রবিবার, ০৭ Jun ২০২৬, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন

প্রকৃতির অপূর্ব ক্যানভাস : মালদ্বীপ সফরনামা

- ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী*


মহান আল্লাহর এই সৃষ্টিজগত সত্যিই বিস্ময়ে ভরা। পৃথিবির কোথাও সুউচ্চ পাহাড়, কোথাও সবুজ বনভূমি, কোথাও মরুভূমির নীরবতা, আবার কোথাও সীমাহীন নীল জলরাশি। সম্প্রতি মালদ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। ভারত মহাসাগরের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট প্রায় হাজার দ্বীপের এই দেশটি যেন প্রকৃতির অপূর্ব ক্যানভাস। মালদ্বীপের এই দ্বীপগুলো ঘুরে আসা যেন পৃথিবীর নীল-সবুজ স্বপ্নের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসা। আমি যেসব দ্বীপে গিয়েছি, প্রতিটাই আলাদা স্বভাব, আলাদা সৌন্দর্য, আলাদা গল্পে ভরা। সেখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত এখনও হৃদয়ে রঙিন স্মৃতি হয়ে জেগে আছে। চলুন, ভ্রমণটাকে একটা জীবন্ত বর্ণনায় সাজাই।

স্বপ্নের দরজা খুলে যাওয়া

মালদ্বীপ যাওয়ার একটা স্বপ্ন ছিল। ২৫ এপ্রিল ২০২৫ এর জুমু‘আর দিনে মালদ্বীপ প্রবাসী একরাম ভাই কুমিল্লা কমপ্লেক্সে এ বিষয়ে কথা বলেন। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে তার যাত্রা শুরু হয় ১৫ই ফেব্রুয়ারী ২০২৬ রবিবার। ১৪ তারিখে ফ্লাইট থাকলেও সেটা কোন কারণে বাদ হয়ে যায়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ৯ টা ৩৫ মিনিটে ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। ফিরে আসি ২০ শে মার্চ; তাদের ঈদের দিন দুপুর আড়াইটায় রওনা দিয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাংলাদেশে পৌঁছেছি। মূলত এ সফরটি ছিল তারাবীহ-তাহাজ্জুদ এবং দা‘ওয়াতি সফর। ‘জামইয়াতুস সালাফ’-এর পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে যাওয়া। পৌঁছানের পরই গেস্ট হাউসে একটি রুম বরাদ্দ দেয়া হলো এবং একটা হোটেল “আযদা ক্যাফ” ঠিক করে দিল, আমার যখন যা খুশি সেখান থেকে আমি খেতে পারব।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভূক্ত’ (সূরা ফুসসিলাত : ৩৩)। দাঈদের জন্য এটা একটি বড় পাওয়া- দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত সফর করা ও আল্লাহর সৃষ্টি ও সৌন্দর্য্য উপভোগ করা। পৃথিবির অনিন্দ্য সুন্দর ও অপূর্ব লীলাভূমির দেশ সাগর কণ্যা খ্যাত মালদ্বীপ। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল যেন একাকার হয়ে যায় সুবহানাল্লাহ! কত সুন্দর, যা লিখায় অনুভুতি প্রকাশ করা মুশকিল। সৌন্দর্য্যরে বর্ণনার ক্ষেত্রে মানুষ বলে, ছবির মত সুন্দর। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে- ছবির চেয়েও সুন্দর মাশাআল্লাহ।

মালদ্বীপে লোকদের মাঝে আমি কোন অহংকার দেখিনি, দুনিয়াবী কোন প্রতিযোগিতাও দেখিনি। কে কাকে, কার গাড়ি পার করে দেবে, তার দারুন প্রতিযোগিতা দেখলাম। রাস্তায় মানুষ পারাপারের সময় গাড়ি তার দিকে এগিয়ে আসবে না। অর্থাৎ রাস্তাটা যেন মানুষের পারাপারের জন্য; গাড়ির জন্য না। আগে মানুষ পার হবে, তারপর গাড়ি। মাঝে মাঝে হলুদ রং-এর জেব্রা ক্রসিং আছে রাস্তা পারাপারের জন্য। এদিক দিয়ে পার হলে মোটামুটি শতভাগ নিরাপদ বলা যায়। যত গাড়ি এবং তারা যে গতিতেই আসুক না কেন, তিনি থামতে বাধ্য। মালদ্বীপ সরকার এ বিষয়টা খুব গুরুত্ব সহকারে দেখেন।

