বাক-স্বাধীনতা
- আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
পৃথিবীতে মানুষ কতগুলো স্বতঃসিদ্ধ অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দেশ-কাল, ভাষা-বর্ণ ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জন্য সে অধিকারগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। এই অধিকারগুলো এমনই একটি অলঙ্ঘনীয় বিষয় যে, একে হরণ কিংবা দলন করার অধিকার দুনিয়ার কোন শক্তির নেই। এই অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘বাক-স্বাধীনতা’ বা ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, ক্ষমতার মদমত্ত শাসক, নেতা-নেত্রী এবং বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা আল্লাহ প্রদত্ত মানবজাতির এই স্বীকৃত অধিকার অবলীলায় হরণ ও দলন করেছে এবং করছে। অন্যদিকে বাক-স্বাধীনতার নামে চলছে বাক-স্বেচ্ছাচারিতা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বর্তমান বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয়। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমারেখা নিয়ে বিতর্কের ঝড় তোলা হচ্ছে ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়। বাক-স্বাধীনতার নামে বাক-বিতণ্ডা ও দ্বন্দ-সংঘাত চলছে সভ্যতার প্রায় উষাকাল থেকেই। ব্যক্তির পদমর্যাদা, মানসম্মান নষ্ট করতেও কুণ্ঠাবাধ করছি না আমরা। বাক-স্বাধীনতার নামে চলছে গীবত, অপবাদের মত জঘন্য অপরাধ কার্যক্রম। অথচ বাক-স্বাধীনতা একটি জিঙ্গাস্য বিষয়। বাক-স্বাধীনতার নামে আমরা যাই প্রকাশ করি না কেন, সে ব্যাপারে অবশ্যই মহান আল্লাহ আমাদেরকে পাকড়াও করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِنۡ تُبۡدُوۡا مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ اَوۡ تُخۡفُوۡہُ یُحَاسِبۡکُمۡ بِہِ اللّٰہُ ؕ فَیَغۡفِرُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَ یُعَذِّبُ مَنۡ یَّشَآءُ ‘তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা তোমরা প্রকাশ কর কিংবা গোপন কর আল্লাহ তার হিসাব তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করবেন। সুতরাং যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দিবেন’(সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৮৪)। *
মতপ্রকাশের অধিকার
স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। একজন মানুষ যা বলতে চায়, তা বলতে দেয়া ব্যক্তিত্ব প্রকাশের চূড়ান্ত মাধ্যম। এটি সেই ব্যক্তির নাগরিকত্বের পূর্ণতার পূর্ণ স্বাক্ষর।[১] রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে, স্বাধীনতা অধিকার থেকে অবিচ্ছিন্ন। কারণ স্বাধীনতা ব্যতীত অধিকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের স্বরূপ হল, সমাজ পরিপ্রেক্ষিত তা এমন হবে যে, প্রত্যেকটি নাগরিকই তথায় স্বীয় যোগ্যতা ও প্রতিভার বাস্তব প্রকাশ ও বিকাশ দানের সুযোগ পাবে। এ পথে কোন প্রতিবন্ধকতা আসবে না।[২] জাহেলী সমাজে স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার ছিল অকল্পনীয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বাধীনতার পয়গাম নিয়ে এসে বিশ্ব সভ্যতাকে এহেন আস্তাকুঁড় থেকে উদ্ধার করেন। এমনিভাবে নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের চরম লক্ষ্যই ছিল ব্যক্তির মতামতের স্বাধীনতা।[৩] ইসলাম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনিষ্টের বিপক্ষে এবং ভালর স্বপক্ষে ব্যক্তির বাক-স্বাধীনতার নিশ্চিত হওয়া অপবিহার্য বলে মনে করে।
ইসলামে বাক-স্বাধীনতার গুরুত্ব
ইসলামে ব্যক্তির মত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। মূলত ব্যক্তির মেধা, চিন্তা ও মানবিক প্রতিভার স্ফুরণের জন্য বাক-স¦াধীনতা থাকা একান্ত অপরিহার্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে মুসলিমরা দ্বীনী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারে না। অথচ ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করা মুসলিম মাত্রই কর্তব্য। আর মতপোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেই এ কাজ বাস্তবায়িত হতে পারে। পবিত্র কুরআনে এ কাজের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং এ কাজকে মানুষের ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ الۡعَصۡرِ .اِنَّ الۡاِنۡسَانَ لَفِیۡ خُسۡرٍ . اِلَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ تَوَاصَوۡا بِالۡحَقِّ ۬ۙ وَ تَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ
