রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে শিষ্টাচার
- মূল : আবূ বকর জাবির আল-জাযাইরী (রাহিমাহুল্লাহ)
- অনুবাদ : আল-ইখলাছ ডেস্ক
[কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি মুমিনের জীবন গঠন, ঈমানের পরিচর্যা এবং সঠিক পথের দিকনির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। কুরআনের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী বৈশিষ্ট্য হল- আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদের বারবার یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا অর্থাৎ ‘হে মুমিনগণ!’ বলে সম্বোধন করেছেন। প্রতিটি আহ্বানের অন্তরালে রয়েছে কোন না কোন নির্দেশ, নিষেধ, শিক্ষা, সতর্কতা, সুসংবাদ কিংবা জীবন-সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আবূ বাকর জাবির আল-জাযাইরী (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক প্রণীতنِدَاءَاتُ الرَّحْمٰنِ لِأَهْلِ الإِيمَانِ গ্রন্থটি কুরআনের এসব ঈমানী আহ্বানকে কেন্দ্র করে রচিত একটি মূল্যবান তাফসীরধর্মী গ্রন্থ। এতে প্রতিটি আহ্বানের মর্ম, বিধান, নৈতিক শিক্ষা এবং মুমিনের বাস্তব জীবনে তার প্রাসঙ্গিকতা সহজ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ কুরআনিক শিক্ষাগুলো পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যেই আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন ‘রহমানের আহ্বান’। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে আমরা চাই, পাঠক শুধু আয়াতের অর্থ জানবেন না; বরং আল্লাহর প্রতিটি আহ্বানকে নিজের ঈমান, চরিত্র ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এই আহ্বানগুলো যেন আমাদের শ্রবণ থেকে অন্তরে, অন্তর থেকে আমলে এবং আমল থেকে জীবনের পরিবর্তনে রূপ নেয়- এটাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাঁর আহ্বান শ্রবণ, অনুধাবন ও অনুসরণের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!!-সহকারী সম্পাদক।]
রহমানের আহ্বান-১: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে শিষ্টাচার
মহান আল্লাহ বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَقُوۡلُوۡا رَاعِنَا وَ قُوۡلُوا انۡظُرۡنَا وَ اسۡمَعُوۡا ؕ وَ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা ‘রা-ঈনা’ বল না বরং ‘উনযুরনা’ বল এবং শুনো; আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২/১০৪)।
ব্যাখ্যা
এটি আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাঁর ঈমানদার বান্দাদের প্রতি আহ্বান। তিনি তাদের ঈমানের পরিচয়ে সম্বোধন করেছেন। কারণ, মুমিন তার ঈমানের কারণে জীবন্ত; সে শোনে, বোঝে এবং কোন কাজ করা বা না করার সামর্থ্য রাখে। পক্ষান্তরে কাফির- সে সত্যিকার অর্থে শোনে না, বোঝে না এবং তাকে কোন কাজের নির্দেশ দেয়া হলে তা পালন করে না; আবার কোন কাজ থেকে নিষেধ করা হলেও তা থেকে বিরত থাকে না।
হে এই আহ্বান পাঠকারী! জেনে রাখো, আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁর মুমিন বান্দাদের সম্বোধন করেন, তখন তিনি তাদের এমন বিষয়ের নির্দেশ দেন, যার মধ্যে রয়েছে তাদের সুখ, কল্যাণ ও পূর্ণতা; অথবা এমন বিষয় থেকে নিষেধ করেন, যার মধ্যে রয়েছে তাদের দুর্ভাগ্য ও অপূর্ণতা। কখনো তিনি তাদের সুসংবাদ দেন, কখনো সতর্ক করেন এবং কখনো এমন বিষয় শিক্ষা দেন, যা তাদের জন্য উপকারী। চলুন, আমরা আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কথা শুনি। এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ‘হে আব্দুল্লাহ! আমাকে কিছু উপদেশ দিন’। তিনি বললেন, ‘তুমি যখন আল্লাহকে বলতে শুনবে ‘হে মুমিনগণ!’, তখন মনোযোগ দিয়ে তা শোনো। কারণ এরপর হয় এমন কোন কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হবে, যা তোমার জন্য করা আবশ্যক; অথবা এমন কোন অকল্যাণকর বিষয় থেকে নিষেধ করা হবে, যা থেকে তোমার বিরত থাকা যরূরী’।[১]
এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের আহ্বান করে তাদের ‘রা-ঈনা’ শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন এবং এর পরিবর্তে ‘উনযুরনা’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এর কারণ হল- ইহুদীদের মধ্যকার মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ‘রা-ঈনা’ বলত। তাদের হিব্রু ভাষায় এ শব্দটি বিদ্রƒপ ও উপহাসের অর্থে ব্যবহৃত হত। ফলে তারা এ শব্দের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে উপহাস ও বিদ্রƒপ করত। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে উপহাস করা ও তাঁকে বিদ্রƒপ করা কুফরি কাজ। তাই আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের নিষেধ করেছেন যে, তাঁর রাসূল (ﷺ) যখন তাদের সঙ্গে বসে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দিতেন, তখন তারা যেন তাঁকে ‘রা‘ঈনা’ না বলে। বরং তার পরিবর্তে ‘উনযুরনা’ বলবে। আরবী ভাষায় এর অর্থ হল- ‘আমাদের প্রতি লক্ষ্য করুন’, অর্থাৎ ‘আমাদের একটু অবকাশ দিন; আমাদের প্রতি একটু অপেক্ষা করুন; আপনি যা বলছেন তা যেন আমরা ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে অথবা বুঝতে পারি, সেজন্য আমাদের প্রতি তাড়াহুড়া করবেন না’।
