শনিবার, ০৬ Jun ২০২৬, ০২:২৩ পূর্বাহ্ন

যাদের সাথে বসি, তাদের ভাষায় হাসি 

- তা‘রীফুর রহমান* 



যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করা যাক। ছাত্রজীবনে এমন অনেক ক্লাসমেটকে পেয়েছি, যারা অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের; বাবা-মা উভয়েই শিক্ষিত। কিন্তু খারাপ সার্কেলের সাথে বা শিষ্টাচারহীন ছেলেদের সাথে ঘোরার কারণে চোখের সামনে তারা বদলে গেছে, চরিত্রহীন হয়ে গড়ে উঠেছে। বিপরীতে এমন অসংখ্য ছাত্রের চেহারা এখনো হৃদমাঝারে উদ্ভাসিত হয়, যারা একটা মূর্খ সমাজ থেকে উঠে আসা সত্ত্বেও ভালোদের সাথে ওঠাবসা করার কারণে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছে। এমনকি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এই ছেলেটা একেবারে অনগ্রসর ও ভিন্ন একটা সমাজ থেকে উঠে এসেছিল।

বিংশ শতাব্দীর এমন একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা বসবাস করছি, যেখানে আপনার মেধা, আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য কিংবা দক্ষতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আপনার পরিবেশ। আপনার অতীত কত সুন্দর ছিল বা আপনার জন্মগত প্রতিভা কতটুকু, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, আপনি বর্তমানে কোন্ পরিমণ্ডলে শ্বাস নিচ্ছেন। সঠিক পরিবেশ যেমন সত্য প্রতিভাকে বিকশিত করে, তেমনি নষ্ট আর নোংরা পরিবেশ আমাদের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়।

ধরা যাক, ছোটবেলা থেকে আপনি চাইতেন একজন বড় ডাক্তার হবেন অথবা প্রাজ্ঞ আলেম হবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপনি এমন এক ফ্রেন্ড সার্কেলের মাঝে বড় হচ্ছেন, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে না আছে কোন প্ল্যান কিংবা না আছে নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য; সবাই স্রোতে গা ভাসিয়ে স্বাধীনভাবে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবে হয়ত খুব নিকটবর্তী সময়েই আপনার নিজের সেই বড় বড় স্বপ্নগুলো আপনার কাছেই অবাস্তব মনে হতে শুরু করবে।

আর পরিবেশের প্রভাবের এই বিষয়টি বোঝার জন্য খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

كُلُّ مَوْلُوْدٍ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ

‘প্রত্যেক ভূমিষ্ঠ সন্তান তার নিজস্ব ফিতরাত বা তাওহীদের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে ইয়াহুদী, নাছারা কিংবা অগ্নিপূজক বানায়’।[১] হাদীছটি প্রমাণ করে যে, মানুষের মূল সত্তা সত্যের ওপর থাকলেও পরিবেশের প্রভাব-পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ-তার মৌলিক বিশ্বাস বা আক্বীদার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপমা কতই না সুন্দর!

مَثَلُ الْجَلِيْسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيْسِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيْهِ أَوْ تَجِدُ رِيْحَهُ وَكِيْرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيْحًا خَبِيْثَةً

‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো সুগন্ধি বিক্রেতা (মিশকওয়ালা) এবং কামারের চুল্লির মত। সুগন্ধি বিক্রেতার কাছে থাকলে তুমি হয়তো তার কাছ থেকে সুগন্ধি কিনবে, অথবা অন্তত তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের চুল্লি তোমার শরীর বা কাপড় পুড়িয়ে দিতে পারে, অথবা অন্তত তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে’।[২]

