বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৯ পূর্বাহ্ন

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য

- হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*


ভূমিকা

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। আক্বীদা, ইবাদত, আখলাক, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি-সব ক্ষেত্রেই ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত আল্লাহর সার্বভৌমত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহই সর্বোচ্চ আইন। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অধিকার যেমন কর্তব্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়, তেমনি কর্তব্য পালনের মাধ্যমেই প্রকৃত অধিকার নিশ্চিত হয়। এই প্রবন্ধে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হল-

ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা

ইসলামী রাষ্ট্র হল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার, শাসনব্যবস্থা কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত এবং শাসক ও জনগণ সবাই আল্লাহর বিধানের অধীনে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنِ الۡحُکۡمُ  اِلَّا لِلّٰہِ  ‘আদেশ দানের ক্ষমতা আল্লাহ ব্যতীত কারু নেই’ (সূরা ইউসুফ: ৪০)। এতে বুঝা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে আল্লাহর আদেশ-নিষেধই মূল আলোচ্য বিষয়। কুরআন ও সুন্নাহ হবে আইন ও নীতির ভিত্তি। আমীর যার ভিত্তিতে কাজ করবেন।

ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য

ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ: আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শরী‘আতের শাসন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি এবং জবাবদিহিতার ধারণা।

‘অধিকার’ পরিচিতি

‘অধিকার’ শব্দটি ছোট হলেও এর গুরুত্ব ও প্রয়োগ বিশাল ও ব্যাপক। বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে একে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন-কারও মতে, বর্তমান যুগে ‘অধিকার’ বলতে আইন দ্বারা সীমিত একজন ব্যক্তির কোন কিছু করার স্বাধীনতা, কোন কিছু নিজের অধীনে রাখা বা অন্যের কাছ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করাকে বুঝায়। আইনের ভাষায় বলা যায়, অধিকার হল-একটি স্বার্থ, যা সংবিধান বা সাধারণ আইন দ্বারা সৃষ্ট বা বলবৎযোগ্য হয়’।[১]

যতদূর জানা যায়, সর্বপ্রাচীন লিপিবদ্ধ আইন হচ্ছে রাজা হামুরাবি কর্তৃক প্রণীত বেবিলনীয় কোড (প্রায় ২১৩০-২০৮৮ খ্রি. পূ.) বা হামুরাবি কোড। লিখিত আইনের সূচনা হিসাবে এই ‘কোড’  খুব মূল্য বহন করে এবং পরবর্তীতে মানুষের অধিকার সংরক্ষণে রীতি-নীতি ও প্রথার চেয়ে লিপিবদ্ধ আইন অধিকতর ফলপ্রসূ হিসাবে বিবেচিত’।[২]

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিক বলতে মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ই অন্তর্ভুক্ত, যারা রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে বসবাস করে। ইসলামে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

১. জীবন ও মালের নিরাপত্তা

ইসলামে মানবজীবন অতি পবিত্র। বিনা কারণে কোন মানুষকে হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَا کَانَ لِمُؤۡمِنٍ اَنۡ یَّقۡتُلَ مُؤۡمِنًا اِلَّا خَطَـًٔا ‘কোন মুমিনের জন্য সঙ্গত নয় যে, সে কোন মুমিনকে হত্যা করে ভুলক্রমে ব্যতীত’ (সূরা নিসা: ৯২)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَ مَنۡ یَّقۡتُلۡ مُؤۡمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُہٗ جَہَنَّمُ ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হল জাহান্নাম’ (সূরা নিসা: ৯৩)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مَنۡ قَتَلَ نَفۡسًۢا بِغَیۡرِ نَفۡسٍ اَوۡ فَسَادٍ فِی الۡاَرۡضِ فَکَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیۡعًا ‘যে কউ প্রাণের বদলে প্রাণ অথবা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করল, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ৩২)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ بَيْنَكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদা সম্পন্ন’।[৩] আর অমুসলিম নাগরিকদের জীবন ও সম্পদও মুসলিমদের মতই সুরক্ষিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الجَنَّةِ وَإِنَّ رِيْحَهَا تُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ أَرْبَعِيْنَ عَامًا ‘যে ব্যক্তি কোন যিম্মীকে হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যাবে’।[৪] অতএব ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মান পূর্ণ নিরাপত্তা লাভের অধিকার রাখে।