ছালাতের সময় অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন

ছালাতের ব্যাপারে আমার ৩৩ দিনে চমৎকার একটি অধ্যায় অঙ্কিত হয়েছে। যদিও আমি জীবনের বিভিন্ন সময় ইমাম ছিলাম। কিন্তু মালদ্বীপে ছালাতের সময় আমি এক ওয়াক্তেও বুঝলাম না বাহিরের দৃশ্য কেমন। আমি মুসাফির বিভিন্ন জায়গায় যেতাম; কিন্তু একই সাথে জমা করে দুই ওয়াক্তের ছালাত পড়া হয়নি। এমনকি সফরে আমরা মাগরিব পড়ে রওনা দিব, ওখানে গিয়ে এশার জামা‘আতে শরীক হব, এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাই আমার দেখা হয়নি, ছালাতের সময় মসজিদের বাহিরের দৃশ্যটা কেমন। শতভাগ মুসলিমের দেশে প্রায় সব মানুষই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের (ফালিল্লাহিল হামদ্)। হাদীছ অনুযায়ী ঠিক সময়ে আযান এবং ১৫ থেকে ১০ মিনিট পরে প্রত্যেকটা মসজিদে জামা‘আত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ফজর থেকে এশা সব ছালাতই। আমাদের দেশের ন্যায় বছরের সবসময় ১.৩০-এ যোহর ছালাত, আর ৫টায় আছর ছালাত না। রামাযান মাসে এক ধরণের আবার রামাযান চলে গেলে পরের দিনই দেখি ফজরের আযান দেরি করে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে মাযহাবী ভাইদের নিকট আমার একটি প্রশ্ন- সদউত্তর থাকলে দয়া করে জানাবেন। রামাযান ছাড়া মুসলিমরা বছরে বিভিন্ন ছিয়াম পালন করে থাকেন। তাদের আযান অনুযায়ী যদি সাহারী গ্রহণ করে, তাহলে তাদের ছিয়ামের হালত কি হবে? কারণ এখনও মানুষ আযানের দিকে কান খুলে চেয়ে থাকে। সাহারির শেষ সময় নিয়ে তেমন ইখতিলাফ নাই। অথচ ২০/৩০ মিনিট পরে আযান দিলে তাদের ছিয়ামের কি হবে?

মালদ্বীপ সরকার প্রতি মসজিদে ভালো মানের আলেমকে ইমাম হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন। বিশেষ করে মাদানী, রিয়াদী বা মাক্কী, যারা সঊদী আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করেছেন। আরো চমৎকার বিষয় হলো, দেশের সর্বোচ্চ বেতনধারীরা হলেন ইমামগণ। সরকারী চাকুরিজীবিদের মাঝে ইমামদের বেতনই বেশী। এদের মাঝে আমার বন্ধু আব্দুস সালাম, মুজতবা, বেলাল, মুহাম্মাদ সহ আরো অনেকেই মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পড়াশুনা শেষ করেছেন মাশাআল্লাহ।

মালদ্বীপের বৈচিত্র

মালদ্বীপে প্রায় সবার সাইকেল আছে। এখানে সাইকেল বলতে আমাদের দেশে বলে স্কুটি। বাসের প্রচলন নেই বললেই চলে, কারণ বাস চলার মতো তেমন জায়গা নেই। রাজধানী মালে ও হলহুমালের মধ্যে কিছু বাস চলাচল করে থাকে। মালে শহরে মেট্রবাস চলে- যাতে ১০ রুফিয়া ভাড়া দিয়ে চড়তে হয়। ১ রুফিয়া প্রায় বাংলাদেশি ৬.৫০ টাকা। তাছাড়া বলা যায় প্রত্যেক সদস্যের নিকটই সাইকেল বা বিশেষ ধরণের স্কুটি আছে, সেটাই চলার অন্যতম মাধ্যম।

