উত্তর : নিঃসন্দেহে যিনা কাবীরা গুনাহ এবং এর শাস্তিও অত্যধিক ভয়াবহ। কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা নারী ব্যভিচার করলে তার শাস্তি রজম বা মৃত্যুদণ্ড (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭০-৫২৭১, ৬৮২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯১)। অনুরূপভাবে কোন অবিবাহিত পুরুষ অথবা নারী ব্যভিচার করলে তার শাস্তি একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন (সূরা আন-নূর : ২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯০; আবূ দাঊদ, হা/৪৪১৫; তিরমিযী, হা/১৪৩৪)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩২)। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘কোন ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদপান করে না। ... এ হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, এর অর্থ হলÑ তার হতে ঈমানের নূর ছিনিয়ে নেয়া হয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৭৫)।
শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমরা আল্লাহ তা‘আলার নিকট এই মহাপাপের শাস্তি ও আযাব থেকে পরিত্রাণ চাই, শরী‘আত মোতাবেক তার উপর ব্যভিচারের ‘হদ্দ’ (দণ্ডবিধি) প্রয়োগ করা অপরিহার্য। যদি সে বিবাহিত হয় তাহলে তাকে ‘রাজম’ বা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। পক্ষান্তরে যদি সে অবিবাহিত হয়, তাহলে একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন। তার এই বিষয়টি স্থানীয় কাযী বা বিচারকের নিকট উপস্থাপন করতে হবে এবং তিনিই পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২১/৪৫-৪৬ পৃ,)। কিন্তু ইসলামী শাসকের অনুমতি ব্যতীত কোন পাপের শাস্তি স্বরূপ কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ। যেমন সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি সহ অন্যান্য আলেম বলেন, ‘হদ্দ (মৃত্যুদণ্ড, সাজা, শাস্তি) প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি মুসলিম ইমাম, সুলতান, শাসক অথবা তার স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিনিধির উপর নির্ভরশীল। সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তির বাতাবরণ অপ্রতিহত রাখার জন্য মুসলিম শাসক ও তাঁর প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য কারোর জন্য ‘হদ্দ’ ক্বায়িম করা অনুমোদিত নয়। কোন মুসলিম ব্যক্তি বা সমাজের জন্য হদ্দ ক্বায়িম করা জায়েয নয়। কারণ, এর ফলে যে, বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ, অস্থিরতা, অরাজকতা, নৈরাজ্য ও অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তি বা সমাজের নেয় (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২২/৫-১০; কিতাবুল উম্ম, ৬/১৫৪; আল-কাফি ইবনে কুদামা, ৩/২৩৪; তাফসীরে কুরতুবী, ২/২৫৬; মাজমূঊ রাসাইল ইবনে রজব, ২/৬০৮; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৯/৩০৩ পৃ.)।
যেহেতু আমাদের দেশে ইসলামী শাসক নেই তাই ব্যক্তিগতভাবে বা সামাজিকভাবে হদ্দ (মৃত্যুদণ্ড, সাজা, শাস্তি) প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভবপর নয়। এক্ষেত্রে গুনাহগার ব্যক্তি দুনিয়াবী তুচ্ছ শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে গেলেও কিন্তু পরকালের ভয়াবহ শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট কঠোরভাবে তাওবাহ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত। আল্লাহ তা‘আলা খালিছ তাওবাহর মাধ্যমে শিরকের মত ধ্বংসাত্মক, হত্যার মত মারাত্মক ও ব্যভিচারের মত জঘন্য গুনাহকেও ক্ষমা করার ঘোষণা করেছেন। যে ব্যক্তি খাঁটি ও পবিত্র অন্তরে একনিষ্ঠ ও একাগ্রতার সহিত বিশুদ্ধ তাওবাহ্ করে আল্লাহ তার তাওবাহ ক্ববুল করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যাকে যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে হত্যা নিষেধ করেছেন, তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। আর যারা এগুলো করে, তারা শাস্তি ভোগ করবে। ক্বিয়ামতের দিন ওদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে তারা হীন অবস্থায় স্থায়ী হবে। তবে যারা তাওবাহ করে, বিশ্বাস আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ্ তাদের পাপকর্মগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আল-ফুরকান : ৬৮-৭০)।
সামুরা ইবনু জুনদুব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘... অতঃপর আমরা চললাম এবং চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম। আর সেখানে ভয়ঙ্কর রকমের শোরগোলের শব্দ ছিল। তিনি বলেন, আমরা তাতে উঁকি মারলাম, দেখলাম তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে বের হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে উঠে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, এরা কারা? তারা আমাকে বলল, এ সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা চুলা সদৃশ গর্তের ভিতর আছে তারা হল ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭০৪৭, হা/২২৭৫)।
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, টাঙ্গাইল।