ইসলামী রাষ্ট্রে প্রবেশকারী অমুসলিম অতিথি বা আশ্রয়প্রার্থীও নিরাপত্তা পায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اِنۡ  اَحَدٌ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ اسۡتَجَارَکَ فَاَجِرۡہُ  ‘আর যদি মুশরিকদের কোন ব্যক্তি আপনার নিকট আশ্রয় চায়, তাহলে আশ্রয় দিন’ (সূরা আত-তওবা: ৬)।

২. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার

ইসলাম জোরপূর্বক ধর্ম গ্রহণের বিরোধী। ইসলামী রাষ্ট্রে সকল ধর্মের অধিকার সুরক্ষিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ  ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন যবরদস্তি নেই’ (সূরা বাক্বারাহ: ২৫৬)। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকরা নিজ নিজ ধর্ম পালন, উপাসনালয় রক্ষা ও ধর্মীয় আচার পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে। এতদ্ব্যতীত বৈধ সকল বিষয়ে সকলের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-কে নিষেধ করে বলেন, মানুষের উপর ধর্ম পরিবর্তনের কোন চাপ বা জোর প্রয়োগ করা যাবে না। তিনি বলেন, وَ لَوۡ شَآءَ رَبُّکَ لَاٰمَنَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ کُلُّہُمۡ جَمِیۡعًا ؕ اَفَاَنۡتَ تُکۡرِہُ النَّاسَ حَتّٰی  یَکُوۡنُوۡا مُؤۡمِنِیۡنَ  ‘যদি আপনার প্রতিপালক চাইতেন, তাহলে পৃথিবীর সকল মানুষই ঈমান আনত। তবে কি আপনি লোকদের উপর যবরদস্তি করতে চান যাতে তারা সবাই ঈমানদার হয়’ (সূরা ইউনুস : ৯৯)। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, হেদায়াত ও ইসলামের প্রতি অন্তরের উন্মুক্ততা আল্লাহর তাওফীকের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের অন্তরের অবস্থা জানেন। কে সত্য গ্রহণে প্রস্তুত আর কে নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ لَوۡ اَنۡفَقۡتَ مَا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا مَّاۤ  اَلَّفۡتَ بَیۡنَ قُلُوۡبِہِمۡ وَ لٰکِنَّ اللّٰہَ  اَلَّفَ بَیۡنَہُمۡ  ‘তিনি তাদের অন্তরসমূহে পরস্পরে ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন। যদি তুমি পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ব্যয় করতে, তবুও তাদের অন্তরসমূহে ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে পরস্পরে মহব্বত পয়দা করে দিয়েছেন’ (সূরা আল-আনফাল: ৬৩)। কুরআন শুধু ধর্মীয় সাধীনতাই নয়, বরং ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সব ধরনের স্বাধীনতাই স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমালোচনার স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, কাজের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচার পালনের স্বাধীনতা; তবে অবশ্যই রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে।

মুসলিমদের সঙ্গে অমুসলিমদের সব চুক্তিতে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে, তাদের সম্পদ, জীবন, ভূমি, ধর্ম, ইবাদত খানা ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা থাকবে; তাদের ধর্মীয় পদমর্যাদা পরিবর্তন করা হবে না; তাদের উপর কোন যুল্ম করা হবে না। তেমনি ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্থায়ী চুক্তি, খালিদ ইবনু ওয়ালীদের চুক্তি, আমর ইবনুল ‘আছের মিশর বিজয়ের পর চুক্তি। এসবই অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। মানবাধিকারের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হল, একজন ইহূদীর বিরুদ্ধে চুরির মিথ্যা অভিযোগে কুরআনের একাধিক আয়াত নাযিল হওয়া। এক মুসলিম ব্যক্তি চুরি করে সেই দোষ একজন ইহূদীর উপর চাপাতে চেয়েছিল। তখন আল্লাহ তা‘আলা সত্য প্রকাশ করে দেন এবং নিরাপরাধ ইহূদীকে মুক্তি দেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে ন্যায়বিচার ধর্মভেদে পরিবর্তিত হয় না। এভাবেই ইসলামী শরী‘আত নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার লাভের অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে।

