উত্তর : এটি সূদী কারবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা এটি নির্ধারিত লভ্যাংশের উপর ঋণ দেয়া নেয়া। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, فمتى كان مقصود المتعامل: دراهم بدراهم إلى أجل .....فإنه ربا ‘যখন ব্যাপারী বা বিনিয়োগকারীর নিয়ত হয়, ‘একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকার বিনিময়ে টাকা উপার্জন করা...,তাহলে তা সূদ’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৯/৪৩২-৪৩৩ পৃ.)। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন। আল্লাহ সূদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৫-২৭৯)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা বহুগুণ বৃদ্ধি করে চক্রবৃদ্ধি হারে সূদ খাবে না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও’ (সূরা আলি ইমরান : ১৩০)। নবী (ﷺ) সূদখোর, সূদদাতা, তার সাক্ষীদাতা ও তার লেখককে অভিসাম্পত করেছেন এবং বলেছেন, ‘ওরা সবাই সমান’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৭-১৫৯৮)।
ইমাম ইবনুল মুনযির, ইমাম ইবনে আব্দিল বার্র, ইমাম ইবনে কাত্ত্বান, ইমাম ইবনে কুদামা, শাইখ সায়্যিদ সাবিক্ব, ইমাম কাসানী, ইমাম শিরাজী, শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুমুল্লাহ) ও শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘শরী‘আতসম্মত যৌথ ব্যবসা নীতির একটি উল্লেখযোগ্য হল- ‘মুদারাবাহ’ ব্যবসা, অর্থাৎ লভ্যাংশের অংশীদারিত্ব ভিত্তিক যৌথ ব্যবসা। একজনের টাকা ও অন্যজনের শ্রম। খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ছিল সম্পদ ও রাসূল (ﷺ)-এর ছিল শ্রম, কিন্তু লভ্যাংশের অংশীদার উভয় পক্ষ হবে। এর বৈধতার জন্য কিছু শর্ত আছে। যথা :
(১) অর্থ বিনিয়োগকারীকে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ব নির্ধারিত টাকা লভ্যাংশের নামে দেয়া যাবে না, প্রতি মাসে আপনাকে ৫০০ বা ১০০০ দেবো, এরকম টাকা নির্ধারণ করা যাবে না, বরং উভয়ের সম্মতিতে লভ্যাংশের একটি পার্সেন্টেজ নির্ধারণ করতে হবে, অর্ধাংশ, তৃতীয়াংশ, অথবা চতুর্থাংশ এবং যখন যেমন মুনাফা হবে, সেই হারে-ই তারা ভাগাভাগি করবে।
(২) নগদ বিনিয়োগ করতে হবে।
(৩) বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখ থাকতে হবে। যাতে হিসাব রাখা সহজ হয়।
(৪) নিঃশর্ত বিনিয়োগ হতে হবে। বিনিয়োগকারী শ্রমিকের উপর কোনরূপ শর্তারোপ করতে পারবে না। যেমন কোন জায়গায়, কোন জিনিসের, কোন সময়ে ইত্যাদি ইত্যাদি।
(৫) কর্মী, শ্রমিক বা আমলকারী শুধু লভ্যাংশের অংশীদার হবে। আর ক্ষতি বা লোকসানের দায়ভার শুধু বিনিয়োগকারী বহন করবে। আদতে কিন্তু দু’জনেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এক্ষেত্রে কর্মীর কর্ম আর বিনিয়োগকারীর অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদি আমলকারীকেও অর্থের ক্ষতি বহন করতে হয়, তাহলে এমন মুদারাবাহ্ বাতিল হিসাবে পরিগণিত হবে।
(৬) কোন কারণে মুদারাবার চুক্তি ভঙ্গ করলে সমস্ত লভ্যাংশ বিনিয়োগকারী পেয়ে যাবে, শ্রমিক শুধু তার শ্রমের পারিশ্রমিক পাবে (আল- ইসতিযকার, ২১/১২৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ, ৩/২০৫-২০৭; আল-মাজমূঊ শারহুল মুহাযযাব, ১৪/৩৬৬; ফাতাওয়া আল-জামিউল কাবীর ইবনে বায অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২২৬২২)।
ইসলাম মুদারাবা লেনদেন বৈধ করেছে। ইসলাম সূদবিহীন অর্থ ব্যবস্থা প্রচলনে মুদারাবা তথা অংশীদারিত্ব ব্যবসা জায়েয করেছে। এতে একজনের মূলধন থাকবে এবং অন্যজন ব্যবসায়ে কাজ করবে। আর এভাবে অর্জিত লভ্যাংশ উভয়ের মধ্যকার চুক্তি অনুসারে পাবে। তবে ব্যবসায়ে ক্ষতি হলে মূলধন বিনিয়োগকারীর উপর বর্তাবে। আর শ্রমদাতার উপর ক্ষতির ভাগ বর্তাবে না, যেহেতু তার কষ্ট ও শ্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই সে অর্থের ক্ষতির অংশীদার হবে না। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, وَلَا رِبْحُ مَا لَمْ يُضْمَنْ ‘মুনাফা গ্রহণও জায়েয নয়, যতক্ষণ না লোকসানের দায়িত্ব নেয়া হয়’ (তিরমিযী, হা/১২৩৪; আবূ দাঊদ, হা/৩৫০৪)।