‘কালের শপথ। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়’ (সূরা আল-আছর: ১-৩)। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلۡتَکُنۡ مِّنۡکُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
‘তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল হোক, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সৎ কাজের আদেশ করে এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করে’ (সূরা আলে ‘ইমরান: ১০৪)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ‘মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে’ (সূরা আত-তওবা: ৭১)। মহান আল্লাহ বলেন,کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ ‘তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির (সর্বাত্মক কল্যাণের) জন্য তোমাদের আর্বিভূত করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ কর’ (সূরা আলে ‘ইমরান: ১১০)। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
‘তোমাদের কেউ গর্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগ) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে, তবে এটা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম স্তর’।[৪]
পারস্পরিক পরামর্শ বিধান
পারস্পরিক পরামর্শ বিধানের ক্ষেত্রে অনেক মতামত লক্ষ্য করা যায় এবং পরিশেষে মঙ্গলজনক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এক্ষেত্রে চিন্তা ও মতের স্বাধীনতা অপরিহার্য। বরং তা না থাকলে পারস্পরিক ইসলামী বিধান কার্যকর হওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর জীবনে মতপোষণ ও প্রকাশের বাস্তব প্রয়োগ করে আমাদেরকে শিক্ষা প্রদান করেছেন, যার ঐতিহাসিক ঘটনার কোন শেষ নেই। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে ছাহাবীদের মতপোষণ ও প্রকাশের ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাক্কী বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অথচ তিনি মদীনা থেকে বের হওয়ার সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বের হননি। ওহুদ, আহযাবের যুদ্ধসহ বিভিন্ন যুদ্ধে ও গুরুত্বপূূর্ণ কর্মকাণ্ডে তিনি ছাহাবীদের মতামতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতেন এবং তাঁর নিকট যে মতটি অধিক যথার্থ ও সঠিক বিবেচিত হত, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। এই জন্য ইসলামে শূরা বা পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। আমীর, নেতা, নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্র্গ সাংগঠনিক, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক বিষয়ে সর্বদা মজলিসে শূরা বা যোগ্য পরামর্শকারী ও তাক্বওয়াশীলদের পরামর্শ নিবেন। এটাই আল্লাহর নির্দেশ। আর এটাই হল বৈষয়িক বিষয়সমূহে ইসলামের বুনিয়াদী মূলনীতি। মহান আল্লাহ বলেন,وَ شَاوِرۡہُمۡ فِی الۡاَمۡرِ ۚ فَاِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَوَکِّلِیۡنَ ‘আপনার কর্মকাণ্ডে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তখন আল্লাহ্র উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তার উপরে ভরসাকারীদের ভালবাসেন’ (সূরা আলে ‘ইমরান: ১৫৯)। পরামর্শ করে কাজ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন, وَ الَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪ وَ اَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ ‘তারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, ছালাত কায়েম করে, পারস্পরিক পরামর্শ মতে কাজ করে’ (সূরা আশ-শূরা: ৩৮)।
নেতৃত্ব নির্বাচন
