বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন

দিরিয়াহ : অনাবশ্যক মরুভূমি থেকে আজকের আধুনিক সঊদী আরব 

-তানযীল আহমাদ* 


অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আরব উপদ্বীপের ধূসর মরুভূমি যখন দীর্ঘকালের অখণ্ড নীরবতা ও বিচ্ছিন্নতায় নিমজ্জিত, তখন দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, এই রুক্ষ বালুকাবেলা থেকেই একদিন মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে সৃষ্টি হবে এক অভাবনীয় আলোড়ন। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ যখন বিশ্বজুড়ে মানচিত্র আঁকাআঁকিতে ব্যস্ত, তখন সঊদী আরবের জন্ম কোনো বহিরাগত শক্তির কলমের আঁচড়ে হয়নি; এটি ছিল মরুর অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত এক আত্মিক ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ। বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায়, অন্তহীন গোত্রকলহকে সংহতিতে এবং ধর্মীয় বিচ্যুতিকে বিশুদ্ধ তাওহীদের আলোকধারায় রূপান্তরের সেই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ যাত্রার নামই সঊদী আরবের ইতিহাস।

মরুর বুকে তাওহীদের অভ্যুদয়: দিরিয়াহ চুক্তি ও আদর্শিক ভিত্তি

অষ্টাদশ শতাব্দীর নজদ ছিল মূলত এক রাজনৈতিক ও আত্মিক মরুভূমি। পঞ্চম হিজরিতে উখায়দিরীয় শাসনের অবসানের পর থেকে এ অঞ্চলে কোনো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি ছোট ছোট মরূদ্যান বা জনপদ— যেমন রিয়াদ, দিরিয়াহ কিংবা উয়াইনাহ পরিণত হয়েছিল একেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দুর্গে, যেখানে স্থানীয় গোত্রপ্রধানদের (আমিরুল বালাদ) অন্ধ আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধমূলক লড়াই আর পানির কূপ দখলের সংঘাত ছিল নিত্যদিনের চিত্র। বিচারব্যবস্থায় কুরআন-সুন্নাহর বদলে স্থান পেয়েছিল মরুচারী বেদুঈনদের অলিখিত জাহেলি রীতি (‘সুল্লুম’)। বাণিজ্য কাফেলা আর নিরীহ হজযাত্রীদের রক্তে রঞ্জিত হত পথপ্রান্তর; ত্রাস সৃষ্টি করেছিল যাযাবর দস্যুরা।

রাজনৈতিক এই দেউলিয়াত্বের চেয়েও ভয়াবহ ছিল সমাজের আত্মিক অধঃপতন। যে ভূখণ্ডে ইসলামের জন্ম হয়েছিল, সেই ভূমির মানুষই তখন পাথর আর বৃক্ষের কাছে নিজেদের কল্যাণ কামনা করছিল। যুবাইলাহ-তে ছাহাবী যায়িদ ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথিত কবরে চলত মানত আর সেজদার মহোৎসব; এমনকি সন্তানের সুস্থতা কিংবা উটের বংশবৃদ্ধির আশায় পুজো পেত ‘তারফিয়াহ’ কিংবা ‘শাজারাতুজ জিব’-এর মত বুনো গাছগাছালি।

ঠিক এই আত্মিক শূন্যতার কালে নাজদের উয়ায়নাহ অঞ্চলে আবির্ভূত হন শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (১৭০৩-১৭৯২ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ)। জন্মসূত্রে এক সম্ভ্রান্ত হাম্বলী ফক্বীহ পরিবারের সন্তান শায়খ মক্কা, মদীনা, বছরা ও আল-আহসার প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্যে দীর্ঘ জ্ঞানতপস্যা শেষে স্বদেশে ফেরেন। জন্মভূমিতে ফিরে এসে তিনি শুরু করেন শিরক, বিদ‘আত, কুফর ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জ্ঞানভিত্তিক জিহাদ। তার কন্ঠে ঝংকৃত হয় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সুর। সে সুর ছিল খালেছ তাওহীদের, ছাহাবী ও সালাফে ছালেহীনের সেই আদি ও অকৃত্রিম ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন। উয়াইনাহ অঞ্চলে সংস্কার কাজ শুরু করতে গিয়ে তিনি স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার মুখে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে হিজরত করে পা বাড়ান মরুর ছোট জনপদ দিরিয়াহর দিকে।

