শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন
উত্তর : রাসূল (ﷺ)-এর হাদীছের অনুসরণ করা ফরয। এটা আল্লাহর নির্দেশ, যা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
(১) ‘কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে, অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের অন্তরে কোন দ্বিধা থাকবে না এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়’ (সূরা আন-নিসা : ৬৫)।
(২) ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক’ (সূরা আল-হাশর : ৭)।
(৩) ‘আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। তা তো অহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়’ (সূরা আন-নাজম : ৩-৪)।
(৪) ‘আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশিত হওয়ার পরও যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কতই না মন্দ আবাস!’ (সূরা আন-নিসা : ১১৫)।
(৫) ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। বস্তুত আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)।

তাছাড়া ‘সুন্নাহ’-কে অস্বীকার করলে বা অবহেলা করলে, ইসলামে তার কোন অংশ নেই (মাজাল্লাতুল মানার, ৩০/৬৭৩ পৃ.)। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত মতানুযায়ী হাদীছ অস্বীকারকারীরা কাফির। যথা :
(১) ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধ্বংস অনিবার্য’ (শারহু উছূলি ই’তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল-জামা‘আহ, ৩/৪৭৮ পৃ.)।
(২) ইমাম ইসহাক্ব বিন রাহওয়াইহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এমন প্রত্যেক ব্যক্তি যার কাছে রাসূল (ﷺ)-এর কোন একটি ছহীহ হাদীছ পৌঁছেছে, অতঃপর সে কোন ভয়ের আশঙ্কা ছাড়াই তাকে অস্বীকার করেছে, তবে সে নিশ্চিতরূপে কাফির’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ৪/১৯ পৃ., ফৎওয়া নং-১১৫১২৫)।
(৩) শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা মনে করে যে, রাসূল (ﷺ)-এর  আনুগত্য করা অপরিহার্য নয়, তারা কাফির, তাদের হত্যা করা ওয়াজিব’ (আল-ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা লি ইবনি তাইমিয়্যাহ, ১/৩১৫ পৃ.)।
(৪) ইমাম ইবনু দাক্বীক্ব আল-ঈদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘রাসূল (ﷺ)-এর  হাদীছ ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হওয়ার পরেও যারা তা প্রত্যাখ্যান করে তারা স্পষ্ট কাফির’ (শারহুল ইলমাম, ২/১৭৭-১৭৮ পৃ.)।
(৫) সঊদীর আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন, ‘যারা সুন্নাত অনুযায়ী আমাল করাকে অস্বীকার করে তারা কাফির’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৩/১৯৪ ও ৫/১৯-২০ পৃ.)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ‘সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি ঔদাসীন্য ও বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩)।

তিনি অন্যত্র বলেন, مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللهَ ‘যে আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ তা‘আলারই আনুগত্য করল। আর যে আমার নাফরমানী করল, সে আল্লাহ তা‘আলারই নাফরমানী করল’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৫৭, ৭১৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৫)। সুতরাং ১০০% কুরআন ও হাদীছ মেনে চলতে হবে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হল, মানা আর আমল করা এক জিনিস নয়। মানা বলতে বুঝায়: স্বীকৃতি দেয়া, প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত প্রত্যেকটি আয়াত ও হাদীছকে স্বীকৃতি দিতে হবে। ইমাম সুয়ূত্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা নবী (ﷺ)-এর হাদীছকে অস্বীকার করে তারাও কাফির এবং তারা ইসলামের গণ্ডি ও চৌহদ্দি থেকে নিষ্কাশিত হয়ে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান অথবা অন্য কোন বিধর্মী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে’ (মিফতাহুল জান্নাহ ফিল ইহতিজাজি বিস সুন্নাহ, পৃ. ১৪)।

প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহেল কাফী, ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন (২) : আমি একটি প্রাইমারী স্কুলে চাকরি করি। চাকরি পরীক্ষায় অন্যজন থেকে কিছু প্রশ্ন দেখে লিখেছিলাম। আর বায়োডাটায় একটা মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলাম। বর্তমানে আমি ঐ বায়োডাটা ও পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি হয়েছে। প্রশ্ন হল- ঐ চাকরির টাকা কী আমার জন্য হালাল হবে?
উত্তর : এটি এক প্রকারের প্রতারণা। চাকরী, পরীক্ষায় নকল করা বা চিট করা, স্কলারশিপ, ক্রয়-বিক্রয় বা অন্য যে কোন বিষয়ে ধোঁকা দেয়া হারাম। এর ফলে দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي ‘যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১-১০২)। শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

الغش محرم في الاختبارات ، كما أنه محرم في المعاملات ، فليس لأحد أن يغش في الاختبارات في أي مادة ، وإذا رضي الأستاذ بذلك فهو شريكه في الإثم والخيانة

‘পরীক্ষায় নকল করা বা ধোঁকা দেয়া হারাম, যেরকম তা হারাম ব্যবসা-বাণিজ্যে, পরীক্ষায় কারোর জন্য কোন বিষয়ে নকল করা বা টুকলি করা বৈধ নয়। যখন কোন শিক্ষক তাতে সহযোগিতা করে, তখন সেও গুনাহ এবং খিয়ানতে অংশীদার হয়ে যায়’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৬/৩৯৭ পৃ.)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الغش في الامتحانات محرم ، بل من كبائر الذنوب ‘পরীক্ষায় নকল করা হারাম, বরং এটা কাবীরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত’ (ফাতাওয়া নূরু ‘আলাদ-দারব, ২/২৪ পৃ.)। এখন ভুল বুঝতে পারার পর যেহেতু সংশোধনের সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে আপনি কী করবেন? শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম শাত্বিবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এক্ষেত্রে আপনাকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট খালেছ অন্তরে তাওবাহ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা খালিছ তাওবাহর মাধ্যমে শিরকের মত ধ্বংসাত্মক, হত্যার মত মারাত্মক ও ব্যভিচারের মত জঘন্য গুনাহকেও ক্ষমা করার ঘোষণা করেছেন। যে ব্যক্তি স্বচ্ছ ও পবিত্র অন্তরে একনিষ্ঠ ও একাগ্রতার সহিত খালিছ তাওবাহ করে আল্লাহ তার তাওবাহ ক্ববুল করেন’ (গিযাউল আলবাব, ২/৫৮১; আল-ই’তিছাম, ২/২৮১; মাজাল্লাতুল বুহূছিল ইসলামিয়্যাহ, ১৪/১৮৩-১৮৫ পৃ.)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তবে যারা তাওবাহ করে, বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের পাপকর্মগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ্ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা ফুরক্বান : ৬৮-৭)। অতএব আপনাকে বেশি-বেশি তাওবাহ, ইস্তিগফার, আমলে ছালিহ, ছালাত আদায়, ছাদাক্বা ইত্যাদি করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ পরীক্ষায় নকল করে বা চিট করে অর্জিত সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকুরী করে প্রাপ্ত বেতনের অর্থ হালাল হবে কি-না? এর উত্তরে শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘সর্ব প্রথমে পূর্বের পাপের জন্য তার উপর তাওবাহ করা অপরিহার্য। অতঃপর উক্ত সার্টিফিকেট দেখিয়ে হালাল চাকুরী করা তার জন্য বৈধ’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২৭৯১২৯)। শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, একজন ব্যক্তি একটি সনদের ভিত্তিতে চাকরি করছে, অথচ এই সনদের পরীক্ষায় সে প্রতারণা করেছিল। এখন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, সে এই কাজ ভালোভাবেই করছে। তার বেতনের হুকুম কী হবে, হালাল না হারাম? উত্তরে তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ কোনো দোষ নেই। তবে পরীক্ষায় প্রতারণা করার কারণে তার উচিত আল্লাহর নিকট তাওবাহ করা। আর যদি সে কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করে থাকে, তাহলে তার উপার্জনের দিক থেকে কোন সমস্যা নেই, তবে সে পূর্বে যে প্রতারণা করেছে সেটি ভুল ছিল, আর তার উচিত সে ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কঠোরভাবে তাওবাহ করা’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৯/৩১ পৃ.)। এমন প্রশ্নের উত্তরে সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলেমগণ বলেন, এই কাজের বিনিময় স্বরূপ আপনি যে অর্থ উপার্জন করবেন, তার দ্বারা আপনার লাভবান বা উপকৃত হওয়া দোষনীয় নয়, কারণ আপনি যে বেতন নিয়েছেন তা পাঠদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছেন, এটি জায়েয’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১২/১৫৬ পৃ.)।


প্রশ্নকারী : সাবরিনা আমীন নীলা, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন (৩) : যেসব ইয়াতীম খানা এবং মাদরাসায় বিদ‘আতী কর্মকাণ্ড চলে, বিদ‘আতী শিক্ষক দ্বারা পাঠদান হয়। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সাহায্য চাইলে কি সাহায্য করা যাবে?
উত্তর : এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক সাহায্যে করা যাবে না। কারণ শিরকের পর সর্বাধিক ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক গুনাহের নাম বিদ‘আত। রাসূল (ﷺ) এর ভয়াবহতা সম্পর্কে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেউ আমাদের এই দ্বীনের অংশ নয় এমন কিছু উদ্ভাবন করলে বা অনুপ্রবেশ ঘটালে তা পরিত্যাজ্য- প্রত্যাখ্যাত’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মীয় কাজের মধ্যে এমন বিষয় উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই (দলীলবিহীন), তা অগ্রহণযোগ্য’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।

রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ أحْدَثَ فِيْهَا حَدَثًا أوْ آوَى فِيْهَا مُحْدِثًا، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أجْمَعِيْنَ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ ‘যে কেউ দ্বীনের ব্যাপারে বিদ‘আত উদ্ভাবণ করে কিংবা কোন বিদ‘আতীকে আশ্রয় দেয় কিংবা সাহায্য করে তার উপর আল্লাহ তা‘আলার, ফেরেশতাদের ও সকল মানব জাতির লা‘নত ও অভিসম্পাত। তার কোন ফরয কিংবা নফল ইবাদত গৃহীত হবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৭০; আবূ দাঊদ, হা/২০৩৪)। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেছেন, ‘তোমরা নেককাজ ও তাক্বওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য কর এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যধিক কঠোর’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ২)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাতে ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) ও কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এখানে আল্লাহ তা‘আলা মুমিন ব্যক্তিদেরকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে আদেশ করেছেন এবং অন্যায়, অসৎ, হারাম ও বিদ’আতী কাজে সাহায্য সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন (তাফসীর ইবনু কাছীর, ২/১২; তাফসীরে কুরতুবী, ৬/৪৬-৪৭ পৃ.)। উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, বিদ‘আতে সাহায্যকারী হিসাবে গুনাহগার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

অজ্ঞতাবশত সাহায্য করে ফেললে ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট তাওবাহ করতে হবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা খালিছ তাওবাহর মাধ্যমে শিরকের মত ধ্বংসাত্মক, হত্যার মত মারাত্মক ও ব্যভিচারের মত জঘন্য গুনাহকেও ক্ষমা করার ঘোষণা করেছেন। যে ব্যক্তি স্বচ্ছ ও পবিত্র অন্তরে একনিষ্ঠ ও একাগ্রতার সাথে খালিছ তাওবাহ করে আল্লাহ তার তাওবাহ কবুল করেন (গিযাউল আলবাব, ২/৫৮১; আল-ই’তিছাম, ২/২৮১; মাজাল্লাতুল বুহূছিল ইসলামিয়্যাহ, ১৪/১৮৩-১৮৫ পৃ.)।


প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বী, বরিশাল।
প্রশ্ন (৪) : আমার একটি পাঠা ছাগল আছে, যেটি আমি প্রজননের জন্য রেখেছি। আশেপাশের লোকজন তাদের ছাগলকে প্রজনন করানোর জন্য নিয়ে আসে এবং এজন্য তারা আমাকে কিছু টাকা দেয়। এটা গ্রহণ করা জায়েয হবে কী?
উত্তর : পুরুষ পশু দ্বারা প্রজনন করানোর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হারাম। এতে গর্ভধারণ শর্ত করা হোক বা না হোক- উভয় অবস্থাতেই নিষিদ্ধ। কারণ এ বিষয়ে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা এসেছে এবং উভয় ক্ষেত্রেই নিষেধের কারণ বিদ্যমান। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, বাশুত শামরান এলাকায় প্রায় দুই হাজারের বেশি গাভী আছে, কিন্তু কোনো ষাঁড় নেই। সেখানে একজন ব্যক্তির কাছে একটি ষাঁড় পাওয়া গেলে আমরা তার কাছে ষাঁড় চাইলে তিনি ভাড়া নিতেও অস্বীকার করেন এবং বলেন- এ ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক নেয়া হারাম। প্রশ্ন হল, কেউ যদি একটি ষাঁড় নিয়ে গাভীর মালিকদের কাছে ভাড়ায় দেয়, তা কি হারাম? উত্তরে তাঁরা বলেন, গাভীর প্রজননের জন্য ষাঁড় ভাড়া দিয়ে পারিশ্রমিক নেয়া বৈধ নয়, কারণ নবী (ﷺ) ষাঁড়ের ‘আসব’ বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। ‘আসব’ বলতে তার বীর্য বোঝানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গাভীর মালিকরা যৌথভাবে হলেও নিজেদের জন্য একটি ষাঁড় কিনে নিতে পারেন (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৫/৭৫ পৃ.)। আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (ﷺ) পশুকে পাল দেয়া বাবদ বিনিময় নিতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/২২৮৪; তিরমিযী, হা/১২৭৩)। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) উটের প্রজনন বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৬৫; নাসাঈ, হা/৪৬৭০)।

