উত্তর : মানুষ তার আয়-রোজগার, প্রয়োজনীয় খরচ এবং নিজের অবস্থা অনুযায়ী সেগুলোর বণ্টন করলে তাতে কোন দোষ নেই (আল-মাওয়ার্দী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ্দীন, পৃ. ৩২৯)। এছাড়াও বলা হয়েছে, ‘পরিমিত আয়ের সঙ্গে উত্তম ব্যবস্থাপনা, অপচয়সহ বিপুল সম্পদের চেয়ে উত্তম। মিতব্যয়িতা অল্প সম্পদকেও ফলপ্রসূ করে, আর অপচয় অনেক সম্পদকেও ধ্বংস করে’ (আল-জাহিয, আল-বায়ান ওয়াত-তাবইয়ীন, ২/৭৬ পৃ.)। এ বিষয়ে প্রশ্ন আসার কারণ হল, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূল (ﷺ) ইন্তেকাল করেন, তখন আমার ঘরে এমন কোন খাদ্যদ্রব্য ছিল না, যা কোন প্রাণী খেতে পারে- শুধু আমার তাকের উপর অর্ধ ছা‘ পরিমাণ যব ছিল। আমি তা থেকে খেতে থাকলাম, দীর্ঘদিন পর্যন্ত চলল। পরে আমি তা মেপে দেখলাম, তখন তা শেষ হয়ে গেল’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৭৩)।
ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) খাবারটি মেপেছিলেন স্বাভাবিক নিয়মের চিন্তা করে, সেই অবস্থায় তিনি বরকতের বিশেষ অনুগ্রহের দিকটি লক্ষ্য করেননি। ফলে বিষয়টি আবার স্বাভাবিক নিয়মেই ফিরে যায়। যেমন হাজেরা (আলাইহিস সালাম) যখন যমযমের পানি জমা করেছিলেন, তখন তা কূপের স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে গিয়েছিল’ (কাশফুল মুশকিল, পৃ. ১২১০)। হাফিয ইবনু হাজার বলেন, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীছটি এভাবে বোঝানো হয় যে, তিনি পরীক্ষার জন্য তা মেপেছিলেন, এজন্যই তাতে ঘাটতি দেখা দেয়। এটি ঐ ঘটনার মত, যখন নবী (ﷺ) তৃতীয়বার (গোশতের) ‘বাহু’ চাইলে আবূ রাফি‘ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘একটি ছাগলের তো মাত্র দু’টিই বাহু থাকে!’ তখন নবী (ﷺ) বললেন, ‘তুমি যদি এ কথা না বলতে, তবে যতক্ষণ চাইতাম, ততক্ষণ তুমি আমাকে তা দিতে থাকতে’। অর্থাৎ আপত্তি বা বিরূপ মন্তব্যের অশুভ প্রভাবেই বরকত সরে যায়। আমার কথার সমর্থনে এই হাদীছটিও রয়েছে, ‘তুমি গণনা করতে যেও না, তাহলে আল্লাহও তোমার উপর (রিযিক) গণনা করে সীমিত করে দেবেন’।
এর অনুরূপ বর্ণনা ছহীহ মুসলিম (২২৮১)-এ এসেছে। জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে খাদ্য প্রার্থনা করলে তিনি তাকে অর্ধ ‘ওয়াস্ক’ পরিমাণ যব দেন। লোকটি, তার স্ত্রী এবং তাদের মেহমান- তারা তা থেকে খেতে থাকল। এভাবে চলতে থাকল, অবশেষে যখন সে তা মেপে নিল, তখন সে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলো। তিনি বললেন, ‘তুমি যদি তা না মাপতে, তবে তোমরা তা থেকে খেতে থাকতে এবং তা তোমাদের জন্য অব্যাহত থাকত’। ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মাপা ও পরিমাপ করার সময় তাতে যে বৃদ্ধি (বরকত) উঠে গেল- আল্লাহই ভালো জানেন। কারণ হল, তখন মানুষের দৃষ্টি লোভের দিকে ফিরে যায়; অথচ সে আল্লাহর নে‘মতসমূহের প্রবাহ, তাঁর অনুগ্রহ ও অসংখ্য বরকত প্রত্যক্ষ করছিল। কিন্তু সে এসবের শুকরিয়া আদায় ও যিনি এগুলো দান করেছেন তাঁর উপর ভরসা করা থেকে গাফিল হয়ে পড়ে এবং অলৌকিক বিষয় প্রত্যক্ষ করার পরও স্বাভাবিক কারণগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ হাদীছ থেকে বোঝা যায়, যাকে কোন রিযিক্ব দেয়া হয় বা কোন বিশেষ অনুগ্রহ (কারামাত) দ্বারা সম্মানিত করা হয়, কিংবা কোন বিষয়ে আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুকম্পা করেন- তার কর্তব্য হল, অব্যাহতভাবে শুকরিয়া আদায় করা, আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহকে স্বীকার করা এবং সে অবস্থায় কোন পরিবর্তন না আনা’ (ফাৎহুল বারী, ১১/২৮১ পৃ.)।
সারকথা, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীছটি কারামাতের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ এ খাদ্যে মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাসের চেয়ে অতিরিক্ত বরকত অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু যখন তা মাপা হল বা মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাসের দিকে দৃষ্টি দেয়া হল, তখন বিষয়টি সেই স্বাভাবিক নিয়মেই ফিরে গেল (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৭৫৫৬১, ১৫১৩৬২)।
প্রশ্নকারী : সুমন হোসেন, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।