সখানে তখন শাসন করছিলেন প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী শাসক ইমাম মুহাম্মদ বিন সঊদ (রাহিমাহুল্লাহ)। ১১৫৭ হিজরীর (১৭৪৪ খ্রি.) এক ঐতিহাসিক অপরাহ্নে দিরিয়াহর মাটির প্রাসাদে মিলিত হল তরবারির শক্তি আর তাওহীদের জ্যোতি। ইমাম মুহাম্মদ বিন সঊদ পরম সমাদরে শায়খকে বরণ করে নিয়ে আশ্বস্ত করলেন, ‘আপনার নিজের ফেলে আসা শহরের চেয়েও এক উত্তম জনপদ, চিরন্তন সম্মান ও লৌহকঠিন নিরাপত্তার সুসংবাদ গ্রহণ করুন’।

উত্তরে বিনম্র অথচ দৃঢ় কণ্ঠে শায়খ বললেন, ‘আমিও আপনাকে সম্মান, মর্যাদা ও বিজয়ের সুসংবাদ দিচ্ছি। এই মহিমান্বিত বাক্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’— যে ব্যক্তি বক্ষে ধারণ করবে, জীবনে বাস্তবায়ন করবে এবং একে বিজয়ী করতে সাহায্য করবে, সে-ই এ ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব ও মানুষের ভালোবাসা লাভ করবে’।

এই ঐতিহাসিক মিলন থেকেই জন্ম নিল অমর ‘দিরিয়াহ চুক্তি’। ইমাম গ্রহণ করলেন রাজনৈতিক স্থায়িত্ব বিধান, সীমান্ত রক্ষা এবং প্রশাসনিক শাসনের গুরুদায়িত্ব; আর শায়খ কাঁধে তুলে নিলেন শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় সংস্কার, বিচার ও ফাতাওয়ার ভার । আরব উপদ্বীপের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি ছিল এমন এক নতুন সামাজিক চুক্তি, যা রক্ত ও বংশের সংকীর্ণ অহমিকা গুঁড়িয়ে দিয়ে, শিরক-বিদ‘আত, কুফর এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন জাতিকে এক অভিন্ন ধর্মীয় চেতনার পতাকাতলে একত্রিত করেছিল।

সঊদী রাষ্ট্রের তিনটি ঐতিহাসিক পর্ব

সঊদী আরবের ঐতিহাসিক পরিক্রমা যেন বারবার ভস্ম থেকে ডানা মেলে উড়ে চলা এক ফিনিক্স পাখির উপাখ্যান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে রাষ্ট্র কাঠামোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সর্বগ্রাসী চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা প্রতিবারই অধিকতর শক্তি ও সংহতি নিয়ে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

প্রথম সঊদী রাষ্ট্র (১৭৪৪-১৮১৮ খ্রি.) দিরিয়াহকে রাজধানী করে গঠিত হয় । কিন্তু তা ইবরাহীম পাশার আক্রমণে ১৮১৮ সালে পতন হয়। ইমাম তুর্কির নেতৃত্বে দ্বিতীয় সঊদী রাষ্ট্র (১৮২৪-১৮৯১ খ্রি.) রিয়াদকে রাজধানী করে গঠিত হয়। আর সবশেষে আধুনিক সঊদী আরব ১৯০২ খ্রি. গঠিত হয়।