তবে শর্তহীনভাবে সম্মানী বা হাদিয়া স্বরূপ কিছু গ্রহণ করা যেতে পারে (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৫/৭৪-৭৫ পৃ.)।

হাফিয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ফাৎহুল বারী-তে বলেন,

وَأَمَّا عَارِيَة ذَلِكَ فَلَا خِلَاف فِيْ جَوَازه, فَإِنْ أُهْدِيَ لِلْمُعِيرِ هَدِيَّة مِنْ الْمُسْتَعِيْر بِغَيْرِ شَرْط جَازَ

‘তবে ফাহলকে বিনামূল্যে প্রজননের জন্য দেয়া বৈধ- এতে কোন মতভেদ নেই। আর যদি ব্যবহারকারী শর্ত ছাড়া কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কোন উপহার দেয়, তবে তা বৈধ’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৫০৩৬৭)। আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘পাল দেয়ার উদ্দেশ্যে ষাঁড় প্রদান করে মজুরী নেয়া প্রসঙ্গে নবী (ﷺ)-এর নিকট কিলাব গোত্রের এক লোক প্রশ্ন করলে, তিনি তা নিতে নিষেধ করেন। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা পাল দেয়ার উদ্দেশ্যে ষাঁড় দিই এবং আমাদেরকে (দাবি ব্যতীতই) পুরস্কার স্বরূপ কিছু দেয়া হয়। তিনি তাকে এ ধরণের পুরস্কার নেয়ার অনুমতি দেন’ (তিরমিযী, হা/১২৭৪, সনদ ছহীহ)।


প্রশ্নকারী : মুহাম্মাদ সাব্বির, দিনাজপুর।
প্রশ্ন (৫) : কিভাবে নফসের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
উত্তর : কুপ্রবৃত্তি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনের জন্যই বড় ক্ষতিকর। এটা মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই এর বিরুদ্ধে কঠিনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া প্রতিটি মানুষের উপর অপরিহার্য। আবু হাযিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, قَاتِلْ هَوَاكَ أَشَدَّ مِمَّا تُقَاتِلُ عَدُوَّكَ ‘তুমি তোমার শত্রুর বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধ করো, তার থেকেও অত্যধিক কঠোরতার সহিত তোমার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো’   (হিলয়াতুল আওলিয়া, ৩/২৩১ পৃ.)। এই খেয়াল-খুশিই সকল অশান্তি ও  বিশৃঙ্খলার মূল এবং সকল বিপদ-আপদের কারণ। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,

يَا نَفْسُ تُوْبِىْ فَإِنَّ الْمَوْتَ قَدْ حَانَا * وَاعْصِ الْهَوَى فَالْهَوَى مَا زَالَ فَتَّانَا

‘হে মন! তুমি তওবাহ কর, কেননা মরণ তো অতি নিকটে। আর খেয়াল-খুশির অবাধ্য হবে, কেননা খেয়াল-খুশি তো সব সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’ (কিতাবু মাজমু‘আতিল ক্বাসাইদিল যুহদিয়্যাত, ২/৯৫ পৃ.)। ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘যে তার কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করবে, সে প্রকারন্তরে দুনিয়াদার লোকদের দাসে পরিণত হবে’ (সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ১০/৯৭ পৃ.)।

দ্বিতীয়তঃ নফসের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের কয়েকটি উপায় হল:
(১) পাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা (তিরমিযী, হা/৩৫৯১; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৩২৯)।
(২) গোনাহের জায়গা ও সুযোগ থেকে দূরে থাকা : যে পরিবেশ বা মাধ্যম নফসকে উত্তেজিত করে, তা থেকে দূরে থাকা। যেমন নোংরা ম্যাগাজিন, পত্র-পত্রিকা, প্রেম-কাহিনীমূলক উপন্যাস, চলচ্চিত্র জগতের মডেল, অভিনেত্রী ও গায়িকাদের  উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ চিত্র। এমন স্থানে ভ্রমণে না যাওয়া যেখানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা। যেমন মেলা, সৌখিন বাজার, পার্ক ও সমুদ্র-সৈকতে। নচেৎ এ অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভবপর হবে না (সূরা আল-আন‘আম : ১৫১; সূরা আন-নূর : ১৯,৩১)।
(৩) দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা : গোনাহ ছেড়ে দেয়ার দৃঢ় মানসিকতা তৈরি করা। কারণ, চক্ষুই হল হৃদয়ের আয়না, যখন কোন জিনিস চোখে ভালো লাগে তখনই তার প্রতি অন্তরে কামনা-বাসনা উদিত হয়‌‌। ভিডিও, টিভি বা মোবাইলে সিনেমা, সিরিয়াল ও শর্ট বা রিল ভিডিও দেখা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। নচেৎ কুঁয়োতে বিড়াল রেখে বালতি-বালতি পানি তুলে ফেললেও যেমন পানি পবিত্র হবে না। অনুরূপভাবে আপনিও চক্ষুকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঐ কু-অভ্যাস ছাড়তে পারবেন না (সূরা আন-নূর : ৩০-৩১; ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৭; আবূ দাঊদ, হা/২১৪৯, ২১৫২; তিরমিযী, হা/২৭৭৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৭৪, ২২৯৯১, ২৩০২১)।
(৪) একাকী থাকা যাবে না। বিশেষ করে পূর্বে যৌন-উত্তেজক কোন কিছু নজরে পড়ে থাকলে নির্জনে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সুতরাং সৎ বন্ধু বা দ্বীনি ভাইদের সংস্পর্শে থাকতে হবে। যথাসম্ভব রাত্রীতেও তারই নিকট কবর, পরকাল, মুসলিমদের বর্তমান দুরবস্থা প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করতে করতে পৃথক বিছানায় ঘুমিয়ে যান। তবে একাকীত্ব দূর করতে কোন খারাপ বন্ধুর কাছে বসা বা রাত্রি যাপন করা যাবে না (তিরমিযী, হা/২১৬৫; ছহীহুল জামি‘, হা/২৫৪৬)।
(৫) নফসকে বৈধ কাজে ব্যস্ত রাখা : যেমন বিভিন্ন প্রকার ইবাদত ও যিকির-আযকারে নিজেকে ও নিজের অন্তরকে ব্যস্ত রাখতে হবে। দ্বীনি বই-পুস্তক পড়ুন, অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করুন, কুরআন অথবা ইসলামী বক্তৃতা শুনুন (তিরমিযী, হা/৩৩৭৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৭৯৩; ছহীহুল জামি’ হা/৭৭০০; ছহীহুত তারগীব, হা/১৪৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৬৮০, ১৭৬৯৮)।
(৬) তাক্বওয়া বৃদ্ধির আমল করা : নিয়মিত ওয়াক্তমত ছালাত আদায়, কুরআন পাঠ, সকাল-সন্ধ্যার যিকর ও নফল ছিয়াম নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমরা ছিয়াম রাখ, তবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২/১৮৩)।
(৭) নিজের কৃতকর্মের জন্য বেশি বেশি তাওবাহ-ইসতিগফার করতে থাকা (সূরা হূদ : ৩, ৫২; সূরা আন-নূহ : ১০-১২; সূরা আল-ফুরক্বান : ৭০-৭১)। প্রতিদিন ১০০ বার আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করা। এটি হৃদয় কোমল করে এবং গুনাহ কমিয়ে দেয়। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হল তারা যারা তাওবাহ করে’ (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫১)।
(৮) ভালো সঙ্গী নির্বাচন করা : ভালো সঙ্গী নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আর খারাপ সঙ্গী খারাপ পথে পরিচালিত করে। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের অনুসারী হয়। সুতরাং তার বন্ধু নির্বাচনের সময় এ বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত, সে কাকে বন্ধু নির্বাচন করছে’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৮৩৩)।
(৯) ধৈর্যধারণ করতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৬৯, ৬৪৭০)।


প্রশ্নকারী : আব্দুর রব, বরিশাল।
প্রশ্ন (৬) : আমি একজন সিএনজি চালক। দিনের বেলায় যে জায়গার ভাড়া ২০ টাকাÑ রাতের বেলায় সে একই জায়গায় অনেক চালক ৪০ টাকা নিয়ে থাকে। এভাবে রাতে ভাড়া বাড়ানো যাবে কি?
উত্তর : ভাড়া লাভজনক ব্যবসা। সুতরাং সময় ও পরিস্থিতির নিরিখে দু’জনের সম্মতিতে ভাড়া কম-বেশি করা জায়েয (আল-মুগনী, ৮/৫৪-৫৭; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৫/৯২; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮২৫৬৮)। ইসলামে ব্যবসার মূলনীতি হল- ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। তবে তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে বৈধ) (সূরা আন-নিসা : ২৯)। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘ক্রয়-বিক্রয় কেবল পারস্পরিক সম্মতিতে অনুষ্ঠিত হয়’ (ইবনু মাজাহ, হা/২১৮৫)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলেমগণ বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, অথচ আল্লাহ‌ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সূদকে হারাম করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৫)।

অতএব, উভয়ের পারস্পরিক সম্মতি ও চুক্তি অনুযায়ী তা বিক্রি করতে কোন অসুবিধা নেই, হোক তা এক-চতুর্থাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ মুনাফায়। তেমনিভাবে, নিজের পণ্যের বিক্রয়মূল্যে পার্থক্য থাকলেও তাতে কোন দোষ নেই। তবে শর্ত হল- ক্রেতার কাছে মিথ্যা বলবেন না যে, ‘অমুককে যত দামে বিক্রি করেছি, তোমাকেও তত দামে দিলাম’, অন্যজনের দামে-ই বিক্রি করলাম, অথচ বাস্তবে তার বিক্রয়মূল্য ভিন্ন। এতে যেন কোন প্রতারণা না থাকে। বাজারমূল্যের বিরোধিতা যেন না হয়। তবে তার উচিত সহনশীলতা ও সন্তুষ্টির গুণ ধারণ করা এবং নিজের জন্য যা পসন্দ করেন তা-ই তাঁর মুসলিম ভাইয়ের জন্যও পসন্দ করা। এতে কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। লোভ ও অতিরিক্ত লালসায় না জড়ানো উচিত, কারণ এগুলো সাধারণত হৃদয়ের কঠোরতা, স্বভাবের হীনতা ও চরিত্রের খারাপ দিক থেকে জন্ম নেয়’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৩/৮৮ পৃ.)।

শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মূল কথা হল- তার উপর দায়িত্ব আছে যেন সে তার ভাইয়ের প্রতি খিয়ানত ও প্রতারণা না করে। যদি বাজারে কোন পণ্যের দাম সস্তা ও পরিচিত হয়, যেমন নির্দিষ্ট কোন পণ্য, খাদ্যসামগ্রী বা বাসনপত্র, তাহলে তার জন্য জায়েয নয় যে সে তার মুসলিম ভাইকে প্রতারণা করে বেশি দামে বিক্রি করবে (ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ র্দাব ইবনে বায, ১৯/৫৩ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়া,ব ফৎওয়া নং-১৪৩০৬৭, ৫৮০৯৪১)।

সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হয় যে, পরিবেশ-পরিস্থিতিতে রাতে ভাড়া বাড়ানো যায়, যদি উভয় পক্ষ পরস্পর সন্তুষ্ট হয়ে এতে রাজি হয়। তবে এমন পরিমাণ বাড়ানো উচিত নয়, যাতে যাত্রীর উপর যুলুম হয়। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, رَحِمَ اللهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ وَإِذَا اشْتَرَى وَإِذَا اقْتَضَى ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির উপর রহমত বর্ষণ করুন, যে নম্রতার সাথে ক্রয়-বিক্রয় করে আর পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেও সহনশীলতা ও সহজতা অবলম্বন করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০৭৬)।