মালদ্বীপে কোন বাথরুমে সেন্ডেল দেখিনি। পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি মাশাআল্লাহ এত সুন্দর যে, সেখানে সেন্ডেলের প্রয়োজন অনুভূত হয়না। পানির স্বচ্ছতার কারণে হয়তো তেমন ময়লা বা সেঁতসেঁতে দেখা যায় না। কোন বাংলা বাথরুম দেখিনি; সবই কমোড। সাদা কালারের পোশাক তাদের নেই বললেই চলে, সব পোশাকই রঙিন। পুরো মালদ্বীপে কোন সাপ নাই, শিয়াল বা খেকশিয়াল নাই, কুকুর নাই, বাঘ, ভাল্লুক, খবিস সহ কোন হিংস্র প্রাণিই সেখানেই নেই। কোন গরু, ছাগল, মহিষ, উট, ঘোড়া বা ভ্যাড়া কোন প্রাণিই নেই। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন বিচ্চু আছে কি না? তারা জবাবে বললেন, না সেটাও পাওয়া যাবে না।

আমি ৩৩ দিন কোন এক্সিডেন্ট দেখিনি বা শুনিনি, রাস্তায় পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো দেখিনি, কোন হরতাল নাই, ধর্মঘট নাই, কোন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর চটকদার কথা নাই, মিথ্যা নাই, মিথ্যা অঙ্গীকার নাই, রাস্তাঘাটে ছেলে-মেয়েদের বেহায়াপনা বা হাত ধরাধরি করে আপত্তিজনক কোন পরিস্থিতিও নাই। 

দ্বীপ থেকে দ্বীপে রঙিন অভিজ্ঞতা

হাজার দ্বীপের দেশ মালদ্বীপে পা রাখার মুহূর্তটাই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ। আকাশ থেকে নিচে তাকালে অসংখ্য নীলের শেড, ডিপ ব্লু একটা শিল্পীর প্যালেটের মতো ছড়িয়ে আছে। স্পিডবোটে চেপে দ্বীপে পৌঁছানোর সময় বাতাসে লবণের গন্ধ আর সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা পানি, তার মাঝে মাছের লাফালাফি দেখলে মনে হয় যেন পানিতে আগুন ধরেছে সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

উত্তর-পশ্চিমে যাত্রা শুরু হয়েছিল কুদাহুভাদু ও দারাওয়ান্দু থেকে। ফ্লাইট চড়ে মালে থেকে কুদাহুভাদু যেতে সময় লেগেছে ৪০ মিনিট। সেখানে বাঙ্গালীদের নিয়ে দারুন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটা নিয়ে আমি রাতের একটি ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে দিয়েছিলাম। রাতের কুদাহুভাদু দেখতে কত সুন্দর, পার্কগুলোর পরিবেশ কত সুন্দর ও নিরাপদ, যা স্বচক্ষে না দেখলে বুঝা মুশকিল। সঙ্গী হিসাবে ছিলেন বন্ধু বেলাল মাদানী, অসম্ভব সুন্দর মনের সাদামাটা একজন মানুষ। সফরটা তার সাথে থেকে আরও সুন্দর পর্যবেক্ষণ হয়েছিল এই সরকারী মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক মালদ্বীপী বন্ধুকে সাথে নিয়ে। বাঙ্গালিদের মাঝে প্রচুর দা‘ওয়াতী কাজ দরকার। আমি এ বিষয়ে ‘জমঈয়াতুস সালাফ’-কে ধারণা দিয়েছি গুরুত্বসহকারে। যেন ভবিষ্যতে ভালো কোন দাঈ নিয়ে দা‘ওয়াতী কাজগুলো তারা করতে পারে। প্রসঙ্গত বলতে হয়, আমাকে যে বাঙ্গালী ভাইয়েরা ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়েছিল, দু:খের বিষয় হলো তাদের গলাতেও স্বর্ণ-রূপার চেইন, হাতে বালা ও আঙ্গুলে অষ্টধাতুর আঙটি পরা ছিল। পোশাক ও চুলে মুসলিমের গন্ধ পাওয়া ভার। যা বর্ক্তৃতায় আমি বিষয়টি পরিষ্কার করেছি- সেদেশের জাতীয় পত্রিকায় তা বর্ণনা সহ ছাপানো হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