ক. প্রথম রাষ্ট্র (১৭৪৪-১৮১৮ খ্রি.) ৭৪ বছর: স্বর্ণযুগ ও ট্র্যাজেডি

মুহাম্মাদ ইবনু সঊদের হাত ধরে যার সূচনা, তা পূর্ণতা পেয়েছিল আব্দুল আযীয এবং বিশেষ করে সঊদ ইবনু আব্দুল আযীযের (‘সঊদে কাবীর’) শাসনামলে। এ সময় আরব ভূখণ্ড এমন এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তার মুখ দেখল, যা শত শত বছর কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। হিজাজ, আসির, আল-আহসা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তৃত হলো ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত। কাফেলাগুলো কোনো রক্ষীবাহিনী ছাড়াই মাইলের পর মাইল মরুভূমি পার হতে পারত, বন্ধ হয়ে গেল তীর্থযাত্রীদের ওপর স্থানীয় সর্দারদের তোলাবাজি। কিন্তু এই জাগরণকে ঔদ্ধত্য হিসাবে দেখল ইস্তাম্বুলের উছমানীয় দরবার। সুলতান দ্বিতীয় মাহমূদের নির্দেশে মিশরের উচ্চাভিলাষী শাসক মুহাম্মদ আলী পাশা আধুনিক ফরাসি সামরিক বিদ্যায় প্রশিক্ষিত এবং ভারী কামানে সজ্জিত এক সুবিশাল বাহিনী প্রেরণ করলেন। পুত্র ইবরাহীম পাশার নেতৃত্বে সেই বাহিনী নজদের হৃদপিণ্ড দিরিয়াহ আক্রমণ করে। ১৮১৮ সালে টানা ছয় মাসের অবর্ণনীয় অবরোধ শেষে যখন খাদ্য ও রসদ ফুরিয়ে এলো, তখন নিরীহ প্রজাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচাতে শেষ শাসক ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু সঊদ বীরদর্পে আত্মসমর্পণ করলেন। তাঁকে ইস্তাম্বুলে নিয়ে নির্মমভাবে শহীদ করা হলো। ইবাাহীম পাশা এখানেই ক্ষান্ত হননি; তিনি ঐতিহাসিক দিরিয়াহ শহরটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন, জ্বালিয়ে দিলেন সবুজ খেজুরবাগান, আর নির্বিচারে ফাঁসিতে ঝোলালেন আলে সঊদ ও আলে শায়খ পরিবারের প্রখ্যাত আলেমদের। দৃশ্যত মনে হয়েছিল, এই মরু সাম্রাজ্যের গল্প এখানেই চিরতরে শেষ। কিন্ত আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন।

খ. দ্বিতীয় রাষ্ট্র (১৮২৪-১৮৯১ খ্রি.) ৭৭ বছর

কোনো আদর্শের শিকড় যদি মানুষের আত্মায় প্রোথিত থাকে, তবে তাকে কেবল কামান দেগে মুছে ফেলা যায় না। তেমনই হয়েছিল দিরিয়াহর। পতনের মাত্র ছয় বছরের মাথায় রক্তক্ষয়ী ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ধুলো ঝেড়ে দাঁড়ালেন মুহাম্মাদ ইবনু সঊদের নাতি বীরপুরুষ তুর্কি ইবনু আব্দুল্লাহ। স্বল্পসংখ্যক অনুসারী নিয়ে মরুভূমিতে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে তিনি উছমানীয়-মিশরীয় বাহিনীকে নজদ থেকে বিতাড়িত করলেন। তিনি এবার ধ্বংসপ্রাপ্ত দিরিয়াহকে নয়, বরং অদূরের এক শ্যামল মরূদ্যান রিয়াদ-কে করলেন তাঁর নতুন রাজধানী। গড়ে তুললেন বিখ্যাত ‘কসরুল হুকম’ বা শাসন প্রাসাদ। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র ইমাম ফয়সাল ইবনু তুর্কির হাত ধরে দ্বিতীয় রাষ্ট্র পায় পূর্ণ স্থিতিশীলতা। ফয়সালকে একবার বন্দি করে কায়রোর দুর্গে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, কিন্তু অসীম সাহসিকতায় সেখান থেকে পালিয়ে এসে তিনি পুনরায় আরবের সিংহাসন উদ্ধার করেন।

তবে এই দ্বিতীয় পর্বের অন্তিম মুহূর্তটিও ছিল বিষাদময়। ইমাম ফয়সালের প্রয়াণের পর তাঁর সন্তানদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, যার সুযোগ নিয়ে উত্তরের হাইল অঞ্চলের পরাক্রমশালী আল-রশিদ পরিবার ১৮৯১ সালের ‘মুলাইদার যুদ্ধে’ জয়লাভ করে রিয়াদ দখল করে নেয়। শেষ ইমাম আব্দুর রহমান ইবনু ফয়সাল তাঁর পরিবার ও প্রাণপ্রিয় তরুণ পুত্র আব্দুল আযীযকে নিয়ে কুয়েতের মরুভূমিতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।