প্রশ্নকারী : সাজিদ বিন কামাল, কুমিল্লা।
প্রশ্ন (৭) : ইসলামের কোন ইখতিলাফী মাসআলা বিষয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ এ সমাধান থাকার পরেও ইজমা ও ক্বিয়াছের সমাধান খোঁজা যাবে কি? উক্ত বিষয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সমাধান জানার পরেও যারা ইজমা ও ক্বিয়াসের দোহাই দিয়ে তা অমান্য করে, তাদের হুকুম কি?
উত্তর : ইসলামী শরী‘আতের স্থিরীকৃত নীতিমালাসমূহের মধ্যে রয়েছে- لا اجتهاد مع النص ‘স্পষ্ট দলীল থাকতে ইজতিহাদ বা ক্বিয়াস চলবে না’। তাই এই প্রকারের ক্বিয়াসকে আলিমগণ ভ্রান্ত, অকেজো ও বিকৃত ক্বিয়াস হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃত মুসলিম কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহকেই যথেষ্ট মনে করবে (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৩২৭৮৭; কুয়েতী ফিক্বা বিশ্বকোষ, ৪১/২৪৮; আরশীফ মুলতাক্বা আহলিল হাদীছ, ১১২/৪৯৮ পৃ.)। কোন ইখতিলাফী মাসআলা বিষয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দলীল স্পষ্ট প্রমাণিত হওয়ার পরও যারা ইজমা’ ও ক্বিয়াসের বাহানায় সত্যকে অস্বীকার করে, জুমহূর আলেমের মতানুযায়ী তারা নিশ্চিতরূপে কাফির। বিশেষজ্ঞ আলেমগণের ইজমা অনুযায়ী যে ব্যক্তি কুরআনুল কারীমকে অথবা এর কিছু অংশকে, এমনকি যদি কেউ মাত্র একটি আয়াত অথবা অক্ষরকে অস্বীকার করে, তবুও সে কাফির (কাযী আয়ায, আশ-শিফা বি তা‘রিফি হুকূকিল মুছত্বাফা, ২/১১০৫; আত-তামহীদ, ৪/২৭৮-২৭৯; আল-মুহাল্লা, ১/৩২; আছ-ছারিমুল মাসলূল ‘আলা শাতিমির রাসূল, ৩/১১২১)।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, (১) ‘নিশ্চয় যারা তাদের নিকট কুরআন আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করে, (তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে)। আর এ অবশ্যই এক মহিমান্বিত গ্রন্থ’ (সূরা আল-ফুছছিলাত : ৪১)। তাদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(২) ‘আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করেছে, তারাই জাহান্নামবাসী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ১০, ৮৬)‌।
(৩) ‘আর তিনি ফুরক্বান (অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায়ের মীমাংসাকারী কুরআন) নাযিল করেছেন। নিশ্চয় যারা আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আর আল্লাহ্ মহা-পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী’ (সূরা আলে ইমরান : ৪)।
(৪) ‘নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি অচিরেই আগুনে প্রবিষ্ট করব। যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নতুন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (সূরা আন-নিসা: ৫৬; সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩৯, ৬১; সূরা আলে ইমরান : ১৯, ২১, ৭০, ৭৮; সূরা আন-নিসা : ১৪০; সূরা আল-আন‘আম : ২৭, ৩৩, ৪৯; সূরা আল-আ‘রাফ : ৩৬, ৩৭, ৪০, ১৪৭, ১৮২)।
(৫) আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, ‘কুরআন সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ কুফরী’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৩)। এমতাবস্থায় আক্বীদাগত কোন বিষয় প্রকাশ্যে অস্বীকার করলে সে কাফির হয়ে যাবে এবং তাওবাহ না করা পর্যন্ত তাকে কাফির বলা যাবে। যেমন আল্লাহর সাথে প্রকাশ্যে শিরক করা, প্রকাশ্যে কোন ফরয বিধানকে অস্বীকার করা, হারামকে হালাল মনে করা ইত্যাদি (আছ-ছারিমুল মাসলূল, ১/৫৯০ পৃ.)। অনুরূপভাবে ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) শী‘আ-রাফিযীদের সম্পর্কে বলেন, ‘যারা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নির্দোষিতা ও পবিত্রতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে অথবা তাঁকে গালিগালাজ করে আলেমগণের ঐকমত্যানুযায়ী তারা কাফির’ (তাফসীরুল কুরতুবী, ১২/২০৫; শারহু মুসলিম, ১৭/১১৭ পৃ.)। আর যদি কারণটি আমলগত হয় তাহলে তাকে কাফির বলা যাবে না; বরং কাবীরা গুনাহগার বলতে হবে। যেমন জাদু করা, আমলগত শিরক করা, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সহযোগিতা করা ইত্যাদি (শাইখ ইবনু উছাইমীন রচিত আল-ক্বাওলুল মুফীদ ‘আলা কিতাবিত তাওহীদ দ্রষ্টব্য)।

অনুরূপভাবে ‘সুন্নাহ’কে অস্বীকার করলে বা অবহেলা করলে, ইসলামে তার কোন অংশ নেই (মাজাল্লাতুল মানার, ৩০/৬৭৩ পৃ.)। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত মতানুযায়ী হাদীছ অস্বীকারকারীরা কাফির। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ‘সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি ঔদাসীন্য ও বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৫৩৪)। তিনি অন্যত্র বলেন, مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللهَ  ‘যে আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ তা’আলারই আনুগত্য করল। আর যে আমার নাফরমানী করল, সে আল্লাহ তা’আলারই নাফরমানী করল’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৫৭, ৭১৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৫)। অনুরূপভাবে ইমাম সুয়ূত্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যারা নবী (ﷺ)-এর হাদীছকে অস্বীকার করে তারাও কাফির এবং তারা ইসলামের গণ্ডি ও চৌহদ্দি থেকে নিষ্কাশিত হয়ে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান অথবা অন্য কোন বিধর্মী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে’ (মিফতাহুল জান্নাহ ফিল ইহতিজাজি বিস-সুন্নাহ, পৃ. ১৪)।

আর বিশুদ্ধ ‘ইজমা’ ইসলামী আইন প্রণয়নের অন্যতম উৎস। যদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সেক্ষেত্রে এটি একটি বাধ্যতামূলক শারঈ দলীল এবং কারোর পক্ষে এটির বিরোধিতা করা জায়েয নয়। কিছু শর্তসাপেক্ষে ‘ইজ্‌মা’ ও ‘ক্বিয়াস’ দু’টিই শারঈ দলীল হিসাবে বিবেচিত। তাই শর্তগুলো ভালভাবে বুঝা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ্র পরের স্থান হল ইজমার, আর ইজমার পরের স্থান হল ক্বিয়াসের। ইমাম জারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, هو إتفاق مجتهدي هذه الأمة بعد النبي صلى الله عليه وسلم على حكم شرعي ‘ইজ্মা হল- রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশার পর শারঈ কোন হুকুমের বিষয়ে এ উম্মতের মুজতাহিদগণের ঐকমত্য পোষণ করা’ (আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬/৩৭৯ পৃ)।  পরিভাষায় শাইখ উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, إتفاق (ঐকমত্য) শব্দ দ্বারা ‘মতভেদের অস্তিত্ব বের হয়ে গেছে। যদিও মতানৈক্য একজন বিদ্বানের পক্ষ থেকে হয়। কাজেই কোন বিষয়ে মতানৈক্য বিদ্যমান থাকলে সে বিষয়ে ইজমা সংঘঠিত হবে না। মুজতাহিদগণ (مجتهدي) শব্দ দ্বারা সাধারণ মানুষ ও মুকাল্লিদগণ বের হয়ে গেছে। কাজেই সাধারণ লোকদের একমত হওয়া বা ভিন্নমত পোষণ করা ধর্তব্য হবে না। এ উম্মাতের (هذه الامة) অংশ দ্বারা অন্য জাতির ঐকমত্য বের হয়ে গেছে। সুতরাং ভিন্ন জাতির ঐকমত্য শরী‘আতে ধর্তব্য হবে না। রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশার পর (بعد النبي صلى الله عليه وسلم) অংশ দ্বারা তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর (ছাহাবীদের) ঐকমত্য বের হয়ে গেছে। সেগুলো স্বয়ং সম্পন্নভাবে দলীল হওয়ার কারণে তা ইজমা’ হিসাবে অভিহিত হবে না। কেননা, রাসূল (ﷺ)-এর কথা, কাজ, মৌন সম্মতি ও অনুমোদনের সুন্নাহ দ্বারাই দলীল অর্জিত হয়। এজন্য ছাহাবীরা যখন বলেন, আমরা রাসূল (ﷺ)-এর যুগে এরূপ করতাম অথবা তাঁরা এরূপ করতেন। এগুলো বিধানগতভাবে মারফূ‘ হাদীছ, ‘ইজমার বিবরণ’ নয় (আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ১/২১৩ পৃ.)। শারঈ কোন হুকুমের বিষয়ে (على حكم شرعي ) অংশ দ্বারা জ্ঞানগত কিংবা প্রকৃতিগত বিষয়ে ঐকমত্য বের হয়ে গেছে। এখানে এসবের কোন অনুপ্রবেশ নেই। কেননা, ‘ইজমা’ শরী‘আতের একটি দলীল এখানে আলোচ্য বিষয় এটিই (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২০২২৭১)।

কুরআন, সুন্নাহ ও ছাহাবীদের মন্তব্যের ভিত্তিতে ‘ইজ্মা’ শারঈ দলীল হিসাবে বিবেচিত। তন্মেধ্যে অন্যতম দলীল নিম্নরূপ :
(১) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশিত হওয়ার পরও যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কতই না মন্দ আবাস!’ (সূরা আন-নিসা : ১১৫)। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) সুবিবেচনা এবং দীর্ঘ চিন্তার পরে বলেন, এই আয়াতটি ইজমাকে দলীল হিসাবে প্রমাণ করেছে এবং এর বিরোধিতাকে হারাম করেছে। আর এটিই সর্বাধিক উত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী মতামত (তাফসীরে ইবনে কাছীর, ২/৪১৩ পৃ.)। উপরিউক্ত আয়াত মুমিনদের পথ ও পদ্ধতির আনুগত্য করাকে অপরিহার্য করেছে এবং তাদের বিরোধিতা করা সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করেছে। সুতরাং এখান থেকেই তাঁদের ইজমা’ প্রতিষ্ঠিত হয় (আল-ফুছূল ফিল উছূল, ৩/২৬২ পৃ.)।শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই উম্মতের ইজমা দলীল হিসাবে স্বীকৃত (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৮/১২৫ পৃ.)। অতএব যারা মুমিনদের পথের অনুসরণ করে না, আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য শাস্তির ঘোষণা করেছেন। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, মুমিনদের আনুগত্য করা অপরিহার্য। এটি এমন একটি বিষয় যার উপর আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৯৭৯৩৭)।

(২) আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَ کَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا ‘এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে’ (সূরা আল-বাক্বারা : ১৪৩)। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মানুষের জন্য সাক্ষী হতে পারো’ এটি মানুষের কর্মের বিধানের সাক্ষ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন জানাযার ছালাতের সাক্ষ্যকে আল্লাহ তা‘আলা গ্রহণ করেন। ফলে সাক্ষীর কথা গ্রহণযোগ্য’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া ১৯/১৭৭-১৭৮ পৃ.)।
(৩) আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡہُ اِلَی اللّٰہِ وَ الرَّسُوۡلِ ‘অতঃপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হও, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন কর’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)। শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, সুতরাং আয়াতটি প্রমাণ করে যেসব ব্যাপারে তাঁরা ঐকমত্য পোষণ করেন, সেগুলো আর প্রত্যাবর্তন করতে হবে না, অতএব সেগুলো হক্ব বা সত্য (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৯৭৯৩৭)।
(৪) রাসূল (ﷺ) বলেছেন,

‏إِنَّ اللهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِيْ أَوْ قَالَ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ ﷺ عَلَى ضَلَالَةٍ

