ভূমিকম্প : ক্বিয়ামতের স্মরণ ও ইসলামের শিক্ষা
- ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ*
নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ হিমবাহধস, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। পাহাড় থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নদীপথে নেমে এসে জনবসতি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নেপালে ৯০৩ জনের মৃত্যু এবং ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তিব্বত অঞ্চলে আরও ১৬ জন নিহত এবং প্রায় ৫৪৬ জন নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ দুই অঞ্চল মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৯১৯ জন এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭৯৩ জন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রকল্পের টানেলের ভেতরে আনুমানিক ৯৩৩ জন শ্রমিক আটকা পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।*
দুর্যোগটির প্রভাব শিশুদের ওপরও পড়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, প্রায় ১৭ হাজার শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু শিশুর শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে—নেপালের এই ধ্বংসযজ্ঞ কি ক্বিয়ামতের কোনো নিদর্শন? ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে বিচার করা প্রয়োজন।
প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কি ক্বিয়ামতের আলামত?
ক্বিয়ামত ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের একটি বিষয়। কুরআন ও ছহীহ হাদীছে ক্বিয়ামতের পূর্ববর্তী বিভিন্ন নিদর্শন এবং ক্বিয়ামতের দিনের ভয়াবহ ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে সংঘটিত প্রতিটি বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধস, ঝড় কিংবা হিমবাহধসকে ক্বিয়ামতের নির্দিষ্ট নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা ঠিক নয়।
ছহীহ মুসলিমে ক্বিয়ামতের বড় নিদর্শনগুলোর মধ্যে দাজ্জালের আবির্ভাব, ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণ, ইয়াজূজ-মাজূজ, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া, দাব্বাতুল আরদ, ধোঁয়া এবং বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের ভূমিধসের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই নেপালের বর্তমান দুর্যোগকে ক্বিয়ামতের নিশ্চিত বা নির্দিষ্ট আলামত বলা যাবে না। এর পক্ষে কুরআন বা ছহীহ হাদীছে কোনো সরাসরি দলীল নেই। তবে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা মানুষকে মৃত্যু, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আখিরাতের প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
বিপদ-আপদ মানুষের জন্য পরীক্ষা ও সতর্কতা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَ مَاۤ اَصَابَکُمۡ مِّنۡ مُّصِیۡبَۃٍ فَبِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَ یَعۡفُوۡا عَنۡ کَثِیۡرٍ ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন’ (সূরা আশ-শূরা : ৩০)। এই আয়াত মানুষকে নিজের জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করার শিক্ষা দেয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগে নিহত মানুষ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর শাস্তি পেয়েছেন—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। কার পরিণতি কী এবং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা কতটুকু, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। মুমিনের জন্য বিপদ কখনো পরীক্ষা হতে পারে, কখনো সতর্কবার্তা এবং কখনো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ। তাই দুর্যোগ দেখে অন্যের বিচার না করে নিজের ঈমান ও আমল পর্যালোচনা করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ক্বিয়ামতের সময় কেউ জানে না
ক্বিয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তা কোনো মানুষ জানে না। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ‘নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের জ্ঞান আল্লাহর কাছেই’ (সূরা লুকমান : ৩৪)।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে ক্বিয়ামতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নির্দিষ্ট সময় জানাননি; বরং ক্বিয়ামতের কিছু নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন। অতএব ক্বিয়ামতের দিন-তারিখ নির্ধারণ বা কোনো দুর্যোগ দেখে ক্বিয়ামত আসন্ন বলে ঘোষণা করা ইসলামসম্মত নয়। মানুষের দায়িত্ব হলো সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
ক্বিয়ামতের দিন কী ঘটবে?
