উত্তর : মোহর এবং কাবিন সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। মোহর হলÑ মুসলিম আইন অনুযায়ী মোহর বিয়ের অন্যতম শর্ত। এই শর্ত অনুযায়ী স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে বিয়ের সময় কিছু অর্থ বা সম্পত্তি পায় বা পাওয়ার অধিকার লাভ করে। মোহর বিয়ের সময়ই ধার্য বা ঠিক করা হয়। এটি স্ত্রীর একটি বিশেষ অধিকার। মোহর সম্পর্কে ইসলামী ফিকহ বিশ্বকোষে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘এটি সেই সম্পদ, যা স্ত্রীর জন্য স্বামী কর্তৃক প্রাপ্য হয়, বিয়ের চুক্তির ফলে বা তার সাথে সহবাসের মাধ্যমে। এটি এমন একটি অধিকার, যা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নারীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে এবং পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের তাদের মোহর যথাযথভাবে প্রদান করো’ (সূরা আন-নিসা : ৪)Ñ এই বিধান বিয়ের চুক্তির গুরুত্ব এবং তার মর্যাদা প্রকাশের জন্য, নারীর সম্মান বৃদ্ধি এবং তাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়ার জন্য নির্ধারিত’ (আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২৪/৬৪ পৃ.)।
স্বামীর জন্য তার স্ত্রীকে নির্ধারিত মোহর পরিশোধ করা ফরয। এটা ঋণের মত। কোনও স্বামী যদি জীবদ্দশায় মোহর পরিশোধ না করে থাকে, তাহলে তার মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে প্রথমে মোহর পরিশোধ করতে হবে। তারপর বাকি সম্পদ তার ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে। তবে বিয়ের পর স্ত্রী যদি নির্ধারিত মোহর থেকে কিছু ছাড় দেয় বা মাফ করে দেয় সেটাও তার অধিকার। এতে স্বামীকে তার পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়। এটাকে দেনমোহর বা মোহরানাও বলা হয়। আরবী ভাষায় এর আরেক নাম ‘সিদাক’ (الصداق)। আল্লাহ কুরআনে বলেন,
‘আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশী মনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর’ (সূরা আন-নিসা : ৪)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, نِحْلَةً শব্দের অর্থ المهر ‘মোহর’। ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, أن الرجل يجب عليه دفع الصداق إلى المرأة حتما وأن يكون طيّب النفس ‘একজন পুরুষের জন্য তার স্ত্রীকে মোহরানা প্রদান করা ওয়াজিব এবং তা উদার মন ও সৎ ইচ্ছার সঙ্গে হওয়া কর্তব্য’ (তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ২/২১৩ পৃ.)। ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, هذه الآية تدل على وجوب الصداق للمرأة ، وهو مجمع عليه ولا خلاف فيه ‘এই আয়াতে প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রীকে মোহর দেয়া ওয়াজিব। এটি সর্বসম্মত অভিমত। এতে কোনও দ্বিমত নেই’ (আল-জামি‘ঊ লি আহকামিল কুরআন, ৫/২৪ পৃ.)।
রাসূল (ﷺ) আব্দুর রহমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহ করেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সে কে? তিনি বললেন, জনৈকা আনছারী মহিলা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী পরিমাণ মোহর দিয়েছ? আব্দুর রহমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা). বললেন, খেজুরের এক আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ। নবী (ﷺ) তাঁকে বললেন, একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওলিমার ব্যবস্থা কর’ (ছহীহ বুখারী, ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়-৩৪, ‘আল্লাহ তা‘আলার এ বাণী সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে’ পরিচ্ছেদ-১)।
কাবিন বলতে বিয়ে সম্পাদনের লিখিত চুক্তি বোঝায়। একে কাবিননামা বা নিকানামা বলেও উল্লেখ করা হয়। বিয়ে সম্পাদনের জন্য বা বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য ‘কাবিননামা’ অপরিহার্য নয়। কাবিননামা একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক মনোনীত কাজি সরকার নির্ধারিত ছকে কাবিননামা সম্পাদন করে থাকেন। স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর আদায়, স্ত্রীর ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার নির্ণয়, সন্তানের পিতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথাযথভাবে নিবন্ধিত কাবিননামা একটি আইনি দলীল (বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় ই-তথ্যকোষ)। উল্লেখ যে, আমাদের সমাজে অনেক সময় মোহর শব্দের পরিবর্তে ‘কাবিনের টাকা’ বলা হয়। সুতরাং ‘কাবিনের টাকা’ দ্বারা মোহরই উদ্দেশ্য।
প্রশ্নকারী : হাবীবুল্লাহ, উত্তরা, ঢাকা।