গ. আধুনিক সঊদী আরব (১৯০২ খ্রি.-বর্তমান) : মরু সিংহের বিজয়গাথা

১৯০২ সালের এক কনকনে শীতের রাতে স্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বললেন বিশ বছর বয়সী এক যুবক আব্দুল আযীয ইবনু আব্দুর রহমান। কুয়েত থেকে মাত্র চল্লিশ থেকে ষাটজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীকে নিয়ে উটের পিঠে চড়ে তিনি সন্তর্পণে প্রবেশ করলেন রিয়াদে। ফজরের ঠিক পরপরই দুঃসাহসী আক্রমণে দখল করে নিলেন শহরের কেন্দ্রবিন্দু ‘মাসমাক দুর্গ’। শুরু হল আধুনিক সঊদী আরবের মহাকাব্য।

পরবর্তী তিন দশক ধরে আব্দুল আযীযের জীবন ছিল যুদ্ধের ঘোড়ার পিঠে। এক হাতে উন্মুক্ত তলোয়ার আর অন্য হাতে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে তিনি একে একে উদ্ধার করলেন নজদ, আল-আহসার উপকূল, হাইল, আসির এবং অবশেষে ১৯২৫ সালে পবিত্র হিজাজ। তিনি বুঝলেন, যাযাবর সমাজকে রাষ্ট্রের সুতোয় বাঁধতে হলে দরকার স্থায়িত্ব; তাই গড়ে তুললেন ‘হিজরাহ’ প্রকল্প, যার মাধ্যমে যাযাবর বেদুঈনদের স্থায়ী কৃষিবসতিতে পুনর্বাসিত করে এক সুসংগঠিত সমাজ তৈরি করা হলো।

অবশেষে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর (২১ জুমাদাল উলা ১৩৫১ হি.) এক ঐতিহাসিক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে অখণ্ড ভূখণ্ডের নাম ঘোষণা করা হলো: ‘আল-মামলাকাতুল আরাবিয়্যাতুস সঊদিয়্যাহ’ (কিংডম অব সঊদী আরাবিয়া)। ১৯৩৮ সালে দাম্মামের মাটির নিচ থেকে প্রথম যখন কালো সোনা বা তেলের ফোয়ারা ছুটল, তখন এই রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও এক বিশ্ব পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে পা বাড়াল।

বাদশাহ আব্দুল আযীযের পর তাঁর সুযোগ্য সন্তানগণ— বাদশাহ সঊদ, বিচক্ষণ বাদশাহ ফয়সাল, বাদশাহ খালিদ, দূরদর্শী বাদশাহ ফাহাদ, সংস্কারক বাদশাহ আব্দুল্লাহ এবং বর্তমানের বাদশাহ সালমান ও ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমান— ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এই দেশকে এক মহীরুহে পরিণত করেছেন।

উছমানীয় দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ: একটি অপবাদের নির্মোহ খণ্ডন

একটি বিভ্রান্তিকর ঐতিহাসিক বয়ান আধুনিক মুসলিম মানসে প্রায়ই ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, সঊদী রাষ্ট্র না-কি উছমানীয় খিলাফতের পিঠে ‘ছুরিকাঘাত’ করে কিংবা ইসলামী খেলাফতের বিরুদ্ধে অবৈধ ‘বিদ্রোহ’ (খুরুজ) করে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে আবেগ বাদ দিয়ে দলীলের আয়নায় চোখ রাখলে এই অপবাদের অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. নজদে উছমানীয় সার্বভৌমত্বের অস্তিত্বহীনতা

প্রথমত বুঝতে হবে, ‘বিদ্রোহ’ কেবল তখনই সম্ভব, যখন কারও বৈধ আনুগত্য বা রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে কোনো পক্ষ বসবাস করে। ১৫১৭ সালে সুলতান সেলিম প্রথমের হাতে মামলুকদের পতনের পর উছমানীয়রা হিজাজ ও মিশরের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল বটে, কিন্তু বিস্তীর্ণ নজদ কোনো কালেই উছমানীয় সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক অংশ ছিল না। কারণ:

  • ইস্তাম্বুল থেকে নজদে কখনো কোনো ওয়ালী বা প্রশাসক পাঠানো হয়নি।
  • নজদের প্রতিরক্ষায় সুলতানের কোনো সৈন্য কখনো পাহারা দেয়নি।
  • সেখানকার মানুষের কাছ থেকে ইস্তাম্বুল কোনো দিন খাজনা বা ট্যাক্স নেয়নি।

প্রকৃতপক্ষে রুক্ষ নজদকে তুর্কিরা বিবেচনা করত এক ‘অনাবশ্যক বিরাণভূমি’ হিসাবে, যাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী গোত্রীয় রক্তক্ষয় আর দুর্ভিক্ষের মুখে সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন ছেড়ে রাখা হয়েছিল। ইসলামী রাজনীতির মূলনীতি হলো- যেখানে শাসকের নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষমতা নেই, নাগরিকের দায়ভার নেই এবং যেখানে কোনো ‘বাই‘আত’ বা আনুগত্যের চুক্তিই সম্পাদিত হয়নি, সেখানে শান্তি ও শৃঙ্খলা কায়েমের প্রয়াসকে কোনো ফিক্বহেই ‘বিদ্রোহ’ বলা যায় না।

২. আগ্রাসনের সূচনা ও আত্মরক্ষার অনিবার্যতা

সঊদী রাষ্ট্র কি কখনো ইস্তাম্বুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল? ইতিহাস বলে—কখনোই নয়। কারণ:

  • দিরিয়াহর সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব যখন সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, তখন সাম্রাজ্যের দূরবর্তী সীমান্ত শাসক—বিশেষ করে বাগদাদ ও দামেস্কের উছমানীয় পাশারাই প্রথম সঊদীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
  • মক্কার তৎকালীন শরিফরা রাজনৈতিক সংকীর্ণতা থেকে নজদের সাধারণ মুসলিমদের জন্য পবিত্র হজ্জের দরজা বন্ধ করে দেন এবং নিরস্ত্র হজ্জযাত্রীদের বন্দি করেন।
  • আর ১৮১৮ সালে মুহাম্মাদ আলী ও ইবরাহীম পাশা যে রক্ত বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন, তাতে ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না; তা ছিল ফরাসি সামরিক উপদেষ্টাদের নকশায় পরিচালিত এক নৃশংস রাজতান্ত্রিক আগ্রাসন। সেই আগ্রাসনের মুখে ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু সঊদের প্রতিরোধ ছিল নিজ মাতৃভূমি, ইজ্জত ও ধর্ম রক্ষার সম্পূর্ণ বৈধ আত্মরক্ষা (‘দফউস সায়েল’)।

স্মর্তব্য, উছমানীয় খেলাফত ১৯২৪ সালে বিলুপ্ত হলেও অনেক আগে থেকেই তা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো:

১. সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের মোঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ব্রিটিশ বেনিয়ারা নয়া সাম্রাজ্য কায়েম করে। যার নির্মম ভোগান্তি উপমহাদেশের মুসলিমদেরকে দীর্ঘ দিন যাবৎ পোহাতে হয়। কিন্তু উছমানীয় সালতানাত/খেলাফত এ নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ পায়নি। উপরন্তু, উছমানীয় খেলাফতকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতে খেলাফত আন্দোলন গড়ে ওঠে।
২. আরববিশ্বের হ-য-ব-র-ল অবস্থা। সেখানের নিয়ন্ত্রণ উছমানীয়দের হাতে ছিল না বললে ভুল হবে না। শরীফ হোসাইন সেখানে নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
৩. সাইরেনিকায় (বর্তমান পূর্ব লিবিয়া) সানুসী বিদ্রোহ আরম্ভ হয়।
৪. ১৯২৯ সালে গ্রীস স্বাধীনতা লাভ করে।
৫. ১৮৩০ সালে ফ্রান্স আলজিয়ার্স দখল করে।
৬. বলকানে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার ইন্ধনে অস্থীতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
৭. ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে (১৮৫৪-৫৬) ইংরেজ এবং ফরাসি বাহীনি মিত্রশক্তি হিসাবে নিজস্ব প্রয়োজনে সাহায্যের হস্ত সম্প্রসারণ করলেও তাতে প্রচুর অর্থহানী হয়।