দ্বিতীয়তঃ যদি কোন কোম্পানী বা ব্যাংক সত্যিকার অর্থেই ইসলামিক হয়, সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্ত অনুযায়ী বিনিয়োগ করা যেতে পারে। যেমন-
(১) ব্যাংক যেন বিনিয়োগকৃত অর্থ বৈধ কাজে লাগায়। যেমন, উন্নত প্রকল্প স্থাপন, বিল্ডিং নির্মাণ ইত্যাদি। ব্যাংক কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করবে, সেই দিকগুলো যদি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ না করে, তাহলে এ বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এতে অংশগ্রহণ করা জায়েয হবে না।
(২) মূলধনের গ্যারান্টি দেয়া যাবে না। লোকসান বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংক মূলধন ফেরত দিতে বাধ্য হবে না। কেননা এটি বাইয়ে মুদারাবা এর অন্তর্ভুক্ত, আর বাইয়ে মুদারাবাতে বিনিয়োগকারীই লোকসানের ভার নেবে (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৪/৩৩৪ পৃ.)। যদি মূলধন গ্যারান্টিযুক্ত হয়, তাহলে সেটি আসলে একটি ঋণের চুক্তি হিসাবে গণ্য হবে এবং এর থেকে আনিত লভ্যাংশ সূদ হিসাবে বিবেচিত হবে। কেননা ব্যবসা লাভ-ক্ষতি উভয়ের সঙ্গে জড়িত। কখনো আংশিক ক্ষতি, আবার কখনো সম্পূর্ণটাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংক গ্যারান্টি দেয়া মানে শুধু লভ্যাংশের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যা স্পষ্ট সূদ।
(৩) প্রথম থেকেই উভয়ের সম্মতিক্রমে চুক্তিপত্রে লাভের শতাংশ উল্লেখ থাকতে হবে। সূদী ব্যাংকের মত মাসিক বা বাৎসরিক নির্দিষ্ট শতকরা হারে যেন না হয় (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৫১৩৬৬)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি একই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘প্রশ্নে উল্লেখিত বর্ণনাটি যদি সত্য ও বাস্তব হয়, সেটি যদি সত্যিই পূর্ণাাঙ্গ ইসলামিক ব্যাংক হয়, সূদী ব্যাংক না নয় এবং ইসলামী শরী‘আতের মূল নীতিমালার ভিত্তিতেই বিনিয়োগ করা হয়, সেক্ষেত্রে আপনার জন্য বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে অর্থ জমা করা জায়েয’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৩/৩৬৫-৩৬৬ পৃ.)।
অতএব ইসলামী কোম্পানী বা ব্যাংকে অর্থ বিনিয়োগ করার পূর্বে উপরিউক্ত শর্তসমূহ ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি-না, তা ভালো করে মিলিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে পুরোপুরি ইসলামিক কোন কোম্পানী বা ব্যাংক আছে বলে আমাদের জানা নেই। সেক্ষেত্রে লভ্যাংশ প্রাপ্তির আশায় বিনিয়োগ করার ব্যাপারটি সন্দেহযুক্ত। তাই কোন মুসলিমের জন্য এরূপ সন্দেহযুক্ত উপার্জন ভক্ষণ করা উচিত নয়। কেননা ইসলামী শরী‘আতের স্থিরীকৃত নীতিমালাসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, إذا اجتَمَع الحلالُ والحرامُ غُلِّبَ الحرامُ ‘যখন কোন বিষয়ে হালাল ও হারামের মাস’আলা একত্রিত হয়, তখন হারামের মাসআলা প্রাধান্য পায়’ (অর্থাৎ সেটাকে হারাম বলে গণ্য করতে হয়)। নবী (ﷺ) বলেন, নিশ্চয় হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট, আর উভয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহজনক বিষয়, অনেক মানুষই সেগুলোর বাস্তবতা জানে না। যে ব্যক্তি এসব সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকে সে তার দ্বীন ও মর্যাদাকে নিরাপদে রাখে, আর যে লোক সন্দেহজনক বিষয়ে পতিত হবে সে হারামের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়বে (ছহীহ বুখারী, হা/৫২, ২০৫১)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে যাতে সন্দেহের সম্ভাবনা নেই তা গ্রহণ কর। যেহেতু সত্য হল শান্তি ও স্বস্তি এবং মিথ্যা হল দ্বিধা-সন্দেহ’ (তিরমিযী, হা/২৫১৮; নাসাঈ, হা/৫৭১১)।
প্রশ্নকারী : জমিরুদ্দীন, দূর্গাপুর, রাজশাহী।