দারাওয়ান্দু আরেকটি দ্বীপ। যেখানে রাজধানী মালে থেকে যেতে একবার যাত্রী উঠানামা সহ ৪০ মিনিট সময় লাগে। সেটা কুদাহুভাদুর চেয়ে আমার কাছে আরও সুন্দর মনে হয়েছে। নাম লিখে গুগলকে জিজ্ঞেস করলে তারাও এর স্বাক্ষ দেবে। সেখানে নারিকেল-ডাব ভর্তি নারিকেল গাছ অনেক। গাছ থেকে সরকার ছাড়া কেউ নারকেল-ডাব নামাবে না। সব দ্বীপের বিষয়ে একটি খবর হলো- সেখানে বিদু্যুৎ ব্যবস্থাপনা জেনারেটর। অর্থাৎ প্রতিটি দ্বীপে জেনারেটর বসানো আছে, সেটাই বিরতিহীন চলতে থাকে। তাই কখনো বিদ্যুৎ যায় না। যা দ্বারা এসি সহ সব চাহিদা মিটানো সম্ভব হচ্ছে। কোন তার দেখা যায়না, আহামরি মিটারের আজগুবি কোন বিলও আসে না, ৩০০ টাকার বিল কখনো ৫০০০ বা ১০০০০ হয়ে আসে না। কোন অভিযোগ নাই এক কথায়। প্রতিটি দ্বীপেই জনসংখ্যা হারে হাসপাতাল আছে। হাসপাতাল দেখলে আপনার মনে হবে, এটা কোন পর্যটন কেন্দ্র। আমাদের দেশের হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা এত বেশী, যা বিরক্তির কারণ হয়ে গেছে। ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে তিন হাজার রোগীকে ধারণ করতে হয়। সেখানে পুরো তার বিপরীত। কারণ রোগী ছাড়া হাসপাতাল একবারেই বেমানান। আর সেটা দেখার জন্য যেতে হবে সুদূর সাগর দেশ মালদ্বীপে। ডাক্তারেরা অফিসারের মত যথাসময় হাজির থাকেন, রোগী নাই, ফার্মাসিস্টারা ঔষধ নিয়ে বসে থাকেন প্রেসক্রিপশন আসে না। কারণ সেখানে ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে কোন চুক্তি হয়নি, কোম্পানির কোন লোকও আসে না, ডাক্তারদের গাদাগাদা হাদিয়া দিতে হয় না। এক আজব দেশ। পাঁচ/সাত হাজার ডলার বেতনে আর কতইবা হবে টাকায়। ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা! সেটা দিয়ে কি আমাদের দেশের ১ লাখ টাকা মূল্যের বেতনের ডাক্তারদের পোষাবে? এখানে নামে বেতন ১ লাখ, উপরি কামাই হয়তো ৩০ লাখ। তাইতো সঊদী, কুয়েত, মালদ্বীপের মতো দেশে আমাদের দেশের সম্মানিত ডাক্তারেরা নাকি যেতে চাই না। যদিও এ পর্যন্ত যারা গেছেন, মাশাআল্লাহ দ্বীনে ও দুনিয়াই তারা খুবই ভালো আছেন। কিন্তু কে কাকে বুঝাবে?