৩. খলীফার আনুগত্য বিষয়ে শায়খের নির্ভুল বিশ্বাস

শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) কি উছমানীয় সাম্রাজ্যকে ‘কাফের’ ফৎওয়া দিয়েছিলেন? এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় মিথ্যাচার। আল-কাসিমের অধিবাসীদের কাছে লেখা তাঁর ঐতিহাসিক চিঠিতে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর আক্বীদা স্পষ্ট করেছেন:

‘আমি মুসলিম শাসকদের আনুগত্য করা অপরিহার্য (ওয়াজিব) মনে করি—তারা নেককার হোক কিংবা ফাসেক, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দেয়। যে ব্যক্তি খিলাফতের আসনে বসেছেন এবং মানুষ তাঁর ওপর একমত হয়েছে কিংবা তরবারীর শক্তিতে বিজয়ী হয়ে খলীফা হয়েছেন, তাঁর আনুগত্য করা ওয়াজিব এবং তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা হারাম’।

শায়খ উছমানীয় সাম্রাজ্য ধ্বংসের কোনো ডাক দেননি; তিনি আক্রমণ করেছিলেন সমাজের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়া শিরক ও কুসংস্কারকে, যা বহু উছমানীয় ভূখণ্ডেও প্রশ্রয় পাচ্ছিল।

৪. খিলাফত আসলে কারা বিলুপ্ত করেছিল?

আরেকটি অভিযোগ করা হয় যে, সঊদী রাষ্ট্র না-কি খিলাফত পতনে ভূমিকা রেখেছে। অথচ নির্মম সত্য হলো, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তা লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার প্ররোচনায় যে তথাকথিত ‘আরব বিদ্রোহ’ (১৯১৬) হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন মক্কার শরিফ হুসাইন বিন আলী, সঊদীরা নন! বাদশাহ আব্দুল আযীয অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এই দ্বন্দ্বে নিজেকে জড়াননি। এমনকি উছমানীয় খিলাফত যতদিন ছিল ততদিন তিনি কোন মামলাকার ঘোষণা দেননি। ১৯২৪ সালে উছমানীয় খিলাফত বিলুপ্ত হবার আরো ৮ বছর পর ১৯৩২ সালে তিনি মামলাকা আরাবিয়ার ঘোষণা দেন।

আর খিলাফত? তাকে কোনো আরব বেদুইন হত্যা করেনি। ১৯২৪ সালে ইস্তাম্বুলের পার্লামেন্টে বসে যে মানুষটি খিলাফতকে সমূলে উৎখাত করে উছমানীয় রাজপরিবারকে দেশান্তরী করেছিলেন, তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি জাতীয়তাবাদের জনক মোস্তফা কামাল। নিজ ঘরের লোকেরাই যখন খিলাফতের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল, তখন তার দায় হাজার মাইল দূরের রিয়াদের ওপর চাপানো এক চরম ঐতিহাসিক অবিচার।

মুসলিম উম্মাহর অভিভাবকত্ব: সেবার এক অনন্য দিগন্ত

সঊদী আরব কেবল তেলসমৃদ্ধ একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বিশ্ব মুসলিমের আত্মিক হৃদপিণ্ড। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি বৈশ্বিক মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় যে ভূমিকা রেখেছে, তা সমকালীন ইতিহাসে অতুলনীয়। যেমন:

১. পবিত্র হারামাইন শরীফাইনের বিস্ময়কর রূপান্তর

উছমানীয় বা মামলুক ইতিহাসের কোনো যুগেই মক্কা ও মদীনা এমন অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মুখ দেখেনি। সঊদী শাসনামলে হারামাইন শরীফাইনে যে মেগা-প্রসারণ হয়েছে, তা প্রকৌশল বিদ্যার এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়। লাখ লাখ বর্গমিটারের এই মার্বেল চত্বরে আজ একই সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষ পরম শান্তিতে রুকু-সেজদা করেন। মক্কা-মদীনার দ্রুতগামী ‘হারামাইন এক্সপ্রেস ট্রেন’, বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক জামারাত সেতু এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে আজ হজ্জ ও ওমরাহ পালন হয়ে উঠেছে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল। সবচেয়ে বড় কথা, সমগ্র পৃথিবীর মুসলিমদের দেয়া এই বিপুল খেদমতের বিপরীতে সঊদী সরকার কোনো তীর্থকর বা ধর্মীয় রাজস্ব আদায় করে না।

