রাফেযী শী‘আদের বিভ্রান্তি: মুসলিম উম্মাহর জন্য বিষফোঁড়া
- ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
(২য় কিস্তি)
মুত‘আ বিবাহ
রাফেযী শী‘আরা মুত‘আ বিবাহকে বৈধ মনে করে এবং উক্ত বিবাহে অনেক ফযীলত রয়েছে বলে বিশ্বাস করে। মুত‘আ বিবাহ সম্পর্কে তাদের কিছু বক্তব্য নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. বিখ্যাত শী‘আত আলিম ‘ফৎহুল্লাহ আল-কাশানী’ তার তাফসীরের মধ্যে উল্লেখ করেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি একবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে হুসাইনের মর্যাদার সমান; আর যে ব্যক্তি দুইবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে হাসানের মর্যাদার সমান; আর যে ব্যক্তি তিনবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে আলী ইবনু আবী তালিবের মর্যাদার সমান এবং যে ব্যক্তি চারবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে আমার মর্যাদার সমান’।[১] তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুত‘আ বিয়ে (সাময়িক বিবাহ) না করে দুনিয়া থেকে বের হয়েছে (মৃত্যুবরণ করেছে), সে ক্বিয়ামতের দিন নাক কাটা অবস্থায় হাজির হবে’।[২]
২. তিনি তার তাফসীরের মধ্যে ফারসি ভাষায় বর্ণনা করেন, যার অনুবাদ হল, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিবরীল আমার নিকট আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপহার নিয়ে আগমন করল। আর ঐ উপহার ছিল মুমিন নারীদের ভোগ করা। আর এই উপহার আমার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা আর কোন নবীকে দান করেননি ... (নাঊযুবিল্লাহ)। তোমরা জেনে রাখ, পূর্ববতী সকল নবীর উপর আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে মুত‘আ বিয়ের মাধ্যমে বিশেষিত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তার জীবনে একবার মুত‘আ বিয়ে করবে, সে ব্যক্তি জান্নাতের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। ... আর যখন মুত‘আ বিবাহিত নারী ও পুরুষ কোন জায়গায় একত্রিত হবে, তখন তাদের উপর একজন ফেরেশতা নাযিল হবে এবং সে তারা বিচ্ছিন্ন হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে পাহারা দেবে; তাদের উভয়ের মধ্যে যে কথাবার্তা হবে, সে কথাবার্তাগুলো হবে যিক্র ও তাসবীহ। আর তাদের একজন যখন অপরজনের হাত ধরবে, তখন তাদের উভয়ের আঙ্গুলসমূহ থেকে গুনাহসমূহ ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে থাকবে; আর যখন তাদের একজন অপরজনকে চুম্বন করবে, তখন তাদের জন্য প্রত্যেক চুম্বনের বিনিময়ে হজ্জ ও ওমরাহর ছাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তাদের সহবাসের সময় প্রত্যেক কামনা ও স্বাদের বিনিময়ে সুউচ্চ পর্বতসমূহ পরিমাণ পুণ্য লেখা হবে। আর যখন তারা গোসলে মশগুল থাকবে এবং পানি ফোঁটা ঝড়বে, তখন আল্লাহ তা‘আলা ঐ পানির প্রত্যেক ফোঁটা দ্বারা একজন করে ফেরেশতা সৃষ্টি করবেন, যে আল্লাহ্র তাসবীহ পাঠ করবে ও তার পবিত্রতা বর্ণনা করবে এবং তার তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনার ছওয়াব তাদের উভয়ের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হতে থাকবে। হে আলী! যে ব্যক্তি এই সুন্নাতটিকে (মুত‘আ বিয়েকে) হালকা ও দুর্বল মনে করবে এবং তাকে অপসন্দ করবে, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয় এবং আমি তার দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত ...।