অনেকে মনে করেন, ‘আমি আমার জায়গায় ঠিক থাকলেই তো ঠিক। মানুষ যা করে করুক, আমি আমার আদর্শ নিয়ে চলব’। কিন্তু এই কথাটা সব সময় ঠিক নয়। উল্লেখিত হাদীছের দিকে একটু মনোযোগ দিলে দেখতে পাব, পরিবেশ অনেকটা অদৃশ্যের মত কাজ করে। আপনি চান আর না চান, আপনার চতুষ্পার্শ্বের প্রভাব আপনাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করবে। ঠিক যেমন আপনি না চাইলেও হাফরের/কামারের দুর্গন্ধ আপনার নাকে আসে। আপনি এমন এক প্রতিষ্ঠানে থাকেন যেখানে সময়কে প্রপারলি মেইনটেইন করা হয় না; নিয়মিতই যেখানে ৯টার মিটিং ১০টায় শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় আপনার অবচেতন মন একসময় ভেবেই বসবে, ৯টা মানেই হয়তো ১০টা। বিশ্বাস করুন, ধীরে ধীরে আপনার মধ্য থেকেও সময়ের প্রতি মূল্যবোধ উঠে যাবে।

আপনার চতুষ্পার্শ্বের বন্ধু-বান্ধব যদি সারাক্ষণ সিস্টেম নিয়ে অভিযোগই করতে থাকে, তবে একটা ধ্রুব সত্য হল, আপনার মস্তিষ্ক প্রতিটি পরিস্থিতিতে কেবল কমতিগুলোই খুঁজতে শিখবে। আপনার চোখে ভালো কিছু ধরা পড়বে না; আপনি অকৃতজ্ঞ হয়ে উঠবেন। ‘কৃতজ্ঞতা’ বলতে যে একটা শব্দ আছে, তা হয়তো আপনার অভিধান থেকে হারিয়ে যাবে। যিনি আপনার সৃষ্টিকর্তা, তিনিই তো বলে দিয়েছেন:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ کُوۡنُوۡا مَعَ  الصّٰدِقِیۡنَ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর সত্যবাদীদের সাথে থাকো’ (সূরা আত-তাওবা : ১১৯)।

মানুষ চাইলেও পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে পারে না। একটা না একটা সার্কেলে তাকে থাকতেই হয়। আপনার অফিসের সবাই যদি ঘুষখোর হয়, যেখানে পরিবেশটাই এমন যে ঘুষ সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক সাধারণ একটা বিষয়Ñ বলুন তো সেই পরিবেশে কতক্ষণই বা আপনি ঘুষ না নিয়ে থাকবেন? হয়তো আল্লাহ আপনাকে সুযোগ দিলে আপনি ঘুষ না নিয়েই আপনার চাকরি করবেন। তবে এ কথা সত্য যে, দু-চার বছর এরকম পরিবেশে থাকলে ঘুষ না নিলেও ঘুষকে আপনি স্বাভাবিকভাবে দেখতে শুরু করবেন। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَ اصۡبِرۡ نَفۡسَکَ مَعَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ رَبَّہُمۡ بِالۡغَدٰوۃِ  وَ الۡعَشِیِّ یُرِیۡدُوۡنَ وَجۡہَہٗ  وَ لَا  تَعۡدُ عَیۡنٰکَ عَنۡہُمۡ ۚ تُرِیۡدُ زِیۡنَۃَ الۡحَیٰوۃِ  الدُّنۡیَا ۚ وَ لَا تُطِعۡ مَنۡ  اَغۡفَلۡنَا قَلۡبَہٗ عَنۡ  ذِکۡرِنَا وَ اتَّبَعَ ہَوٰىہُ  وَ کَانَ   اَمۡرُہٗ   فُرُطًا

‘আর আপনি নিজেকে ধৈর্যের সাথে রাখবেন তাদের সাথে, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের রবকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ডাকে। আপনি দুনিয়ার জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করতে গিয়ে ঐ সব সৎ লোক থেকে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আর আপনি তার আনুগত্য করবেন না, যার হৃদয়কে আমরা আমাদের স্মরণ হতে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেছে ও যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে’ (সূরা আল-কাহ্ফ : ২৮)।