সমাজ পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব একটি অপরিহার্য বিষয়। মানুষের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত নে‘মত সমূহের অন্যতম সেরা নে‘মত হল নেতৃত্বের যোগ্যতা। এই যোগ্যতা ও গুণ সীমিত সংখ্যক লোকের মধ্যেই আল্লাহ দিয়ে থাকেন। বাকীরা তাদের অনুসরণ করে। নবী-রাসূলগণ ব্যতীত অন্য নেতাদেরকে আল্লাহ সরাসরি নিয়োগ করেন না। বরং বান্দাদেরকেই নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে যোগ্য, তাক্বওয়াশীল, আদর্শ ও আমানতদার ব্যক্তিদের একজন নেতা নির্বাচন করা। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ۙ وَ اِذَا حَکَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡکُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন এ বিষয়ে যে, তোমরা আমানত সমূহ যথাযোগ্য স্থানে সমর্পণ কর। আর যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচার-ফায়ছালা করবে, তখন ন্যায় বিচার করবে’ (সূরা আন-নিসা: ৫৮)।
সুধী পাঠক! নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য এযাবৎ চারটি পন্থা দেখা গেছে। যথা-অছিয়ত বা নামকরণ ভিত্তিক, পরামর্শভিত্তিক, রাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক।[৫] প্রচলিত চারটি নির্বাচন পদ্ধতির প্রথম দু’টির সাথে ইসলামের সম্পর্ক স্বাভাবিক। পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে মতপোষণ ও প্রকাশের অবিচ্ছেদ্য ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। যার বাস্তব শিক্ষা দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের জন্য আদর্শ হিসাবে অবশিষ্ট রেখে গিয়েছেন। যদি ইসলামে মতপোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকত, তাহলে ইসলামের তৃতীয় খলীফা নির্বাচনে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বাধাপ্রাপ্ত হতেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইসলামে স্বীকৃত বলেই তিনি খলীফা নির্বাচনে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন এবং নিজের মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে যোগ্য ব্যক্তি হিসাবে ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে খলীফা নির্বাচন করা হয়। সুতরাং সাংগঠনিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহ সকল ব্যবস্থায় নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের গুরুত্ব অত্যধিক।
মতপ্রকাশের মূলনীতি
বাক-স্বাধীনতা ইসলাম স্বীকৃত অধিকার। এটি মানবাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সভ্যতার উষালগ্ন থেকে আজ অবধি হেয়জ্ঞান করা হয়ে থাকে বাক-স্বাধীনতার মূলনীতিকে। নিম্নে মূলনীতিগুলো বর্ণনা করা হল।
মূলনীতি-১: আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান
যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে একমাত্র আর্দশ এবং পথ প্রদর্শনকারী হিসাবে গ্রহণ করে, সে কখনো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সিদ্ধান্তের চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিতে পারে না। এটা ঈমানের প্রাথমিক ও মৌলিক দাবী। এর ব্যত্যয় ঘটলে নিজেকে মুমিন বা মুসলিম হিসাবে দাবী করার কোন পথ অবশিষ্ট থাকে না। মহান আল্লাহ বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُقَدِّمُوۡا بَیۡنَ یَدَیِ اللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সামনে অগ্রগামী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (সূরা আল-হুজুরাত: ১)। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এর অর্থ কুরআন ও সুন্নাহ্র পরিপন্থী কোন বক্তব্য পেশ না করা’।[৬]
মূলনীতি-২: ইসলামের মৌলিক আক্বীদা বিরোধী না হওয়া
মত প্রকাশের অধিকার ভোগ করার সময় ইসলামের মৌলিক বিধান, আক্বীদা বা বিশ্বাসের বিরোধীতা করা যাবে না। ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস ও জীবনাদর্শের সমালোচনা করা যাবে না এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ইসলামী আদর্শের বিকৃতরূপ প্রচার ও প্রসার করার অধিকারও কাউকে দেয়া যেতে পারে না। কেননা এ কাজ মুসলিমকে নাস্তিক বা মুরতাদে রূপান্তরিত করে। আর অমুসলিমের জন্য বাক-সন্ত্রাসের পথ সুগম করে। ‘ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশন’, ‘ফ্রীডম অফ স্পীচ’, তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতার নাম করে পশ্চিমা বিশ্ব আজ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের প্রতি আঘাত হেনেছে। বিশেষতঃ নাইন-ইলেভেনের পর থেকে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার অপতৎপরতা চালাচ্ছে কিছু পশ্চিমা মিডিয়া। উদাহরণ স্বরূপ:
(এক) ‘শার্লি এবাদো’ নামক কুরুচিপূর্ণ ম্যাগাজিনের কথা। শুধু ‘শার্লি এবাদো’ নয়, শার্লি এবাদোর পূর্বে ডেনমার্ক সহ বেশ কয়েকটি দেশের পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। আর তাতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদ যুগিয়েছে সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব।[৭]
(দুই) হিন্দুত্ববাদী ভারতে পুরোহিত ও রাজনীতিবিদরা ইসলাম ও মহানবীকে নিয়ে হরহামেশাই বাজে মন্তব্য করে। তারমধ্যে নূপুর শর্মা, নিতেশ রানে, রামগিরি হল আপডেট ভার্সন। গত ২০২৪-এর আগষ্টেও ইসলাম ও মহানবী কে নিয়ে কটুক্তি করায় ভারতে মুম্বাই ঘেরাও করতে হাজার হাজার মুসলিমের রোডমার্চ হয়েছে। এর পরিপেক্ষিতে ইয়াতি নরসিংহানন্দ নামের এক হিন্দু পুরোহিতকে আটক করা হয়েছে।
(তিন) পশ্চিমা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও পশ্চিমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক শ্রেণীর ব্লগার রয়েছে, যারা তথাকথিত মুক্তচিন্তা-মুক্তবুদ্ধি ও নাস্তিকতার নামে প্রিয় ইসলাম, কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মান-মর্যাদার অবমাননা করে এবং জঘন্য ইসলামবিদ্বেষী (যেমন ট্রান্সজেন্ডার, এলজিবিটি কিউ, সমকামীতার প্রচার ও প্রসার) আচরণের মাধ্যমে তাওহীদী জনতার ধর্মীয় অনুভূতিতে তীব্রভাবে আঘাত করে আসছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে (পূজামণ্ডবে) কুরআন অবমাননার ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক কলামিস্ট ও গল্পকার আনিসুল হক ‘ছহি রাজাকারনামা’ নামে বই লিখে কুরআনের আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক করেছে। ইসলামবিদ্বেষী হিসাবে পরিচিত সচলায়তন ব্লগে আনিসুল হকের ‘ছহি রাজাকারনামা’ লেখাটি প্রকাশ পায়। তার ‘গদ্যকার্টুন’ বইটিতে পর্দানসিন নারী ও দাড়ি-টুপিধারী আলেমদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন শিশির ভট্টাচার্য। ২০১০ সালে ‘সন্দেশ’ থেকে প্রকাশিত আনিসুল হকের বইটিতে ‘ছহি রাজাকারনামা’ ছাড়াও ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’, ‘নমিনেশন ইন্টারভিউ গাইড’সহ কয়েকটি লেখায় ইসলামি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিদ্রুপ করা হয়েছে।[৮] মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মহান আল্লাহর কালাম। এটার সাথে মুসলিমের আত্মার সম্পর্ক জড়িয়ে। কেউ যখন কুরআন অবমাননা করে, তখন সে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। যা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। অন্যদিকে একজন মুসলিমের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসার স্থানটি পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে পবিত্র। আর সেই মহা শ্রদ্ধার মানুষটাকে যখন কেউ হাসির পাত্র হিসাবে উপস্থাপন করে, তখন মুসলিমের অন্তরে কিভাবে তা দগ্ধ করে! কতটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়! কিভাবে বিষফোড়ার মত যন্ত্রণা করে! বাক-স্বাধীনতার ফেরিওয়ালা বা মুক্তমনা ধ্বজাধারীরা কী সেটা বোঝে না? সবাইকে মনে রাখতে হবে, সীমাহীন মতপ্রকাশ ও বাক-স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। অন্যের ধর্মবিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ক্রমাগত আঘাত বা কটাক্ষ করে উস্কানিমূলক বর্ণবাদী বক্তব্য, লেখালেখি ও ব্লগিং-কোনভাবেই স্বীকৃত বাক-স্বাধীনতার আওতায় পড়ে না। উপরন্তু এগুলো বাকসন্ত্রাস বৈ কিছু নয়।
মূলনীতি-৩ : মতামত প্রকাশ করে বীরত্ব-বাহাদুরী এবং যিদ ও অহংহার জাহির না করা
ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করে বীরত্ব, বাহাদুরী ও অন্যকে হীন প্রমাণ করার প্রচেষ্টা চালানো যাবে না। আবার নিজের মত প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কোন রকম যিদ-হটকারী বা অহংকার করা যাবে না। আধুনিক সভ্যতার শতাব্দীতে বাক-স্বাধীনতার বাগাড়ম্বরের পিছনে থাকে নিকৃষ্ট মানুসিকতা, থাকে বীরবর ও পৌরুষ প্রকাশের অপচেষ্টা। যেমনটা ছিল জাহেলী সমাজের মানুষদের মধ্যে। তারা যখন কথা বলত বীরত্ব প্রকাশ করাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। আর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ অহংকারে স্ফীত হয়ে জনসাধারণের উপর নিজের মতামত চাপিয়ে দিত। উদাহরণস্বরূপ :
(এক) ইয়ামান থেকে গণীমতের মাল আসলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা বণ্টন করতে থাকেন। এমতাবস্থায় বনী তামীম গোত্রের যুল খুওয়াইছিরা নামে এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে বলে, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন, আপনি ইনছাফ করুন! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ধিক তোমাকে! আমিই যদি ইনছাফ না করি তবে কে ইনছাফ করবে’? [৯]
(দুই) উচ্চ কণ্ঠস্বরে কথা বলা মানব চরিত্রের অপ্রীতিকর আচরণের পরিচায়ক। এটি প্রথমতঃ শিষ্টাচার বিরোধী, উপরন্ত নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। বনু তামীমের এক প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মদিনায় এসেছিল। উক্ত দলে কিছু মূর্খ লোক ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হুজরার পিছন থেকে ডাকাডাকি শুরু করল, হে মুহাম্মাদ, হে মুহাম্মাদ (يا محمد، يا محمد)।[১০] মহান আল্লাহ রাসূল (ﷺ)-কে এভাবে অমার্জিত ভাষায় ডাকাডাকি করা পসন্দ করেননি। সম্মানি মানুষদের সাথে কথা বলার সময় কিভাবে শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করতে হয়, তা শিক্ষা দেয়ার জন্য আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَرۡفَعُوۡۤا اَصۡوَاتَکُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ النَّبِیِّ وَ لَا تَجۡہَرُوۡا لَہٗ بِالۡقَوۡلِ کَجَہۡرِ بَعۡضِکُمۡ لِبَعۡضٍ اَنۡ تَحۡبَطَ اَعۡمَالُکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لَا تَشۡعُرُوۡنَ .اِنَّ الَّذِیۡنَ یَغُضُّوۡنَ اَصۡوَاتَہُمۡ عِنۡدَ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ امۡتَحَنَ اللّٰہُ قُلُوۡبَہُمۡ لِلتَّقۡوٰی ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّ اَجۡرٌ عَظِیۡمٌ . اِنَّ الَّذِیۡنَ یُنَادُوۡنَکَ مِنۡ وَّرَآءِ الۡحُجُرٰتِ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ.
‘হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর আওয়াজের উপর তোমাদের আওয়াজ উচ্চ করো না। তোমরা নিজেরা পরস্পরে যেমন উচ্চ আওয়াজে কথা বল, তাঁর সঙ্গে সে রকম উচ্চ আওয়াজে কথা বলো না। তা করলে তোমাদের (যাবতীয়) কাজকর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে, আর তোমরা একটু টেরও পাবে না। যারা তোমাকে হুজরার বাইরে থেকে (উচ্চৈঃস্বরে) ডাকে, তাদের অধিকাংশই অবুঝ’ (সূরা আল-হুজুরাত: ২-৪)।
[ইনশাআল্লাহ আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]
* পি-এইচ. ডি গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র :
[১]. ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস, ঠড়ষ.ীারর, ঢ়.২৪১.
[২]. মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, আল-কুরআনে রাষ্ট্র ও সরকার (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী, ২০০০ খ্রীঃ), পৃঃ ২৮৬।
[৩]. মুহাম্মাদ শফীউদ্দীন, বিশ্বসভ্যতায় মহানবী (ছাঃ)-এর অবদান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ১২ বর্ষ, ৭তম সংখ্যা, (ঢাকা : ই.ফা.বা, জুলাই, ৯৭ইং), পৃঃ ১৮৪-১৮৬।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৪৭৮; মিশকাত, হা/৫১৩৭।
[৫]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন, পৃ. ২৩।
[৬]. তাফসীরে তাবারী, ২২তম খণ্ড, পৃ. ২৭২।
[৭]. মাসিক আত-তাহরীক, ফেব্রুয়ারী ২০১৫, পৃ. ২৭।
[৮]. দৈনিক আমার দেশ, বৃহস্পতিবার, ২৮/০৩/২০১৩।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৩২।
[১০]. তাফসীর ইবন কাছীর, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৬৯; তুহফাতুল আহওয়াযী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১০৯।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সমাজ-সংস্কার