আর দক্ষিণের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘হিতাদু’ আর ‘ফেদু’ নামক দ্বীপ থেকে। এখানে স্থানীয় জীবনের স্পর্শ সবচেয়ে বেশি। নারিকেল গাছের ছায়া, ছোট্ট রাস্তায় সাইকেল চালানো, আর হাসিখুশি মানুষ, এসব নিয়েই এ দ্বীপগুলো। প্রকৃতি হলেও এখানে যে বনজঙ্গল আছে, তা চাইলে এক নিমিষেই শেষ করা যাবে, কিন্তু যেখানে গাছপালাই নাই, সেখানে জঙ্গল তো আশির্বাদ। তাই কৃত্রিম বলা যেতে পারে বেশকিছু ঘোন জঙ্গল আছে। এক ঋতুর দেশ গ্রীষ্ম-বসন্ত-হেমন্তের মিশ্রণে পুরো বছর একটিই আবহাওয়া অনুভূত হয় মাশাআল্লাহ। গ্রীষ্মকাল বলা হলেও অতিরিক্ত, অসহনীয় গরম নয়। যদিও জাতীয় মসজিদ ছাড়া সব মসজিদেই এয়ারকন্ডিশন যুক্ত হয়ে গেছে, অফিস-আদালতেও এসিমুক্ত নয়; যা ১০ বছর পূর্বেও এমনটা ছিল না। বলা হয় এই দ্বীপগুলো মালদ্বীপের হার্ট বা হৃদয়।

ফুভাহমুলাক দ্বীপ

এই দ্বীপ অন্য সবকছিুর থেকে আলাদা। এখানে সমুদ্রের পাশাপাশি মিঠা পানির লেক, তাতে মাছ, ৫/৭ কেজি ওজনের মাছ, হাতে এসে ধরা দেয় অনায়াসেই, কারণ তারা মনে হয় বুঝে আমাদের ধরবে না। এখানেই একমাত্র মিঠা পানির পুকুর বা লেক দেখেছি পুরো মালদ্বীপে। এখানে গভীর সমুদ্রে বড় বড় হাঙ্গরের উপস্থিতি প্রচুর পরিমাণ। এখানে এই হাঙ্গর দেখার জন্যই দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন। স্পীডবোট ও অক্সিজেন বোতল ভাড়া করে নিয়ে পর্যটকরা চলে যান গভীর সাগরে উপভোগ করতে ‘টাইগার শার্ক’ নামে খ্যাত সেই ডোরাকাটা হাঙ্গর দেখতে। এ ধরণের হাঙ্গর নাকি দুনিয়াতে এখানেই পাওয়া যায় অথবা এখানে বেশী দেখা যায়। বলা হয় মালদ্বীপের সাগরের পানি নাকি পৃথিবীর অন্য স্থানে চেয়ে দেখতে বেশী সুন্দর। আসলেই সুন্দর। ছবির মত বলা হলেও আবারও বলি ছবির চাইতেও সুন্দর মাশাআল্লাহ।

আড্ডু সিটি

‘ফুভাহমুলাক’ দ্বীপ থেকে ৫০০ টাকা মূল্যের টিকিট নিয়ে পূর্বেই রিজার্ভ করে রাখা এসি যুক্ত স্পীডবোটে করে রওনা দিলাম ‘আড্ডু’ সিটির দিকে। এসিযুক্ত বলার কারণে, আমার জানা ছিল না স্পীডবোটে এসি থাকে। সেখান থেকে দুই ঘন্টা সময় নিয়ে ‘আড্ডু’ সিটিতে। মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় স্থল জায়গা এটি। যা এক দিক থেকে অপর প্রান্তের দূরুত্ব প্রায় ১৫ কি.মি.। যা মালে বলেছিলাম সর্বোচ্চ ৬ কি.মি.। তার মানে সে তুলনায় এটা অনেক বড়। এখানে বড় বড় রাস্তাও আছে। মালের পরে এখানেই একমাত্র জায়গা দেখলাম বাস চলে। মানে স্কুল বাসও আছে, কারণ দূরুত্ব আছে। মালে থেকে ৭০০ কি.মি. দূরের স্থানে ফ্লাইটে যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টা ২৫ মিনিট। এটা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত নয়; মাঝের স্থান মালে থেকে দক্ষিণের দ্বীপ ভারত মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি। একটি বিষয় বলা হয়, মালদ্বীপ ছোট একটি রাষ্ট্র। সত্য হলেও সেটা স্থলভাগ এর উপর নির্ভর করেই বলা হয়। মাত্র ৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়োতন হলেও সমুদ্রসহ এর আয়োতন ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার। অথচ আয়তনে সবচেয়ে ছোট যেলা বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জ ৬৮৪ বর্গকিলোমিটার। আড্ডুসিটির সাথে আরও কিছু দ্বীপ একীভূত হয়েছে। যেমন : মারাদু, গান গ্যান, হিতাদু, ফেদু, হুলহুদু, মিদধু। এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। শ্রীলঙ্কা, ভারত যাতাওয়াত করা যায়। ফাকা ময়দান ও মসজিদে মোট দুটি দারস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মানুষের আন্তরিকতা বর্ণনা দেয়ার মতো মাশাআল্লাহ। দ্বীনের ব্যাপারে যদিও তারা গাফেল। অধিকাংশ প্রবাসী কুমিল্লা যেলার। চাইলে দেশে থেকেও কুমিল্লা অঞ্চলে গিয়ে তাদের সাথে বসে দা‘ওয়াতী কাজ করা যায়।