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বলল, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! যে দিরহামটি মুমিন তার মুত‘আ বিয়েতে খরচ করবে, তা আল্লাহ্র নিকট মুত‘আ বিয়ের বাইরে এক হাযার দিরহাম ব্যয় করার চেয়ে উত্তম। হে মুহাম্মাদ! জান্নাতের মধ্যে ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট একদল হুর রয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মুত‘আ বিয়ের অনুসারীদের জন্য। হে মুহাম্মদ! যখন মুমিন পুরুষ মুমিন নারীকে মুত‘আ বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে, তখন সে তার যে জায়গায়ই দাঁড়াবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং মুমিন নারীকেও ক্ষমা করে দেবেন ...।
আছ-ছাদিক থেকে বর্ণিত, মুত‘আ বিয়ে আমার এবং আমার বাপ-দাদার দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি তার উপর আমল করবে, সে আমাদের দ্বীনের উপর আমল করবে এবং যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করবে, সে আমাদের দ্বীনকে অস্বীকার করবে; বরং সে আমাদের দ্বীন ব্যতীত অন্য দ্বীনের অনুসরণ করবে। মুত‘আ বিয়ের স্ত্রীর গর্ভের সন্তান স্থায়ী স্ত্রীর গর্ভের সন্তানের চেয়ে উত্তম। আর মুত‘আ বিয়ের বিধান অস্বীকারকারী কাফির, মুরতাদ’।[৩]
অথচ আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে মুত‘আ বিবাহ হারাম। আবুল আব্বাস আল-কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
وَأَجْمَعَ السَّلَفُ وَالْخَلَفُ عَلَى تَحْرِيْمِهَا، ... وَإِلَّا الرَّافِضَةَ، وَلَا يُلْتَفَتُ لِخِلَافِهِمْ؛ إِذْ لَيْسُوا عَلَى طَرِيقَةِ الْمُسْلِمِينَ
‘সালাফ ও খালাফ সকল আলেমই মুত‘আ বিবাহ হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত। ... তবে রাফেযিরা এর ব্যতিক্রম। তাদের মতভেদকে গুরুত্ব দেয়া হয় না; কারণ তারা মুসলিমদের অনুসৃত পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়’।[৪] বরং অনেক আলেম এটিকে প্রকাশ্য ব্যভিচার (যিনা) হিসাবে গণ্য করেছেন। ইমাম ইবনু রুশদ আল-মালিকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
وَأَمَّا مَنْ تَوَاطَأَ مَعَ امْرَأَةٍ فِيْمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا عَلَى أَنْ يَطَأَهَا، وَيَسْتَمْتِعَ بِهَا مُدَّةً مِنَ الزَّمَانِ، عَلَى شَيْءٍ يَبْذُلُهُ لَهَا مِنْ مَالِهِ، فَلَيْسَ ذَلِكَ بِنِكَاحِ الْمُتْعَةِ، وَإِنْ سَمَّيْنَاهُ نِكَاحًا، وَإِنَّمَا هُوَ زِنًا
‘যদি কোন ব্যক্তি কোন নারীর সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সহবাস ও ভোগের বিনিময়ে তাকে কিছু অর্থ দেয়ার চুক্তি করে, তবে সেটি যদিও আমরা তাকে ‘বিবাহ’ নামে অভিহিত করি, কিন্তু তা আদৌ বিবাহ নয়; বরং তা যিনা’।[৫]
যাকাত, না-কি ‘খুমুস’-এর নামে সম্পদ আত্মসাৎ?
