সুখময় সৌভাগ্যের মৃত্যু লাভের উপায়
-ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন*
(৬ষ্ঠ কিস্তি)
[ফেব্রুয়ারী’ ২৫-এর পর]
৫- পাপ হতে তাওবা করে আল্লাহর পথে চলা।
পাপ হতে তাওবা করা; আত্মশুদ্ধির পথে নতুন যাত্রা। মানুষ ভুল করতে পারে, পাপেও লিপ্ত হতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহর দয়া অসীম। তিনি প্রত্যেক পাপীকে সুযোগ দিয়েছেন ফিরে আসার, তাওবা করার, নতুনভাবে জীবন শুরু করার। আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করা মানে শুধু পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া নয়, বরং হৃদয় থেকে অনুশোচনা করা, সেই পথ থেকে ফিরে আসা এবং জীবনে পরিবর্তন আনা। এটি আত্মশুদ্ধির এক অনন্য মাধ্যম, যা একজন মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে।
তাওবা
তাওবা অর্থ হল ফিরে আসা, পাপ থেকে সরে এসে আল্লাহর কাছে ধাবিত হওয়া। এটি কেবল মুখের কথা নয়; বরং অন্তরের গভীর উপলব্ধি ও দৃঢ় সংকল্পের প্রকাশ। হাদীছে এসেছে, التوبة الندامة ‘তাওবা হলো অনুশোচনা’।[১] আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَ تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ جَمِیۡعًا اَیُّہَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ
‘তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর। সম্ভবত তোমরা সফলতা পাবে’ (সূরা আন-নূর: ৩১)। আরেক আয়াতে তিনি বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ تَوۡبَۃً نَّصُوۡحًا ؕ عَسٰی رَبُّکُمۡ اَنۡ یُّکَفِّرَ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَ یُدۡخِلَکُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবায়ে নাসূহা (খাঁটি তাওবা) কর। সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মাফ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নদী...’ (সূরা আত-তাহরীম: ৮)।
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, খাঁটি তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা শুধু পাপ ক্ষমা করেন না, বরং তিনি জান্নাতের দরজাও খুলে দেন। ‘তাফসীরে কুরতুবী’-তে বলা হয়েছে, ‘তাওবাতুন নাসূহা হল- মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করা, অন্তরে অনুশোচনা করা এবং নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপ থেকে দূরে রাখা’।
খাঁটি তাওবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে, যা পালন না করলে তাওবা পূর্ণতা পায় না—
- পাপ কাজকে চিরতরে বর্জন করা। শুধু মুখে তাওবা করলেই হবে না। বরং সেই পাপ কাজ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে হবে।
- কৃত পাপের জন্য আল্লাহর নিকট লজ্জিত হওয়া। সত্যিকারের লজ্জা এবং অনুশোচনা না থাকলে তাওবা প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হয় না।
- পাপ কর্মে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। যদি কেউ মনে মনে আবার সেই পাপে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, তাহলে তার তাওবা নিছক মুখের বুলি হয়ে যাবে।
- একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাওবা করা। লোক দেখানো তাওবা মূল্যহীন।
- মানুষের হক্ব সংক্রান্ত পাপ থাকলে তা মিটিয়ে দেয়া। যেমন, কারও কাছে ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা, কারও প্রতি অন্যায় করলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্ত এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের আগেই তাওবা করা। কারণ, এই দুই সময়ের তাওবা কবুল হয় না।
তাওবা শুধু অতীত পাপ মুছে দেয় না, বরং একজন ব্যক্তির জীবনকে আমূল বদলে দেয়। যারা সত্যিকার অর্থে তাওবা করে, তারা নতুন এক আলোতে জীবন দেখতে পায়। তাদের হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে, কারণ তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আনে। হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে আদমসন্তান! যদি তুমি আসমান-যমীন পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আসো, কিন্তু আমার সঙ্গে কাউকে শরীক না করো, তাহলে আমি তোমাকে আসমান-যমীন পরিমাণ ক্ষমা দান করব’।[২]