‘আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতকে অথবা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মকে কখনোও পথভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না’ (তিরমিযী, হা/২১৬৭; আবূ দাঊদ ,হা/৪২৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৩৯৫০; ছহীহুল জামি‘, হা/১৮৪৮; তাখরীজুস সুন্নাহ, হা/৮২)। উপরিউক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতকে গোমরাহী অথবা ভ্রান্তির উপর ঐকমত্য হওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন (আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬/৩৯৬ পৃ.)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, কোন বিষয়ে এ উম্মতের ঐকমত্য পোষণ করা হয়ত হক্ব হবে, না হয় বাতিল হবে। যদি হক্ব হয় তাহলে সেটি দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য। আর যদি বাতিল হয়, তাহলে এটি কিভাবে হতে পারে যে, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাবান এ উম্মত আল্লাহর নবী (ﷺ)-এর পর হতে ক্বিয়ামত পর্যন্ত একটি বাতিল বিষয়ের উপর ঐকমত্য পোষণ করবেন, যে বিষয়ের ব্যাপারে আল্লাহ সন্তুষ্ট নন? এটা তো বড়ই অসম্ভব বিষয়! (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল লিইবনি উছাইমীন, ১১/৬৩ পৃ.)।  ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, تسوية فرع بأصل في حكم لعلة جامعة بينهما ‘ক্বিয়াস হল কোন হুকুমের ক্ষেত্রে মূল দলীল ও শাখাগত দলীলের মাঝে সমন্বয়কারী ইল্লাত (হুকুমের কারণ) থাকার কারণে উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা’ (রওযাতুল নাজীর ওয়া জান্নাতুল মানাজীর, ২/১৪১ পৃ.)। সুতরাং শাখা (الفرع) দ্বারা উদ্দেশ্য যাকে ক্বিয়াস করা হয়। মূল (الأصل) দ্বারা উদ্দেশ্য যার উপর অন্যকে ক্বিয়াস করা হয়। বিধি-বিধান (الحكم) হল শারঈ দলীল যা বিধি-বিধান দাবী করে। যেমন, ওয়াজিব, হারাম, ছহীহ ও ফাসিদ প্রভৃতি। কারণ (العلة) হল ঐ অন্তর্নিহিত অর্থ, যার কারণে মূল (الأصل) এর হুকুম সাব্যস্ত হয়। এ চারটি হল ক্বিয়াসের রুকন বা ভিত্তি (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২০২২৭১)।

শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কুরআন, সুন্নাহ ও ছাহাবীদের মন্তব্যের ভিত্তিতে ক্বিয়াস শারঈ দলীল হিসাবে বিবেচিত। তন্মেধ্যে অন্যতম দলীল হল-
(১) আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اَللّٰہُ  الَّذِیۡۤ  اَنۡزَلَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ وَ الۡمِیۡزَانَ ‘আল্লাহ সেই সত্তা যিনি সত্যতা সহ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনি আরও অবতীর্ণ করেছেন ন্যায়দণ্ড’ (সূরা আশ-শূরা : ১৭)। ন্যায়দণ্ড বা দাঁড়িপাল্লা হল- যার দ্বারা বিভিন্ন জিনিস ওযন করা হয় এবং সেগুলোর মাঝে তুলনা করা হয়।
(২) আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, کَمَا بَدَاۡنَاۤ  اَوَّلَ خَلۡقٍ نُّعِیۡدُہٗ ‘যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবেই আমি দ্বিতীয় বার সৃষ্টি করব’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ২১৪)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর সে বায়ু মেঘমালা সঞ্চারিত করে। অতঃপর আমি তা মৃত ভূখণ্ডের দিকে পরিচালিত করি। অতঃপর তদ্বারা সে ভূখণ্ডকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করে দেই। এমনিভাবেই হবে পুনরুত্থান’ (সূরা আল-ফাতির : ৯)। উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি জীবকে পুনরায় সৃষ্টি করাকে প্রথমবার সৃষ্টি করার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন এবং মৃত ব্যক্তিদেরকে জীবিত করাকে জমিন জীবিত করার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন। মূলত এটিই হল- ‘ক্বিয়াস’।
(৩) ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার মা মারা গেছেন এবং তার এক মাসের ছিয়াম বাকি আছে। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে এটা আদায় করে দিব? তখন তিনি বললেন, যদি তোমার মায়ের উপর ঋণ থাকত, তাহলে তুমি কি তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করে দিতে? সে বলল, হ্যাঁ। উত্তরে তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহ্র ঋণ তো পরিশোধিত হবার সবচেয়ে বেশী দাবীদার’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৫৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৪৮)।
(৪) আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার একটি কালো সন্তান জন্মেছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কিছু উট আছে কি? সে জবাব দিল হ্যাঁ। তিনি বললেন, সেগুলোর রং কেমন? সে বলল, লাল। তিনি বললেন, সেগুলোর মধ্যে কোনটি ধূসর বর্ণের আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে সেটিতে এমন রং কোত্থেকে এলো। লোকটি বলল, সম্ভবত পূর্ববর্তী বংশের কারণে এমন হয়েছে। তিনি বললেন, তাহলে হতে পারে, তোমার এ সন্তানও বংশগত কারণে এমন হয়েছে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩০৫, ৬৮৪৭, ৭৩১৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫০০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭২৬৮)। কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত এ রকম প্রতিটি দৃষ্টান্তই ক্বিয়াসের উপর প্রমাণ বহন করে। কেননা এতে কোন জিনিসকে তার সমজাতীয় জিনিসের পর্যায়ভুক্ত করার বিষয়টি নিহিত আছে। (আল-ফুছূল ফিল উসূল ৪/৪৮ পৃ.)।
(৫) শাসন কার্য ফয়সালার ক্ষেত্রে আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশ্যে চিঠিতে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘তারপর তোমার বুঝ, যা তোমার কাছে প্রতিভাত হয়, তদানুযায়ী ফায়সালা করবে। যে মাসআলার ব্যাপারে কুরআন-হাদীছে কোন দলীল নেই তা তোমার কাছে পেশ করা হলে তুমি ঐ সব মাসআলাকে অন্যান্য বিষয়ের সাথে ক্বিয়াস বা পারস্পরিক তুলনা করবে এবং উপমা সম্পর্কে জ্ঞান রাখবে। তারপর তোমার ধারণানুসারে যা আল্লাহর নিকট অধিকতর প্রিয় এবং হক্বের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, তার উপরই নির্ভর করবে’ (বাইহাক্বী, ১০/১১৫; দারাকুৎনী, ৪/২০৬-২০৭)। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত মর্যাদাবান চিঠি, যা উম্মাহ গ্রহণ করে নিয়েছেন। ইমাম মুযনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ছাহাবীদের যুগ থেকে তার যুগ পর্যন্ত সকল ফক্বীহ্ একমত যে, ‘নিশ্চয় হক্বের অনুরূপ জিনিসও হক্ব এবং বাতিলের অনুরূপ জিনিসও বাতিল হিসাবে বিবেচিত। এবং তারা ফিক্বহের সকল বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে ক্বিয়াসের ব্যবহার করছেন (ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮৬ পৃ.)।

উল্লেখ্য, অনেক আলিম বলেন, ক্বিয়াসকে ক্বিয়াস না বলে ইজতিহাদ বলা অধিক সুসংগত। কেননা ইজতিহাদ হাদীছের স্পষ্ট শব্দ দ্বারা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে ক্বিয়াস বা অনুমানের মধ্যে এক প্রকারের শিথিলতা আছে। ইজতিহাদের সংজ্ঞা: ইজতিহাদের আভিধানিক অর্থ হল- কষ্টকর কোন কিছু পাওয়ার জন্য চেষ্টায় নিয়োজিত থাকা। পারিভাষিক অর্থ- بذل الجهد لإدراك حكم شرعي ‘শারঈ কোন হুকুম জানার জন্য চেষ্টায় নিয়োজিত থাকাকে ইজতেহাদ বলে’। যিনি এ ধরণের চেষ্টায় নিয়োজিত থাকেন, তাকে মুজতাহিদ বলে। আমর ইবনুল ‘আছ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তিনি রাসূল (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ ‘কোন বিচারক ইজতিহাদে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছলে তার জন্য আছে দু’টি পুরস্কার। আর বিচারক ইজতিহাদে ভুল করলে তার জন্যও রয়েছে একটি পুরস্কার’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৬)।


প্রশ্নকারী : মোস্তফা মনোয়ার অনিক, হারাগাছ, রংপুর।
প্রশ্ন (৮) : কিডনি বা চক্ষু বিক্রি করা কি জায়েয?
উত্তর : ‘মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা জায়েয নয়; বরং হারাম (মাজমা‘ আল-ফিক্বহী)। হারাম হওয়ার প্রমাণসমূহ- (ক) মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার ব্যক্তিগত মালিকানাভুক্ত নয়। শরী‘আত তাকে এগুলো বিক্রি করার অনুমতি দেয়নি। সুতরাং মানব অঙ্গ বিক্রি করা এমন কিছুর অন্তর্ভুক্ত, সে নিজে যার মালিক নয়। রাসূল (ﷺ) বলেন, لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ ‘তোমার কাছে যা নেই তা বিক্রি করো না’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫০৩; তিরমিযী, হা/১২৩২)। (খ) মানুষের অঙ্গ বিক্রি করার মধ্যে মানুষের অবমাননা রয়েছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন। অতএব এই কাজ শরী‘আতের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এই কারণেই আমরা দেখি যে, অধিকাংশ ফক্বীহ মানব অঙ্গ বিক্রির হারাম হওয়ার কারণ হিসাবে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মানুষের সম্মানিত হওয়াকে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি,... এবং অনেকের উপর তাদেরকে যথেষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৭০)।

ইমাম শাত্বিবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘প্রাণ সংরক্ষণ এবং বুদ্ধি ও দেহের পরিপূর্ণতা- এগুলো বান্দাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার অধিকার; বান্দাদের নিজস্ব অধিকার নয়। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বান্দার জীবন, দেহ ও বুদ্ধিকে পরিপূর্ণ করে দেন- যার মাধ্যমে সে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে- তখন বান্দার পক্ষে তা বাতিল বা পরিত্যাগ করা ছহীহ নয়’ (আল-মুওয়াফাকাত, ২/৩৭৬ পৃ.)। ‘রাওদাতুত্ব ত্বালিবীন’ গ্রন্থে এসেছে, ‘কারো জন্য বৈধ নয় যে সে নিজের জন্য অন্য কোন নিরাপদ ব্যক্তির অঙ্গ কেটে নেবে; আবার কোন ব্যক্তির জন্যও বৈধ নয় যে সে নিজ অঙ্গ কেটে কোন বিপন্ন ব্যক্তিকে দেবে’ (রাওদাতুত্ব ত্বালিবীন, ৩/২৮৫)। শাইখ আলাউদ্দীন আল-হাছকাফী (রাহিমাহুল্লাহ) যে জিনিসগুলো বিক্রি করা জায়েয নয়- তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘মানুষের চুল (বিক্রি করা জায়েয নয়), আদম সন্তানের সম্মানের কারণে- যদিও সে কাফির হয়’ (আলাউদ্দীন আল-হাছকাফী, আদ্-দুররুল মুখতার, ২/৬৪ পৃ.)। ‘মুগনী আল-মুহতাজ’ গ্রন্থে এসেছে, ‘নিশ্চিতভাবে হারাম- কোন ব্যক্তির জন্য তার নিজের দেহের কোন অংশ কেটে তা অন্য কোনো বিপন্ন ব্যক্তিকে দেয়া’ (মুগনী আল-মুহতাজ, ৪/৪০০ পৃ.)। ‘মাজাল্লাতুল মাজমা‘ এ এসেছে, ড. আল-বার বলেন, ‘স্বাধীন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা জায়েয নয়- এ বিষয়ে ফক্বীহগণ একমত (মাজাল্লাতুল মাজমা, সংখ্যা ৪, ১ম খণ্ড, পৃ. ১)।