৩. ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার

ন্যায়বিচার ইসলামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। শাসক ও সাধারণ নাগরিক সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُوۡنُوۡا قَوّٰمِیۡنَ بِالۡقِسۡطِ  ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক’ (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)। তিনি আরো বলেন, اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ۙ وَ اِذَا حَکَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡکُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহকে যথাস্থানে সমর্পণ কর। আর যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়-নীতির সাথে করবে’ (সূরা আন-নিসা: ৫৮)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

 أَنَّ قُرَيْشًا أَهَمَّهُمْ شَأْنُ المَرْأَةِ المَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ فَقَالُوا وَمَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللهِ ﷺ ؟ فَقَالُوا وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلَّا أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ حِبُّ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ  أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللهِ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ ثُمَّ قَالَ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الحَدَّ وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا.

‘মাখযূম গোত্রের এক চোর নারীর ঘটনা কুরায়শের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলল। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগল এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারে? তারা বলল, একমাত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রিয়তম উসামা ইবনু যায়দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা নবী করীম (ﷺ)-এর সঙ্গে কথা বললেন। নবী করীম (ﷺ) বললেন, তুমি কী আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘনকারিণীর সাজা মাওকুফের সুপারিশ করছ? অতঃপর নবী করীম (ﷺ) দাঁড়িয়ে খুৎবায় বললেন, তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোন বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় ছেড়ে দিত। অন্য দিকে যখন কোন অসহায় গরীব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার উপর হদ্দ বা শাস্তি জারি করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা চুরি করত তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম’।[৫]

এমনকি শত্রুদের প্রতিও ন্যায়বিচার করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا  یَجۡرِمَنَّکُمۡ شَنَاٰنُ قَوۡمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعۡدِلُوۡا ؕ اِعۡدِلُوۡا ۟ ہُوَ  اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ‘এবং কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অবিচারে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর, যা আল্লাহভীতির সর্বাধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ৮)। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গে এক ইহূদীর বর্ম সংক্রান্ত মামলায় বিচারক শুরাইহ (রাহিমাহুল্লাহ) আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ না করে ইহূদীর পক্ষে ফায়ছালা দেন। কারণ প্রমাণ পূর্ণ হয়নি। এতে ইহূদী ব্যক্তি ইসলামের ন্যায়পরায়ণতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন’।[৬]

৪. মানবিক মর্যাদার অধিকার

প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির কারণে সম্মানিত। তিনি প্রত্যেক মানুষকে, চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম, প্রত্যেককে সম্মানিত ও মর্যাদাবান হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রতিনিধি। তিনি বলেন, لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡۤ  اَحۡسَنِ تَقۡوِیۡمٍ  ‘অবশ্যই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে’ (সূরা আত-তীন: ৪)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَ لَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ  اٰدَمَ  ‘আমরা আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি’ (সূরা বাণী ইসরাঈল : ৭০)। মানবজাতির এই সম্মানের অন্যতম প্রমাণ হল-আল্লাহর নির্দেশে সকল ফেরেশতা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সিজদা করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اِذۡ  قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا   اِلَّاۤ   اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی ‘যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন তারা সিজদা করল ইবলীস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল’ (সূরা ত্বো-হা: ১১৬)। কোন নাগরিককে জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ধর্মের কারণে অপমান করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