২.বিশুদ্ধ তাওহীদের আলো ও কুরআনের মশাল

মদীনা মুনাওয়ারায় প্রতিষ্ঠিত ‘কিং ফাহদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স’ আজ পৃথিবীর বুকে আল্লাহর কালামের সবচেয়ে বড় বাতিঘর। প্রতি বছর এখান থেকে আরবী এবং প্রায় ৮০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত কোটি কোটি কপি পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিশ্বের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেয়া হয়। পাশাপাশি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও রাজকীয় ভাতার ব্যবস্থা করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা হচ্ছে। আজ আফ্রিকা, এশিয়া কিংবা ইউরোপের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে যোগ্য আলেম সমাজ তাওহীদের আলো ছড়াচ্ছেন, তাঁদের এক বিরাট অংশ এই উন্মুক্ত শিক্ষাদানের ফসল।

৩. নিপীড়িতের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর: ফিলিস্তীন ও অন্যান্য অঙ্গন

ফিলিস্তীন প্রশ্নে সঊদী আরবের অবস্থান সর্বদাই আপসহীন ও নীতিগত।

  • ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মুখের ওপর বাদশাহ আব্দুল আযীয বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— ফিলিস্তীনীদের ভূখণ্ডে ইহুদী পুনর্বাসনের তীব্র বিরোধিতা।
  • ১৯৪৮-এর প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে সঊদী সেনা পাঠানো থেকে শুরু করে। ১৯৭৩ সালের রামাযান যুদ্ধে বাদশাহ ফয়সালের সেই কিংবদন্তিতুল্য ‘তেল নিষেধাজ্ঞা’ পশ্চিমা বিশ্বের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বাদশাহ ফয়সাল পশ্চিমা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বলেছিলেন: ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা খেজুর আর উটের দুধ খেয়ে বেঁচে ছিলেন; আমরাও প্রয়োজনে আবার মরুভূমিতে ফিরে যাব, কিন্তু মুসলিমদের প্রথম ক্বিবলাকে আমরা বিকিয়ে দিতে পারি না’।
  • পরবর্তীতে ২০০২ সালের বৈরূত সম্মেলনে সঊদী আরবের উত্থাপিত ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’ আজও ফিলিস্তীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মূল ভিত্তি হিসীবে বিবেচিত।

এভাবে শুধু ফিলিস্তীনই নয়; নব্বইয়ের দশকে সার্বিয়ান আগ্রাসনের মুখে যখন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মুসলিমরা গণহত্যার শিকার হচ্ছিল, তখন সঊদী আরবের কোটি কোটি ডলারের মানবিক ও সামরিক সহায়তা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। একই ভূমিকা তারা রেখেছে কসোভো, আফগানিস্তান এবং সাম্প্রতিককালে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের মানবিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও।

৪. বিশ্ব মুসলিম সংহতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার

মুসলিম উম্মাহকে এক ছাতার নিচে আনার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোর মূল কারিগর এই দেশ:

  • ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘রাবেতাতুল আলাম আল-ইসলামী’ (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ) আজ বিশ্বজুড়ে ইসলামের মধ্যমপন্থী রূপ তুলে ধরতে এবং ইসলামোফোবিয়া রুখতে কাজ করে যাচ্ছে।
  • ১৯৬৯ সালে পবিত্র মসজিদুল আক্বসায় ইহুদীদের অগ্নিসংযোগের ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বাদশাহ ফয়সালের উদ্যোগে জেদ্দায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন’ (ওআইসি), যা জাতিসংঘের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসাবে ৫৭টি মুসলিম দেশের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত। যদিও এখন এই সংস্থার কাজ ঝিমিয়ে পড়েছে।
  • মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে গঠিত ‘ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (আইডিবি)-এর মূল তহবিল জোগানদাতা এই রাষ্ট্রটিই।