কুরআনে ক্বিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেদিন পৃথিবীর বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে এবং মানুষ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, যার সঙ্গে দুনিয়ার কোনো ঘটনার তুলনা করা যায় না। যেমন,
১. শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে
আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা ইসরাফীল (আলাইহিস সালাম) শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন। এতে আসমান যমীনের সবাই অচেতন/মৃত হয়ে যাবে, যাদের আল্লাহ ইচ্ছা করবেন তারা ব্যতীত। মহান আল্লাহ বলেন, وَ نُفِخَ فِی الصُّوۡرِ فَصَعِقَ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا مَنۡ شَآءَ اللّٰہُ ؕ ثُمَّ نُفِخَ فِیۡہِ اُخۡرٰی فَاِذَا ہُمۡ قِیَامٌ یَّنۡظُرُوۡنَ ‘আর শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা অচেতন হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। অতঃপর আবার তাতে ফুঁ দেওয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে’ (সূরা আয-যুমার : ৬৮)। অর্থাৎ ক্বিয়ামতের সময় আল্লাহর নির্দেশে শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এরপর পুনরুত্থানের পর্যায় শুরু হবে।
২. পৃথিবীতে প্রচণ্ড ভূমিকম্প ও মহাবিপর্যয় ঘটবে
পৃথিবী প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠবে এবং পাহাড়গুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
اِذَا زُلۡزِلَتِ الۡاَرۡضُ زِلۡزَالَہَا . وَ اَخۡرَجَتِ الۡاَرۡضُ اَثۡقَالَہَا
‘যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী তার বোঝাসমূহ বের করে দেবে’ (সূরা আয-যিলযাল : ১-২)। মহান আল্লাহ বলেন,
اِذَا رُجَّتِ الۡاَرۡضُ رَجًّا . وَّ بُسَّتِ الۡجِبَالُ بَسًّا . فَکَانَتۡ ہَبَآءً مُّنۡۢبَثًّا
‘যখন পৃথিবী প্রবলভাবে কেঁপে উঠবে এবং পাহাড়সমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে’ (সূরা আল-ওয়াক্বিয়া : ৪-৬)। সেদিন আকাশ, পৃথিবী, পাহাড় ও সমুদ্রের বর্তমান পরিচিত কাঠামো পরিবর্তিত হবে। দুনিয়ার জীবনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে শুরু হবে আখিরাতের স্থায়ী জীবন।
৩. পাহাড়গুলো ধূলিকণার মত হয়ে যাবে
ক্বিয়ামতের দিন পাহাড়গুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলিকণার মত হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَّ بُسَّتِ الۡجِبَالُ بَسًّا. فَکَانَتۡ ہَبَآءً مُّنۡۢبَثًّا
‘পাহাড়গুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে, অতঃপর সেগুলো বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে’ (সূরা আল-ওয়াক্বিয়াহ : ৫-৬)।
৪. আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে, সমুদ্রগুলো একাকার হয়ে যাবে এবং সূর্য নিভে যাবে
ক্বিয়ামতের দিন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে, সমুদ্রগুলো একাকার হয়ে যাবে এবং সূর্য নিভে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
اِذَا السَّمَآءُ
انۡفَطَرَتۡ ۙ﴿۱﴾ وَ اِذَا الۡکَوَاکِبُ انۡتَثَرَتۡ ۙ﴿۲﴾ وَ اِذَا الۡبِحَارُ فُجِّرَتۡ
﴿ۙ۳﴾
‘যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে। আর যখন নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে। আর যখন সমুদ্রগুলোকে একাকার করা হবে’ (সূরা আল-ইনফিতার : ১-৩)। মহান আল্লাহ বলেন, اِذَا الشَّمۡسُ کُوِّرَتۡ ‘যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে’ (সূরা আত-তাকভীর : ১)।
৫. মানুষ পুনরুত্থিত হবে
মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না। মহান আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন। মহান আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ اِنَّکُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ تُبۡعَثُوۡنَ
‘তারপর তোমরা অবশ্যই ক্বিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত হবে’ (সূরা আল-মুমিনূন : ১৬)। পৃথিবীতে মানুষ যে জীবন কাটিয়েছে, তার প্রতিটি কাজের হিসাব তাকে দিতে হবে। এই বিশ্বাসই একজন মুমিনকে দায়িত্বশীল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
৬. প্রতিটি কাজের হিসাব হবে
মানুষের ছোট-বড় কোনো কাজই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
فَمَنۡ یَّعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّۃٍ خَیۡرًا یَّرَہٗ. وَ مَنۡ یَّعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّۃٍ شَرًّا یَّرَہٗ
‘যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখতে পাবে’ (সূরা আয-যিলযাল : ৭-৮)। তাই সামান্য ভালো কাজকেও অবহেলা করা উচিত নয়। একইভাবে ছোট মনে করে কোনো গুনাহে জড়িয়ে পড়াও নিরাপদ নয়। মানুষের কথা, আচরণ, অধিকার আদায় এবং অন্যের প্রতি তার ব্যবহার—সবকিছুরই মূল্য রয়েছে।
৭. ক্বিয়ামতের দিন পূর্ণ ন্যায়বিচার হবে