এই হাদীছ প্রমাণ করে, যত বড় পাপই করা হোক না কেন, আল্লাহর দরবারে খাঁটি তাওবা করলে তিনি ক্ষমা করেন। তাওবা গ্রহণযোগ্য হলে কী পরিবর্তন আসে? যদি কারও তাওবা আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেন, তবে তার জীবনে কয়েকটি লক্ষণ প্রকাশ পায়—
- পূর্বের পাপের প্রতি ঘৃণা জন্মায়। সে আর কখনো সেই পাপে ফিরতে চায় না।
- আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়। তার হৃদয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
- নেক আমলের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। সে ছালাত, ছিয়াম, দান-সদকা এবং ভালো কাজের প্রতি আগ্রহী হয়।
- পরহেযগার ও সৎ সঙ্গীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়। সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে থাকতে চায় এবং পাপীদের সঙ্গ ত্যাগ করে।
- মন শান্ত হয়ে যায়। তাওবার পর অন্তরে যে প্রশান্তি আসে, তা পৃথিবীর কোন বস্তু দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
অনেকেই ভাবে, ‘আমার এত পাপ, আমি কি ক্ষমা পাবো?’ কিন্তু আল্লাহ বলেন,
قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের প্রতি সীমা অতিক্রম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন’ (সূরা আয-যুমার: ৫৩)।
তাই নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। আজই তাওবা করুন, আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। একবার আন্তরিক তাওবা করলে, আল্লাহ আপনার অতীতকে মুছে দিয়ে আপনাকে নতুন জীবন দান করবেন।
‘তাওবাতুন নাসূহা’ বা খাঁটি তাওবার দৃষ্টান্ত
‘তাওবাতুন নাসূহা’-খাঁটি তাওবার ভুরি ভুরি প্রমাণ হাদীছে বিদ্যমান। যেমন, হাদীছে এসেছে,
১- একদিন মাঈয ইবনু মালিক নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে পবিত্র করুন। রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমার প্রতি আক্ষেপ হয়। তুমি ফিরে যাও। আল্লাহর কাছে মাফ চাও, তাওবা কর। সে চলে যেতে লাগল। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে পবিত্র করুন। নবী (ﷺ) তাকে পূর্বের কথাগুলোই বললেন। এভাবে যখন সে চতুর্থবার এসে বলল, তখন রাসূল (ﷺ) তাকে বললেন, তোমাকে আমি কী থেকে পবিত্র করব? সে বলল, যিনা হতে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন, সে পাগলামী করছে না-কি? বলা হল, না। সে পাগল নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তবে কি সে মদ পান করেছে? তখন জনৈক ছাহাবি দাঁড়িয়ে তার মুখ শুঁকলেন। কিন্তু মদের গন্ধ পেলেন না। নবী (ﷺ) বললেন, তাহলে কি তুমি সত্যিই যিনা করেছ? সে বলল, জি! রাসূল (ﷺ) তাকে পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হল। এ ঘটনার দু’তিন দিন পর রাসূল (ﷺ) ছাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা মাঈয ইবনু মালিকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। সে এমনভাবে তাওবা করেছে যে, তা যদি সমস্ত উম্মতের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হয়; তা যথেষ্ট হয়ে যাবে’।
এ ঘটনার পর আয্দ বংশের গামেদী গোত্রের কোন এক নারী এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে পবিত্র করুন। রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমার উপর আক্ষেপ হয়। তুমি ফিরে যাও। আল্লাহর কাছে মাফ চাও এবং তাওবা কর। তখন সে বলল, আপনি মাঈয ইবনু মালিককে যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আমাকেও কি সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান? আমি তো যিনা করার মাধ্যমে অন্তঃসত্ত্বা নারী। রাসূল (ﷺ) বললেন, সত্যিই কি তুমি যিনার দ্বারা গর্ভবতী? মহিলাটি বলল, জি, হ্যাঁ। নবী (ﷺ) বললেন, যাও, তোমার পেটের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় থাক। তখন এক আনছারী ছাহাবি মহিলাটির বাচ্চা প্রসব বেদনা পর্যন্ত তাকে নিজ দায়িত্বে রাখল। সন্তান প্রসব হওয়ার পর ঐ লোকটি নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বলল, গামেদি গোত্রের মহিলাটি বাচ্চা প্রসব করেছে। রাসূল (ﷺ) বললেন, তার শিশু বাচ্চা রেখে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা যাবে না। কারণ, তখন বাচ্চাটির দুধ পান করানোর মত কোন লোক থাকবে না। তখন আনছারদের এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তাকে দুগ্ধ পান করানোর দায়িত্ব আমি নিলাম। তারপর, রাসূল (ﷺ) তাকে পাথর মেরে হত্যা করলেন।