প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বি, বরিশাল।
প্রশ্ন (৯) : গ্রাম বা শহরে বিবাহ অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়া শেষে বর/কনে পক্ষকে উপহার দেয়ার চিরাচরিত নিয়মটা ইসলাম কতটুকু সমর্থন করে? সমাজ রক্ষার্থে ঐখানে গিয়ে বাধ্য হয়ে কোন উপহার দিলে পাপ হবে কি?
উত্তর : বর্তমানে উপহার প্রদানের প্রচলনটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এটা শরী‘আত সম্মত নয়। কারণ এই দাওয়াতে ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয় দামী উপহারের আশায়। আর গরীবদের বঞ্চিত করা হয়। এটা শরী‘আতে নিষিদ্ধ। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘নিকৃষ্ট আহার হল ওয়ালীমার ঐ আহার, যাতে কেবল ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয় এবং গরীবদের বাদ দেয়া হয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩২)। অতএব দামী উপহারের আশায় শুধু ধনীদের দাওয়াত দেয়া নিষিদ্ধ। ওয়ালীমাকে ব্যবসার অনুষ্ঠানে পরিণত করা যাবে না। যেখানে চেয়ার টেবিল নিয়ে উপহার গ্রহণ ও নিবন্ধনের আয়োজন করা হয়, তা ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া কিছুই নয়। তবে আনন্দচিত্তে খুশি উপলক্ষে উপহার দেয়া বৈধ। উপহার বিনিময়ে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা হাদিয়া বিনিময় করো ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করো’ (ছহীহুল জামি’, হা/৩০০৪)। সুতরাং কোনরূপ শর্ত, শ্রুতি ও প্রদর্শনী ছাড়াই হাদিয়া দেয়া বা গ্রহণ করা মোটেও দোষনীয় নয়। শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘অনেক দেশে মানুষের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী খুশির উপলক্ষে- যেমন কারো বিয়ে হলে, কারো ঘরে সন্তান জন্মালে, কিংবা এ ধরনের অন্য কোন আনন্দঘন অনুষ্ঠানে উপহার প্রদান করা হয়; এতে কোন দোষ নেই; বরং এটি একটি ভালো কাজ। কারণ এতে আর্থিক সহমর্মিতা প্রকাশ পায় এবং এমন সব উপলক্ষে অন্যদের সাহায্য করা হয়, যেখানে সাধারণত ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে অর্থের প্রয়োজন বেশি হয় (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪২৩১৭)। তাই আত্মীয়-স্বজন আনন্দচিত্তে কিছু উপহার দিলে তা গ্রহণ করা জায়েয ও উত্তম। উল্লেখ্য যে, বন্ধুত্বের খাতিরে কিছু চেয়ে নিলে তাতেও কোন সমস্যা নেই (ছহীহ বুখারী, হা/১২৭৭)। এমনকি অভাবী ব্যক্তির ওয়ালীমাকে সহজ করার জন্য সাহায্য করা মুস্তাহাব। রাসূল (ﷺ)-এর ওয়ালীমায় সাহায্য করার উদ্দেশ্যে রান্না করা গোস্ত-রুটি হাদিয়া স্বরূপ পাঠানো হয়েছিল এবং তিনি সবাইকে ডেকে তা খাইয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৬৩)।


প্রশ্নকারী : তানভীর আহমাদ, মোমেনশাহী সেনানিবাস।
প্রশ্ন (১০) : হস্তমৈথুন নিষিদ্ধ হওয়ার শারঈ দলীল কী?
উত্তর : কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ্র আলোকে হস্তমৈথুন করা হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ।... আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংরক্ষিত রাখে। তবে নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত, এতে তারা নিন্দিত হবে না। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারাই হবে সীমালংঘনকারী’ (সূরা আল-মুমিন : ১-৭)। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, উপরিউক্ত আয়াতসমূহের ভিত্তিতে ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) স্বীয় গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’-এর মধ্যে বলেছেন, অত্র আয়াত প্রমাণ করে যে, হস্তমৈথুন করা হারাম। কোন মুসলিম নিজের বিবাহিতা স্ত্রী এবং অধিকারভুক্ত দাসী ছাড়া অন্য কারো বা কিছুর মাধ্যমে কাম-তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারে না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ‌ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে’ (সূরা আন-নূর : ৩৩)। রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চক্ষুকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন ছিয়াম পালন করে। কেননা ছিয়াম প্রবৃত্তিকে ও যৌন উত্তেজনাকে দমন করে’ (ছহীহ বুখারী হা/১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০০; তিরমিযী, হা/১০৮১; নাসাঈ, হা/৩২০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৪৫)। এখানে বিধান-প্রণেতা বিবাহে অসমর্থ যুবকদলকে ছিয়াম পালনের মাধ্যমে সংযম অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পরন্তু হস্তমৈথুন বৈধ হলে নিশ্চয় তার কোন ইঙ্গিত তিনি দিয়ে যেতেন। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

أَمَّا الاسْتِمْنَاءُ فَالأَصْلُ فِيْهِ التَّحْرِيْمُ عِنْدَ جُمْهُوْرِ الْعُلَمَاءِ، وَعَلَى فَاعِلِهِ التَّعْزِيْرُ، وَلَيْسَ مِثْلَ الزِّنَا وَاَللهُ أَعْلَمُ

‘জামহূর আলেমর মতানুযায়ী হস্তমৈথুন করা হারাম। যে এটি করবে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। তবে তা ব্যভিচারের মত নয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত’ (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ৩/৪৩৯ পৃ.)।

একজন মানুষের যৌবন কালটাই হল তার জীবনের স্বর্ণ যুগ। কর্ম সম্পাদন, ক্যারিয়ার গঠন ও নেক আমল করার এটাই মুখ্য সময়। আর এই সময়েই একজন যুবককে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে অসংখ্য অশুভশক্তি। অতএব এই সময়টিকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং সৎ ও কল্যাণকর কাজে লাগাতে পারবে সেই-ই সফলকাম। মানব জীবনের এই নির্দিষ্ট সময়কালকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেমন, রাসুল (ﷺ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামাত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না হওয়া পর্যন্ত আদম সন্তানের পাদ্বয় আল্লাহ তা‘আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। (১) তার জীবনকাল সম্পর্কে, সে কিভাবে তা অতিবাহিত করেছে? (২) তার যৌবনকাল সম্পর্কে, সে কিভাবে তা বিনাশ বা ধ্বংস করেছে? (৩-৪) তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং কোন্ কোন্ খাতে তা ব্যায় করেছে এবং সে যতটুকু জ্ঞানার্জন করেছিল সে অনুযায়ী কী আমল করেছে’ (তিরমিযী, হা/২৪১৬-২৪১৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৯৪৬)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমরা পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিস আসার পূর্বে সুবর্ণ সুযোগ মনে কর। (১) তোমার যৌবনকালকে কাজে লাগাও বার্ধক্য আসার পূর্বে, (২) তোমার সুস্থতাকে কাজে লাগাও অসুস্থতার পূর্বে, (৩) তোমার সচ্ছলতাকে কাজে লাগাও অসচ্ছলতা আসার পূর্বে, (৪) তোমার অবসর সময়কে কাজে লাগাও ব্যস্ততার পূর্বে এবং (৫) আর তোমার জীবনকে কাজে লাগাও মৃত্যু আসার পূর্বে’ (ছহীহুত তারগীব, হা/৩৩৫৫; মিশকাত, হা/৫১০২)।


প্রশ্নকারী : মুহাম্মাদ শিমুল, ঢাকা।
প্রশ্ন (১১) : দেশের জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কেউ মারা গেলে, তাকে শহীদ বলা যাবে কী?
উত্তর : বিষয়টি নিয়তের উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র পথে নিহত হয়, সে শহীদ। আর ‘আল্লাহর পথে’ (في سبيل الله)- এর অর্থ হল- সে যুদ্ধ করে এই উদ্দেশ্যে যে, আল্লাহর কালেমা সমুন্নত হোক। এটাই যুদ্ধের ময়দানের শহীদের পরিচয়, যেমনটি নবী (ﷺ) স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। আবূ মূসা আশ‘আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক বেদুঈন নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করল- এক ব্যক্তি যুদ্ধ করে গনীমতের জন্য, আরেক ব্যক্তি যুদ্ধ করে যেন তার নাম ছড়িয়ে পড়ে, আরেক ব্যক্তি যুদ্ধ করে যাতে তার অবস্থান দেখা যায়- এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে? তখন নবী (ﷺ) বললেন, مَنْ قَاتَلَ لِتَكُوْنَ كَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ ‘যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে আল্লাহর কালেমা সমুন্নত করার জন্য, প্রকৃতপক্ষে সে-ই আল্লাহর পথে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩১২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৪)। তাই মুসলিম হয়েও যদি আল্লাহর কালেমাকে সুউচ্চ করার উদ্দেশ্য না করে, নিজের দুনিয়াবী স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য লড়াই করে নিহত হয়, সেই ব্যক্তি শহীদ নয়। বরং শহীদ হল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার জন্য লড়াই করে নিহত হয় (শারহু রিয়াযিছ ছালিহীন, ইবনু উছাইমীন, ১/৬৬ পৃ.)।

শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘.. নিঃসন্দেহে দ্বীন, জীবন, পরিবার, সম্পদ এবং দেশ ও দেশের জনগণকে রক্ষা করা শরী‘আততসম্মত জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। আর যে মুসলিম এসব রক্ষায় নিহত হয়, সে শহীদ হিসাবে গণ্য হয়। নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘যে লোক নিজের ধনমাল রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ। যে লোক নিজের দ্বীনের হিফাযত করতে গিয়ে মারা যায় সে শহীদ। যে লোক নিজের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ। যে লোক তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে মারা যায় সেও শহীদ’ (তিরমিযী, হা/১৪১৮-১৪২১)।

অতএব, হে প্রহরীরা! আমরা তোমাদেরকে আল্লাহভীতি অবলম্বনের, সকল কাজে একমাত্র আল্লাহর জন্য ইখলাছ বজায় রাখার, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সঙ্গে আদায় করার, আল্লাহর অধিক যিকির করার, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে অবিচল থাকার, ঐক্য বজায় রাখার ও বিরোধ থেকে দূরে থাকার, শান্ত হৃদয়ে ধৈর্য ও দৃঢ়তা অবলম্বনের, আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা রাখার এবং সকল গুনাহ থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দিচ্ছি’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুশ শাইখ ইবনে বায, ১৮/৯২ পৃ.)।

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ বিভিন্ন প্রকারের। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকার হল- আল্লাহর কালেমাকে সুউচ্চ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা। এটিই আল্লাহর পথে সংগ্রাম এবং যারা যুদ্ধ করবে তাদের প্রত্যেকের উপর এই নিয়ত আবশ্যক। যদি কেউ নিজের দেশের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর কালেমাকে সর্বোচ্চ করা- তাহলে সেটিও আল্লাহ্র পথে সংগ্রামের অন্তর্ভুক্ত। কারণ কাফিরদের হাত থেকে দেশ মুক্ত করা আল্লাহর দ্বীন ও মুসলিমদের জন্য বিজয়। সুতরাং সে তার যুদ্ধের নিয়ত করবে- আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করা, মুসলিম ভূখণ্ডের পরিসর বৃদ্ধি করা এবং মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি করা। কেবল দেশপ্রেমের জন্যই যুদ্ধ করবে- এমনটি হওয়া উচিত নয়। তবে কেউ যদি নিজের প্রাণের জন্য, নিজের ঘরের জন্য, নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য, নিজের সন্তানদের জন্য বা নিজের দেশের জন্য লড়াই করে- তাহলে সে একজন মাযলূম (অত্যাচারিত)। আর সে যদি মুসলিম অবস্থায় নিহত হয়, তবে সে শহীদ হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু সে ‘আল্লাহর পথে জিহাদকারী’ নয়। আল্লাহর পথে জিহাদকারী সে-ই, যে যুদ্ধ করে এই উদ্দেশ্যে যে আল্লাহর কালেমা সুউচ্চ হোক। আর যে ব্যক্তি প্রতিরক্ষামূলকভাবে লড়াই করে, সে মাযলূম- সে নিহত হলে শহীদ; কিন্তু সে মুজাহিদ হিসাবে মুজাহিদদের পূর্ণ ফযীলত পায় না, যতক্ষণ না তার যুদ্ধের উদ্দেশ্য আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করা হয়। আর এমন কিছু যুদ্ধের ধরন আছে, যা এই স্তরের নয়। যেমন- কেউ নিজের প্রাণ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে, কারণ তার উপর আক্রমণ করা হয়েছে; সে নিহত হলে শহীদ। কেউ নিজের পরিবার ও সম্মান রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে; সে নিহত হলে শহীদ ও মাযলূম। কেউ নিজের সম্পদ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে; সে নিহত হলে শহীদ। যেমন, নবী (ﷺ) সেই ব্যক্তিকে বলেছিলেন, যে জিজ্ঞেস করেছিল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি কেউ আমার কাছে এসে জোরপূর্বক আমার সম্পদ নিতে চায়? তিনি বললেন, তাকে তোমার সম্পদ দিও না। সে বলল, যদি সে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করে? তিনি বললেন, তুমিও তার সঙ্গে যুদ্ধ করো। সে বলল, যদি আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। সে বলল, আর যদি সে আমাকে হত্যা করে? তিনি বললেন, ‘তাহলে তুমি শহীদ’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০)।

অতএব প্রমাণিত হল, যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ, নিজের প্রাণ বা নিজের নারীদের (পরিবারের সম্মান) রক্ষায় মাযলূম অবস্থায় নিহত হয়, সে শহীদ। এভাবেই যারা কাফিরদের হাত থেকে নিজেদের দেশ মুক্ত করার জন্য, অথবা কাফিরদের কবলে পতিত দেশ উদ্ধার করার জন্য, কিংবা নিজেদের ইসলামিক দলকে সাহায্য করার জন্য যুদ্ধ করে- তারা মাযলূম। কিন্তু তাদের এই যুদ্ধ সেই জিহাদ নয়, যার সম্পর্কে নবী (ﷺ) বলেছেন, যে যুদ্ধ করে যাতে আল্লাহ্র কালেমা সমুন্নত হয়, সে আল্লাহর পথে (দুরূসুশ শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায, ৫/১৬ পৃ.)।