দুনিয়ায় অনেক অপরাধের বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ক্ষমতাবান ব্যক্তি কখনো আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে, আবার নিরপরাধ মানুষও অন্যায়ের শিকার হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর আদালতে কোনো অবিচার থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَ نَضَعُ الۡمَوَازِیۡنَ الۡقِسۡطَ لِیَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ فَلَا تُظۡلَمُ نَفۡسٌ شَیۡئًا ‘আমি ক্বিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের পাল্লা স্থাপন করব। অতএব কোনো ব্যক্তির প্রতি সামান্যও যুলুম করা হবে না’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৪৭)। সেদিন মানুষের সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় নয়; তার ঈমান ও আমলই হবে মূল বিষয়।
ক্বিয়ামতের দিনে মানুষের অবস্থা
কুরআনে বলা হয়েছে, ক্বিয়ামতের দিন মানুষ নিজের অবস্থার পরিণতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকবে যে, দুনিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোও তখন তার কাছে গৌণ হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
فَاِذَا جَآءَتِ الصَّآخَّۃُ . یَوۡمَ یَفِرُّ الۡمَرۡءُ مِنۡ اَخِیۡہِ. وَ اُمِّہٖ وَ اَبِیۡہِ . وَ صَاحِبَتِہٖ وَ بَنِیۡہِ
‘অতঃপর যখন বিকট আওয়াজ (ক্বিয়ামত) আসবে, সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও তার বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও তার সন্তান-সন্ততি থেকে’ (সূরা আবাসা : ৩৩-৩৬)।
কারণ প্রত্যেক মানুষ নিজের হিসাব ও পরিণতি নিয়ে চিন্তিত থাকবে। এ থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার জীবনে যেসব বিষয়কে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, আখিরাতের বিচারে সেগুলোর অনেক কিছুই তুচ্ছ হয়ে যাবে।
নেপালের দুর্যোগ আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
১. জীবন ক্ষণস্থায়ী
মুহূর্তের মধ্যে মানুষের জীবন ও সম্পদ বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে। তাই তাওবাহ, সৎকর্ম ও নেক আমলকে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা উচিত নয়।
২. মানুষের সক্ষমতা সীমিত
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিলেও প্রকৃতির বিশাল শক্তির সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়। এটি আমাদের বিনয়ী ও সচেতন হতে শেখায়।
৩. মানবিক দায়িত্ব অপরিহার্য
দুর্যোগের সময় আহত, অসহায়, নিখোঁজদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বিপদের সময়ে মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই প্রকৃত মানবতার পরিচয়।
৪. বিপদ আত্মশুদ্ধির সুযোগ
অন্যের বিপর্যয় দেখে শুধু আতঙ্কিত না হয়ে নিজের জীবন, চরিত্র, আমল ও মানুষের অধিকার নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। বিপদ আমাদের ভুল থেকে ফিরে আসার এবং নিজেকে সংশোধনের সুযোগ করে দিতে পারে।
৫. আখিরাতের প্রস্তুতি যরূরী
ক্বিয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তা কোনো মানুষ জানে না। তবে মৃত্যু যে কোনো সময় আসতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাওবাহ, নেক আমল ও মানুষের হক্ব আদায়ের মাধ্যমে সবসময় আখিরাতের জন্য প্রস্তুত থাকা।
আতঙ্ক নয়, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কেন্দ্র করে গুজব, ভয় বা ভিত্তিহীন ক্বিয়ামতের ভবিষ্যদ্বাণী ছড়ানো উচিত নয়। ইসলাম মানুষকে আতঙ্কিত করার পরিবর্তে শিক্ষা গ্রহণ, আল্লাহকে স্মরণ এবং বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ لۡتَنۡظُرۡ نَفۡسٌ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٍ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে’ (সূরা আল-হাশর : ১৮)। এই আয়াত আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা আখিরাতের জন্য কী প্রস্তুত করেছি?
পরিশেষে বলা যায়, নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগ মানবজীবনের অসহায়ত্ব, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সুস্পষ্ট দলীল ছাড়া এ ঘটনাকে ক্বিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন বলা সঠিক নয়।
বরং এমন বিপর্যয় থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত—মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, দুনিয়ার জীবন সাময়িক এবং একদিন প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের হিসাব নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই ক্বিয়ামত কখন আসবে—এই প্রশ্নের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ক্বিয়ামত বা মৃত্যু যদি আজই আসে, আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত? এ ধরনের ঘটনা যেন আমাদের আতঙ্কিত না করে; বরং তাওবাহ, আত্মশুদ্ধি, সৎকর্ম, মানবিকতা এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের জন্য দু‘আ করা এবং নিজের আমল সংশোধন করাই হতে পারে এসব ঘটনা থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফীক্ব দান করুন এবং ক্বিয়ামতের কঠিন দিনে তাঁর রহমত ও ক্ষমা লাভকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন- আমীন!!
* প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সাময়িক প্রসঙ্গ