ভাইরাস জ্বর : প্রয়োজন সতর্কতা
-ডা. মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম হৃদয়*
এই মুহূর্তে একটা নতুন ধরনের ভাইরাস জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ডেংগু বা চিকনগুনিয়া নয়, তবে লক্ষণগুলো ভয়াবহ এবং অনেকেই এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ভাইরাল ফিভার বা ভাইরাস জ্বর বছরের যেকোনো সময় হতে পারে। তবে আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় এই রোগ বেশি হতে দেখা যায়। ক্রমে এই ভাইরাসজনিত রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একসঙ্গে পরিবারের অনেকেই আক্রান্ত হতে পারে। কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে এমন ভাইরাল জ্বর পরিবারের সবাইকে আক্রান্ত করতে পারে না। জ্বরের শুরুতে এর প্রকৃতি নিরূপণ করা না গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জ্বরের ধরন ও বিভিন্ন উপসর্গ দেখেই ভাইরাল জ্বর নির্ণয় করা যায়।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভাইরাল জ্বরে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অন্যান্য ভাইরাল জ্বরের মতো এটিও আপনা-আপনি সাধারণত ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। ভাইরাসজনিত জ্বরের অন্যান্য রোগের মতো এরও কোনো প্রতিষেধক নেই, টিকাও নেই। লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হয়।
ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ
হঠাৎ করে তীব্র জ্বর (১০২-১০৩ ডিগ্রি)। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড ব্যথা (মাসল, জয়েন্ট, চোখ, পিঠ) মাথা ব্যাথা। শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়, প্রচণ্ড দুর্বলতা, মাথা ঘোরা। প্রেসার লো হয়ে যেতে পারে। চোখ লাল হওয়া, বেশির ভাগ সময় জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকে। বিশেষ ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। মুখে বিস্বাদ, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য হয় ইত্যাদি। জ্বর নেমে যাওয়ার পরও শরীরের ব্যথা রয়ে যায় অনেকদিন এবং প্রচুর দুর্বল থাকে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বাচ্চার মুখ লাল হয়ে যায়, গা প্রচণ্ড গরম থাকে, মাথা ব্যথা করে, সঙ্গে থাকে সর্দি ও কাশি। সব সময় মাথা ভারী মনে হয়। এতে বাচ্চারা দুর্বল হয়ে পড়ে।
চিকিৎসা ও পরামর্শ
আমরা যখন অসুস্থ হই, মহান আল্লাহই আমাদের সুস্থতা দান করেন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন, وَ اِذَا مَرِضۡتُ فَہُوَ یَشۡفِیۡنِ ‘আর যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনি আমাকে আরোগ্য করেন’ (সূরা আশ-শু‘আরা : ৮০)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً ‘আল্লাহ তা‘আলা এমন কোন রোগ নাযিল করেননি, যার ঔষধ সৃষ্টি করেননি।[১] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ فَإِذَا أُصِيْبَ دَوَاءٌ الدَّاءَ بَرَأَ بِإِذْنِ اللهِ ‘প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ রয়েছে। সুতরাং রোগের জন্য যখন সঠিক ঔষধ ব্যবহৃত হয়, তখন আল্লাহর হুকুমে রোগী রোগমুক্ত হয়ে যায়।[২] রোগীর জন্য চিকিৎসা ও পরামর্শ হলো,
১. জ্বর থাকলে জ্বর কমানোর ও শরীরের ব্যথা কমার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা। ২. জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাথা ধুয়ে দেওয়া। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, জ্বরের উৎপত্তি জাহান্নামের তাপ হতে। সুতরাং তোমরা পানি দ্বারা তা ঠাণ্ডা কর।[৩] ৩. খাওয়া-দাওয়া স্বাভাবিক রাখা এবং বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূল খাওয়া। ভিটামিন সি-যুক্ত ফল : মাল্টা, কমলা, লেবু, আমলকি আমড়া, পেয়ারা। জিঙ্ক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার : কলা, পাকা পেঁপে, ডিমের কুসুম। প্রোটিন : ডিম (সিদ্ধ), চিকেন স্যুপ, ডাল, খিচুড়ি মাছ। বিশুদ্ধ পানি বেশি করে খাওয়া। দিনে অন্তত ৩ লিটার ( স্যালাইন বা লেবুর শরবত খাওয়া যেতে পারে) তবে চিনি খাওয়া মোটেই ঠিক নয়। ৪. বমি করলে বমির মেডিসিন দিয়ে বমি বন্ধ করার চেষ্টা করা। ৫. অন্য কোন উপসর্গ দেখা দিলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শমতো চিকিৎসা করা ৬. বিশ্রামে থাকা। ৭. সর্দি-কাশি, গলাব্যথা হলে সকাল-বিকেল চা বা কফি খাওয়া যেতে পারে ৮. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া। ৯. মধু পান করা। কেননা মধুর মধ্যে নিরাময় রয়েছে।[৪] ১০. কালজিরা খাওয়া। কেননা কালজিরার মধ্যে মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের ঔষধ রয়েছে।[৫]
জ্বর হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক?