কিছু কিছু পরিবেশ আমাদের সন্তানদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। সন্তান একটু বড় হলেই যখন আমরা বাইরে পাঠাই লেখাপড়ার জন্য, বলুন তো তখন কোন্ আশঙ্কাটা সবচেয়ে বেশি আমাদের পীড়া দেয়? ‘সন্তান খারাপ কারো সাথে মিশে খারাপ অভ্যাসে অভ্যস্ত হবে না তো?’ এটাই তো, তাই না?  চিন্তা করা যায়? যে সন্তানকে রক্তে-মাংসে আপনি বড় করলেন, গায়ে কোন কালিমা লাগতে দেননি- কোন এক পরিবেশ তাকে অমানুষ বানিয়ে দেয়। অনেক অভিভাবক তো সন্তানের ওপর এতটা নির্ভর করেন যে, অবচেতন মনে বলেই বসেন- ‘না, আমার ছেলে এটা কখনো করতে পারে না’। কিন্তু তিনি হয়তো জানেনই না যে, তার সন্তানের ভেতরের কম্পাসটা পরিবেশের কারণে ইতিমধ্যেই তার দিক বদলেছে।

আপনার প্রতিভা হয়তো আপনাকে দৌড় শুরু করতে সাহায্য করবে, কিন্তু দৌড়ে টিকে থাকা এবং লক্ষ্যে পৌঁছানো নির্ভর করবে আপনার ‘সার্কেল’ বা বলয়ের ওপর। এখন সিদ্ধান্ত আপনার- আপনি যদি বাজপাখির মত আকাশে উড়তে চান, তবে মুরগির খামারে সময় কাটানো বন্ধ করতে হবে।

১০০ জন ব্যক্তিকে খুনের সেই ঘটনা নিশ্চয় মনে আছে। সে তার পাপের বোঝা নামাতে চাইল। সে এক দরবেশের (আবিদ) কাছে গিয়ে আকুতি জানাল, ‘হে আল্লাহর বান্দা, আমি নিরানব্বইটি খুন করেছি। আমার কি তওবার কোন পথ খোলা আছে?’ সে লোকটির পাপের গভীরতা দেখে আঁতকে উঠে বলল, না! তোমার কোনো ক্ষমা নেই। হতাশা আর ক্রোধে অন্ধ হয়ে লোকটি তাকেও তলোয়ারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিল। পূর্ণ হলো একশ’ খুনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। কিন্তু যার অন্তরে আল্লাহ একবার অনুশোচনার বীজ বুনে দেন, তাকে ফেরানো কঠিন। সে আবার বের হলো শান্তির খোঁজে। এবার দেখা হলো এক প্রাজ্ঞ আলেমের সাথে। আলেম তাকে নিরাশ করলেন না। তিনি বললেন, অবশ্যই তোমার তওবার সুযোগ আছে। তোমার আর তওবার মাঝে কে বাধা হতে পারে? তিনি বললেন,

انْطَلِقْ إِلَى أَرْضِ كَذَا وَكَذَا، فَإِنَّ بِهَا أُنَاسًا يَعْبُدُونَ اللهَ فَاعْبُدِ اللهَ مَعَهُمْ، وَلَا تَرْجِعْ إِلَى أَرْضِكَ، فَإِنَّهَا أَرْضُ سَوْءٍ

‘তুমি এই পাপাচারী জনপদ ছেড়ে চলে যাও। অমুক স্থানে যাও, সেখানে এমন কিছু মানুষ আছে যারা মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন। তুমিও তাদের সাথে মিশে যাও। মনে রেখো, তোমার পুরোনো এলাকায় আর ফিরবে না; কারণ ওই পরিবেশটাই বিষাক্ত’।[৩] অতএব আপনাকে ভালোদের সাথে থাকতেই হবে; তবেই সফলতার আশা করা যায়। আপনি অপরাধীদের এলাকায় থেকে ভালো হবেন, এটা অসম্ভব, যেমনটা আমরা হাদীছে পড়লাম।

