আত্মীয়তার সম্পর্ক ও মেহমানদারি
- শাইখ মো. আব্দুল বারী ফরাজী*
মানব সমাজের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান পরিবার। নর-নারীর পারস্পরিক বৈধ মিলনের ফলে এ পরিবারের সৃষ্টি। এ পরিবার থেকেই একটি নতুন বংশের সৃষ্টি হয়। রক্তের দিক দিয়ে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, চাচা, ফুফু প্রভৃতি এবং বৈবাহিক দিক দিয়ে সকল আপনজনই আত্মীয়। মামা-মামি, মামাতো ভাই, মামাতো বোন, খালা-খালু, তাদের সন্তান-সন্ততি, ফুফাতো ভাই, ফুফাতো বোন, তাদের সন্তান-সন্ততিও আত্মীয়। যাদের সঙ্গে দুধের সম্পর্ক আছে তারাও আত্মীয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক অনেক ব্যাপক ও বহু প্রশস্ত। আত্মীয়দের সম্পর্ক রক্ষা করা, তাদের প্রতি সদাচরণ করা, তাদের সাহায্য সহযোগিতা করা সকলের প্রতি বিশেষ কর্তব্য। পিতা মাতার পরেই আত্মীয়-স্বজনের হক্ব সর্বাপেক্ষা বেশি। আল্লাহ কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
﴿وَاتَّقُوْا اللهَ الَّذِيْ تَسَآءَلُوْنَ بِه وَالْأَرْحَامَ﴾
“তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পর নিজেদের অধিকার দাবি করো। আর রক্তের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করো না।”[১]
﴿وَاٰتَى الْمَالَ عَلٰى حُبِّه ذَوِيْ الْقُرْبٰى﴾
(তারাই সত্যিকারের মুত্তাকী বা ধর্মপরায়ণ) “যারা আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজনকে ধন-সম্পদ দান করে।”[২]
﴿وَاٰتِ ذَا الْقُرْبٰى حَقَّهٗ وَالْمَسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيْرًا﴾
“আত্মীয়-স্বজনকে তার হক্ব দান করো এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।”[৩]
﴿لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوْا وَجُوْهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰـكِنَّ الْبِرَّ مَنْ أٰمَنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكُتُبِ وَالنَّبِيِّيْنَ وأٰتَى الْمَالَ عَلٰى حُبِّه ذَوِى الْقُرْبٰى وَالْيَتٰمٰى وَالْمَسٰكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ وَالسَّائِلِيْنَ وَفِى الرِّقَابِ وَاَ قَامَ الصَّلوةَ وَاٰتَى الزَّكَوْاةَ﴾
“সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, ক্বিয়ামাত দিবসের ওপর, মালাইকা (ফেরেশ্তাদের) ওপর এবং সমস্ত নবীগণের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা সলাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে।”[৪] আর আত্মীয়-স্বজনদের দান করা দ্বিগুণ সাওয়াব। নবী করীম (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) বলেছেন:
لَهُمَا أَجْرَانِ: أَجْرُ الْقَرَابَةِ وَأَجْرُ الصَّدَقَةِ.
“তাদের উভয়ের জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে। এক. নিকটাত্মীয়তার সাওয়াব, দুই. সাদাক্বাহ্ ও দানের সাওয়াব।”[৫]
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ.
“আত্মীয়তা ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”[৬]
وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَصِلْ رِحْمَهُ.
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”[৭]
্রلَيْسَ الوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الوَاصِلُ الَّذِيْ إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَاগ্ধ.
“আত্মীয়-স্বজনের সদ্ব্যবহারের বিনিময়ে সদ্ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়; বরং কোনো আত্মীয় যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নও করে তথাপি তার সাথে সদ্ব্যবহার করাই হলো সর্বোত্তম “ছেলায়ে রেহমী” তথা সম্পর্ক বজায় রাখা।”[৮]
لَا تَنْزِلُ الرَّحْمَةُ عَلٰى قَوْمٍ فِيْهِ قَاطِعُ رِحْمٍ.