এসব আয়াত প্রমাণ করে-জীবিত ও মৃত অবস্থায় মানুষের সম্মান রক্ষা করা অপরিহার্য। ইসলাম মানবজাতির ঐক্যের ডাক দিয়েছে এবং গোত্র ও জাতিকে পরিচয়ের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে-বিভেদ ও সংঘাতের জন্য নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ  اِنَّا خَلَقۡنٰکُمۡ  مِّنۡ ذَکَرٍ وَّ اُنۡثٰی وَ جَعَلۡنٰکُمۡ شُعُوۡبًا وَّ قَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوۡا ‘হে মানুষ! আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও নারী থেকে। অতঃপর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পার’ (সূরা আল-হুজরাত: ১৩)। বিদায় হজ্জ্বের ভাষণেও রাসূল (ﷺ) বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ ‘হে মানুষসকল! সাবধান! তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক’।[৭]

ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে যে, অমুসলিমদের সঙ্গে বিতর্ক করতে হলে উত্তম পদ্ধতিতে করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَا تُجَادِلُوۡۤا اَہۡلَ الۡکِتٰبِ اِلَّا بِالَّتِیۡ ہِیَ  اَحۡسَنُ ‘আর কিতাবধারীদের সাথে তোমরা বিতর্ক করো না উত্তম পন্থায় ব্যতীত’ (সূরা আনকাবূত: ৪৬)। এমনকি মুসলিমদের উপাস্যদের গালমন্দ করতেও কুরআন নিষেধ করেছে, যাতে তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি না দেয়’ (সূরা আল-আন‘আম: ১০৮)। এগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে মানব মর্যাদা সবার জন্য সমানভাবে সংরক্ষিত।

৫. সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবিকার অধিকার

ইসলামী রাষ্ট্রে দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বলদের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যাকাত, ছাদাক্বা ও বাইতুল মালের মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হয়। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ ‘সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়, যে উদরপূর্তি করে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে’।[৮]

৬. মত প্রকাশ ও পরামর্শ প্রদানের অধিকার

ইসলামে শূরা বা পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। নাগরিকরা ন্যায়সংগত বিষয়ে মতপ্রকাশ করতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ ‘এবং তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে’ (সূরা আশ-শূরা: ৩৮)। এতদ্ব্যতীত বৈধ সকল বিষয়ে সকলের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। সেই সাথে ইসলামকে অদ্বৈতবাদ, সর্বেশ্বরবাদ, আওলিয়াবাদ প্রভৃতি শিরকী দর্শন হতে মুক্ত থাকবে।

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের কর্তব্য

অধিকারের পাশাপশি নাগরিকদের উপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছে।

১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ اُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের’ (সূরা আন-নিসা: ৫৯)।

২. রাষ্ট্রের আইন মান্য করা

যে আইন কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী নয়, তা মান্য করা নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, اِسْمَعُوْا وَأَطِيْعُوْا وَإِنِ اسْتُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ كَأَنَّ رَأْسَهُ زَبِيْبَةٌ ‘যদি তোমাদের উপর এমন কোন হাবশী দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথাটি কিসমিসের মত তবুও তার কথা শোন ও তার আনুগত্য কর’।[৯] উল্লেখ্য যে, মুসলিম বা অমুসলিম দেশের সরকার শরী‘আত বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে সে দেশর মুসলিম নাগরিক বা প্রবাসীদের কর্তব্য বা করণীয় কী? এ ক্ষেত্রে কর্তব্য হল-

(১) উত্তম পন্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ ‘তোমাদের কেউ গর্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তা সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক’।[১০]

(২) দেশে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত গঠন করা এবং বৈধপন্থায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো’ (সূরা আর-রা‘দ: ১১)।