কোনো সুনির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনোসিসে পৌঁছার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দিলে প্রকৃত রোগটি অনেক সময় ধরা পড়ে না। সুচিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। জ্বর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যান্টিবায়োটিক দিলে বাচ্চাদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার সুযোগও হয় না। তাই অন্তত দুই দিন না গেলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। মনে রাখবেন মেনিনজাইটিস বা সেপটিসেমিয়া ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দেরি করে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে কোনো অসুবিধা নেই।
সাবধানতা
ভাইরাসের কারণে জ্বর থেকে শরীরে দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন না করলে ভাইরাল জ্বর রূপ নেয় নানা জটিল রোগে। যেমন : নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, ডায়রিয়া, সাইনোসাইটিস ইত্যাদি। এমনকি মস্তিষ্কেরও ক্ষতি করতে পারে। এক্ষেত্রে মাম্পস, টিটেনাস, চিকেন পক্স, পোলিও, হেপাটাইটিস, স্মল পক্স, টিকা শিশুদের যথা সময়ে দিতে হবে। ভাইরাল জ্বর হলে রোগীকে একটু আলাদা রাখতে হবে। জ্বর হওয়ামাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
যে চার ধরণের জ্বর হঠাৎ করেই মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে
১. ডেঙ্গু
রোগীর দু-একদিন জ্বর, অল্প গলাব্যথা, কাশি, হঠাৎ করে অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়া, শক সিনড্রোম হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, পালস না পাওয়া, ব্লাড প্রেশার না পাওয়া যায় না এবং অনেকেই মারা যাচ্ছে। প্রায়ই মারা যাচ্ছে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে। কেউ যদি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তাহলে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো যায়। ডেঙ্গু রোগীদের শরীরের যে কোন জায়গা থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ মানেই তা হেমারেজিক ডেঙ্গুতে রূপ নিয়েছে। হেমারেজিক ডেঙ্গুতে চোখে রক্ত জমে যায়; নাক, দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত ঝরে; মুখ, কান, মলদ্বার এরকম যেকোনো একটি বা একের অধিক অংশ দিয়ে রক্ত বের হতে পারে। বমি ও কাশির সাথেও রক্ত বের হতে পারে। হেমারেজিক ডেঙ্গুতে রোগী মারা যেতে পারে যদি ব্রেইন, হার্ট এরকম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে যদি হেমারেজ হয়।
২. ইয়োলো ফিভার বা হলুদ জ্বর
ইয়োলো ফিভার বা হলুদ জ্বর মশার কামড়ে ছড়ায় এবং এই মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। এডিস এবং হেমাগোগাস মশার কামড়ে এই জ্বর ছড়ায়। হলুদ জ্বরের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাংসপেশী ব্যথা, মাথাব্যথা, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব বা বমি। সাধারণত ৩-৬ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে খুবই কম সংখ্যক রোগী এই জ্বরে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক এসব উপসর্গ থেকে সেরে ওঠার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে পৌছায়। এই ধাপে, শরীরের তাপমাত্রা প্রচণ্ড বেড়ে যায় এবং আবারো জ্বর আসে, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিশেষ করে লিভার এবং কিডনি আক্রান্ত হয়। এই ধাপে মানুষ জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। শরীরের ত্বক এবং চোখে হলুদ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মূত্র গাঢ় রঙের হয়, পেট ব্যথা এবং বমি হয়। মুখ, নাক, চোখ বা পেটে রক্তক্ষরণ হতে পারে। যেসব রোগী এই ধাপে পৌঁছায় তাদের মধ্যে অর্ধেকই ৭-১০ দিনের মধ্যে মারা যায়।
৩. ম্যালেরিয়া
কারো যদি জ্বর থাকে এবং জ্বরের সাথে সাথে ঠান্ডা, মাথাব্যথা, ক্লান্তিভাব, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি ও নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হয় তাহলে দেরি না করে তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ এসব লক্ষণ প্রাণঘাতি হতে পারে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে এ ধরণের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অ্যানোফিলিস নামে এক ধরণের স্ত্রী মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে বা তার ব্যবহৃত সুঁচ ব্যবহারের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। প্রাথমিক উপসর্গগুলো সাধারণ জ্বর আক্রান্তের মতোই মৃদু হয় এবং ম্যালেরিয়া বলে সনাক্ত করাও কঠিন। তবে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা যেতে পারে।
৪. টাইফয়েড জ্বর
টাইফয়েডের অন্যতম উপসর্গ হচ্ছে উচ্চমাত্রায় জ্বর। এছাড়া প্রচণ্ড ক্লান্তি, মাথাব্যথা, বমি, পেট ব্যথা এবং আমাশয় ও ডায়রিয়াও থাকে। জ্বরের সাথে এ ধরণের উপসর্গ অনেক সময় প্রাণঘাতি হয়। তাই চিকিৎসকের এ ধরণের উপসর্গ দেখলে চিকিৎসকের কাছে নেয়ার পরামর্শ দেন। টাইফয়েডে আক্রান্ত অনেক রোগীর দেহে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এটি মারাত্মক আকার ধারণ করলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। সালমোনেলা টাইফি নামে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে টাইফয়েড ছড়ায় যা প্রাণঘাতি একটি রোগ। এই ব্যাকটেরিয়া একবার শরীরে ঢুকে পড়লে তা বিভাজিত হতে থাকে এবং এটি রক্তে মিশে যায়। সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে এটি ছড়ায়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে টাইফয়েড সনাক্ত করা যায়।
* এমবিবিএস (ডিইউ), পিজিটি (মেডিসিন), সিএমইউ (আল্ট্রা), সিসিডি (বারডেম), স্পেশাল ট্রেইন্ড ইন ডার্মাটোলজি, নিউরোলজি রিউমাটোলজি, মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন বিভাগ), আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বসুন্ধরা, ঢাকা।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৭৮।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২০৪।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২২১০।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৮০।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২২১৫।
প্রসঙ্গসমূহ »:
চিকিৎসা