উকুলহাস/উকুলুহাস

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আসলেই বিখ্যাত, শান্ত আর সবুজ এই দ্বীপটি। রাজধানী মালে থেকে বিশেষ বাহন স্পিডবোট দিয়ে প্রায় ২.৩০ ঘন্টা সময় নিয়ে মাঝ সাগর দিয়ে সেখানে যেতে হয়। মালে থেকে সাগরকে যেভাবে দেখা যায়, সাগরকে ভিন্নভাবে দেখার মহাসুযোগ এটা। মোবাইলে ডিজিটাল মিটার ইন্সটল করে দেখলাম স্পীডবোট ৭৫-৮০ কি.মি. গতিবেগে উকুলহাস এর দিকে ছুটলো। মালে থেকে উকুলুহাস-এর পথে সাগরযাত্রা এটা শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া না, বরং এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে শহর থেকে নীলের দেশে ঢুকে পড়া।

মালে-এর ব্যস্ততার জীবন পেছনে ফেলে স্পিডবোট যখন ধীরে ধীরে গভীর জলে ঢোকে, তখনই বদলে যায় দৃশ্যপট। কংক্রিটের শহর পেছনে মিলিয়ে যায়, সামনে খুলে যায় অসীম নীল সমুদ্র সুবহানাল্লাহ! ইঞ্জিনের গর্জন, পানির ওপর দিয়ে ছুটে চলার শব্দ, আর মুখে লেগে থাকা লোনা বাতাস, সব মিলিয়ে এক ধরনের ভালোলাগা তৈরি করে। স্পিডবোট যত গতি পায়, ততই সাগরের ঢেউগুলো যেন খেলতে শুরু করে। কখনও নৌকা হালকা লাফ দেয়, কখনও মসৃণভাবে পানির ওপর স্লাইড করে। মনে হয় ঢেউয়ের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আবার এই ওঠা-নামার মাঝেই বুকের ভেতর হালকা ধুকধুকানি ভয় আর আনন্দের মিশ্রণ। কখনও হঠাৎ উড়ে যায় উড়ুক্কু মাছ, কখনও ভাগ্যগুণে দূরে দেখা যাবে ডলফিনের ছায়া, মনে হয় যেন সমুদ্র নিজেই তার গোপন সৌন্দর্য দেখাচ্ছে। আল্লাহু আকবার!

চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য। চারদিকে শুধু পানি আর পানি, কিন্তু সেই পানির রং কিন্তু একঘেয়ে নয়। মালদ্বীপে পানির রং নিয়েই আলাদা শেড আলাদা গল্প বলা যায় অনায়াসেই। চুলে বাতাস লাগা, চোখে সূর্যের আলো, আর সামনে অসীম দিগন্ত, মনে হয় সব চিন্তা কোথাও হারিয়ে গেছে। এটা এমন এক মুহূর্ত, যেখানে দুনিয়া বিমুখতার চিন্তা খুব সহজ হয়ে যায়, যাতে সাংসারিক বা কাজের কোন তাড়া বা চাপ অনুভূত হয় না। যখন উকুলুহাস ধীরে ধীরে কাছে আসে, তখন সাগরের রং আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। নিচে দেখা যায় বালির তল, ছোট-বড় মাছের ঝাঁক। অভূতপূর্ব দৃশ্য মাশআল্লাহ।