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘নবী (ﷺ) ঐ নারীকে বললেন, তুমি চলে যাও। সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর। অতঃপর সন্তান প্রসব হওয়ার পর মহিলাটি আসল। রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি চলে যাও। তোমার সন্তানকে দুগ্ধ পান করাতে থাক। দুগ্ধ ছাড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর। তারপর যখন তার বাচ্চাটি দুধ ছাড়ানোর যোগ্য হয় তখন মহিলাটি বাচ্চাকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হল। বাচ্চার হাতে এক টুকরো রুটি ছিল। এবার মহিলাটি বলল, হে আল্লাহর নবী (ﷺ)! আমি তার দুধ পান ছাড়িয়েছি। সে এখন অন্য খাবার খেতে পারে। রাসূল (ﷺ) বাচ্চাটিকে এক ছাহাবীর তত্ত্বাবধানে দিলেন এবং মহিলার জন্য একটি গর্ত খুঁড়তে নির্দেশ দেন। সেখানে মহিলার বুক পর্যন্ত গর্ত খনন করা হল। (মহিলাকে সেই গর্তে নামিয়ে) লোকদেরকে পাথর নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলেন।
খালিদ ইবনু ওয়ালিদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একটু সামনে বেড়ে তার মাথায় একখণ্ড পাথর নিক্ষেপ করলেন। ফলে রক্ত খালিদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর চেহারায় এসে পড়ল। তখন তিনি সেই মহিলাকে তিরস্কার করে কিছু একটা বললেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, খালিদ! থাম। আল্লাহর কসম! যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় এ মহিলাটি এমন তাওবা করেছে, যদি বড় কোন যালিমও এ ধরণের তাওবা করে তাকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে। অতঃপর তিনি মহিলা জানাযার ছালাত আদায় করার আদেশ দিলেন। তার জানাযা আদায় করা হল এবং দাফন কাজ সম্পূর্ণ করা হল’।[৩]
সুধী পাঠক! কেউ খালেছ নিয়তে তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবাকে কবুল করেন। সে যত বড় পাপিই হোক না কেন। যদি শিরক না করে থাকে। এজন্য শুরুতেই তাওহীদপন্থী হওয়ার আলোচনা করেছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ডাকবে, আমার নিকটে ক্ষমার প্রত্যাশা রাখবে; আমি তোমাকে মাফ করে দিব। তোমার অবস্থা যাই হোক না কেন। এতে আমি কারো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তোমার পাপ যদি আকাশ পর্যন্তও পৌঁছে যায়, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও; আমি তোমাকে মাফ করে দিব। এতে আমি কারো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! আমার সাথে কাউকে শরীক না করে তুমি যদি পৃথিবীসম পাপ নিয়েও আমার সাথে সাক্ষাৎ কর, আমি পৃথিবীসম ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হব’।[৪]
২- বানি ইসরাঈলের নিরানব্বই লোক হত্যাকারীর ঘটনাটা সকলেরই জানা। সে কত বড় পাপী ছিল! অথচ সে খাঁটি তাওবা করার কারণে আল্লাহ তাকে মাফ করে জান্নাতের মেহমান করে নিয়েছেন। হাদীছের ভাষ্যে ঘটনাটি এভাবে এসেছে-
আগেকার লোকেদের মধ্যে এক লোক ছিল। সে নিরানব্বই লোককে হত্যা করেছে। সে জিজ্ঞেস করল, এ দুনিয়াতে সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান লোক কে? তাকে এক আলেম দেখিয়ে দেয়া হয়। সে তার নিকট এসে বলল, সে নিরানব্বই লোককে হত্যা করেছে। এমতাবস্থায় তার জন্য কি তাওবা আছে? আলেম বলল, না। তখন সে আলেমকেও হত্যা করে ফেলল। সুতরাং সে আলেমকে হত্যা করে একশ’ পূর্ণ করল। অতঃপর সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল, এ দুনিয়াতে সবচেয়ে জ্ঞানী কে? তখন তাকে জনৈক আলেম লোকের সন্ধান দেয়া হলো। সে আলেমকে বলল যে, সে একশ’ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। তার জন্য কি তাওবা আছে? আলেম বললেন, হ্যাঁ। এমন কে আছে যে ব্যক্তি তার মাঝে ও তার তাওবার মাঝে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশে যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন আছে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হও। নিজের ভূমিতে আর কখনো প্রত্যাবর্তন কর না। কেননা এ দেশটি ভয়ঙ্কর খারাপ। তারপর সে চলতে লাগল। এমনকি যখন সে মাঝপথে, তখন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসল।