৫. নিঃস্বার্থ মানবতার হাত: কেএসরিলিফ (কঝৎবষরবভ)

২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘কিং সালমান মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ কেন্দ্র’ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর একটি। কোনো রাজনৈতিক শর্ত, ধর্মীয় ভেদাভেদ কিংবা সংকীর্ণ স্বার্থ ছাড়াই সংস্থাটি আজ সিরিয়া, ইয়ামান, সোমালিয়া, পাকিস্তান থেকে শুরু করে বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে।

উপসংহার

সঊদী আরবের পথচলা কোনো মসৃণ রাজপথ ছিল না। এটি ছিল মরুঝড়, রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ক্রমাগত পুনর্জন্মের এক মহাকাব্য। যে রাষ্ট্রের বীজ বোনা হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর দিরিয়াহর এক সাদামাটা মাটির কুটিরে—একটি খাঁটি আদর্শ আর একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তরবারির মিলনে—তা আজ একুশ শতকের আধুনিক পৃথিবীতে স্বমহিমায় ভাস্বর।

উছমানীয়দের বিরুদ্ধে তথাকথিত বিদ্রোহের যে ধোঁয়াশা রাজনৈতিক কারণে ছড়ানো হয়, তা দলীলের কষ্টিপাথরে এক নিরেট বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই নয়। বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিশৃঙ্খল মরুকে একতাবদ্ধ করে পবিত্র হারামাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশ্বমঞ্চে মুসলিম উম্মাহর সম্মান পুনরুদ্ধার করাই ছিল এই রাষ্ট্রের মূল সুর।

আজ সঊদী আরব একদিকে যেমন তার হাজার বছরের ইসলামী ঐতিহ্য ও তাওহীদের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি সমকালীন জ্ঞানবিজ্ঞান, আধুনিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে সমগ্র প্রাচ্যকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।


* সাধারণ সম্পাদক, জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি (জবভবৎবহপবং ্ ইরনষরড়মৎধঢ়যু)
১। উসমান ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বিশর, উয়ুনুল মাজদ ফী তারিখে নাজদ (রিয়াদ: দারাতুল মালিক আব্দুল আযীয, ১৯৮২), খণ্ড ১ ও ২।
২। ড. আব্দুল্লাহ বিন ছালিহ আল-উছাইমীন, তারীখুল মামলাকাতিল আরাবিয়্যাতিস সঊদিয়্যাহ (রিয়াদ: মাকতাবাতুল উবায়কান, ১৯৯৮), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০-৭৫।
৩। আল-ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ,  মুনীর আল-আজলানী, তারীখুল বিলাদিল আরাবিয়্যাতিস সঊদিয়্যাহ (রিয়াদ: দারুশ শুবল, ১৯৯৩ খ্রি.)।
৪। আব্দুর রহমান ইবনে কাসিম আল-নাজদি, আল-দুরারুস সানিয়্যাহ ফিল আজওয়িবাতিন নাজদিয়্যাহ (বৈরুত: দারুল আরাবিয়্যাহ, ১৯৯৬ খ্রি.), খণ্ড ১ ও ৯।
৫। শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, মুআল্লাফাতুশ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব (মুকাদ্দামাতুত তাওহীদ ও কাসিমবাসীর প্রতি পত্র) (রিয়াদ: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়), ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১।
৬। ইবরাহীম ইবনু ছালিহ ইবনু ঈসা, আকদুদ দুরার ফিমা ওয়াকাআ ফী নাজদ মিনাল হাওয়াদিছ (রিয়াদ: দারাতুল মালিক আব্দুল আযীয, ১৯৯৯ খ্রি.)।
৭। খাইরুদ্দীন আল-জিরিকলি, শিবহুল জাজিরাহ ফী আহদিল মালিক আব্দুল আযীয (বৈরূত: দারুল ইলম লিল-মালাঈন, ১৯৭০ খ্রি.)।
৮। ড. সালিহ বিন ফাওযান, বারাআতু দাওয়াতিশ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব মিন তুহমাতিল খুরুজ আলাল খিলাফাহ (রিয়াদ: মাকতাবাতুর রুশদ, ২০০৪ খ্রি.)।




প্রসঙ্গসমূহ »: ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ফেসবুক পেজ