“যে জাতির মধ্যে আত্মীয়তা ছিন্নকারী লোক থাকে সে জাতির ওপর মহান আল্লাহর রহমত নাযিল হয় না।”[৯]
ভালোবাসা হৃদ্যতা বৃদ্ধির জন্য আত্মীয়-স্বজনদের সামর্থ্য অনুসারে উপহার উপঢৌকন দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
নবী করীম (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) বলেছেন: تَهَادَوْا تَحَابُّوْا.
“তোমরা পরস্পর উপঢৌকন আদান-প্রদান করো। তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাবে।”[১০]
এসব আত্মীয়-স্বজনগণ আমাদের প্রকৃত মেহমান বটে। তাছাড়া যেসব মুসলমান দুঃস্থ দরিদ্র তারাও আমাদের মেহমানের পর্যায়ে পড়ে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ إِخْوَةٌ﴾
“নিশ্চয়ই মু’মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।”[১১]
রাসূলুল্লাহ (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) বলেছেন:
্রالمُسْلِمُ أَخُوْ المُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ، وَمَنْ كَانَ فِيْ حَاجَةِ أَخِيْهِ كَانَ اللهُ فِيْ حَاجَتِهِগ্ধ.
“মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে না তার ওপর যুলুম করতে পারে। আর না তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করতে পারে। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে রত থাকে, আল্লাহ তা‘আলা তার প্রয়োজন পূরণ করেন।”[১২]
নবী করীম (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) আরো বলেছেন:
وَاللهُ فِيْ عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِيْ عَوْنِ أَخِيْهِ.
“বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত তার মুসলিম ভাইয়ের সাহায্যে রত থাকে, মহান আল্লাহও তাকে সাহায্য করতে থাকেন।”[১৩]
অতএব আমাদের কর্তব্য, আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং মাঝে মধ্যে এসব মেহমানদেরকে বেড়াতে আনা, যথাসাধ্য তাদের মেহমানদারী করা ও দাওয়াত করে খাওয়ানো। পর্যায়ক্রমে অপরাপর দরিদ্র অসহায় মুসলমানদেরও সাহায্য করা, দাওয়াত করে খাওয়ানো এতে যেমন আত্মীয়তার হক্ব আদায় হবে, তেমনি আল্লাহ আপনার ওপর সন্তুষ্ট হবেন এবং আপনার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন ইন্ শা-আল্লাহ।
মনে রাখবেন, আপনি যখন কোনো আত্মীয় ও মেহমানের আগমনে ও তাকে দেখে খুশি হবেন তখন পরম করুণাময় আল্লাহ তা‘আলাও আপনার ওপর খুশি হয়ে যাবেন।
এক প্রতিবেশীর প্রতি অপর প্রতিবেশীর হক্ব ও কর্তব্য
প্রতিবেশী কারা: মানুষ সমাজে তার বন্ধু-বান্ধব, মহল্লা, রোড বা প্লট অথবা গলি কিংবা পাড়ার লোক এবং গ্রামের লোকজনের সঙ্গে সমাজবদ্ধ হয়ে মিলে-মিশে বসবাস করে ও কাজ-কারবার করে। ইসলামী পরিভাষায় এরা সকলেই প্রতিবেশী। রাসূলুল্লাহ (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) বলেছেন:
প্রতিবেশী রোগাক্রান্ত হলে তার খোঁজখবর নিবে। সে মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে। যদি সে ঋণ চায় তাহলে বিনা শর্তে তাকে ঋণ দিবে। যদি সে কোনো খারাপ কাজ করে বসে তাহলে তা গোপন রাখবে। সে কোনো কিছু দ্বারা সৌভাগ্যবান হলে তাকে মুবারকবাদ ও ধন্যবাদ জানাবে। কোনো বিপদে পড়লে তার উদ্ধার কাজে এগিয়ে আসবে। স্বীয় অট্টালিকা এতটুকু উঁচু করবে না যাতে তার ঘর হতে বের হওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তোমার গৃহে যখন কোনো ভালো খাদ্য রান্না করো, তখন উক্ত খাদ্য যেন তাদের এবং তাদের সন্তানদের কষ্ট দান না করে অর্থাৎ- তাদেরকেও কিছু দান করবে। রাসূলুল্লাহ (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) বলেছেন: কেউ যদি তরকারি রান্না করে তাহলে সে যেন ঝোল বেশি দেয় এবং প্রতিবেশিদের নিকট পাঠিয়ে দেয়।[১৪]
প্রতিবেশীর মৃত্যু হলে তার জানাযায় শরিক হবে এবং তাকে কাফন-দাফন দিবে। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে এবং তাদের দুঃখে সমবেদনা জানাবে। সর্বোপরি, প্রতিবেশী যদি হিন্দু, ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ বা অন্য ধর্মের লোক হয়, তাহলেও তাদের সঙ্গে সর্বদা সুন্দর ব্যবহার করবে এবং তাদের অধিকারগুলো আদায় করবে।
একদিন ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আম্র ইবনুল ‘আস (*)’র গৃহে একটি বকরী যবেহ করার সময় রাসূলুল্লাহ (উবংপৎরঢ়ঃরড়হ: ঝষ%২০খ) সেখানে উপস্থিত হলেন এবং গৃহবাসীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের ইয়াহুদি প্রতিবেশীকে গোশ্ত হাদিয়া দিয়েছো কী?
মোটকথা, প্রতিবেশী মুসলমান, অমুসলমান বা আত্মীয় কিংবা অনাত্মীয় যে কোনো শ্রেণীর হোক না কেন, যার যতটুকু অধিকার ও হক্ব রয়েছে ততটুকু আদায় করা অবশ্যই কর্তব্য। যে প্রতিবেশীকে কষ্ট দিবে সে মু’মিন নয়; সে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না, সে জান্নাতে যাবে না। যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে, সে প্রকৃত ঈমানদার নয়।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের মাঝে মানবিক গুনাবলি জাগ্রত করতে হবে। মানবিক হতে হবে। আমরা মাটির তৈরি আদম সন্তান আবার মাটিতেই মিশে যাব তাহলে মানুষের মানুষে দূরত্ব কমে যাবে। পৃথিবীটা শান্তিময় হয়ে যাবে। কবির ভাষায়:
কোথাও স্বর্গ কোথাও নরক, কে বলেছে বহুদূর
মানুষেতে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরা সুর।[১৫]
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন আমাদের সাবাইকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফীক্ব দান করুন - আমীন।
- বি. সি. এস. (সাধারণ শিক্ষা), আরবী প্রভাষক, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা।
[১] সূরা আন্-নিসা: ১।
[২] সূরা আল-বাক্বারাহ্: ১৭৭।
[৩] সূরা বানী ইসরা-ঈল: ২৬।
[৪] সূরা আল-বাক্বারাহ্: ১৭৭।
[৫] মুসলিম- হা. ৪৫/১০০০।
[৬] মুসলিম- হা. ১৯/২৫৫৬।
[৭] বুখারী- হা. ৬১৩৮।
[৮] বুখারী- হা. ৫৯৯১।
[৯] বায়হাক্বী- মা. শা., ৬/২২৩।
[১০] মু‘আত্তা ইমাম মালিক- হা. ১৮৯৬।
[১১] সূরা আল-হুজুরা-ত: ১০।
[১২] বুখারী- হা. ২৪৪২, ৬৯৫১।
[১৩] মুসলিম- হা. ৩৮/২৬৯৯।
[১৪] তাবরানী।
[১৫] কবি শেখ ফজলুল করিম।
প্রসঙ্গসমূহ »:
পরিবার