এবার রহমতের ফিরিশতা ও ‘আযাবের ফিরিশতার মধ্যে তার ব্যাপারে বাকবিতণ্ডা দেখা গেল। রহমতের ফিরিশতারা বললেন, সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাওবার উদ্দেশ্যে এসেছে। আর ‘আযাবের ফিরিশতারা বললেন, সে তো কখনো কোন সৎ কাজ করেনি। এমতাবস্থায় মানুষের আকৃতিতে এক ফিরিশতা আসলেন। তারা তাকে তাদের মাঝে মধ্যস্থতা বানালেন। তিনি উভয়কে বললেন, তোমরা উভয় স্থান পরিমাপ কর। এ দু’টি ভূখণ্ডের মধ্যে যেটা নিকটবর্তী হবে সে অনুযায়ী তার ফায়সালা হবে। তারপর উভয়ে পরিমাপ করে দেখলেন যে, সে ঐ ভূখণ্ডেরই বেশি নিকটবর্তী যেখানে পৌঁছার জন্য সংকল্প করেছে। অতঃপর রহমতের ফিরিশতা তার রূহ কবয করে নিলেন। ক্বাতাদাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাসান বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘যখন তার মৃত্যু এলো, তখন সে বুকের উপর ভর দিয়ে কিছু এগিয়ে গেল। তখন আল্লাহ এ ভূমির প্রতি আদেশ করলেন যেন তা দূরবর্তী হয়ে যায় এবং ঐ ভূমির প্রতি আদেশ করলেন যেন তা নিকটবর্তী হয়ে যায়’।[৫]
উল্লেখিত হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন অপরাধী যদি পাপ করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে খালেস অন্তরে তাওবা করে, আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করেন। হাদীছে বর্ণিত লোকটির তাওবা করার সুযোগ হয়নি, আল্লাহর ক্ষমা অর্জনের লক্ষ্যে সে বের হয়েছে কেবল। তবুও আল্লাহ তা‘আলা তাকে মাফ করে দিয়েছেন। (সুবহানাল্লাহ)। তার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা খুশি হয়ে গেলেন। আর আল্লাহ তা‘আলা যার প্রতি খুশি হয়ে যান সে তো জান্নাত পাবেই। এমনিভাবে আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি তাওবাকারীর প্রতি খুশি হয়ে থাকেন।
৩- হাদীছে এসেছে, ‘এক লোক মরু প্রান্তরে সফরে ছিল। সেখান থেকে পায়ে হেটে জনপদে যাওয়া অসম্ভব। তার খাদ্য-পানীয় ছিল তার বাহনের উপর। বাহনটি তার কাছ থেকে ছুটে পালিয়ে যায়। সে তার বাহনের ব্যপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়ে। লোকটি বাড়ি ফেরার আশা এবং বেঁচে থাকার আশা বাদ দিয়ে একটি গাছের নিচে শুয়ে পড়ে। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের অপেক্ষা করতে থাকে।
এমনসময় সে হঠাৎ দেখে তার বাহনটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে তার লাগাম ধরে খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে বলে ফেলে, হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব। এই লোক বাহন পেয়ে যত খুশি হয়েছে, তাওবাকারীর প্রতি আল্লাহ এরচেয়ে অনেক বেশি খুশি হন’।[৬]
হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, ‘পাপ হতে তাওবাকারী পাপহীন ব্যক্তির ন্যায়’।[৭] অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ তা‘আলা বান্দার তাওবা কবুল করেন তার প্রাণ কন্ঠাগত না হওয়া পর্যন্ত’।[৮]
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে প্রকৃত তাওবা করে মৃত্যুবরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* অধ্যয়নরত, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সউদ ইসলামী ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ, সঊদী আরব; সাবেক মুদাররিস, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫২, সনদ ছহীহ।
[২]. তিরমিযী, হা/৩৫৪০, সনদ ছহীহ।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯৫।
[৪]. তিরমিযী, হা/৩৫৪০; ছহীহুল জামি‘, হা/৪৩৩৮, সনদ ছহীহ।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৭৭০, ১১২৯০।
[৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৭; ছহীহুল জামি‘, হা/৫০৩০।
[৭]. ত্বাবারাী, আস-সুনানুল কুবরা, হা/১০২৮১; ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫০, সনদ হাসান লি-গায়রিহ।
[৮]. তিরমিযী, হা/৩৫৩৭, সনদ ছহীহ।