(৩) বিভিন্ন উপায়ে সরকারকে নছীহত করা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, اَلدِّيْنُ النَّصِيْحَةُ قُلْنَا لِمَنْ؟ قَالَ لِلهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُوْلِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنَ وَعَامَّتِهِمْ ‘দ্বীন হলো সহমর্মিতা বা কল্যাণ কামনা। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, কার জন্য সহমর্মিতা? তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলার জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর জন্য, মুসলিমদের নেতার জন্য এবং সর্বসাধারণ মুসলিমের জন্য’।[১১]

(৪) সরকারের হেদায়াতের জন্য দু‘আ করা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِيْنَ تُحِبُّوْنَهُمْ وَيُحِبُّوْنَكُمْ وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّوْنَ عَلَيْهِمْ وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِيْنَ تُبْغِضُوْنَهُمْ وَيُبْغِضُوْنَكُمْ، وَتَلْعَنُوْنَهُمْ وَيَلْعَنُوْنَكُمٍْ ‘তোমাদের সর্বোত্তম নেতা হচ্ছে তারাই যাদেরকে তোমরা ভালোবাস আর তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসে। তারা তোমাদের জন্য দু‘আ করে, তোমরাও তাদের জন্য দু‘আ কর। পক্ষান্তরে তোমাদের নিকৃষ্ট নেতা হচ্ছে তারাই যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর আর তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দাও আর তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দেয়...’।[১২]

(৫) সুস্পষ্ট অন্যায় ও কুফরী করলে সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকটে কুনূতে নাযেলা পাঠ করা। ‘আছিম আল-আহওয়াল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি আনাস ইবনু মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ছালাতে (দু‘আয়ে) কুনূত’ পড়তে হবে কি না-এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর তিনি বললেন, হ্যাঁ পড়তে হবে। আমি বললাম, রুকূর আগে পড়তে হবে, না পরে? তিনি বললেন, রুকূর আগে। আমি বললাম, অমুক ব্যক্তি আপনার সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আপনি রুকূর পর কুনূত পাঠ করার কথা বলেছেন। তিনি বললেন, সে মিথ্যা বলেছে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাত্র এক মাস ব্যাপি রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন। এর কারণ ছিল এই যে, নবী করীম (ﷺ) সত্তরজন কারীর একটি দলকে মুশরিকদের নিকট কোন এক কাজে পাঠিয়েছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাদের মধ্যে চুক্তি ছিল। আক্রমণকারীরা বিজয়ী হল। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রতি বদদু‘আ করে ছালাতে রুকূর পর এক মাস ব্যাপী কুনূত পাঠ করেছেন’।[১৩]

(৬) প্রয়োজনে হিজরত করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাওয়াতের প্রথম দিকে যখন মক্কার মুসলিমদের উপর কাফেররা চরম নির্যাতন করছিল, তখন তিনি তাদেরকে পার্শ্ববর্তী ন্যায়নিষ্ঠ খ্রিস্টান রাজা নাজাশীর হাবশা রাজ্যে তাদেরকে হিজরত করার নির্দেশ দেন’।[১৪]

(৭)  আর মুসলিম সরকারের সুস্পষ্ট কুফরী প্রমাণিত হলে, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা কল্যাণকর হবে কি-না, সে বিষয়ে অবশ্যই দেশের নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম পরামর্শ করে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং মুসলিম নাগরিকগণ তাদের অনুসরণ করবেন। বিদ্রোহ করায় কল্যাণের চেয়ে যদি অকল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে, তাহলে বিদ্রোহ করা যাবে না। বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ফায়ছালা নাযিল হয়’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০৯; সূরা আত-তওবা: ২৪)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِي أَثَرَةً وَأُمُوْرًا تُنْكِرُوْنَهَا قَالُوْا فَمَا تَأْمُرُنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ أَدُّوْا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوْا اللهَ حَقَّكُمْ ‘আমার পরে তোমরা অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করবে এবং এমন কিছু বিষয় দেখতে পাবে, যা তোমরা পসন্দ করবে না। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তাহলে আমাদের করণীয় কী? উত্তরে তিনি বললেন, তাদের অধিকার পূর্ণরূপে আদায় করবে, আর তোমাদের অধিকার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো’।[১৫] কেননা তাদের পাপ তাদের উপর এবং তোমাদের পাপ তোমাদের উপর বর্তাবে’।[১৬] তিনি বলেন, أَعْطُوْهُمْ حَقَّهُمْ فَإِنَّ اللهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرْعَاهُمْ ‘তোমরা তাদের হক দিয়ে দাও। কেননা আল্লাহ শাসকদেরকেই জিজ্ঞাসা করবেন তাদের শাসন সম্পর্কে’।[১৭]