তবে উমার ফারুক্ব (ﷺ) একদা খুত্ববায় বলেন, তোমরা বলে থাক যে, অমুক শহীদ, অমুক শহীদ। তোমরা এরূপ বলো না। বরং ঐরূপ বলো যেরূপ রাসূল (ﷺ) বলতেন। তা হল, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করেছে বা নিহত হয়েছে, সে ব্যক্তিই শহীদ (আহমাদ, হা/২৮৫, সনদ হাসান; ফাৎহুল বারী, ৬/৯০ পৃ.)।


প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ, বরিশাল।
প্রশ্ন (১২) : ইসলামী শরী‘আতে চুল কাটার বিধান ও পদ্ধতি কীরূপ হবে?
উত্তর : ইসলামী শরী‘আতের আলোকে চুল কাটার সঠিক পদ্ধতি হল- চতুর্দিক থেকে সমানভাবে চুল কাটা। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) ‘ক্বাযা’ থেকে নিষেধ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি নাফি‘ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্বাযা’ কী? তিনি বললেন, শিশুর মাথার (চুল) কিছু কামানো এবং কিছু রেখে দেয়া (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯২০-৫৯২১; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২০)। অন্যত্র বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, একদা নবী (ﷺ) দেখলেন যে, একটি শিশুর মাথার কিছু অংশ কামানো আর কিছুটা অবশিষ্ট রাখা আছে। তিনি তাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, হয় সবটুকু কামিয়ে ফেলো নতুবা সবটুকু রেখে দাও (আবূ দাঊদ, হা/৪১৯৫; নাসাঈ, হা/৫০৪৮)। আলেমগণ বলেন, ‘ক্বাযা’ বলতে বোঝায় ‘মাথার কিছু অংশ কাটা ও কিছু অংশ অবশিষ্ট রাখা, অথবা মধ্যস্থলের চুলগুলো কাটা এবং চতুর্দিকের চুলগুলো অবশিষ্ট রাখা, যেমন : খ্রীষ্টানরা করে থাকে, অথবা চারিধারের চুল কাটা এবং মধ্যস্থলের চুলগুলো অবশিষ্ট রাখা। যেমন : অধিকাংশ নির্বোধেরা করে থাকে। অনুরূপভাবে মাথার অগ্রভাগ কেটে পশ্চাৎদেশ অবশিষ্ট রাখা। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এগুলো অগ্নিপূজকদের কর্ম, আর যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুতারাং বুঝা গেল যে, চুলের কিছু অংশ কাটা ও কিছু অংশ বাকি রাখা নাজায়েয’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৫/১৭১ পৃ.)। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে মারফূ‘ হাদীছে এসেছে- ‘হিজামা ছাড়া শুধু ঘাড়ের পেছনের চুল মুণ্ডন করা অগ্নিপূজকদের কাজ’। আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি তার এক গোলামকে দেখলেন, যার মাথায় দুই পাশে ঝুঁটি বা চুলের গোছা ছিল। তখন তিনি বললেন, ‘এই দুটো মুণ্ডন করে দাও অথবা ছোট করে কেটে দাও। কারণ এটা ইয়াহুদীদের বেশভূষা’। আর মারূযী বলেন- আমি আবূ আব্দুল্লাহ (অর্থাৎ ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল)-কে ঘাড়ের পেছনের চুল মুণ্ডন করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘এটা মাজূসীদের কাজ। আর যে কোন জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’ (ফাতাওয়া আল-মারআতিল মুসলিমাহ, ২/৫১০ পৃ.)।

উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশে রাসূল (ﷺ)-এর চুল রাখার পদ্ধতিকে বাবরী চুল বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এই পরিভাষাটি সঠিক নয়। অভিধানে বাবরী শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দ বাবর বা বাব্বার থেকে- যার অর্থ সিংহ। বাবরী মানে সিংহ সদৃশ বা সিংহের কেশরের মত কাঁধে ছাড়ানো চুল। কাঁধ পর্যন্ত প্রলম্বিত কুঞ্চিত কেশদাম, বড় কোঁকড়া চুল।

হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূল (ﷺ) অধিকাংশ সময় চুল লম্বা রাখতেন (ফাৎহুল বারী, ১০/৩৬০; ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ র্দাব, ২২/০২ পৃ.)। এমনকি কোন কোন সময় তাঁর চুলে চারটি বেণী করা যেত (আবূ দাঊদ, হা/৪১৯১; তিরমিযী, হা/১৭৮১)। হাদীছের পরিভাষায় রাসূল (ﷺ)-এর লম্বা চুল রাখার পদ্ধতিকে তিনটি শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। যথা : (১) ‘ওয়াফরাহ’ তথা কানের লতি পর্যন্ত লম্বা চুল। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ)-এর চুল তাঁর দুই কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল (আবূ দাঊদ, হা/৪১৮৫, ৪১৮৭; তিরমিযী, হা/১৭৫৫)।

(২) ‘লিম্মাহ’ তথা গর্দান ও কানের লতির মাঝামাঝি বরাবর লম্বা চুল। বার’আহ ইবনু আযীব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি কোন ব্যক্তিকে ‘লিম্মা’ অর্থাৎ কান পর্যন্ত বাবরীধারী চুলে ও লাল ইয়ামানী চাদরের আবরণে রাসূল (ﷺ) থেকে অধিক সুন্দর দেখিনি। রাবী মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ) অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেন, তাঁর চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ছিল (ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩৭; আবূ দাঊদ, হা/৪১৮৩; তিরমিযী, হা/১৭২৪, ৩৬৩৫)।

(৩) ‘জুম্মাহ’, তথা ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত বা ঘাড় পর্যন্ত আলম্বিত চুল (নাসাঈ, হা/৫০৬৬; আবূ দাঊদ, হা/৪১৮৫, ৪১৮৭; তিরমিযী, হা/১৭৫৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৩৫)। অতএব রাসূল (ﷺ) কখনো তাঁর চুল কাঁধ সমান লম্বা রাখতেন আবার কখনো ছোট করতেন। দুটোই বৈধ, এমন নয় যে, লম্বা চুল রাখলে ছাওয়াব পাওয়া যাবে, আর ছোট চুল রাখলে গুনাহ হবে, কিংবা এর বিপরীত। তবে তিনি চুলের যত্ন নিতে বলেছেন। রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ كَانَ لَهُ شَعْرٌ فَلْيُكْرِمْهُ ‘যার মাথায় চুল আছে সে যেন এর যত্ন নেয়’ (আবূ দাঊদ, হা/৪১৬৩; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫০০)। আনাস (ﷺ) বলেন, নবী (ﷺ)-এর মাথার চুল (কখনও) কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হত (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯০৩-৫৯০৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ﷺ)-এর চুল মধ্যম ধরনের ছিল না একেবারে সোজা, না বেশি কোঁকড়ানো। আর তা ছিল দু’কান ও দু’কাঁধের মাঝ পর্যন্ত (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯০৫; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৬৯৮২২)।


প্রশ্নকারী : মাসুম বিল্লাহ, আটুয়া দক্ষিণপাড়া, পাবনা।
প্রশ্ন (১৩) : বিজ্ঞান বলছে পৃথিবী গোলাকার বা বলের ন্যায়। এক্ষেত্রে কুরআন-হাদীছে কোন বক্তব্য এসেছে কি? এই বিষয়ে সালাফে ছালেহীন কী আক্বীদা পোষণ করতেন?
উত্তর : বহু বিজ্ঞ আলিম পৃথিবী গোলাকার হওয়ার বিষয়ে ইজমা বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) আবুল হাসান ইবনুল মুনাদী (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে একটি বক্তব্য পেশ করেছেন। ইমাম আবুল হাসান আহমাদ ইবনু জাফর ইবনুল মুনাদী নিদর্শনসমূহের জ্ঞান ও দ্বীনি শাস্ত্রসমূহে বৃহৎ গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ আলিমদের অন্যতম এবং ইমাম আহমাদের ছাত্রদের দ্বিতীয় স্তরের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেছেন, ‘আলিমদের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে আসমান একটি গোলকের ন্যায়’। তিনি আরও বলেন, ‘তদ্রƒপ তারা এ বিষয়েও একমত যে পৃথিবী তার স্থলভাগ ও জলভাগসহ সকল গতিবিধিতে একটি গোলকের মত। এর প্রমাণ হল- সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রসমূহের উদয় ও অস্ত একসাথে পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষের জন্য হয় না, বরং পূর্বাঞ্চলের জন্য পশ্চিমাঞ্চলের আগেই হয়’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৫/১৯৫ পৃ.)।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, দু’জন ব্যক্তি ‘আসমান ও পৃথিবীর আকৃতি’ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। এ দু’টি কি ‘গোলাকার বস্তু’? একজন বলেছে গোলাকার, অন্যজন তা অস্বীকার করে বলেছে, ‘এর কোন ভিত্তি নেই’ এবং একে প্রত্যাখ্যান করেছে। সঠিক মত কোন্টি? তিনি জবাবে বলেন, মুসলিম আলিমদের নিকট আসমানসমূহ গোলাকার। এ বিষয়ে মুসলিমদের ইজমা বহু ইমাম ও আলিম বর্ণনা করেছেন। যেমন আবুল হাসান আহমাদ ইবনু জাফর ইবনুল মুনাদী, যিনি ইমাম আহমাদের ছাত্রদের দ্বিতীয় স্তরের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের একজন; তাঁর প্রায় চারশ’টি গ্রন্থ রয়েছে। এ ধরনের ইজমা বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাযম ও আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী।

আলিমগণ ছাহাবী ও তাবি’ঈন থেকে সুপরিচিত সনদের মাধ্যমে এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন এবং কুরআন ও রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ থেকেও তা উল্লেখ করেছেন। শ্রবণভিত্তিক (নাক্বলী) প্রমাণ দ্বারা বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও এর উপর হিসাববিদ্যাগত (গণিতভিত্তিক) প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত। আমি মুসলিমদের প্রসিদ্ধ আলিমদের মধ্যে কাউকে এ মত অস্বীকার করতে জানি না, শুধু বিতর্কপ্রবণ একটি ক্ষুদ্র দল ব্যতীত। তারা জ্যোতিষীদের সাথে বিতর্কের সময় সম্ভাবনার কথা বলে বলেছিল, পৃথিবী চৌকো, ষড়ভুজ বা অন্য কিছুও হতে পারে। তারা গোলাকার হওয়াকে অস্বীকার করেনি; বরং এর বিপরীতের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। আর আমি কাউকে জানি না যে নিশ্চিতভাবে বলেছে- পৃথিবী গোলাকার নয়- এমন কথা কেবল অজ্ঞদের কাছ থেকেই শোনা যায়, যাদের কথার কোন মূল্য নেই (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ৬/৫৮৬ পৃ.)।

আবূ মুহাম্মাদ ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তারা বলে- প্রমাণসমূহ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে পৃথিবী গোলাকার, অথচ সাধারণ মানুষ ভিন্ন কথা বলে। আমাদের উত্তর- আল্লাহর তাওফীক কামনা করে এই যে, জ্ঞান ও ইমামতির উপযুক্ত কোন মুসলিম ইমামই পৃথিবীর গোলাকার হওয়াকে অস্বীকার করেননি, কারো পক্ষ থেকেই এর বিরোধিতায় একটি কথাও সংরক্ষিত নেই। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর প্রমাণ এসেছে’। এরপর তিনি এ বিষয়ে একাধিক দলীল উল্লেখ করেন (আল-ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, ২/৭৮ পৃ.)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুরআন, বাস্তবতা ও আলিমদের বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত যে, পৃথিবী গোলাকার। কুরআনের দলীল হল- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ بِالۡحَقِّ ۚ یُکَوِّرُ الَّیۡلَ عَلَی النَّہَارِ وَ یُکَوِّرُ النَّہَارَ عَلَی الَّیۡلِ

‘তিনি যথাযথভাবে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর পেঁচিয়ে দেন এবং দিনকে রাতের উপর পেঁচিয়ে দেন’ (সূরা আয-যুমার : ৫)। (التكوير) এর অর্থ কোন কিছুকে গোলকের মত করে পেঁচানো- যেমন পাগড়ি পেঁচানো হয়। জানা বিষয় যে, রাত ও দিন পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে আসে। এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী গোলাকার; কারণ যদি কোন কিছুকে অন্য কিছুর উপর পেঁচানো হয় এবং পৃথিবীর উপরই যদি এ পেঁচানো ঘটে, তবে যে বস্তুর উপর পেঁচানো হচ্ছে সেটি গোলাকার হওয়াই আবশ্যক। বাস্তবতার দিক থেকেও এটি প্রমাণিত। যেমন, কেউ যদি জেদ্দা থেকে পশ্চিম দিকে সরল পথে উড়ে যায়, তবে সে পূর্ব দিক দিয়ে আবার জেদ্দাতেই ফিরে আসে। এ বিষয়ে দুইজনের মধ্যে মতভেদ নেই।