‘খুমুস’-এর নামে মানুষের সম্পদ গ্রহণকারী শী‘আ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সেই ধর্মীয় নেতাদের কোন মৌলিক পার্থক্য নেই, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ الۡاَحۡبَارِ وَ الرُّہۡبَانِ لَیَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ النَّاسِ بِالۡبَاطِلِ وَ یَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ
‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় বহু ধর্মীয় পণ্ডিত ও সন্ন্যাসী অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করে এবং আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয়’ (সূরা আত-তাওবাহ : ৩৪)।
যারা প্রশ্ন করেন, শী‘আদের বিশ্বাসের অসারতা তুলে ধরার পরও তারা কেন নিজেদের আক্বীদায় অটল থাকে? তাদের উত্তরে ড. আলী আস-সালূস বলেন,
وَأَعْتَقِدُ أَنَّهُ لَوْلَا هَذِهِ الْأَمْوَالُ لَمَا ظَلَّ الْخِلَافُ قَائِمًا بَيْنَ الْجَعْفَرِيَّةِ الرَّافِضَةِ وَسَائِرِ الْأُمَّةِ الْإِسْلَامِيَّةِ إِلَى هَذَا الْحَدِّ، فَكَثِيْرٌ مِنْ فُقَهَائِهِمْ يَحْرِصُوْنَ عَلَى إِذْكَاءِ هَذَا الْخِلَافِ حِرْصَهُمْ عَلَى هَذِهِ الْأَمْوَالِ
‘আমার বিশ্বাস, এই অর্থসম্পদ না থাকলে জাফরী (শী‘আ) সম্প্রদায় ও মুসলিম উম্মাহর বাকি অংশের মধ্যে এ বিরোধ এত দীর্ঘস্থায়ী হত না। তাদের বহু ফক্বীহ এ মতপার্থক্যকে জিইয়ে রাখতে যতটা আগ্রহী, ঠিক ততটাই আগ্রহী এ অর্থসম্পদের প্রতিও’।[৬]
সুধী পাঠক! এই দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠী দু’টি নিকৃষ্ট পাপকে একত্র করেছে, তাহল- ‘খুমুস’-এর নামে সম্পদ গ্রহণ এবং ‘মুতআ’-এর নামে ব্যভিচার। শাইখ শাহাতা মুহাম্মাদ ছাক্বর বলেন,
إِنَّ فَسَادَ الْإِنْسَانِ يَأْتِي مِنْ طَرِيقَيْنِ: الْجِنْسِ وَالْمَالِ، وَكِلَاهُمَا مُتَوَافِرٌ لِعُلَمَاءِ الشِّيعَةِ، فَالْفُرُوجُ وَالْأَدْبَارُ عَنْ طَرِيقِ الْمُتْعَةِ وَغَيْرِهَا، وَالْمَالُ عَنْ طَرِيقِ الْخُمُسِ وَمَا يُلْقَى فِي الْعَتَبَاتِ وَالْمَشَاهِدِ، فَمَنْ مِنْهُمْ يَصْمُدُ أَمَامَ هَذِهِ الْمُغْرِيَاتِ؟
‘মানুষের নৈতিক অধঃপতন প্রধানত দু’টি পথ দিয়ে আসে: যৌনতা ও সম্পদ। আর এই উভয় বিষয়ই শী‘আ আলেমদের জন্য সহজলভ্য: মুত‘আ ও অন্যান্য উপায়ে যৌন ভোগ, আর খুমুস ও মাজার-দরগাহে প্রদত্ত অর্থের মাধ্যমে সম্পদ। এমন প্রলোভনের সামনে তাদের মধ্যে কে-ই বা টিকে থাকতে পারে?’[৭]
তথ্যসূত্র :
[১]. মোল্লা ফাৎহুল্লাহ আল-কাশানী, তাফসীরু মানহাজিছ ছাদেক্বীন, পৃ. ৩৫৬।
[২]. তাফসীরু মানহাজিছ ছাদেক্বীন, পৃ. ৩৫৬।
[৩]. তাফসীরু মানহাজিছ ছাদেক্বীন, পৃ. ৩৫৬।
[৪]. আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু উমার ইবনু ইবরাহীম আল-কুরতুবী, আল-মুফহিমু লিমা আশকালা মিন তালখীছি কিতাব মুসলিম (দামেস্ক: দারু ইবনি কাছীর, ২য় সংস্করণ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৯৩।
[৫]. আবুল ওয়ালীদ মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইবনু রুশদ আল-কুরতুবী, মাসাইল আবিল ওয়ালীদ ইবনু রুশদ (বৈরূত: দারুল জাইল, ২য় সংস্করণ, ১৪১৪ হি./১৯৯৩ খ্রি.), পৃ. ১১২০।
[৬]. ড. ‘আলী ইবনু আহমাদ আলী আস-সালূস, মা‘আল ইছনা আশায়্যিাহ ফিল উছূলি ওয়াল ফুরূঊ (রিয়াদ: দারুল ফাযীলাহ, ৭ম সংস্করণ, ১৪২৪ হি./২০০৩ খ্রি.), পৃ. ১১১৬।
[৭]. শাহাতা মুহাম্মাদ ছাক্বর, আশ-শী‘আতু হুমুল আদুউউ ফাহযারহুম (মিশর: মাকতাবাতু দারিল ‘উলূম, তাবি), পৃ. ৯৫।
প্রসঙ্গসমূহ »:
ভ্রান্ত মতবাদ