৩. ন্যায় ও সৎকাজে সহযোগিতা করা : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কর’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ২)।

৪. অন্যায় থেকে বিরত থাকা ও প্রতিরোধ করা : আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ ‘তোমাদের কেউ গর্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তা সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক’।[১৮]

৫. জান-মাল দ্বারা রাষ্ট্র রক্ষা : ইসলামী রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে তা রক্ষা করা নাগরিকদের দায়িত্ব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَّ جَاہِدُوۡا بِاَمۡوَالِکُمۡ وَ اَنۡفُسِکُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ  ‘এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে তোমাদের মাল দ্বারা ও জান দ্বারা’ (সূরা আত-তওবা: ৪১)।

৬. কর ও আর্থিক দায়িত্ব আদায় : যাকাত, খারাজ, জিযিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রের নির্ধারিত আর্থিক দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করা নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

৭. শাসক ও নাগরিকদের পারস্পারিক সম্পর্ক : ইসলামী রাষ্ট্রে শাসক প্রভু নয়; বরং খাদেম। নাগরিকরা তার সহযোগী ও পরামর্শদাতা। উভয়ের সম্পর্ক আখেরাতমুখী জবাবদিহিতা ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

উপসংহার

ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় ন্যায়, ইনসাফ, মানবিক মর্যাদা ও আখেরাতের জবাবদিহিতার সমন্বয় ঘটে। যদি নাগরিকরা তাদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে এবং রাষ্ট্র অধিকার নিশ্চিত করে, তবে একটি আদর্শ, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠিত সম্ভব।

*পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।

তথ্যসূত্র :
[১]. Dr. A.B.M. Mofijul Islam Patwari and Md. Akhtaruzzaman, Elements of Human Rights and legal Aids, (Dhaka), P. 1.
[২]. আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবাধিকার, পৃ.৮।
[৩]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাই, ছহীহ বুখারী, হা/৬৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮; মিশকাত, হা/২৫৫৫।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩১৬৬।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৭৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৮৮; মিশকাত, হা/৩৬১০।
[৬]. ইমাম ওয়াক্বী‘, আখবারুল কাযা, ২য় খণ্ড, পৃ.২০০।
[৭]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৫৩৬, সনদ ছহীহ।
[৮]. বায়হাক্বী, সুনানে কুবরা, হা/১৯৬৬৮; বায়হাক্বী, ‘শু‘আবুল ঈমান’, হা/৩৩৮৯; সনদ ছহীহ, ছহীহুল জামে‘, হা/৫৩৮২।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৪২; মিশকাত, হা/৩৬৬৩।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯; মিশকাত, হা/৫১৩৭।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫; মিশকাত, হা/৪৯৬৬।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৫; মিশকাত, হা/৩৬৭০।
[১৩]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, ছহীহ বুখারী, হা/৪০৯৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৭; মিশকাত, হা/১২৮৯।
[১৪]. বায়হাক্বী, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩১৯০।
[১৫]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, ছহীহ বুখারী, হা/৭০৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৩; মিশকাত, হা/৩৬৭২।
[১৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৬; মিশকাত, হা/৩৬৭৩।
[১৭]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪২; মিশকাত, হা/৩৬৭৫।
[১৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯; মিশকাত, হা/৫১৩৭।




প্রসঙ্গসমূহ »: বিধি-বিধান রাজনীতি

ফেসবুক পেজ