আর আলিমরা বলেন, যদি সূর্যাস্তের সময় পূর্বাঞ্চলে একজন ব্যক্তি মারা যায় এবং সূর্যাস্তের সময়ই পশ্চিমাঞ্চলে আরেকজন মারা যায়, অথচ তাদের মাঝে দূরত্ব থাকে- তবে পশ্চিমে সূর্যাস্তের সময় যে ব্যক্তি মারা গেল, সে পূর্বে সূর্যাস্তের সময় মারা যাওয়া ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে (যদি সে তার ওয়ারিস হয়)। এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী গোলাকার, কারণ যদি পৃথিবী সমতল হত, তবে সব দিক থেকে একই সময়ে সূর্যাস্ত হওয়া আবশ্যক হত। এটি স্পষ্ট হওয়ার পর কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না (ফাতাওয়া নূর ‘আলাদ্ দারব, আল-ইলমানিয়্যা: নাশআতুহা ওয়া তাতাওউরুহা, ১/১৩০ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১১৮৬৯৮)। শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইসলামী বিদ্বানগণ সর্বসম্মতভাবে একমত যে, পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু মানুষের চোখে এটি সমতল বলে মনে হয়, কারণ এটি অনেক বড় এবং এর গোলাকারতা বা বক্রতা খুব কাছ থেকে দেখা যায় না। তাই যে দাঁড়িয়ে তাকায় সে এটিকে সমতল বলে মনে করে, কিন্তু যখন সম্পূর্ণরূপে দেখা হয়, তখন বাস্তবে এটি গোলাকার। ইমাম ইবনে হাজম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুরআন ও সুন্নাহর প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবী গোলাকার’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২১১৬৫৫)।


প্রশ্নকারী : সাব্বির আহমাদ ওসমানী, মুগদা, ঢাকা।
প্রশ্ন (১৪) : কাফের দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যাবে কি?
উত্তর : কাফিরদের দেয়া জাতীয়তা গ্রহণ করা বা তাদের দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ এর অর্থ হল- তাদের বশ্যতা স্বীকার করা এবং তাদের শাসনে প্রবেশ করা (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১২/৫৮ পৃ.)। প্রথমেই জানা উচিত যে, কাফিরদের দেশে সফর করা এবং সেখানে বসবাস করা বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে বৈধ, যা আলিমগণ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। এর সারসংক্ষেপ হল- (১) মানুষ যেন তার দ্বীনের ব্যাপারে নিরাপদ থাকে, এতটা জ্ঞান ও ঈমান তার মধ্যে থাকতে হবে, যা তাকে বিভ্রান্তি থেকে দূরে রাখবে। (২) সে যেন অন্তরে কাফিরদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা থেকে বিরত থাকে। (৩) সে যেন তার দ্বীন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, যেমন- ছালাত আদায় ইত্যাদি। এটি হল সারকথা। আর বিস্তারিতভাবে বলা যায় যে, কাফিরদের দেশে বসবাস কখনও বৈধ হয়, কখনও তা মুস্তাহাব হয়, আবার কখনও তা হারাম হয়। এটি নির্ভর করে ঐ ব্যক্তির অবস্থা, তার বসবাসের উদ্দেশ্য এবং সে কতটুকু নিজের দ্বীন স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারছে তার উপর (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮৩৯১২)।

শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কাফিরদের দেশে বসবাস করা একজন মুসলিমের দ্বীন, আখলাক্ব, চরিত্র এবং আচার-আচরণের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আমরা নিজেরা এবং অন্যরাও প্রত্যক্ষ করেছি- অনেকেই যারা সেখানে গিয়ে বসবাস করেছে, তারা সেখান থেকে বিপথগামী হয়ে ফিরে এসেছে। কেউ ফিরে এসেছে ফাসিক্ব হয়ে, কেউ বা ফিরে এসেছে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে, আবার কেউ সব ধর্মকেই অস্বীকার করেছে, আবার কেউ ইসলাম ধর্মকে অস্বীকার করে নাস্তিকতায় পতিত হয়ে, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। এভাবে তারা চরম অবিশ্বাস ও দ্বীনের প্রতি বিদ্রুপে লিপ্ত হয়েছে- এমনকি তারা সম্পূর্ণ অস্বীকারবাদে লিপ্ত হয়েছে, ধর্ম ও ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে উপহাস করেছে। এজন্যই সেখানে বসবাসের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য, বরং আবশ্যক এবং এমন শর্ত আরোপ করা যরূরী যা এসব সর্বনাশা গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে এবং ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে রক্ষা করবে।

কাফিরদের দেশে বসবাসের দু’টি মৌলিক শর্ত রয়েছে। প্রথম শর্ত : বসবাসকারী তার দ্বীনের ব্যাপারে নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ তার মধ্যে পর্যাপ্ত জ্ঞান, ঈমান ও দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে যা তাকে দ্বীনের উপর অটল রাখবে এবং বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করবে। তার অন্তরে কাফিরদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করা থেকে দূরে থাকবে। কারণ তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা ঈমানের পরিপন্থী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আপনি পাবেন না আল্লাহ ও আখিরাতের উপর বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়, যারা ভালোবাসে তাদেরকে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে হোক না এ বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র ভাই অথবা এদের জ্ঞাতি-গোত্র...’ (সূরা আল-মুজাদালাহ : ২২)। তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। সুতরাং যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে আপনি তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের সাথে মিলিত হতে দেখবেন এ বলে যে, ‘আমরা আশঙ্কা করছি যে, কোন্ বিপদ আমাদের আক্রান্ত করবে’। অতঃপর হয়ত আল্লাহ বিজয় বা তাঁর কাছ থেকে এমন কিছু দেবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সে জন্য লজ্জিত হবে’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৫১-৫২)।

আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, এক ব্যক্তি একদলকে ভালোবাসে, কিন্তু (‘আমলে) তাদের সমপর্যায়ের হতে পারেনি। তিনি বললেন, মানুষ যাকে ভালোবাসে, সে তারই সাথী হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৬৮, ৬১৬৯, ৬১৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪১)। তিনি অন্যত্র বলেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১; ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৫৬)। অতএব আল্লাহর শত্রুদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। কারণ ভালোবাসা তাদের অনুসরণ ও সম্মতিকে ডেকে আনে, অন্ততপক্ষে তাদের মন্দের প্রতিবাদ না করাকেও বোঝায়। এজন্য নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘যে কোন জাতিকে ভালোবাসে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত’। দ্বিতীয় শর্ত : সে যেন দ্বীন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। যেমন- সে যেন ছালাত, জুমু‘আহ, জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ এবং অন্য ইবাদতসমূহ পালন করতে পারে। যদি সে এসব করতে না পারে, তবে তার জন্য সেখানে বসবাস বৈধ নয়, বরং হিজরত করা তার জন্য আবশ্যক। ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) হিজরতের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ সম্পর্কে বলেন, প্রথম দল হল- সেই সব মানুষ যাদের উপর হিজরত করা ফরয। আর তারা হল এমন লোক, যারা হিজরত করতে সক্ষম এবং কাফিরদের দেশে বসবাস করে দ্বীন প্রকাশ করতে পারে না, ওয়াজিব ইবাদত পালনে অক্ষম থাকে। তাদের উপর হিজরত ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা নিজেদের উপর যুলুম করে, তাদের প্রাণ-হরণের সময় ফিরিশতাগণ বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?’ তারা বলে, ‘দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম’। তারা বলে, ‘আল্লাহর যমীন কি এমন প্রশস্ত ছিল না যেখানে তোমরা হিজরত করতে?’ এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস! (সূরা আন-নিসা : ৯৭)। এটি ভীষণ কঠোর হুঁশিয়ারি, যা হিজরতের ফরয হওয়ার প্রমাণ। কারণ দ্বীনের ফরয পালন করা ফরয, আর হিজরত হল সেই ফরয পূরণের উপায়। আর কোন ফরয আদায়ের জন্য যা প্রয়োজনীয়, সেটিও ফরয (আল-মুগনী, ৮/৪৫৭ পৃ.)।

উপরিউক্ত দু’টি মৌলিক শর্ত পূর্ণ হলে, কাফিরদের দেশে বসবাস ছয়টি ভাগে বিভক্ত হয়। যথা:
প্রথম ভাগ : ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বসবাস করা। এটি এক ধরনের জিহাদ, যা ফরযে কিফায়া- যদি দাওয়াত সম্ভব হয় এবং কোন বাধা না থাকে। কারণ ইসলাম প্রচার করা দ্বীনের আবশ্যক অংশ, যা নবীগণের পথ। নবী (ﷺ) প্রত্যেক যুগে ও কালে তাবলীগ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জেনে থাকলেও তা অপরের কাছে পৌঁছে দাও’।
দ্বিতীয় ভাগ : কাফিরদের অবস্থা ও তাদের ধর্মীয় ভ্রান্তি, নৈতিক অধঃপতন, অনিয়ম-কানুন অধ্যয়ন করার জন্য বসবাস করা, যাতে মুসলিমদের সতর্ক করা যায়। এটিও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। তবে শর্ত হল- এটি যেন বড় কোন ক্ষতির কারণ না হয়।
তৃতীয় ভাগ : মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, যেমন- দূতাবাস বা কূটনৈতিক সম্পর্ক। তখন শাসক বা রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী বসবাস বৈধ হবে।
চতুর্থ ভাগ : ব্যক্তিগত প্রয়োজন যেমন- ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা। এগুলোতে প্রয়োজনের তীব্রতা অনুযায়ী বসবাস বৈধ। আলিমগণ সর্বসম্মতিক্রমে এটিকে জায়েয বলেছেন, কারণ অসংখ্য ছাহাবী অমুসলিম দেশে ব্যবসায়িক সূত্রে যাওয়া আসা করতেন।
পঞ্চম ভাগ : পড়াশোনার উদ্দেশ্যে বসবাস করা। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ছাত্র সাধারণত শিক্ষককে আদর্শ মনে করে, তার চিন্তা-ভাবনা ও আচরণে প্রভাবিত হয়। এজন্য ছাত্রের মধ্যে বাড়তি কিছু শর্ত থাকা যরূরী:
(১) পর্যাপ্ত মানসিক পরিপক্কতা।
(২) শরী‘আতের পর্যাপ্ত জ্ঞান, যাতে হক্ব-বাতিল আলাদা করতে পারে।
(৩) দৃঢ় ঈমান, যাতে বিভ্রান্তি ও পাপ থেকে বাঁচতে পারে।
(৪) শেখার উদ্দেশ্যটি মুসলিম সমাজের প্রকৃত প্রয়োজনীয় জ্ঞানের জন্য হতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

ষষ্ঠ ভাগ : স্থায়ী বসবাসের জন্য থাকা। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এতে সে কাফিরদের সাথে মিশে যায়, তাদের সমাজে পরিবার লালন-পালন করে, সন্তানরা তাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে বড় হয়ে ওঠে। এ অবস্থার কারণে নবী (ﷺ) বলেছেন, জারীর ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আমি ঐ সমস্ত মুসলিম থেকে দায়মুক্ত যারা মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তা কেন? তিনি বললেন, এইটুকু দূরে থাকবে যেন উভয়ের আগুন না দেখা যায়’ (আবূ দাঊদ, হা/২৬৪৫; তিরমিযী, হা/১৬০৪; ছহীহুল জামি’, হা/১৪৬১; ইরওয়াউল গালীল, হা/১২০৭; সিলসিলা ছহীহাহ, ২/২২৮ পৃ.)।

অতএব, কোন ঈমানদার কীভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে কাফিরদের দেশে বসবাস করে, যেখানে প্রকাশ্যে কুফর পালিত হয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান প্রতিষ্ঠিত হয় না, অথচ সে নিজে তা প্রত্যক্ষ করে, শুনে এবং তাতে সন্তুষ্ট হয়- বরং সেসব দেশের নাগরিকত্ব নেয়! এটি তার ও তার পরিবার-সন্তানদের দ্বীন ও চরিত্রের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। এটিই হল- কাফিরদের দেশে বসবাসের ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত। আল্লাহর কাছে দু‘আ করি এটি যেন হক ও সঠিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় (শারহুল উসূলিছ ছালাছাহ্, ইবনে উছাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ৬/১৩২ পৃ.)।