দা‘ওয়াতী কাজের অফুরন্ত সুযোগ

মালদ্বীপের বাসিন্দার তুলনায় সেখানে বাঙ্গালী আছে পরিমাণে অনেক বেশী। প্রায় ১ লক্ষ ৩ হাজার। শিরক-বিদ‘আত ও মাযার-ফকিরের দেশ থেকে যাওয়া অধিকাংশ বাঙ্গালীই পীরপন্থী, মাযারপন্থী, শিরক ও বিদ‘আতের সাথে সম্পৃক্ত। তাদের শুধু ছালাতের দা‘ওয়াত দিয়ে ভালো পথে আনা সম্ভব না। আল্লাহর পরিচয়, দ্বীনের পরিচয় ও নবীর পরিচয়, আক্বীদা, তাওহীদ ইত্যাদি বিষয়ে দা‘ওয়াত খুবই জরুরী। শতভাগ মুসলিমদের দেশ হওয়াই এ ধরণের দা‘ওয়াতী কাজ করা সহজ। যদিও পুরো পৃথিবীই তাওহীদ বিরোধী, সেক্ষেত্রে মালদ্বীপে ‘জামঈয়াতুস সালাফ’ নামক একটি সরকার সমর্থিত সালাফী সংগঠন আছে, যারা নিয়মিত সালাফী দা‘ওয়াত নিয়ে কাজ করে থাকেন। যেখানে সেদেশের প্রায় ৬৫ জন মাদানী যুক্ত মাশাআল্লাহ। যাদের অনেকের সাথেই দেখা ও আলাপ এর সুযোগ হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়ায, উম্মুল কুরা সহ সঊদীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা আলেমরা এ কাজে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। শায়খদের নিকটই জানলাম পূর্বে তাদের দাড়ি রাখাও নিষেধ ছিল- যা আজ থেকে ২০ বছর পূর্বের ঘটনা। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জামঈয়াতুস সালাফ’-এর মাধ্যমে দা‘ওয়াতী কাজই তাদের হিজাব ও দাড়ির বিষয়টি সহজ করেছে। যখন মদীনা থেকে তারা বাড়ী আসতো, তাদের দাড়ি মুন্ডন করে দেশে ঢুকতে হতো। পুরো দেশের রাস্তায় কোথাও একজনও হিজাবী মহিলা পাওয়া যেত না। যারা পর্দা করতো গ্রাম-গঞ্জে ব্যক্তিগতভাবে করতে পারতো। এগুলো সবই ছিল পূর্বের শাসকদের যুলুম। দা‘ওয়াতী কাজের সুবাদে দেশের প্রায় অঞ্চলে যাওয়া ও দেখার সুযোগ হয়েছে। তাতে এ অভিজ্ঞতাও হয়েছে, বাঙ্গালির অধিকাংশই দ্বীন বুঝে না। ৫০০ মানুষের একটি জমায়েতে জিজ্ঞেস করি আপনারা কুরআন কে কে জানেন? উত্তরে ১০জনও পাইনি। ব্যাসিক কিছু প্রশ্ন, যার মাধ্যমে কবর পার হতে হবে, এমন প্রশ্নেরও সন্তষজনক উত্তর পাইনি।

দ্বীপের মাঝেও ছোট ছোট বিস্ময়

সে দেশের ধর্মমন্ত্রী পিএইচ.ডি ডিগ্রীধারী তিনি নিজেই ইমামতি করেন। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ড. মুহাম্মাদ শাহীম আলী সাঈদ মাদানী নিজেই এশার ছালাতের ও বিতর ছালাতের ইমামতি করলেন। ৮ রাকা‘আত তারাবিহর সময় পাশাপাশিই পায়ে পা মিলিয়ে ছালাত আদায় করলাম। তেলাওয়াত যেমন মাশাআল্লাহ সুন্দর, অনুরূপ ব্যবহারও। একবারের জন্যও তাকে মন্ত্রী মনে হয়নি আমার। আসলে আমাদের শেখার আছে অনেক। একজন মন্ত্রী কেন, প্রেসিডেন্ট হয়েও তারা অহংকার করেন না। রাস্তায় কোন প্রটোকল ব্যবহার করেন না; বরং সবাই যথেষ্ঠ সম্মান করেন, গাড়ি দেখলে কোন সাইরেন না বাজালেও সাধারণ চোখে দেখেই সেই গাড়িকে এগিয়ে দেয়ার চেষ্টায় থাকেন।