মুছ‘আব ইবনু উমাইর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বদলে যাওয়ার কাহিনী কে না জানে! কত সুন্দর বিলাসী জীবন ছিল তার! তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের সবচেয়ে সুশ্রী ও শৌখিন যুবক; যাঁর পরনে থাকত সিরিয়ার উন্নত রেশমি পোশাক আর পায়ে থাকত দামী চামড়ার জুতো। এই মানুষটাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহচর্যে এসে, দারুল আরকামে ছাহাবীদের সুশীতল জীবন দেখে নিজেকে পুরোটাই চেঞ্জ করে ফেললেন। স্বয়ং রাসূল (ﷺ) তাঁর এমন দুনিয়া-বিমুখতা দেখে একদিন আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন। মুহাম্মাদ ইবনু কা‘ব আল-কুরাযী (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে এমন একজন ব্যক্তি বলেছেন, যিনি আলী ইবন আবী তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছেন, আমরা একদিন মসজিদে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাথে বসে ছিলাম। এমন সময় মুছ‘আব ইবনু উমাইর (রাহিমাহুল্লাহ) আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তার গায়ে ছিল শুধু একটি চাদর, যা পশম দিয়ে জোড়া লাগানো ছিল। তাকে দেখে এবং পূর্বের তুলনায় বর্তমানের করুণ অবস্থার কথা স্মরণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেঁদে ফেললেন’।[৪]

হানযালা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা : স্বয়ং ছাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ও পরিবেশের প্রভাব বুঝতে পারতেন। একদা আবূ বকর ছিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ছাহাবী হানযালা আল-উসাইয়িদী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সঙ্গে দেখা করলেন এবং তাঁকে প্রশ্ন করলেন, হানযালাহ! তুমি কেমন আছ? জবাবে তিনি বললেন, হানযালাহ তো মুনাফিক হয়ে গেছে! সে সময় তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! তুমি এ কি বলছ!? হানযালাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে থাকি, তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা শুনিয়ে দেন; মনে হয় যেন আমরা উভয়টি চাক্ষুষ দেখছি। আবার আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট থেকে বের হয়ে আপনজন, স্ত্রী-সন্তান এবং ধন-সম্পদের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যাই, তখন আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই’। আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমারও একই অবস্থা। নিশ্চয় আমরা এ বিষয় নিয়ে (নবীজির সাথে) সাক্ষাৎ করব’।[৫]

ইমাম যাহাবী : এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’-তে আক্বীদা গঠনে পরিবেশের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি আশ্চর্য হওয়ার মত কিছু তথ্য দিয়েছেন। পরিবেশ শুধু মানুষের বাইরের আচার-আচরণ নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কেও পরিবর্তন করে দেয়। এমনকি আক্বীদাও চেঞ্জ করে দিতে পারেÑএরকম বেশ কিছু উপাখ্যান তিনি উল্লেখ করেছেন। আলী ইবনুল মাদিনী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন বলতেন, ‘আলী ইবনুল মাদিনী যখন আমাদের কাছে আসতেন, তখন সুন্নাহ প্রকাশ করতেন। আর যখন বছরায় যেতেন, তখন শী‘আ মত প্রকাশ করতেন’।[৬] উল্লেখ্য, এখানে শী‘আ আক্বীদা বলতে চরমপন্থী ইসলামবিরোধী শী‘আ আক্বীদা নয়; বরং আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি অতি-ভালোবাসাকে বোঝানো হয়েছে, যদিও বিষয়টি অনুচিত ছিল।