প্রশ্নকারী : আব্দুর রব, বরিশাল।
প্রশ্ন (১৫) : স্বামী স্ত্রী মিলনের সময় একে অপরের লজ্জাস্থানে মুখ দিতে পারবে কি? যেহেতু কুরআনে বলা হয়েছে- স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পোশাক স্বরূপ।
উত্তর : ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সহবাসের আগে যে বিষয়গুলো করা উচিত তার মধ্যে রয়েছে- স্ত্রীর সঙ্গে আদর-খেলাধুলা করা, তাকে চুম্বন করা এবং তার জিহ্বা চোষা’ (যাদুল মা‘আদ, ৪/২৫৩ পৃ.)। শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর সঙ্গে যেভাবে ইচ্ছা উপভোগ করা বৈধ। তার জন্য কেবল দু’টি বিষয় হারাম করা হয়েছে। যথা: (১) পেছনের পথে অর্থাৎ মলদ্বারে সহবাস করা। (২) হায়িয ও নিফাসের সময় সহবাস করা। এ ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে, যেমন চুম্বন করা, স্পর্শ করা, তাকানো ইত্যাদির মাধ্যমে স্বামী তার স্ত্রীকে উপভোগ করতে পারে। এমনকি যদি স্বামী স্ত্রীর স্তন থেকে দুধ পান করে ফেলে, তাও বৈধ উপভোগের অন্তর্ভুক্ত। এতে কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হবে না, কারণ প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান হারাম সম্পর্ক সৃষ্টি করে না। হারাম সম্পর্ক সৃষ্টি করে কেবল সেই দুধপান, যা শিশুকালে- দুই বছরের মধ্যে হয়ে থাকে’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৪৭৭২১)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলিমগণ বলেন, স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর দেহের সব অংশকে উপভোগ করা বৈধ। শুধু মলদ্বার, হায়িয ও নিফাসের সময় সহবাস এবং হজ্জ ও উমরার ইহরাম অবস্থায় সহবাস ব্যতীত। অন্যত্র তাঁরা বলেন, স্বামীর জন্য স্ত্রীর স্তন চোষা বৈধ, এক্ষেত্রে দুধ পেটে পৌঁছালেও কোন হারাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৯/৩৫১-৩৫২ পৃ.)। ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মলদ্বারে প্রবেশ ছাড়া নিতম্বদ্বয়ের মাঝখানে উপভোগে কোন সমস্যা নেই। কারণ সুন্নাহতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে কেবল মলদ্বারে সহবাস সম্পর্কে। আর নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিল কষ্ট/অপবিত্রতা, যা মলদ্বারের প্রবেশ পথেই সীমাবদ্ধ- তাই নিষেধাজ্ঞাও সেখানেই সীমাবদ্ধ’ (আল-মুগনী, ৭/২২৬ পৃ.)।

ইমাম আল-কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ছহীহ বিবাহের বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্ত্রীর জীবিত অবস্থায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকানো ও স্পর্শ করা বৈধ; কারণ সহবাস তাকানো ও স্পর্শের চেয়েও উচ্চতর। যখন সহবাস হালাল করা হয়েছে, তখন প্রথমত তাকানো ও স্পর্শও হালাল হওয়াই স্বাভাবিক’ (বাদায়িউছ ছানায়ী, ২/২৩১ পৃ.)। ইমাম ইবনু আবিদীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আবূ ইউসুফ, ইমাম আবূ হানীফাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, একজন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীর লজ্জাস্থান স্পর্শ করে এবং স্ত্রী তার স্বামীর লজ্জাস্থান স্পর্শ করে- যাতে তার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়- এতে কি কোনো দোষ আছে? তিনি বলেনঃ না; বরং আমি আশা করি এতে ছাওয়াব বৃদ্ধি পাবে’ (রদ্দুল মুখতার, ৬/৩৬৭ পৃ.)। কাযী আবূ ইয়ালা (ﷺ) বলেন, ‘সহবাসের আগে নারীর লজ্জাস্থান চুম্বন করা জায়েয, আর সহবাসের পরে তা মাকরূহ- কারণ তখন তা অপসন্দনীয়/অসুবিধাজনক হয়ে যায়’ (কাশ্শাফুল কিনা, ৫/২০৯; হাশিয়াতুদ দাসূক্বী, ২/২১৫; মারদাওয়ী, আল-ইনছাফ, ৮/৩৩ পৃ.)। কাযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সহবাসের আগে নারীর লজ্জাস্থান চুম্বন করা জায়েয, আর সহবাসের পরে তা মাকরূহ’ (আরশীফ মুলতাক্বা আহলিল হাদীছ, ২৫/৬৭ পৃ.)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

نِسَآؤُکُمۡ حَرۡثٌ لَّکُمۡ  ۪ فَاۡتُوۡا حَرۡثَکُمۡ اَنّٰی شِئۡتُمۡ ۫ وَ قَدِّمُوۡا لِاَنۡفُسِکُمۡ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ  مُّلٰقُوۡہُ  ؕ وَ بَشِّرِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ

‘তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর’ (সূরা আল-বাক্বারা : ২২৩)।

যেহেতু বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হল- স্বামী-স্ত্রী বৈধভাবে একে অপর থেকে আনন্দ উপভোগ করা এবং এর মাধ্যমে হারামপন্থা থেকে নিজের লজ্জাস্থান এবং চক্ষু হেফাজত করা। যদিও কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন যে, মুখে যেহেতু আল্লাহর যিকির করা হয় এবং লজ্জাস্থান দিয়ে নাপাকি বের হয়, তাই স্বামী-স্ত্রী একে অপরের যৌনাঙ্গে মুখ লাগানো ঠিক নয়। আমরা বলব, কোন্টা ঠিক আর কোন্টা ঠিক নয় তা নির্ধারণকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল। এর বাইরে আমরা কোন কিছুকে হারাম বলার অধিকার রাখি না। তবে অনেক আলিমের মতে, সর্বোচ্চ বলা যেতে পারে, এটি সুস্থ রুচিবোধ ও উন্নত চরিত্র বিরোধী এবং আদব পরিপন্থী কাজ কিন্তু তা হারাম বা এর জন্য গুনাহগার হতে হবে-এমন কোন কথা বলা ঠিক নয়। যেমন, শাইখ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাকে এই প্রশ্ন বহু দেশে করা হয়েছে। আমি বলেছি, এটি পশুর কাজ। আর নবী (ﷺ) মানুষকে পশুর অনুকরণ করতে নিষেধ করেছেন’ (১৭:৭০)। যদিও আমাদের কাছে এমন কোন স্পষ্ট দলীল নেই, যা এই কাজকে হারাম বলে ঘোষণা করে। কিন্তু আমাদের কাছে এমন দলীল আছে, যা মুসলিমকে পশুর অনুকরণ থেকে নিষেধ করে- বিশেষত নিকৃষ্ট পশু যেমন কুকুরের অনুকরণ থেকে (রিহলাতুন নূর: ২৩ ب/ ০০: ২৯: ১৪, আল-হুদা ওয়ান-নূর: ১৭৪/২১: ১৯: ০০; জামিঊ তুরাছিল আল্লামা আল-আলবানী ফিল ফিক্বহী, ১২/২১৬)। সুতরাং সুস্থ রুচিবোধ ও অনুত্তম হওয়ার দিক বিবেচনায় এ থেকে বিরত থাকা ভালো। তবে যদি লজ্জাস্থান থেকে নির্গত নাপাক বস্তু গিলে ফেলা হয় তাহলে তা হারাম।


প্রশ্নকারী : ফুয়াদ, কাঁঠাল বাগান।
প্রশ্ন (১৬) : তালাক্ব দেয়ার শারঈ পদ্ধতি কী?
উত্তর : (১) ত্বালাক্ব প্রদানকালে স্বামীকে সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন হতে হবে। পাগল, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অন্য কর্তৃক বল প্রয়োগ করে তালাক্ব দিলে ত্বালাক্ব কার্যকর হবে না (ফিকহুস সুন্নাহ, ২/২০০-২০১; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ৩৩/১০২; ইগাছাতুল লাহফান, পৃ. ২৬; আশ-শারহুল মুমতি‘, ১০/৪৩৩ পৃ.)।
(২) সুন্নাতী পদ্ধতি হল- স্ত্রী হায়িয থেকে পবিত্র হওয়ার পর সহবাস কিংবা নির্জন বাসের পূর্বেই স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দেয়া, অর্থাৎ হায়িয চলাকালীন ত্বালাক্ব দেয়া বিদ‘আত (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭১)।
(৩) এক ত্বালাক্ব দিয়ে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী স্বামীর গৃহেই থাকবে (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ১-২)।
(৪) ত্বালাক্ব দেয়ার সময় বা ফিরিয়ে নেয়ার সময় দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখবে (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ১-২)। (৫) এক সঙ্গে একের অধিক ত্বালাক্ব দেয়া যাবে না, এক সঙ্গে দুই বা তিন ত্বালাক্ব দিলেও একটি ত্বালাক্ব হিসাবেই গণ্য হবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭২, ৩৫৬৫-৩৫৩৮, ৩৫৬৬; আবূ দাঊদ, হা/২১৯৬, ২২০০; মাজমূঊ ফাতাওয়া লি ইবনি বায, ২২/১৩১, ২১/২৭৪ ও ৩৯৯)।


প্রশ্নকারী : আফযাল, বরিশাল।




প্রশ্ন (৪) : টিভিতে বিভিন্ন ইসলামিক অনুষ্ঠান দেখে আমরা উপকৃত হই। কিন্তু অধিকাংশ সময় টিভির প্রতিটা চ্যানেলে বেপর্দা নারীদের বিজ্ঞাপন ও বাজনা চলে। দেখতে না চাওয়া সত্ত্বেও বেপর্দা নারীর দিকে দৃষ্টি চলে যায়। এমতাবস্থায় করণীয় কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩৬) : জায়নামাজে বিভিন্ন ছবি থাকে যেমন কা‘বা ঘর, চাঁদ, তারা, গাছের ছবি ইত্যাদি। উক্ত জায়নামাজে ছালাত আদায় করা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৯) : ‘ফাযায়েলে কুরআন’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ‘ছালাতে কুরআন তেলাওয়াত করা ছালাতের বাইরে কুরআন তেলাওয়াত করা অপেক্ষা উত্তম। ছালাতের বাইরে কুরআন তেলাওয়াত করা ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ বলার চেয়ে উত্তম। ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা ছাদাক্বাহ হতে উত্তম; ছাদাক্বাহ ছিয়াম হতে উত্তম। আর ছিয়াম হচ্ছে জাহান্নামের ঢাল স্বরূপ’ (বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/২০৯৫; মিশকাত, হা/২১৬৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/২০৬২; ফাযায়েলে আমল, পৃ. ২৩০)। উল্লিখিত বক্তব্যগুলো কি ছহীহ? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩০) : ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়া সম্পর্কে কেমন ধারণা পোষণ করতে হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩৩) : যে ব্যক্তি রামাযান মাসের শেষ জুম‘আয় ক্বাযা ছালাতগুলো আদায় করবে, তার জীবনের ৭০ বছরের ছুটে যাওয়া প্রত্যেক ছালাতের ক্ষতি পূরণের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। উক্ত বক্তব্যের কোন প্রমাণ আছে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১২) : ‘একই বিক্রয়ে দু’টি শর্ত বৈধ নয়’ (তিরমিযী, হা/১২৩৪) হাদীছের সঠিক ব্যাখ্যা কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৮) : যুলহিজ্জার চাঁদ উঠলে নখ, চুল কাটা যায় না- এ হুকুম সবার জন্য, না-কি যারা কুরবানী করবে তাদের জন্য? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩১) : মানুষ মারা গেলে মাইকিং করে শোক সংবাদ প্রচার করা কি ঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৭) : রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন তোমাদের নিকট দিয়ে কোন ইহুদী বা খ্রিস্টান বা মুসলিমের লাশ অতিক্রম করবে, তখন তোমরা তার জন্য দাঁড়াবে। এটা তার সম্মানে নয়, তোমরা মূলত ফেরেশতাদের সম্মানার্থে দাঁড়াও’ (মুসনাদে আহমাদ হা/১৯৫০৯) মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৩) : ইমামের সূরা ফাতিহা পড়ার সাথে সাথে মুছল্লীগণও তা পড়বে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৬) : গ্রাম অঞ্চলে অল্প শিক্ষিত মহিলারা রাগের মাথায় গালি দেয়, ‘আল্লার ঘরের আল্লা আমার কপালে শান্তি দিলা না’ (নাউজুবিল্লাহ)। এই কথা বললে সে কি মুসলিম থাকবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৯) : কেউ যদি বলে আমি হস্তমৈথুন করলে আমি ঈমান হারাবো সে হস্তমৈথুন করলে তার কি ঈমান চলে যাবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