প্রেসিডেন্ট নিজেই তারাবিহ পড়েন। হ্যাঁ এটা সত্য যে, তাকেও মরতে হবে এবং কবরে প্রশ্নোত্তর দিতে হবে। কিন্তু দুনিয়ার বাস্তবতায় এগুলো বিরল বলেই মনে হয়। আমি গল্প করছিলাম শাইখ আহমদ সামিরের সাথে। তিনি বললেন, মন্ত্রী কেন, দেশের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাইজ্জু নিজেই পুরো তারাবির ছালাত জাতীয় মসজিদে আদায় করেন। কোন সিকিউরিটি নেই, এক্সট্রা কোন পুলিশের সায়রনওয়ালা গাড়িও নেই সুবহানাল্লাহ! এ যেন সালাফদের যুগের খলীফাদের চলাচলের মত।

ঈদের ছালাত আদায় করলাম দেশের সবচেয়ে বড় জামা‘আত বা জাতীয় জামা‘আতে। আমি মাঠে ছালাতের সিদ্ধান্ত নিলাম। আগে আগে উপস্থিত হওয়ায় সামনের কাতারে জায়গা পেলাম। ছালাত শুরুর ১০ মিনিট আগে দেখলাম দুইটা গাড়ি সহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আসতেছেন। দেখলাম প্রেসিডেন্ট বাউন্ডারির বাহিরে সিকিউরিটি রেখে একাই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসলেন ইমামের কাতারের পেছনে। শুধু সাংবাদিকেরা ছবি তুলতেছেন। তবে কারো সাথে তিনি একটি ছবিও তুলবেন না। আশ্চর্য হলাম সাধারণ একটি শার্ট প্যান্ট পরা মানুষ, এদেশের নাকি প্রেসিডেন্ট। ছালাত শেষ করে ২০ শে মার্চ অর্থাৎ ঈদের দিন দুপুর আড়াইটায় রওনা দিয়ে সাতটার দিকে বাংলাদেশে পৌঁছেছি আলহামদুলিল্লাহ।

পরিশেষে বলা যায়, মালদ্বীপের সৌন্দর্য শুধু চোখকে মুগ্ধ করে না; হৃদয়কেও নাড়া দেয়। সূর্যাস্তের সময় আকাশ ও সমুদ্রের রঙের অপূর্ব মিশ্রণ যেন এক নীরব শিল্পকর্ম। সন্ধ্যার সময় ঢেউয়ের মৃদু শব্দ শুনতে শুনতে মনে হয়েছে, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে মানুষ কত সহজে দূরে সরে যেতে পারে! প্রকৃতির এত সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর কুদরতের কথা আরও গভীরভাবে অনুভব করা যায়।

এই ভ্রমণ আমাকে শুধু আনন্দই দেয়নি; বরং নতুন এক উপলব্ধিও দিয়েছে। মানুষ যত আধুনিকই হোক না কেন, প্রকৃতির সান্নিধ্য ছাড়া প্রকৃত প্রশান্তি পাওয়া কঠিন। মালদ্বীপের নীল জলরাশি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও শান্ত আবহাওয়া আমাকে শিখিয়েছে, প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতিও মানুষকে শান্তি ফিরিয়ে দেয়।


জীবনের ব্যস্ততার মাঝে মালদ্বীপ ভ্রমণ আমার জন্য ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। স্মৃতির পাতায় এই সফর দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ। একরাম, আব্দুল কাদের, শরিফ, ওমর ফারুক, রেজাউল করিম, দিন ইসলাম, ইয়াসিন, ইউনুস, আমজাদ, রানা, জাহিদ, আযাদ ভাই সহ মালদ্বীপের সকল সঙ্গীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। মহান আল্লাহ আমার এ সফরকে কবুল করুন, দা‘ওয়াতি কাজগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করুন এবং এ সফরের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন-আমীন!!




প্রসঙ্গসমূহ »: ভ্রমণ স্মৃতি

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