের ভয়াবহতা স্মরণ করানো। ঈমান ও ইয়াকীন বৃদ্ধির চেষ্টা করা। নেককার মহিলাদের সঙ্গের ব্যবস্থা করা। উপকারী ইসলামী বই, লেকচার ও অডিও সরবরাহ করা। নিয়মিত ছালাত সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া। সুতরাং যদি স্ত্রী ছালাতে নিয়মিত না হওয়ার ওপর অটল থাকে, তাহলে তাকে ত্বালাক্ব দেয়া আপনার জন্য বৈধ। ত্বালাক্ব দিলে তার সমস্ত প্রাপ্য অধিকার আদায় করা আপনার ওপর আবশ্যক হবে। এর মধ্যে মুয়াখ্খার মোহর বা বিলম্বিত মোহরও অন্তর্ভুক্ত। কারণ মুয়াখ্খার মোহর স্ত্রীর একটি বৈধ অধিকার। নির্ধারিত সময় এলে বা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ত্বালাক্ব বা মৃত্যুর সময় তা পরিশোধ করতে হবে।

আরেকটি বিধান হল- আপনি চাইলে তাকে অবিলম্বে ত্বালাক্ব না দিয়েও অপেক্ষা করতে পারেন এবং তাকে খুলা‘ (خلع) গ্রহণের দিকে আহ্বান করতে পারেন, যাতে সে মোহরের সব বা কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করবে। কারণ স্ত্রী যদি আল্লাহর ফরয বিধান ত্যাগ করে, তাহলে তা স্বামীর জন্য কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। এর দলীল আল্লাহ তা‘আলার বাণী- وَ لَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ لِتَذۡہَبُوۡا بِبَعۡضِ مَاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ  اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ‘তোমরা তাদেরকে কষ্ট দিয়ে আটকে রেখো না, যাতে তাদেরকে দেয়া সম্পদের কিছু অংশ ফিরিয়ে নিতে পার; তবে যদি তারা স্পষ্ট অশ্লীলতা বা গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে ভিন্ন কথা’ (সূরা আন-নিসা : ১৯)

অতএব স্ত্রী ছালাত আদায় না করলে স্বামীর কর্তব্য হল- স্ত্রীকে ছালাতের নির্দেশ দেয়া এবং এ ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করা। যদি স্ত্রী একেবারেই ছালাত না পড়ে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। যদি কখনো পড়ে, কখনো ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকে নরমভাবে নছীহত, শিক্ষা ও সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে ত্বালাক্ব দেয়া বৈধ। ত্বালাক্ব দিলে স্ত্রীর প্রাপ্য মুয়াখ্খার মোহরসহ সব অধিকার আদায় করা স্বামীর ওপর আবশ্যক। কিছু ক্ষেত্রে খুলার মাধ্যমে মোহরের সব বা কিছু অংশ পরিত্যাগ করে বিচ্ছেদও হতে পারে (ফাতাওয়া সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২১৪৭৭৯)


প্রশ্নকারী : এ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম, ঢাকা।





প্রশ্ন (৬) : খাদ্য ও পানীয় হারাম হলে দু‘আ কবুল হবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৪) : ইসলামে ছেলেদের পোশাক-পরিচ্ছেদ কেমন হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৮) : জীবনে অনেক পাপ করেছে এমন ব্যক্তি কোন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। এখন তওবা করলে পাপ ক্ষমা হবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২০) : গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের জন্য অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব বা যা ইসলামে হারাম করা হয়েছে সেসবের ডিজাইন করতে হয়। আবার কোন সময় গানের ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে হয়। এক্ষেত্রে কেউ গান শুনলে ডিজাইনার কি গুনাহ পেতে থাকব? আবার বিদেশী নারী ক্লায়েন্টের জন্য বিদেশী নারীদের ছবি ডিজাইনের কাজ করতে হয়। প্রশ্ন হল- এরকম ডিজাইনের কাজ করা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৬) : প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদ অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করার পর নবী (ﷺ)-এর উপর দুরূদ পাঠ করা যাবে কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩) : জনৈক বক্তা বলেন, আশূরার দিনেই ক্বিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত দাবী কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৪) : জান্নাতে কি রাত দিন হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৯) : রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পাঠ করতে ভুলে যাবে, সে জান্নাতের পথ ভুলে যাবে’ মর্মে বর্ণনাটি কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৬) : ছিয়ামের ফিদিয়া কোন্ ব্যক্তি পাবে? কতটুকু দিতে হবে এবং কোন্ খাদ্য দিয়ে আদায় করতে হবে? খাদ্যের পরিবর্তে টাকা দিয়ে আদায় করা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩০) : ঋতুবতী মহিলাদের কুরআন তেলাওয়াত করার বিধান কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৪) : টিভিতে বিভিন্ন ইসলামিক অনুষ্ঠান দেখে আমরা উপকৃত হই। কিন্তু অধিকাংশ সময় টিভির প্রতিটা চ্যানেলে বেপর্দা নারীদের বিজ্ঞাপন ও বাজনা চলে। দেখতে না চাওয়া সত্ত্বেও বেপর্দা নারীর দিকে দৃষ্টি চলে যায়। এমতাবস্থায় করণীয় কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩) : পবিত্র কুরআন ওযূ ছাড়া স্পর্শ যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ

ফেসবুক পেজ