এছাড়া আল্লাহ তা‘আলা তাদের জ্ঞান ও শিক্ষা গ্রহণের সময় মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং যথাযথ আদব ও শিষ্টাচার অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিরদের- যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে উপহাস ও বিদ্রƒপ করত, তারা ইহুদী হোক কিংবা অন্য কেউ, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অর্থাৎ এমন কঠিন শাস্তি, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও বেদনাদায়ক। এই শাস্তি দুনিয়াতেও তাদের কোন কোনভাবে স্পর্শ করতে পারে, আখিরাতের শাস্তির পূর্বেই।
এই মহিমান্বিত আয়াতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে শিষ্টাচার অবলম্বনের অপরিহার্যতা এবং কথা কিংবা কাজের মাধ্যমে তাঁর প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের নিষিদ্ধতা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে কেউ যদি অজ্ঞতা ও না জানার কারণে এমন কোন কথা বা কাজ করে ফেলে, যার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি অসম্মান রয়েছে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি জেনে-বুঝে এমন শব্দ বা আচরণ করে, যার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি অসম্মান রয়েছে, তাহলে সেটিই প্রকৃত কুফরি। আল্লাহ তা‘আলার কাছে আমরা এর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
সুধী পাঠক! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা হারাম এবং ইচ্ছাকৃত ও জ্ঞাতসারে করলে তা কুফর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তেমনি শিক্ষক, শিক্ষাগুরু, মুরব্বি, পথপ্রদর্শক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে অশোভন আচরণ করাও হারাম। অনুরূপভাবে কোন মুমিনকে দোষারোপ করা, তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, উপহাস করা কিংবা বিদ্রƒপ করাও হারাম। যে ব্যক্তি এ কাজ করে এবং তাওবা না করে, সে ফাসিক।
চলো, আমরা আল্লাহ তা‘আলার বাণী পাঠ করি-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا یَسۡخَرۡ قَوۡمٌ مِّنۡ قَوۡمٍ عَسٰۤی اَنۡ یَّکُوۡنُوۡا خَیۡرًا مِّنۡہُمۡ وَ لَا نِسَآءٌ مِّنۡ نِّسَآءٍ عَسٰۤی اَنۡ یَّکُنَّ خَیۡرًا مِّنۡہُنَّ ۚ وَ لَا تَلۡمِزُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَ لَا تَنَابَزُوۡا بِالۡاَلۡقَابِ ؕ بِئۡسَ الِاسۡمُ الۡفُسُوۡقُ بَعۡدَ الۡاِیۡمَانِ ۚ وَ مَنۡ لَّمۡ یَتُبۡ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
‘হে মুমিনগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য কোন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর কোন নারী যেন অন্য কোন নারীকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ কর না এবং পরস্পরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। ঈমানের পর ফাসিক নামে পরিচিত হওয়া কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই যালিম’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১১)।
অতএব আসুন! আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে অশোভন আচরণ থেকে সতর্ক হই। আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারিত হলে কিংবা তাঁর কিতাব তিলাওয়াত করা হলে আমাদের উচিত মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং অন্তরকে বিনম্র ও ভীত করা। তখন আমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করা কিংবা হাসি-তামাশা করা উচিত নয়। আর যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নাম উচ্চারিত হয় কিংবা তাঁর কোন হাদীছ পাঠ করা হয়, তখন আমাদের উচিত মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাঁর প্রতি অন্তরে তাঁর মর্যাদা, সম্মান, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটানো।
এটাই হল এই মহান আল্লাহর আহ্বানের ফল, যার সংরক্ষণ ও অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সম্মানিত করেছেন। সুতরাং আসুন আমরা এই আহ্বানের ফল লাভ করি এবং এর দ্বারা উপকৃত হই। এর জন্য আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করি এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ, তিনিই সকল প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা ও স্তুতির যোগ্য।
وَسَلَّامُ عَلَي الْمُرْسَلِيْنَ، وَالْحَمْدُ للّٰہِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
তথ্যসূত্র :
[১]. আবূ উবাইদ আল-কাসিম ইবনু সাল্লাম, ফাযায়িলুল কুরআন, পৃ. ৭৪; ইবনু আবী হাতিম, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, হা/১০৩৭; আবূ নু‘আইম, হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩০। উল্লেখ্য, এটা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীছ নয়, বরং ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর বক্তব্য। আহমদ শাকির (রাহিমাহুল্লাহ) এ বর্ণনার সনদ সম্পর্কে বলেছেন, إِسْنَادُهُ جَيِّدٌ إِلَّا أَنَّ فِيهِ انْقِطَاعًا ‘এর সনদ ভালো, তবে এতে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে’। দ্র.: https://dorar.net/h/ldql7EnU?utm_.comhttps://dorar.net/h/ldql7EnU?utm_.com.
প্রসঙ্গসমূহ »:
রহমানের আহ্বান