আলী ইবনুল মাদিনী হলেন হাদীছ শাস্ত্রের একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত, ইমাম বুখারীর শিক্ষক। এমন মহান একজন ব্যক্তিত্বও পরিবেশের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি, কারণ তখন বছরায় ছিল শী‘আ আক্বীদার প্রসার। ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বছরায় তিনি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ফযীলত প্রকাশ করতেন এজন্য যে, সেখানে অনেক মানুষ উছমানপন্থী ছিল এবং তাদের মাঝে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারে কিছু বিরূপ মনোভাব ছিল’।[৭]

একই গ্রন্থে আরও এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু বকর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আমার বোন আমাকে জানিয়েছে যে, তোমার বাবা নিজের ওপর এ নিয়ম করে নিয়েছিলেন যে, তিনি যখনই দু’জন মানুষকে তাক্বদীর নিয়ে বিতর্ক করতে শুনতেন, তখনই উঠে দুই রাকা‘আত ছালাত আদায় করতেন’। এর ওপর মন্তব্য করে ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এটি প্রমাণ করে যে, সে সময় বছরা তাক্বদীর বিষয়ক বিতর্কে উত্তাল ছিল। নতুবা আজ যদি কোন ফক্বীহ নিজের ওপর এমন নিয়ম আরোপ করতেন, তাহলে হয়তো এক-দুই বছরও কেটে যেত, কিন্তু তাক্বদীর নিয়ে বিতর্করত কাউকে পেতেন না’।

এভাবেই হাফেয যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) সে যুগে শাম ও ইরাকের অবস্থা তুলে ধরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রতিটি অঞ্চলে কিছু নির্দিষ্ট আক্বীদা-বিশ্বাস এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, সেখানে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্ম খুব কমই সেগুলো থেকে বের হতে পারত। ছোটরা সেসব বিশ্বাসের ওপরই বড় হত, আর বয়ষ্করাও সেগুলোর ওপরই বার্ধক্যে পৌঁছাত।

অনেকেই মনে করেন অমুক খুব ভালো ব্যক্তি, তিনি কখনো এমন করতেই পারেন না। ভাই  , ভালো আপেলের সংস্পর্শে এসে পঁচা আপেল ভালো হয়ে যাওয়ার ইতিহাস জগতে নেই বললেই চলে; তবে পঁচা আপেলের সংস্পর্শে এসে ভালো আপেল নষ্ট হওয়ার দৃষ্টান্ত অহরহ। গোবরে পদ্মফুল কদাচিৎ ফুটলেও ফুটতে পারে, কিন্তু সচরাচর কি এমন দেখা যায়?

পরিশেষে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান, আপনারা আপনাদের সন্তান কিংবা অধীনস্তদের প্রতি ‘ওভার কনফিডেন্ট’ হবেন না। আগে দেখুন- সে কোন্ পরিবেশে বড় হচ্ছে। আরবীতে একটি প্রবাদ বাক্য আছে: الإنسان ابن بيئته ‘মানুষ তার পরিবেশের সন্তান’। আমার মনে হয়, একজন ব্যক্তির আদ্যোপান্ত বোঝার জন্য তার বন্ধুমহল দেখাটাই যথেষ্ট। তবে হ্যাঁ, এর মধ্যেও আল্লাহ তা‘আলা অনেককে ভালো রাখেন। অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য থেকেও তাঁদের দৃঢ় ঈমানের পরিচয় দেন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন। সর্বোপরি সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক পরিবেশে আমাদের সন্তান ও অধীনস্তদের লালন-পালন করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!


* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ আল-বুখারী, হা/৪৭৭৫, ‘কিতাবুত তাফসীর’, সূরা আর-রূম।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৮।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৬।
[৪]. তিরমিযী, হা/২৪৭৬।
[৫]. ছহীহ মুসলিম হা/৬৮৫৯।
[৬]. তারীখে বাগদাদ, ১১/৪৬৩ পৃ.।
[৭]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১১/৪৭ পৃ.।




প্রসঙ্গসমূহ »: তারবিয়াত আত্মশুদ্ধি

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